নাম : আবদুল কুদ্দুস

গ্রাম : কসবা

ডাক : কসবা

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ২০/২১

১৯৭১ সালে পেশা : কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র

বর্তমান পেশা : রাজনীতি

 

 

 

কলেজ ছাত্র আবদুল কুদ্দুস পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মার্চ মাসেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেনকসবার পতন ঘটলে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনিপ্রশিক্ষণ শেষে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসাবে যুদ্ধে অংশ নেনআবদুল কুদ্দুস জানিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা

 

প্র: ২৫-২৬ মার্চ ঢাকাতে পাকসেনাদের আক্রমণ সম্পর্কে আপনারা তখন কি শুনেছেন?

 

উ: আমরা শুনেছি যে ২৫শে মার্চ রাতের বেলা হানাদার বাহিনী অতর্কিত ঢাকা নগরীতে হামলা চালাইছেসাধারণ মানুষ,জানীতিবিদ,বুদ্ধিজীবী,শিক্ষাবিদ প্রত্যেকের উপরে তারা গোলা বর্ষণ করতে আরম্ভ করছেবাসা থেকে ধরে নিয়া যাইতেছেতখন দেশে একটা হাহাকারের সৃষ্টি হইয়া গেলমানুষ দলে দলে ঢাকা ছাড়তে আরম্ভ করলো

 

প্র: কিভাবে শুনেছেন?

 

উ: লোকজন যে আসা যাওয়া করতাছে এদের মাধ্যমেমানুষ পায়ে হাইট্যা,কেউ গাড়ি-ঘোড়া দিয়া,যেভাবে হউক জীবন বাঁচাবার তাগিদে আইসা পড়তে লাগলগ্রামে ফিরা আইলোএদের মাধ্যমেই সব শুনছি

 

প্র: আপনার তখন কি মনে হয়েছিল?

 

উ: তখনতো আমরা ভাষা জ্ঞানই হারাইয়া ফেলছিআমরা কি করবো এখন? কোথায় যাব? আমরা এরপর সংগঠিত হইছিলামছাত্রলীগ,আওয়ামী লীগ,আনসার এবং আরো অনেককে নিয়া আমরা একটা সংগঠন তৈয়ার করলামহানাদার বাহিনী আমাদের যাতে আক্রমণ করতে না পারে এবং আক্রমণ করলেও যাতে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি সেইজন্য ব্যারিকেড সৃষ্টি কইরা আনসারদের হাতে অস্ত্র দিলামথানা থেইক্যা অস্ত্র দেওয়া হইলব্যারিকেড সৃষ্টি করলাম ২৬ শে মার্চের পরেআমরা প্রাথমিকভাবে কসবাতে ইপিআর ক্যাম্পে যে অবাঙালি ৩ জন ছিল এদেরকে মাইরা ফেলার লাইগ্যা একটা পরিকল্পনা করলাম এবং আমরা সাকসেসফুল হইলামকসবায় পাকসেনা আসার ১০/১৫ দিন আগেই একাজ করেছিলামহাজার হাজার লোক একাজে সহযোগিতা করছেঐ ক্যাম্পে বাঙালি ইপিআর এর যে সদস্য ছিল-তারাও আমাদেরকে সহযোগিতা করছেতাদের সহযোগিতার জন্যইতো আমরা সাকসেসফুল হইছিনয়তো হওয়ার কথা না

 

প্র: ১৯৭১ এ আপনি কি আক্রান্ত হয়েছিলেন?

 

উ: যুদ্ধে আমি ঠিক আক্রান্ত হই নাই২৫শে মার্চে ঢাকাতে গোলাগুলি আরম্ভ হওয়ার বেশি কিছু পরে কসবাতে আসলেন গাফফার সাবহায়দার সাব আসলেনবাহার সাব আসলেনউনারা কসবাতে আসার পর উনাদের সাথে আমরা একটা যোগসূত্র রক্ষা কইরা চলছিতাঁরা কসবায় থাকতেন এম.পি এমদাদুল বারী সাহেবের বাড়িতেকেবল দিনের বেলাতেই থাকতেন,রাত্রে আবার ভারতের ভিতরে চইলা যাইতেনতাঁরা আমাকে এবং আমার বন্ধু তাজুলকে ডাইক্যা নিয়া বললেন যে,কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পাক আর্মি নানা জায়গায় মুভ করবেকাজেই যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি

 

প্র: পাকসেনারা কিভাবে আপনার এলাকা আক্রমণ করলো?

 

উ: তারা ঐ কুঠির রাস্তা থেইকাই গোলাগুলি করতে করতে কসবাতে ঢুইকা পড়লোশেষ পর্যন্ত তারা টি. আলী সাহেবের বাড়িতে আইসা ক্যাম্প তৈয়ার করল্‌ আমরা কিছু প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিলামগুলি করছিলাম আমরাআমাদের সঙ্গে কিছু আনসারের লোকজন ছিলযেমন- আবদু মিয়া,হাশেম ভাই এই রকম আরও কিছু লোকজন ছিলসে সময় ছাত্রলীগের আমি ছিলাম,দাদুল,শাহ আলম,মানিক,কাইউম ভাই এরা ছিলেনকিন্তু টিকতে পারি নাইপাকসেনারা আইস্যা প্রচুর গোলাগুরি করছেআমরা ভারতে চইলা গেলামএরপর তারা বাড়িঘর পুড়াইতে আরম্ভ করলোলুটতরাজ আরম্ভ করলোনির্যাতন শুরু করলো

 

প্র: আপনাসের সাব-সেক্টর কমান্ডার তখন কে ছিলেন?

