নাম
: মোঃ
আবুল কাশেম
পিতা
: মোঃ
আমজাদ হোসেন
গ্রাম
: রঘুনাথপুর,
ইউ : রামপুর
ডাক
: নূরুল মজিদ,
থানা
: পার্বতীপুর,
জেলা
: দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : এস. এস. সি.
১৯৭১
সালে পেশা : এস. এস. সি.
পরীক্ষার্থী
১৯৭১
সালে বয়স : ১৬/১৭
বর্তমান
পেশা : কৃষিকাজ
প্র:
১৯৭১ সালে আপনি
কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের
সঙ্গে জড়িত হলেন
?
উ: ১৯৭০ সালের
নির্বাচনের পর
আমাদের দেশের মধ্যে
এক বিরাট আন্দোলন
শুরু হলো। এরপর ৭১-র মার্চে
অসহযোগ আন্দোলন
আরম্ভ হয়ে গেলো। আমাদের অধিকার
নিয়ে পাকিস্তানি শাসক
গোষ্ঠী একটা ষড়যন্ত্র আরম্ভ করলো। এর প্রেক্ষিতে
আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধিকার আদায়ের
জন্য দেশের জনগণকে
হুকুম দিলেন যে, তোমরা তোমাদের
যা কিছু আছে তাই
নিয়ে স্বাধীনতা
আনার জন্য আন্দোলন
করো।
তাঁর
কথা অনুযায়ী আমরা
আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে
পড়লাম। এ দেশের
সর্বস্তরের মানুষ
খান সেনাদের বিরুদ্ধে
এবং পাকিস্তানি কুচক্রের
বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে
পড়লো। প্রথম
দিকে আমরা একটু
অসহায় অবস্হায় ছিলাম। আমাদের হাতিয়ার
ছিলো না। আমরা একটু বিভ্রান্ত
ও হয়ে
গেলাম। তখন
আমরা চিন্তা করলাম যে, কোথায় যাই, কি করি। আমরা তখন জানতে
পারলাম যে, ভারতে আমাদের
অনেক লোক গেছে। খান সেনারা
আইসা আমাদের বাড়িতে
আগুন লাগাই দিয়া
গেলো এবং আমার
এলাকার সমস্ত বাড়িঘর
জ্বালাই পুড়াইয়ে
দিলো। তখন
আমার পরিবার নিয়া
আমি বহুদূর অন্তত: দশ মাইল
দূরে যাইয়া আশ্রয়
নিলাম। আমার
বাবা, মা, দাদা এবং
আরও কয়েকজন আত্মীয়
স্বজনসহ সেখানে
আশ্রয় নিলাম। আমার চাচা
এখানকার আওয়ামী
লীগের একজন প্রভাবশালী
নেতা ছিলেন। তার খুব প্রভাব
ছিলো। তার
কথাবার্তা সবাই
শুনতো। তাঁর
কথামতোই এই এলাকার
লোক যুদ্ধ করি
গেছেন এবং সংগ্রামে
গেছেন। আমিও
তাঁর কথামতো ইন্ডিয়াতে
চলি গেলাম। ওখানে যাইয়া দেখি
লোক কেবল ইন্ডিয়াতে
আসছে। আমি
ওখানে যাওয়ার পর
এমন অবস্হা যে, আমরা কি
খাবো, কোথায়
থাকবো, কোনো ব্যবস্হা নাই। এক স্কুলের
ধারে যাইয়া আশ্রয়
নিলাম। ওখানে
কিছু চাল-ডাল আমায়
দেওয়া হলো। খাই আর ওখানে থাকি। তারপরেই চিন্তাভাবনা করি, কি করি, কোথায় যাই। দেশে বা কিভাবে
যাবো, আমাদের
কি হবে, না হবে-- এই চিন্তা
ভাবনা
করি।
কিছুদিন
কাটার পর শুনলাম
যে,
যারা
মুক্তিযুদ্ধ করতে
চায় তাদেরকে প্রথম
পর্যায়ে ডাঙ্গার
হাট ক্যামেঙ ভর্তি
করা হবে। তখন আমি ওখানে
যাইয়া ভর্তি হয়ে
গেলাম।
প্র:
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনী আপনার এলাকায়
ঢাকার মতো কোনো
হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো
কি ?
