নাম
:
আবদুল অহেদ
গ্রাম
:
জেটুয়ামুড়া
ডাক
:
বিষ্ণুউড়ী
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : আনুমানিক
২০
১৯৭১
সালে পেশা :
কৃষিকাজ
বর্তমান
পেশা : কৃষিকাজ
আবদুল
অহেদ একজন
কৃষক। তিনি
ভারতে সামরিক
প্রশিক্ষণ
নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করেন। আবদুল
অহেদ তাঁর
সাক্ষাৎকারে
প্রশিক্ষণকালীন
সময়ের কথা,যুদ্ধের
কথা আর
গ্রামের
মানুষের কথা
বলেছেন।
প্র:
’৭১ সালে
আপনি কি করতেন?
উ:
সংগ্রামের
আগদা আমার
বাবা মারা গেল। মারা
যাওয়ার বেশ
আগেই আমার
লেখাপড়া বন্ধ
হইয়া গেছে। কিছুদিন
পরেই সংগ্রাম
লাগলো। দুর্যোগ
তহন একটু কম। একদম
লাস্টে যহন
মানুষ মারা
আরম্ভ করলো,একটা
হইহোল্লা
লাইগ্গা
গেছেগা,তহন বুঝলাম
যে না দেশে
গোলমাল। পরেতো
দেখলাম লোকজন
পালাইয়া
আসতাছে। আত্নীয়-স্বজন
বাহিরে যারা
আছেন
চাকরি-বাকরি
করতাছেন
তাদের থেইকাও
খবর আইতাছে যে,ধইরা
ধইরা মাইরা
লায় এবং জেতা
ধইরা মাডিদা
খাদাইলায়। তহন গেলামগা
আগরতলা। আগরতলা গিয়া
সাইরা তহন
সয়দাবাজের
মাহতাব সাব
আছিল পুলিশের
লোক,এর
কাছে বললাম
আমরা শতেক লোক
আছি।
প্র:
এই লোকগুলি কি
আপনার এলাকার? আপনারা
পরে কি করলেন?
উ: আমাদের
এই সয়দাবাজ
হইতে কসবা
থানা হইতে
বহুত লোক তহন
সেখানে। মাহতাব সাব
কইলো,তোমাদের
কোনো চিন্তা
ভাবনা নাই। তোমরা থাকো। তোমরার
উদ্দেশ্য কি? তহন
আমরা এই একশ
লোকের একজন
প্রতিনিধি
বানাই দিলাম। তাঁর কাছে
বললাম যে,আমরা
আইছি দেশে যে
নির্যাতন
চলছে আমরা জান
দিয়া পারি, প্রাণ
দিয়া পারি
দেশকে আমরা
মুক্ত করতে
চাই। এই কথা
কইছি পরে তহন
মাহতাব সাব খুশি
অইছে। খুশি
অইছে পরে তহন
তো আমাদের
কংগ্রেস ভবনে
নিয়া গেল। নিয়া নাম
তালিকা করলো। কইরা
সাইরা তহনতো
আমরারে
হাফাইন্যা
পাডাই দিল। ঐহানে আমরা
প্রায় ১৫/২০
দিন ছিলাম। মাহতাব সাব
তহনতো
আমাদেরকে
পিটি প্যারেড
করাইতো। রোজ মাহতাব
সাব আমরারে
ট্রেনিং
করাইতো। এইহান থেইক্কা
আমরারে নিল
গোকুলনগর। গোকুলনগর
প্রায় ৮/১০
দিন রাখলো। রাইখ্যা
সাইরা এরপরে
একদিন রাইতের
অন্ধকারে
অনেক গাড়ি
আইসা লাগল। গাড়ি আইলো
প্রায় ৫০টা। ৫০টা গাড়ি
আসার পরে
তহনকা কইলো যে
তোমরার ট্রেনিং
সেন্টারে
যাইতে অইবো। কোথায়
যাইতে অইবো? কোনো
কথা নাই। তহনকা
ডাক্তার সাব
আইলো। এরপরে
মেডিকেল চেক
আপ শুরু করলো। এরপরে
আমরা গেলাম। এরপরে
ড্রাইভাররে
জিগাইলাম
কোথায় নিবেন,কি বিষয়? কয় বলতে
পারি না। গোকুলন গর
থেইক্কা
তহনকা গাড়ি
ছাড়লো একবারে রাইত
এগারটার সময়। তহনকা এই
গাড়ি যাইতেই
আছে, যাইতেই
আছে। যহন
আগরতলা পার
অইয়া গেছে
তহনকা আমাদের
মন একটু
