নাম : আবদুল হামিদ

পিতা : আলহাজ মনিরউদ্দীন আহমদ

গ্রাম/ মহল্লা : গৌরিপাড়া,

পৌরসভা : ফুলবাড়ি,

ডাক : ফুলবাড়ি

থানা : ফুলবাড়ি,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : বি. এ.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৮

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র,

বর্তমান পেশা : শিক্ষকতা

 

 

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে  আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: ঠিক আক্রান্ত না, যুদ্ধ করার সময় আহত হয়েছি

 

প্র: কিভাবে সেটা ?

 

উ: এটা মালদহর মেহেদীপুরেসেখানে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে আমি যুদ্ধ করিএখানে যুদ্ধ করার সময় একদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোঁড়া একটা শেল আমার ৫০ গজ দরে মাটিতে পড়ে বিস্ফোরিত হয়তার কয়েকটা ছোট টুকরা আমার শরীরের হাতে-মুখে এবং পায়ে আঘাত করলে আমি আহত হইসেখান থেকে আমাকে মালদহ হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়হসপিটালে চিকিৎসা নিয়ে আমি সুস' হইকিন্তু আমার সহযোদ্ধা আজমল হোসেন ঐ শেলের বড় টুকরার আঘাতে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেতার দেহ খন্ডবিখন্ড হয়ে গেছিলোতার বাড়ি আমার এলাকাতেইওটা টু ইঞ্চ মর্টারের গোলা ছিলো

 

প্র: আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ? আপনার ট্রেনিং গ্রহণের বিষয়টি বিস্তারিত বলবেন কি ?

 

উ: ১৯৭১ সালে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আমি ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেইসেখানে আমি ট্রেনিং সেন্টারে যোগদান করিএরপর সেখান থেকে আমাদের হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য শিলিগুড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়পানিহাটা নামক স্হানে আমাদের প্রশিক্ষণ হয়সেখানে ট্রেনিং শেষ করার পরে লং রেঞ্জ ফায়ারের জন্য আমাদেরকে আবার মেঘালয় নিয়ে যাওয়া হয়সেই প্রশিক্ষণ শেষ করার পর আমাদেরকে সর্বপ্রথম মালদহের মেহেদীপুরে পাঠানো হয়সেখানে আমরা দীর্ঘদিন অবস্হান করিসেখানে আমরা ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে যুদ্ধ করি

 

প্র: আর কোন্‌ কোন্‌ এলাকায় আপনারা যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: মেহেদীপুরের কলাবাড়িতে যুদ্ধ করেছিওখান থেকে আমরা পরে রাজশাহীতে গেছিরাজশাহী থেকে আমরা পুনরায় বগুড়াতে যাইবগুড়াতেও আমরা যুদ্ধ করেছিডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে যুদ্ধ চলাকালে মেহেদীপুরে শত্রু পক্ষের একটা গোলার আঘাতে মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সাহেব শাহদাত বরণ করেনরাজশাহীর সোনা মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়তিনি আমাদের কমান্ডার ছিলেন

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানিরা আমাদের এলাকায় আক্রমণ চালায়এখন আমি বলতে পারি- তাদের সঙ্গে ছিলো সাঁজোয়া গাড়ি এবং দরপাল্লার অস্ত্র শস্ত্রএ সব নিয়েই তারা আমাদের এলাকায় আক্রমণ চালাইছিলো

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আপনার এলাকায় কি করলো ?

 

উ: এখানে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছেঘরবাড়ি জ্বালাই পুড়াই দিছে এবং অত্র এলাকার মা-বোনদের ইজ্জত তারা নষ্ট করছে

 

প্র: আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: নাআমার পরিবারের কেউ শহীদ হয় নাইতবে আমার বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি তারা করেছেলুটপাট এবং অগ্নি সংযোগও করেছে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: ট্রেনিং শেষ হওয়ার পরই আমার এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়এটা জুন মাসের পর থেকে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে সাধারণ জনগণের ধারণা কেমন ছিলো ?

