নাম
:
আবদুল
কুদ্দুস
মুন্সি
পিতা
:
মৃত মুন্সি
মোঃ ইউসুফ
গ্রাম
:
বাসুদেবপুর,
ইউনিয়ন
:
হিলি
হাকিমপুর,
ডাক
:
বাংলা হিলি
থানা
:
হাকিমপুর,
জেলা
:
দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা :
ম্যাট্রিক
১৯৭১
সালে বয়স : ৪৮
১৯৭১
সালে পেশা : ব্যবসা
ও রাজনীতি
বর্তমান
পেশা : অবসর জীবন
প্র:
১৯৭০ সালের
নির্বাচন এবং
তার পরবর্তী
ঘটনা
সম্পর্কে
আপনি কি জানেন
?
উ: আমি
তখন রাজনীতির
সঙ্গে যুক্ত
ছিলাম। হাকিমপুর
থানা আওয়ামী
লীগের সভাপতি
ছিলাম। আমরা
তখন নির্বাচন
করেছি। নির্বাচনের
আগে থেকেই
আমাদের এই আশা
ছিলো যে, আমরা
সংখ্যাগরিষ্ঠ
দল হিসাবে বেরিয়ে
আসবো এবং
সত্যিই আমরা
বিজয়ী হলাম। লিগ্যাল
ফ্রেমওয়ার্কের
ভেতর দিয়ে
ইলেকশন দেয়া
হয়েছিলো। এ সময় মুসলিম
লীগ এবং
পশ্চিম পাকিস্তানি
শাসক গোষ্ঠী
বিভিন্ন রকম
পরিকল্পনা
করেছিলো যাতে
করে আওয়ামী
লীগ মেজরিটি
না পায়। ১৯৪৭
সালে দেশ
ভাগের পর
থেকেই আমরা
বাঙালিরা সকল
ক্ষেত্রে
বঞ্চিত ছিলাম। তখন মনে
হয়েছিলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ
হয়ে যদি পাকিস্তানে
আমরা সরকার
গঠন করতে পারি
এবং
বঙ্গবন্ধু
যদি প্রধানমনী
হন,
তাহলে
অবশ্যই
আমাদের যে
ডিসপেরিটিগুলো
আছে সেগুলো দর
হবে। কিন্তু
শেষ ব্যবস্হা
সেটা হয় নাই। মার্চ
মাসের
মাঝামাঝি সময়
থেকে ইয়াহিয়ার
সঙ্গে আওয়ামী
লীগের বৈঠক
চলছিলো। ক্ষমতা হস্তান্তর
নিয়ে ইয়াহিয়া
খানের উপর
আমাদের খুব
একটা আস্হা ছিলো
না। এতে
সমস্যার
সমাধান হবে
এমন আশাবাদীও
আমরা ছিলাম না। তারপরও
আলোচনা শুরু
হয়েছিলো। এমন অবস্হায়
বঙ্গবন্ধু
১৯৭১ সালের ৭
মার্চ বললেন, ‘এবারের
সংগ্রাম
স্বাধীনতার
সংগ্রাম, এবারের
সংগ্রাম
মুক্তির
সংগ্রাম’। আমরা তাঁর এই
ভাষণ শুনে
উজ্জীবিত
হলাম।
প্র:
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চ
পাকিস্তানি
সামরিক বাহিনীর
আক্রমণ
সম্পর্কে
আপনি কি
শুনেছেন ?
উ: ২৫
মার্চে পাকিস্তানি
সামরিক
বাহিনী ঢাকার
রাজারবাগ
পুলিশ লাইন, পীলখানায়
ইপিআর হেড
কোয়ার্টার
এবং
বিশ্ববিদ্যালয়ে
আক্রমণ করলো। এ সব
সংবাদ আমরা
সাথে সাথেই
পেয়ে যাই। ঢাকা আওয়ামী
লীগ অফিস থেকে
তখন আমাদের
সঙ্গে একটা
চেইন অফ
কমান্ড গড়ে
তোলা হয়েছিলো। ঢাকার
সঙ্গে
প্রত্যেকটি
ডিস্ট্রিক্টের, ডিস্ট্রিক্টের
সঙ্গে মহকুমা
এবং থানার যোগাযোগ
আমরা রক্ষা করতাম, যার ফলে
আমরা সাথে
সাথে এ খবরটা
পেয়ে যাই। খবরে জানা
গেলো যে, পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করে
নির্বিচারে
বাঙালি নিধন
করছে। অন্যদিকে
৭ মার্চে
যেভাবে
নির্দেশ দেয়া
হয়েছিলো
সেভাবে আমরা
সেচ্ছাসেবক
বাহিনী গঠন করি। আমরা তখন
থেকেই
প্রিপারেশন
নিচ্ছিলাম, কোনো
রকম আক্রমণ
যদি আমাদের
উপর হয় তা হলে
আমরা কি করবো। বিশেষ করে
সীমান এলাকায়।
প্র:
১৯৭১ সালে
পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর
হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?