 

উ: আমাদের মুজিব বাহিনীর সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সৈয়দ রেজাউর রহমানআর হাই কমান্ড ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি

 

প্র: আপনি মুজিব বাহিনীতে ছিলেন?

 

উ: জ্বিআমি মুজিব বাহিনীর থানা কমান্ডার ছিলাম

 

প্র: আপনার কোনো অপারেশনের কথা মনে পড়ে? দু-একটা অপারেশনের কথা বলবেন?

 

উ: আমি তখন মুরাদনগর থানায় কাজ করিআমি একদিন এক রাজাকারের বাড়িতে গেলাম তাকে ধরার জন্যসে রাজাকারের নেতা ছিলআমরা চতুর্দিক দিয়া বাড়িটা বেড় দিলামবর্ষাকাল ছিলবেড় দেওয়ার পর দেখলাম যে মহিলা ছাড়া কোনো লোকজন নাইহঠাৎ কইরা আমার চোখে পড়লো একটা মেয়েগ্রাম অঞ্চলে যে খুটার উপর পায়খানা থাকে মেয়েটি সেই পায়খানার গর্তে পইড়া আছে খুটাটা ধইরাতখন আমি মেয়েটাকে হাতে ধইরা তুললামসে আমার ভয়ে,লোকজনদের ভয়ে অস্হিতখন আমি বললাম যে তোমার কোন বাড়ি? বললো যে আমি ঐ বাড়িরবললাম যে ওমুক তোমার কি হয়? সে বললো,আমার চাচা হয়উনি তো গোডাউনে াককে বাড়িত আসে না আপনাদের ভয়ে ঐ গোডানের তখন রাজাকাররা থাকতোএরপর আমরা চইলা গেলামএই রকম বহু ঘটনা যুদ্ধ করতে যাইয়া ঘটছেচারগাছ যুদ্ধে ছিলামঐখানে আমাদের ভাই শাকুর,মোজাম্মেল সহ ৬/৭ জন নির্মমভাবে মারা যায় পাঞ্জাবিদের গুলিতেঐখানে পাসেনাদের আক্রমণ করার সম্ভাবনা ছিল নাকথা ছিল এদেরকে আমি যাইয়া রিসিভ করবোএদেরকে সেইভাবে আসার জন্য আমরা বলছিলামওরাতো হঠাৎ কইরা ভারত থেইকা নাইম্যা আসছে চারগাছ বাজারেকিন্তু সেখানে পাঞ্জাবি ছিল বাংকার কইরাএরা মনে করছে মুক্তিবাহিনীর বাংকারবাজারের কাছাকাছি আইসাই এরা জয় বাংলাবইলা চিৎকার মারছেযেইমাত্র জয় বাংলাকইরা চিৎকার দিছে ওমনি ঐ বাংকার থেইক্যা এল. এম. জির. গুলি বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের উপরমুক্তিযোদ্ধার দলছি পথ ভুইলা মান্দারপুর জোড়পুকুর পাড়ে না উইঠ্যা তারা বাজারে আইসা পড়ছেফলে,জীবন দিতে হইছেএই ঘটনা স্বাধীনতার এক দুই মাস আগে ঘটছে

 

প্র: তখন আপনার এই এলাকায় কারা যুদ্ধ পরিচালনা করছে?

 

উ: এইখানে ক্যাপ্টেন গাফফার সাব ছিলেন

 

প্র: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে কারা কাজ করছে এই এলাকায়? আপনারা কি ভারতে গিয়া সংগঠিত হইছেন?

 

উ: হাঁ,ভারতে গিয়া সংগঠিত হইছিআমাদের মুজিব বাহিনীতে ছিলেন শেখ মণি ভাই,সৈয়দ রেজাউর রহমানএরপরে ছিল মনিরুল হক চৌধুরীউনারাই মেইন সংগঠক ছিলেনসিরাজুল হক সাহেব,তারপর মমতাজ বেগম উনারা তখন ভারতে থাইকাই মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে যারা ট্রেনিং নিতথ-উনাদের তত্ত্বাবধান করতেন

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি দেখলেন?

 

উ: গ্রামে ফিরে দেখলাম যে,গ্রাম পুড়াইয়া ছারখার করে ফেলছেমানুষের খাওয়ার ব্যবস্হা নাইবাসস্হান নাইআমি নিজেইতো স্বাধীনতার পর ছয় মাস পর্যন্ত বর্তমান যে আর্দশ স্কুল সেইখানে ঘুমাইছিআমারতো ঘর সংসার বলতে কিছুই ছিল নাবাড়িঘর একদম কিছু রাখে নাই

 

প্র: স্কুল,কলেজ,মসজিদ,মাদ্রাসা এইগুলি?

 

উ: সবকিছু ভাইংগা চুরমার কইরা ফেলছে

 

প্র: কুদ্দুস ভাই,আপনার অস্ত্র কি করলেন?

 

উ: আমি শেখ সাবের ডাকে অস্ত্র জমা দিয়া দিছিরেসকোর্স ময়দানে অস্ত্র জমা দিছি

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি কি করলেন?

 

উ: যুদ্ধের শেষে আমি বেকার অবস্হায় দিন যাপন করতে আরম্ভ করলামপুনরায় পড়াশুনা শুরু করলামকিন্তু টাকা পয়সার অভাবে আর করতে পারি নাইহঠাৎ কইরা আমার বাবা মারা গেলেনখাওয়া পরার অসুবিধা হইলছোট বোন একটা রইলসেইজন্য আমার আর লেখাপড়া করা হইয়া উঠে নাই

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : মোঃ সোলেমান খান

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ৮ আগস্ট ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৩২