দুর্বল
লাইগ্গা গেছে
যে ব্যাপার কি? ভারতের
যে সোলজার
আছিল তারারে
জিগাইলাম। তারাও কোনো
কিছু কয় না। কয় বলতে পারি
না। আগে ছিল
একটা
প্রাইভেট
মোটর গাড়ি,পাছে
একটা অর্থাৎ ৫০টা
গাড়ির আগে
একটা এবং
পাচ্ছে একটা। এইভাবে
রাইতে দিনে
চলছি। চাইর
দিনের মত
গেলাম। চাইর
দিন গিয়া
সাইরা এই এমনই
রাইতের বেলা
তিন দিগদা
পাহাড় আর
একদিগদা খোলা
সেহানে নামাই
দিছে। তহনকা
নামাই দিল পর
আমরা গেলাম। আমরা তো
আর হিন্দি
কিছু বুঝি না। আমাদের
কিছু হিন্দি
বুজুইন্না
লোক আছিল ঢাকা
আড়াই হাজার
থানার। তাদের
থাইক্যা
বুইজ্যা
নিতাম। আমরা
যখন আইছিলাম
তখন আমাদের
গাড়ি একবার
২০০শ ফুট নিচের
দিগে যায়,আবার
মনে হয় ৫০০
ফুট উপরের
দিগে উঠে। আমরার ১৬০০শ’ লোকের
মাঝে ১০০শ
লোকের মাঝে
১০০শ লোকের
জ্ঞান ছিল
কিনা সন্দেহ। আল্লার
রহমতে আমার
জ্ঞান ছিল। তার পরেতো
নামাই দিছে। তহনকা
আমাদের জাগা
করছে পাহাড়ের
উপরে। ঐখানে
উডার মতো
আমাদের কোনো
শক্তি ছিল না। ১২২টা
সিঁড়ি আছে। কিছুক্ষণ
গিয়া সাইরা
গর্তের মতোন
কদ্দুর জাগা
কইরা রাখছে
জিরানের
(বিশ্রাম)
লাগি। তো
অনেক কষ্ট
কইরা গেলাম। গিয়া দেহি
ঐখানে আমাদের
আর অভাব নাই। যেমন খানা,বিছানা,থাকার
কোনো কিছুরই
অভাব নাই। ঐহানে
যাওয়ার পরে প্লেট
দিছে,কম্বল
দিছে,গামছা
দিছে,লুঙ্গি
দিছে,খানা
খাদ্য যা আছে
সব কিছু দিছে।
প্র:
সব কিছু
আপনারা সাথে
সাথে পাইছেন?
উ: হাঁ,দিছে। কিন্তু কিছু
দিলে আমরা
খাইতে পারি না। একটার
অভাব পরছে,পানির। এক জগ
কইরা পানি দিত
ছোট জগদা। বলতো যে এই
জাগ দিয়া
খাইতে অইবো,হাত ধুইতে
অইবো,সবকিছু
করতে অইবো। পরে আর কি
করাম,গাড়ি
যে উচা নিচা
করছে না,আপ ডাউন,তহনকা এই
মাথাত আর কিছু
নাই। তহনকা
একজগ পানি
দিয়া হাত
ধুইতে ধুইতে
সব ফালাই দিছি। ভাত খাইতে
লই না। খাইতে
লইলেই ধপরদা
পইরা যাইগা। এরপরে
মাডিত হাত
খইরা গেছেগা। আমরা ঐ
বাইগুন
(বেগুন) ক্ষেত
লাগাই না,এইডার
মতন মাডি। তহনকা হাত
ধুইতে ধুইতে
সব গেছেগা। তহন আর
খাইলাম না। দুই তিন নলা
(গ্রাস) দিয়া
সাইরা আর পারি
না। এইরমভাবে
প্রায় লোকেই
খাইতারছে না। তহনকা
আমরা শুইলাম। শুইলাম
পরে তহনকা
ঠ্যাং জায়গা
উপরের দিগে। খালি
দুনিয়া ঘুরে। দুনোদিগে
কোনো কিছু
নাইতো। পরদিন
আমাকে দিয়া
দিছে ভারতের
ফৌজের ধারে। তহন
ভারতের ওস্তাদরে
আমরা কইলাম
আরকি আমাদের
যে লোকে
হিন্দি বুঝে
তারারে কইলাম
যে আজকা যদি
আমরারে কোনো
কিছু কয়, আমরাতো
পারবো না। আমরা তো ভাই
দাঁড়াইতে
পারি না। তহনকা
আমরারে একদিন
রেস্ট দিল। পরের দিন
থেইক্কা শুরু
করলাম
ট্রেনিং।
প্র:
আপনাদের হাতে
কি কি অস্ত্র
দিত তারা?