উ: অবশ্যই। আমাদের এলাকায়
তারা প্রতি মুহূর্তে
আসিছে। আমাদের
বাড়িটা ছিলো একদম
টাউনের কাছেই এবং
রেল লাইনের ধারে। তারা গাড়ি
নিয়া সব সময় আসতো। যখন যাকে পাইতো
হত্যা করতো। বাড়িতে আগুন
লাগাইতো। বিভিন্ন ধরনের
মালামাল তারা এখান
থেকে লুটপাট করি
নিয়া যাইতো। মানুষকে ধরি
নিয়া যাইতো। একদিন আমার
এক চাচা রাত্রি
বেলা মসজিদে নামাজ
পড়ে সেখানেই ঘুমাইতে
ছিলেন। হঠাৎ
পাকিস্তানি সৈন্য, কিছু রাজাকার
এবং দালালরা আমার
চাচাকে আটক করে। আরো অনেককে
সে দিন আটক করে।
প্র:
আপনার চাচার নাম
কি ছিলো ?
উ: আমার চাচার
নাম মোহাম্মদ খায়রুল
এনাম। তিনি
মসজিদে ঘুমিয়ে
ছিলেন। তাঁকে
ধরা হয়। তাঁর
সাথে আরো কয়েকজন
ছিলো। একজনের
নাম বুলবুল। সে আওয়ামী
লীগ কর্মী ছিলো। আমার চাচা
ছাড়া বাকিদেরকে
পাকিস্তানি সৈন্যরা
ওখানেই হত্যা করে। গুলি করে মারে। আমার চাচাকে
তারা ধরি নিয়া
যায়।
তাকে
নিয়া যাইয়া নির্মমভাবে
তাঁকে জ্বালা যন্ত্রনা দিছিলো। তারা হত্যা
করবে, এমন
সময় আল্লাহর কি
অশেষ মেহেরবাণী, আমার চাচা
তাদের হাত থেকে
বাঁচি যায়। খান সেনারা তাকে
ছাড়ি দেয়। ইন্ডিয়াতে যাওয়ার
আগ পর্যন্ত এখান থাকিয়া
যতটুকু আমি জানতে
পারছি তাতে দেখি
যে,
তারা
অনেক অত্যাচার
করছে। যার
সবগুলা বলতে গেলে
হয়তো অনেক সময়
লাগবে। এ সব
ঘটনা আমাকে মুক্তিযুদ্ধে
যাইতে উৎসাহ জুগাইছিলো। মনে করতাম
আমরা বাঁচি আর
মরি আমাদেরকে যুদ্ধ
করি এ দেশকে স্বাধীন
করতেই হবে।
প্র:
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর হাতে আপনি
আক্রান্ত হয়েছিলেন
কি ?
উ: পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর হাতে একবার
আক্রান্ত হইছিলাম। যুদ্ধ করছিলাম
তখন।
একদিন
রাজাকারদের সঙ্গে
গেরিলা যুদ্ধ করে
এক বাড়িতে আশ্রয়
নিছিলাম। তখন পাকিস্তানি দালালদের
কেউ একজন তাদেরকে
খবর দেয়। বদরগঞ্জের ওখানে
পাকিস্তানি সৈন্যরা
ছিলো। পরদিন
বিকাল বেলা আমরা
একখানে এক ব্রিজ
উড়ে দেওয়ার জন্য
সেখানে যাওয়ার
প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেই সময় পাকিস্তানি সৈন্য
আর রাজাকাররা আমাদের
ঘিরি ফেলে। তখন আমরা আর কি
করি।
আমরা
চতুর্দিকে পজিশন
নিয়া তাদের সঙ্গে
গোলাগুলি আরম্ভ
করি।
এই গোলাগুলি
চলতে থাকে মনে
করেন ৪/৫ ঘন্টা। আমরা একটানা
তাদের সঙ্গে লড়ি। তাদের ৬ জন
নিহত হয়। আমরা তাদেরকে
হটায় একদম বদরগঞ্জের
দিকে নিয়া যাই। তারপর আমরা
ওখান থেকি ভাগি
ইন্ডিয়ার দিকে
চলে যাই।
প্র:
আপনার এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা
কখন থেকে আক্রমণ
শুরু করলো ?
উ: আমার সঠিক
তারিখটা মনে নাই। তবে আনুমানিক
২৫/২৬ মার্চের
পরেই তারা রংপুর
থাকিয়া সাঁজোয়া
গাড়ি এবং বিভিন্ন
ধরনের কামান নিয়া
মেইন রাস্তা দিয়া ফায়ারিং
করতে করতে পার্বতীপুরের
দিকে অগ্রসর হইতে
থাকে। তারপর
থেকে আমাদের উপর
অত্যাচার চলিতে
থাকে।
প্র:
তারা আপনাদের উপর
কিভাবে আক্রমণ
করলো ?