উ: আমি আক্রান্ত
হইনি। কারণ
প্রথম এখানে
যখন পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী
আক্রমণ করে
তখন আমরা
প্রতিরোধ করি। কিন্তু
আমরা তাদের
বিরুদ্ধে ঐ
পর্যায়ে সফল
হইনি। ১৯৭১
সালের ২১
এপ্রিল
রিট্রিট করে
আমরা ইন্ডিয়াতে
চলে যাই। বেঙ্গল
রেজিমেন্ট, আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর
এবং পুলিশ
সমন্বয়ে একটা
প্রতিরোধ বাহিনী
গঠন করা
হয়েছিলো। সেচ্ছাসেবক
বাহিনী নাম
বাদ দিয়ে
মুক্তিবাহিনী
গঠন করা হয় এই
হিলিতেই। এর কমান্ডার
ছিলেন বেঙ্গল
রেজিমেন্টের
তৎকালীন
ক্যাপ্টেন
আনোয়ার সাহেব
আর মেজর নিজামউদ্দীন। মেজর
নিজাম তার
দ্বৈত
মনোভাবের
কারণে বেঙ্গল
রেজিমেন্টের
সৈনিকদের
হাতেই পরে
বিরামপুরে
নিহত হন।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করলো ?
উ: পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী আমাদের
এলাকায় ১৭
এপ্রিল থেকে
আক্রমণ শুরু
করে। আমরা সে
সময় তাদের
প্রতিরোধ
করেছিলাম। আমাদের এই
প্রতিরোধ
ভাঙতে তাদের
৩/৪ দিন সময় লাগে। পরে
পাঁচবিবি, বিরামপুর
উত্তর, দক্ষিণ এবং পর্ব
দিক থেকে
আমাদের এখানে
তারা
ত্রিমুখি আক্রমণ
করে। এইটাই
ছিলো তীব্র
আক্রমণ। এই তীব্র
আক্রমণটা
আমরা ঠেকাতে
পারিনি। আমাদের
ডিফেন্স ভেঙে
যায়। তখন
আমরা ভারতের
মাটিতে আশ্রয়
নিতে বাধ্য হই।
প্র:
পাকিস্তানি
সামরিক
বাহিনী আপনার
এলাকায় কি
করলো ?
উ: পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী
যেখানেই
ব্যারিকেড
পেয়েছে, সেখানেই
আগুন দিয়েছে, ঘর বাড়ি
পুড়িয়ে
দিয়েছে। ব্রিজ-কালভার্ট
যেখানে ভাঙা
পেয়েছে
সেখানে তারা
২/৪
কিলোমিটারের
মধ্যে
প্রত্যেকটি
গ্রাম জ্বালিয়ে
পুড়িয়ে শেষ
করেছে। যাকে
সামনে পেয়েছে
তাকে গুলি
করেছে বা ধরে
নিয়ে গেছে।
প্র:
সেই সময় আপনার
পরিবারে কেউ
শহীদ হয়েছেন কি
?
উ: না, আমার
পরিবার তখন
ভারতে আশ্রয়
নিয়েছিলো।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন থেকে
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয় ?
উ:
মার্চের ৩ মাস
পর
মুক্তিবাহিনী
ট্রেনিং নিয়ে
এসে এ দিকে তৎপরতা
শুরু করে। পাকিস্তানি
বাহিনী এই
এলাকা দখল
করার পর আমরা
ভারতে চলে গিয়ে
ক্যাম্প স্হাপন করি। প্রথমে সব
রিসিপশন ক্যাম্প
ছিলো। এরপরে
পতিরামে
ট্রেনিং ক্যাম্প
হয়। আমরা
অনেকগুলো
রিসিপশন ক্যাম্প
স্হাপন করি। এ সব ক্যাম্প
থেকে বাছাই
করা যুবক
ছেলেদের নিয়ে
আশপাশে ৭টা ক্যাম্পে
ট্রেনিং দেয়া
হতো। সবগুলি ক্যাম্পই
ছিলো ভারতের
মাটিতে। ছেলেরা
প্রশিক্ষণ
নেয়ার পর
তাদেরকে আমরা
বাংলাদেশে
পাঠাতাম।
প্র:
তখন মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
জনগণের
মনোভাব কেমন ছিলো
?
উ:
মুক্তিবাহিনী
সম্বন্ধে
জণগণের
মনোভাব অত্যন
ভালো ছিলো। মুক্তিবাহিনী
ভারত থেকে
ট্রেনিং নিয়ে
বাংলার
মাটিতে এসে
থাকা এবং
খাওয়া পেতো। তাদের উপস্হিতি যেন পাকিস্তানি
সেনা বা তাদের
দালালরা না
টের পায় সে
গোপনীয়তা তারা
রক্ষা করতো। এমন কি
মেয়েরা ব্যবস্হা
মুক্তিযোদ্ধাদের
পথ ঘাট দেখিয়ে
দিতো। যারা
রাজনীতির
সঙ্গে ছিলো না
তারাও এটা
বুঝতো যে, দেশের
স্বার্থেই
আমাকে কাজ
করতে হবে।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
কারা রাজাকার
ছিলো ?