উ: তারা
পয়লা দিছে
থ্রি নট থ্রি
রাইফেল। এর পরে
স্টেনগান। এর পরে
ব্রিটিশ
স্টেনগান
এরপরে এল. এম.
জি,
এস.
এল. আর. আর
রাইফেল
ভারতের। এরপরে
গ্রেনেড। থ্রি ইঞ্চি
মর্টার জিডা
এইডাও
দেখাইছে।
প্র:
মুক্তিযুদ্ধ
সম্পর্কে
সাধারণ জনগণ
যারা ছিল
তাদের মনোভাব
কি ছিল?
উ: তাদের
মনোভাব
আমাদের উপরে
ষোল আনাই ভাল
ছিল। ভালো
থাকার কারণেই
আমরা
বাঁইচ্যা আছি।
প্র:
তারা কি
সাহায্য
সহযোগিতা
করতো আপনাদেরকে?
উ: সব সময়
সাহায্য
সহায়তা করছে। মাছ,ভাত,পানি,অস্ত্র
দেওয়া বা
পাকবাহিনী
দেখলে
আমাদেরকে
লুকাইয়া রাখা,এমন কি
পাকবাহিনী
দেখলে আমাদের
যে নাইল্লা (পাট)
আছে না? নাইল্যার
হোলা (পাটখড়ি)
উপরেদা
ফালাইয়া রাখছে
আমাদের দেশেই। জনগণ যা
করছে তা বলা
সম্ভবই না।
প্র:
আপনার গ্রামে
বা আপনার
এলাকার মধ্যে
রাজাকার ছিল
কারা কারা?
উ: না,এই
ধরনের লোক
আমাদের
গেরামে ছিল না।
প্র: আপনার
এলাকার নাম
হলেও যারা
রাজাকার ছিল
বা আলবদর বা
আলশামস-এই রকম
কয়েক জনের নাম
বলতে পারেন?
উ: আমাদের
হাতে যেডি ধরা
পড়ছে এডি বলতে
পারি আরকি। যেমন-ঐ
সিদ্দিক বইলা
তোতলা কইরা
আছিল, কসবার
শহীদুল্লাহ
আবার
কলিমউদ্দীন
আছিল রাজাকার। এইডি
আমাদের হাতে
ধরা পড়ছে।
প্র:
ধরার পরে
তাদের কি
করলেন আপনারা?
উ: ধরার
পরে আমাদের যে
থানা
কমান্ডার
ছিলো হাসেম
সাব,তাঁর
হাতে হস্তান্তর কইরা
দিছি। তারা
এরপরে কি করছে
না করছে এইডা
তারা কইতারবো।
প্র:
যুদ্ধ যখন শেষ
হলো,যুদ্ধের
শেষে আপনি কি
করলেন বা
আপনার গ্রামে
ফিরে আপনার
গ্রামের অবস্হা
বা অন্য
গ্রামের
অবস্হা কি
দেখলেন?