উ: প্রথমে
তারা হঠাৎ করিয়া
গাড়ি নিয়া আসিয়া
আমাদের এলাকা ঘিরি
ফেলে। ঘিরি
ফেলার পরে তারা
লোকজনকে ধরে এবং
সেখানেই গুলি করে। তারপর যুবক
ছেলেপেলেদের ধরি
গাড়িতে করি নিয়া
তারা চলি যাইতো। তাদের ক্যাম্পে নিয়া সবাইকে
বিভিন্ন অত্যাচার
করে পরে মারি ফেলতো।
প্র:
আপনার পরিবারের
কেউ শহীদ হয়েছেন
কি ?
উ: আমার পরিবারের
কেউ শহীদ হয় নাই।
প্র:
আপনার গ্রামের
লোকজন শহীদ হয়েছেন
কি ?
উ: আমার গ্রামে
আবদুর রহিম এবং
ফজল রহমান-- এরা
দু’জন শহীদ
হয়েছেন। এই দু’জনই আবার আমার
দূর সম্পর্কের আত্মীয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা
তাদেরকে হত্যা
করছে।
প্র:
আপনার এলাকায় কখন
থেকে মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু হয়
?
উ: আমার এলাকায়
২৫শে মার্চের পরেই
কিছু কিছু যুদ্ধ
আরম্ভ হয়। তারপর আমরা ভারত
থেকে ট্রেনিং নেওয়ার
পর এই এলাকায় পুরোপুরি
তৎপরতা শুরু হয়। প্রকৃত পক্ষে
পুরোপুরি লড়াই
শুরু হয় জুলাই
থাকিয়া।
প্র:
আপনি মুক্তিযোদ্ধা
হিসাবে কখন থেকে
তৎপরতা শুরু করেন
?
উ: জুন মাসে
ট্রেনিং শেষ করিয়া
আমি জুলাইয়ের দিক
থাকিয়া তৎপরতা
আরম্ভ করি।
প্র:
তখন মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে এই
এলাকার জনগণের
মনোভাব কেমন ছিলো
?
উ: আমরা যখন
ট্রেনিং নিয়ে এখানে
আসলাম তখন আমাদের
এলাকার লোকজন যথেষ্ট
উৎসাহ দেখাইছে
এবং আমাদেরকে খুব
সম্মান করছে। কোথায় থাকবো, কিভাবে
আমরা যুদ্ধ করবো
তার ব্যবস্হাদি তারা
করছে। কোথায়
কে আছে না আছে সমস্ত তথ্য তারা
সংগ্রহ করে দিতো
এবং তার ফলে যুদ্ধ
করতে আমাদের কোনো
অসুবিধা হইতো না। এইভাবে আমার
এলাকার লোক যথেষ্ট
সাহায্য করছে।
প্র:
যুদ্ধকালে বিরোধিতা
করেছিল কারা ?
উ: আমার এলাকায়
তেমন কেউ একটা
বিরোধিতা করেনি। হয়তো দুই/চারজন
ছিলো। তারা
কিছুটা গোপনে আমাদের
বিরোধিতা করছিলো। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে
করতে পারে নাই।
প্র:
আপনার গ্রাম বা
এলাকায় রাজাকার, আল-বদর কারা
ছিলো ?
উ: আমার এলাকায়
রাজাকার বলতে মোসলেম
নামে একজন ছিলো। সে অত্যন্ত দুধর্ষ
ছিলো। সেই
একমাত্র বিশেষ
করি আমাদের এলাকায়
বেশি ক্ষতি করছে। তারপরেও কিছু
রাজাকার ছিলো। তাদের পাকিস্তানি সৈন্যরা
জোর করে ধরে নিয়ে
রাজাকার বানাইছিলো। তারা কিন্তুক আমাদের
বিরোধিতা করে নাই। আমাদের উপকারই
করছে। আমাদের
প্রতি তাদের কোনো
বিরূপ মনোভাব ছিলো
না,
তারা
যদিও রাজাকার ছিলো। তারা নামে
মাত্রই রাজাকার
ছিলো।
প্র:
তারা এখন কোথায়
?