উ: আমার
এখানে তো ৩
মাইলের মধ্যে
কেউ ছিলো না। তারপরও
রাজাকার, আল-বদর এই
এলাকায় ছিলো। তাদেরকে পাকিস্তানিরা
অন্য এলাকা
থেকে এনেছিলো। পাকবাহিনী
অন্য গ্রামের
লোককে ধরে
নিয়ে এসে রাজাকার
বানিয়েছিলো। অবশ্য
কিছু লোক
তাদের সক্রিয়
সহযোগিতা
করতো। এরা
মুসলীম লীগ
এবং জামাতের
রাজনীতির
সঙ্গে সমঙৃক্ত
ছিলো। আমরা
এসে শুনি, অনেকেই
অনিচ্ছা
সত্ত্বেও
সহযোগিতা
করছে। আবার
সক্রিয়
ভূমিকাও কেউ
কেউ পালন
করেছে। কিন্তু
তাদের নাম
সংগ্রহ করা
সম্ভব হয়নি।
প্র:
স্বাধীনতা
বিরোধীদের
ধরা হয়েছিলো
কি ?
উ: সক্রিয়
স্বাধীনতা
বিরোধী যারা
ছিলো তারা বেশিরভাগ
মুক্তিবাহিনীর
হাতে নিহত
হয়েছে। যারা
বেঁচে গেলো
তাদেরকে আমরা
পরে কিছু
করিনি। বিশেষ
করে আওয়ামী
লীগের তরফ
থেকে আমাদের
উপর নির্দেশ
ছিলো যে, আইন নিজের
হাতে তুলে না
নেওয়ার। আমরা
তাদেরকে ধরে
ধরে থানায়
দিতাম। তাদের
বিরুদ্ধে তদন
হতো। তদন
হওয়ার পর
অভিযোগ
প্রমাণিত হলে
তাদেরকে চালান
করা হতো। কোর্টের বিচারে
অনেকে শাসি
পেয়েছে, অনেকে
মুক্তি
পেয়েছে। এ সব
ঘটনাগুলো
ঘটেছে।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
কি অবস্হা দেখলেন
?
উ: আমি
সীমানের
মানুষ, একটা সীমান
দেখলেই
বাংলাদেশের সম্পূর্ন
চিত্র ফুটে
ওঠে। এখানে
২/৩ মাইলের
মধ্যে কোনো
বাড়িঘর ছিলো
না। পরে স্হানীয়
মানুষদের
রিহেভিলেটেশন
করতে
আমাদেরকে
অনেক বেগ পেতে
হয়েছে। গ্রামকে
গ্রাম দেখেছি
কোনো বাড়ি নেই, পানির ব্যবস্হা
নেই, কোনো
কিছুই নেই।
প্র:
স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির
এগুলোর
অবস্হা কেমন
ছিলো ?
উ: এগুলো সম্পূর্ন
ধ্বংসপ্রাপ্ত
ছিলো। এমন
কি আমার
এলাকায়
মসজিদে নামাজ
পড়বার মতো ব্যবস্হাও
ছিলো না। মসজিদটি পরে
নতুন করে করতে
হয়েছে। স্কুলের
তো কোনো
প্রশ্নই ওঠে
না। স্কুলগুলো
তো পাকিস্তানিদের
ক্যাম্প ছিলো। বেঞ্চ-টেঞ্চ
লাকড়ি বানিয়ে
তারা রান্না
বান্না করতো, বাংকার
বানাতো- এ সব
করেছে। কালভার্ট
তারা রিট্রিট
করে যাবার সময়
ভেঙে দিয়ে
গেছে। রিট্রিট
করে যাবার সময়
তারা আমবাড়ি
প্রথম হল্ট
করে। আমবাড়ি
থেকে ফুলবাড়ি
হয়ে তারা
সৈয়দপুরের দিকে
যায়। তখন
ফুলবাড়ির
ব্রিজটা
তারাই ভেঙে
দেয়- যাতে মুক্তিবাহিনী
বা মিত্র
বাহিনী আসতে
না পারে। ডিসেম্বর
মাসে তারা
ক্রমশ:
কনসেনট্রেট
হয়েছে
সৈয়দপুর, রংপুর এবং
দিনাজপুর। সে সময় তারা
বেশিরভাগ
ব্রিজ-কালভার্ট
ভেঙে চলে গেছে। ফলে, তাদের উপর
আমরা আক্রমণ
করতে পারি নাই।
প্র:
মুক্তিযুদ্ধের
নয় মাস আপনি
কি ভূমিকা পালন
করেছেন ?
উ: আমি
সংগঠক হিসাবে
কাজ করেছি। আমার হাতে অস
ছিলো না। অবশ্য আমার
নিজস্ব
বন্দুক ছিলো। ভারতেই ছিলাম। ক্যাম্প
পরিচালনায়
ছিলাম।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : আবদুল
কাইয়ুম
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ: অক্টোবর ২২, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৬৫