উ: অন্ধকারময়,দুই হাত
আড়াই হাত ঘাস
লম্বা অইয়া
গেছেগা। বন জঙ্গল
অইয়া গেছেগা। গেরামের
লোকেরা বুঝে
না। আর
আমরাও বুঝিনা
কি করুম। তহন আমরা
অনেক ভয়ে ভয়ে
রাইতে আইলাম। এর পরেদা
আমাদের যেখানে
সন্দেহ লাগজে,তহন ঐ
ভারতের সৈন্য
আমাদের
এলাকায় আনা
অইছে। আইন্যা
যেহান সন্দেহ
লাগছে তারার
যে যন্ত্র আছে
না?
ঐ
দিয়া তাদের
হাতে মাইন
উডান অইছে। একদিগদা
তারা উডাইয়ে
আর একদিগদা
আমরা আবাদ কইরা
নিছি। খুব
কষ্ট অইছে।
প্র:
যুদ্ধে যারা
নিহত অইছে
আপনারা তাদের
কি করলেন বা
কোথায় সমাধিস্হ করলেন?
উ: আমরার
নিজস্ব লোক
যারা তাদেরকে
মাডি দেওয়ার চেষ্টা
করছি। রক্ষ্মীপুরে
আমাদের
মুক্তিবাহিনীর
লোক যারা শহীদ
হইছিল তাদের
আমরা প্রাণপণ
কইরা আনছি। আর আমাদের যে
বিরোধী
পার্টি তাদের
গর্ত কইরা সাইরা
গাইরা ফেলছি।
প্র:
ঐ যে লক্ষ্মীপুরের
কথা বললেন,ঐ সমাধিস্হলে কতজন
শহীদের সমাধি
আছে আপনি বলতে
পারেন?
উ: ১৩
জনের মতন।
প্র:
নাম বলতে
পারেন তাঁদের?
উ: দুই
তিনজনের বলতে
পারি। যেমন
বিলগরের আছিল
আবিদ ভাই। এরপরে
মান্দাইলের
আছিল হাসেম আর
আছে হিন্দু মিয়া-এই
তিনজন।
প্র:
প্রথম দিন
কোথায় যুদ্ধ
করলেন?
উ: প্রথম
যুদ্ধই
আমাদের কসবায়। কসবায় যে
রেজিস্ট্রি
অফিস আছে,স্কুল
আছে-ঐ জায়গায়। এই এলাকা
সেক্টর টু-য়ের
মধ্যে। ট্রেনিং
শেষে আগরতলা। তারপর
সেখান থেইকা
কসবা যুদ্ধে
নামছি।
প্র:
আপনার
কমান্ডার
কারা ছিলেন?
উ: পুরা
অঞ্চলে আছিল
ক্যাপ্টেন
গাফফার সাব। অন্য কমান্ডার
ছিল
সিমরাইলের
মতিউর রহমান,সহকারী
ছিল আবদুল হক
মাস্টার। তারপর
আমাদের
প্লাটুন
কমান্ডার ছিল
হাকিম মাস্টার,সুবেদার
ফজলুর রহমান,এরপর
রংপুরের
নায়েক
সুবেদার আজিজ।
প্র:
আপনি কি
যুদ্ধের সময়
আক্রান্ত
হয়েছিলেন?
উ: হাঁ,কসবা
যুদ্ধে ২
ইঞ্চি
মর্টারের শেল
আমার উপর পড়ছে। এই
যুদ্ধডা হইছে
কার্তিক
মাসের
শেষ দিকে। তিন দিকদা
এ্যাটাক হইছে
আমাদের উপর। এইহানদা
আমাদের ১৫/২০
জন নিহত হইছে। শেল পড়নের
পর আমি অচল
হইয়া পড়ছি। আমারে পিছনে
লইয়া গেছে। অনেকদিন
হাসপাতালে
ছিলাম। হাসপাতালে
থাকতেই দেশ
স্বাধীন হইছে।
প্র:
আপনার
হাতিয়ারটা কোথায়
জমা দিলেন বা
কি করলেন?
উ: ইডা
জমা দিলাম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আমাদের যে
কমান্ডার ছিল
হাকিম
মাস্টার,ঐ হাকিম
মাস্টারের
মারফতে জমা
দিলাম।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারী : এইচ. এম.
ইকবাল
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ১৭ অক্টোবর
১৯৯৬
ক্যাসেট
:
কসবা ২৪