উ: মোসলেম
রাজাকার তো মারা
গেছে। সে ভারতে
পলায়ে গেছিলো। পরবর্তীতে
আমরা তাকে ধরি
নিয়া আসি মারি
ফেলছি।
প্র:
যে সমস্ত রাজাকার, আল-বদর স্বাধীনতা
যুদ্ধের বিরোধিতা
করেছিলো তাদের
ধরা হয়েছিলো কি
?
উ: আমরা কিছু
কিছু রাজাকার ধরছিলাম। তাদেরকে শায়েস্তাও করছি, মারিও ফেলছি। তারপরে আমাদের
নেতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
করার পর তাদেরকে
আমরা কিছু আর করতে
পারি নাই।
প্র:
আপনি মুক্তিযোদ্ধা
হিসাবে কোন্ কোন্
এলাকায় যুদ্ধ করেছেন
?
উ: মুক্তিযোদ্ধা
হিসাবে আমি প্রথম
দিকে আমার এলাকাতেই
যুদ্ধ করি। সেটা রঘুনাথপুর
গ্রাম। তারপরে
ঐ দিকে গুড়গুড়িতে
একটা বিরাট জঙ্গল
এলাকা ছিলো, সে এলাকায়
যুদ্ধ করি। পরে এদিকে টাকশুর
হাট, তারপরে
আপনার ওখরা বাড়ি
যুদ্ধ করি। মোটকথা পার্বতীপুর
থানার মধ্যেই যুদ্ধ
করছি।
প্র:
সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ
আপনি কোথায় করেছেন
?
উ: আমরা তো
গেরিলা ছিলাম। বড় যুদ্ধ করার
ব্যাপারে আমাদের
উপর নিষেধ ছিলো। সে রকম হাতিয়ারও
আমাদের ছিলো না, হেভী হাতিয়ার
ছিলো না। নির্দেশ ছিলো
গেরিলা হিসাবে
যুদ্ধ করার। ভয়াবহ যুদ্ধের
মধ্যে, আমরা একখানেই
বড় বিপদে পড়ছিলাম, যেটা আমি
আগে বলছি। সেটা টেকসোনার
হাটের কাছেই এক
গ্রামে। সেখানে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের
ঘেরাওয়ের মধ্যে
পড়ছিলাম। তারপরে ওখানে
৫ ঘন্টা ধরে মুখোমুখি
যুদ্ধ করি। এ ছাড়া আরেকখানে
আমরা ঘেরাওয়ের
মধ্যে পড়ছিলাম। সেখানে অবশ্য
আমরা যুদ্ধ করি
নাই।
বাঁচার
জন্য ওখান থাকি
আমরা ভাগি যাই।
প্র:
আপনার কাছে কি
অস্ত্র ছিলো ?
উ: আমার কাছে
এস.এল.আর. ছিলো। তাছাড়া ব্রিজ
ভাঙার জন্য এক্সপ্লোসিভ
ছিলো। ব্রিজ
ভাঙতে যা লাগে
সেইসব ছিলো। আর এন্টি ট্যাংক
মাইন, ছোট
ছোট মাইন আমাদের
কাছে ছিলো।
প্র:
দেশ যে দিন স্বাধীন
হয় তখন আপনি কোথায়
ছিলেন ?
উ: দেশ যখন
স্বাধীন হয় তখন
আমি আমার এলাকাতেই
ছিলাম। সেখানে
থাকিয়া আমরা ছোটখাটো
অপারেশন করতেছিলাম। এই অপারেশন
করতে করতেই দেশ
স্বাধীন হয়া গেলো। তার আগেই অবশ্য
খান সেনারা এখান
থাকি ভাগি যায়।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনি
গ্রামে ফিরে আপনার
গ্রামের অবস্হা কি দেখলেন
?
উ: যুদ্ধ শেষে
যখন বাড়িতে ফিরে
আসলাম তখন এই গ্রামে
কোনো জিনিস ছিলো
না। শুধু মাটি
আর বড় বড় ঘাস। এখানে মানুষ
যে বাস করতো এই
রকম চিম আমি দেখতে
পাই নাই।
প্র:
আপনার এলাকার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, মন্দির
এগুলোর অবস্হা কেমন ছিলো
?
উ: খান সেনারা
এমন বর্বর ছিলো
যে,
স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসা
এরা কিছুই মানে
নাই।
সব ভেঙে
চুরে ধ্বংস করছে। কতকগুলান মাটির
সাথে মিশাই দিছে। মন্দির একটাও
ছিলো না।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনার
অস্ত্র কি করলেন
?
উ: যুদ্ধে