নাম : আবদুর রাজ্জাক

পিতার নাম : হাজী রমিজউদ্দিন আহমেদ

গ্রাম : কুঠি

ডাক : কুঠি

ইউনিয়ন : কুঠি

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ২৬

১৯৭১ সালে পেশা : এস. এস. সি.

১৯৭১ সালে পেশা : অবসরপ্রপ্ত সৈনিক

বর্তমান পেশা : ব্যবসা

 

 

আবদুর রাজ্জাক অত্যন্ত কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করেছেনতিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন-মুক্তিযোদ্ধাদের কথা,জানিয়েছেন রাজাকারদের অত্যাচারের কাহিনী

 

 

প্র: ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকবাহিনীর হামলার পর আপনি কি করলেন?

 

উ: আমরা জানতে পারলাম যে পাকিস্তানিরা ২৫শে মার্চ রাতে এই দেশের সাধারণ মানুষের উপর,নিরস্ত্র মানুষের উপর আক্রমণ করছেতারপর বাঙালি পুলিশ,তৎকালীন ই.পি.আর তাদেরকে নিরস্ত্র করা হইছেকিছু কিছু পুলিশ তারা আসলোএমনকি কুঠিতে আসলো তারা১৪ই এপ্রিল,দিনটা ছিল বোধহয় বুধবারবেলা সাড়ে দশটা কি এগারোটা হবে আমাদের মানুষ ছিল রাস্তায়হঠাৎ তারা দৌড়াইয়া আইসা খবর দিল যে পাঞ্জাবিরা আসতেছেকুঠি যে গ্রাম সেই গ্রামেও আসতেছেশহীদ মাস্টার সয়দাবাজের,উনি এর কিছুদিন আগে আমার এখানে আসছিলেনআইসা হঠাৎ বললেন যে কালামুড়ার পুলের গোড়াটা কাইট্যা দিতে হবেআমি তখন বেশ কিছু লোক দিলাম উনার কাছেবললাম আপনি এদের নিয়া যানকাজ করাইতে থাকেন আমি আরও কিছু লোকজন নিয়া আসিএইটা হইল এপ্রিল মাসের প্রথম ভাগেব্রিজ ভাঙতে গেলামআমি আরও কিছু লোকজন নিয়া গেলামযাইয়া দেখলাম যে উনি পুলের উত্তর পাশদিয়া ভাংতেছেহঠাৎ আমার খেয়াল হইল যে পুলের এই পাশ দিয়া যদি ভাংগে তাহলে হয়তো আমাদের গ্রাম কালামুড়া গ্রামটাকে জ্বালাইয়া দিবেকারণ কালামুড়া গ্রামটা ছিল পুলের পাশেচিন্তা করলাম যে দক্ষিণ পাশ দিয়া কাটিকারণ দক্ষিণ পাশের গ্রামগুলো অনেক দূরে ছিলসেই জন্য আমি দক্ষিণ পাশ দিয়া কাটার চেষ্টা করলামকাইটা শেষও করছিলাম প্রায়কিন্তু খুব ভালোভাবে কাটতে পারছিলাম নাশহীদ মাস্টার ছিলেনআমি ছিলামআমাদের সভাপতি জহির মিয়া ছিলেনআওয়ামী লীগের এবং ছাত্র লীগের কর্মীরা ছিলগ্রামবাসী ছিল,শ্রমিক,কৃষক ছিল,সবাই ছিলস্বতঃস্ফূর্তভাবেই তারা গেছিল

 

প্র: আপনি গণহত্যা বা শিশুহত্যা বা নারী নির্যাতন কোথায়ও দেখেছেন?

 

উ: কালামুড়া হইছে কিছুআমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামে হইছেআমার এলাকায়ও ছিলকারো কারো ঘরের বউও ছিলহয়তো ঘরে পুরুষ মানুষ ছিল নাভয়ে তারা চইলা গেছেদিনের বেলা ধইরা নিছেরাজাকারদের সহায়তায় ধইরা নিছেএরপরে পাশবিক অত্যাচারও করছে আরকিআসলে এইগুলা আলাপ না করাটাই ভালকারণ,এদের নাম বললে অসুবিধা হবে

 

প্র: এই অঞ্চলে কারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কি ছিল?