 

উ: এ দেশের সাধারণ মানুষ মনে করতেন, এ দেশ আমাদের, আমরা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিসংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও পাকিস্তানিরা আমাদের ক্ষমতা দেয়নিএখন যুদ্ধ চলছেএই যুদ্ধে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিতআমাদের বিজয় সুনিশ্চিত এটাই তারা মনে করতোবিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তারা সাহায্য সহযোগিতা করেছেঅনেক টাইমে তাদেরকে খাবার দিছে, রাসা দেখাই দিছেশত্রু কোন্‌ রাসা দিয়ে চলাফেরা করে, কোথায় কোথায় তাদের আসানা, কোথায় যায় ইত্যাদি সব কিছু নির্দেশ করে দিয়েছে. অত্র এলাকার মানে আমার এলাকার লোকজন

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় রাজাকার কারা ছিলো ?

 

উ: এখানে রাজাকারের কথা বলতে গেলে, আমাকে কিছু কথা বলতে হয়এক শ্রেণীর লোক এ দেশের মাটি ছেড়ে ভারতে যাই নাইতারা পরোক্ষভাবে রাতের বেলা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছে, রাসা দেখাইছে, খাবার দিছেঅন্যদিকে আর একটা অংশ নিজের জীবন বাঁচাবার তাগিদে অনেক টাইমে রাজাকার হয়েছিলোদিনের বেলা তারা হয়তো লোক দেখানোভাবে খান সেনাদের বা বিহারী রাজাকার বাহিনীদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে, কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা আবার মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতাও করছেতারপরও কয়েকজন খারাপ রাজাকার ছিলো আমার এলাকায়

   

সালামসহ এ রকম আরও অনেকই ছিলো খারাপ রাজাকারআর পিস কমিটির যারা মেম্বার ছিলো তাদের অনেকেই হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করতোএলাকায় যাতে করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শানিতে থাকতে পারে, সে জন্য তারা পিস কমিটি গঠন করেসেই টাইমে স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিলোসেই সব স্কুল কলেজ পাকিস্তানিরা তাদের দালালদের মাধ্যমে কিছু চালু করেছিলোতারা লোকজনকে ডাকি নিয়া আসি গ্রামে হাটবাজার বসাইতোহাট বাজার লাগাইতোপিস কমিটির উপর তারা প্রশাসনিক দায়িত্বও দিয়েছিলোজনগণ যাতে করে পাকিস্তানি হানাদারদের সাহায্য সহযোগিতা করেতখনকার পর্ব পাকিস্তানে একটা নরমাল পজিশন আনার চিন্তা ভাবনা তারা করতোকিন্তু তারা সফল হয় নাইএখানে পিস কমিটিতে ছিলো--মমিন, আবদুস সামাদ, জামির মিয়াআরো ছিলোওদের অনেকেই এখন মারা গেছেআবার অনেকে বৃদ্ধ হয়ে গেছে

 

প্র: এ সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: সেই টাইমে দেশ যখন স্বাধীন হয়ে গেলো তখন আমরা মনে প্রাণে চাইছিলাম যে এদের ধরে সুষ্ঠু একটা বিচার করা হোকবিচার করে শাস্তি দেয়া হোকএরা এ দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেকিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ওদের সাধারণ ক্ষমা করে দিলেনএই সাধারণ ক্ষমার কারণে তারা বাঁইচা গেলোরাজাকার-দালালদের যদি বিচার হতো, তাহলে আজকে হয়তো শেখ মুজিবুর রহমানকে মরতে হতো না

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি দেখলেন ?

 

উ: আমি যুদ্ধের শেষে বাড়িতে ফিরে দেখি স্কুল-কলেজ সম্পূর্ন বিধ্বস্ত হয়ে গেছেআমি যে এলাকায় থাকতাম, এসে দেখি যে, সেখানে বহু বাড়িঘর ভাঙি গেছেখানরা বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়াই দিছে, সেই ধ্বংসস্তুপ আমি স্বচক্ষে দেখছি

 

প্র: ব্রিজ, কালভার্ট, মসজিদ-মন্দির ?

 

উ: ব্রিজ কালভার্ট দেখলাম সম্পূর্ন ধ্বংসমন্দির দেখলাম সম্পূর্ন ধ্বংসমসজিদ ভালো ছিলো

 

প্র: আপনার অস কি করলেন ?

 

উ: আমি আমার অস জমা দিয়েছি বগুড়াতে

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : অক্টোবর ২৭, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৬৯