 

উ: আমার ছোট ভাই এরশাদ মুক্তিবাহিনীতে ছিলতারপরে নবাববাড়ির আবদু মিয়াও ছিলতারপরে শাহ আলম ভূঁইয়া ছিলমনু মিয়া ছিলতারপর হিন্দু একটি ছেলে ছিল জহর নামেতারপরে সন্তোষ কুমার সাহা,শফিকুর রহমান,মহসীন এরা ছিলআরও অনেকে ছিলপাকিস্তানিরা এইখানে আসার পর কিছু কিছু পাকিস্তানিমনা ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধকে খুব একটা ভাল চোখে দেখতো নামনে করত যে এইওটা হওয়াতে বোধহয় এই দেশ নষ্ট হইছেতবে বেশিরভাগ মানুষই যখন স্বাধীন বাংলা রেডিও থেইক্যা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাইত তখন তারা নীরবে চোখের পানি ফালাইততারা ভাবতো যে কবে আসবে সেই দিন যেদিন আমাদের দেশ মুক্ত হবে এবং জাতীয় সংগীত আমরা প্রকাশ্যে শুনতে পারবপ্রকাশ্যে আমরা বাজাইতে পারব

 

প্র: আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছেন কি?

 

উ: আমার বড় ভাই শামসুদ্দিন আহমদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেনতিনি আমাদের পরিবারের প্রধান ব্যক্তি ছিলেনশেল পড়ছিলশেল পইড়া উনি মারা গেছেন

 

প্র: আপনার এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?

 

উ: ৪ জন রাজাকার ছিলচুনু মিয়া,সে বর্তমানে নাইসে মারা গেছেএরপর বারেক মিয়া তারপর ওদুদ মিয়া এবং মিলন মিয়া এই চার জনকালামুড়ার পুল যেদিন ভাঙ্গা হইল,গ্রামের মানুষরা যেইদিন ভাঙলো তারা ঐদিনই আশ্রয় নিল রাইফেল সহ দেওড়াঐ সময় আমি তাদেরকে একটা কথা বলছিলাম যে তোমরা যদি বাঁচতে চাও তাইলে এমন একটা কিছু কর যাতে তোমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জাগা পাওপরে আমি এক বাড়িতে তাদেরকে পাইলামএরপর তাদেরকে নিয়া আমি চারগাছ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সারেন্ডার করাই৪টা রাইফেলসহ ৪ জন রাজাকারপরে ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলে আবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে

 

প্র: যুদ্ধের পর এলাকায় এসে কি দেখলেন?

 

উ: যুদ্ধের পরেতো এখানে আইসা দেখি ভাংচুর হইছেতাদের বাংকার বানাইতে তারা ভাংচুর করছেআবার এলাকার কিছু বাড়িঘর কিছু মানুষ নিয়া নিজের বাড়িতে তুইল্যা ফেলছিলঅনেক বাড়িঘরই নিয়া তুইল্যা ফেলছিলআমরা অবশ্য সেই বাড়িঘর আবার স্ব-স্ব জাগায় ফিরাই দিছিআর রাজাকাররা যেসব বাড়িঘর থেকে জিনিসপত্র আইন্যা বাংকারে থুইছিল যেমন টেবিল চেয়ার তারপরে তামার কলস এইগুলা গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে আমরা স্ব-স্ব জাগায় পৌঁছাইয়া দিছিমূল কথা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমি যখন অত্র এলাকায় আসলাম তখন প্রশাসন বলতে কিছু ছিল নাযদিও নাম মাত্র পুলিশ ছিলকিছু সংখ্যক পুলিশ থানাতে ছিলকিন্তু তাদের পরনে কিছু ছিল নাযেহেতু মুক্তিযোদ্ধারা আছেতাদের অস্ত্রের তুলনায় অনেক ভালো অস্ত্রের অধিকারী ছিল মুক্তিযোদ্ধারাতখন একটা অর্ডার আসছিল যে রাজাকারদের ক্লোজ কইরা থানাতে দেওয়ার জন্যএইটা তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারই দিছিলেনযতজন রাজাকার ছিল সবাইকে আমি জড়ো করিকতজন ছিল ঠিক খেয়াল নাইবেশ সংখ্যক ছিল আমার এলাকায়এদেরকে আমি থানায় সারেন্ডার করাইঅনেকেই হাজতে গেছেবঙ্গবন্ধু উদারপন্হী লোক ছিলেনতিনি সকলকে সাধারণ ক্ষমা করে দেন

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : এইচ. এম. ইকবাল

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ১৫ জানুয়ারি ১৯৯৭

ক্যাসেট : কসবা ১১৬