নাম : আবুল কাশেম বাচ্চু

পিতা : মৃত সলিমউদ্দীন ফকির

গ্রাম/মহল্লা : ১৮, হাজী মহসীন রোড, খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকা

থানা : খুলনা মেট্টোপলিটন, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এস. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ২৭/২৮

১৯৭১ সালে পেশা : চাকরি

বর্তমান পেশা : চাকরি

 

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছিলেন বা কি জানেন ?

 

উ: পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইউনিভার্সিটি এলাকা এবং পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্হানে হত্যাযজ্ঞ চালায়পরের দিন আমরা এই আক্রমণের কথা জানতে পারিএটা জানার সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েঅন্যদিকে যারা ইয়াং ছিলো তারা এই খবর শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়লোঐ খবর পাওয়ার পর ইয়াং ছেলেপেলেরা এখানে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেএই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী খুলনায় পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেআমাদের তখন একটাই কথা ওদের হাত থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে হবেযুদ্ধ হবে এটা আমরা ধরে নিয়েছিলামকিন্তু যুদ্ধটা কিভাবে হবে, আমরা কোথা থেকে সাহায্য পাবো-এ সম্বন্ধে আমাদের কোনো আইডিয়া ছিলো না

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: ঠিক পাক বাহিনীর হাতে নয়রাজাকার বা আলবদর বাহিনীর হাতে আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম৭ ডিসেম্বর তারা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলোএটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনাআমি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসিআমার ছোট ৪ ভাই মুক্তিবাহিনীতে ছিলোআমি নানা কারণে মুক্তিবাহিনীতে যেতে পারিনিআমার এক ভাই যুদ্ধরত অবস্হায় পাকিস্তানিদের গুলিতে আহত হয়ে ভারতের ব্যারাকপুর সামরিক হাসপাতালে চিকিসাধীন ছিলোএই খবর আমরা পেয়েছিলাম

 

   তখন আমার রাতে ঘুম হতো নাসেদিন মানে ৭ ডিসেম্বর রাতে আমি জেগেই ছিলামঐ দিন রাত ২টার আগে আগে কারা যেন দরজা নক করেআমি দরজা খোলা মাত্র রাজাকার বা আলবদর বাহিনী আমাকে জাপটে ধরেতারপর তারা আমার হাত বেঁধে ফেললোপাশের ঘরে আমার আব্বা শুয়েছিলেনআমি ওদের বললাম যে, আমার আব্বাকে বলে যাইওরা কাউকে কিছু বলতে দিলো নাআমার বাড়ির কেউ টেরই পেলো না যে, রাজাকার বা আল-বদর আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেওরা আমাকে আটক করেই রওনা হলোঘরের দরজা খোলা রইলোতখন আমাদের বাড়ির পাশেই তকালীন ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানির একটা অফিস ছিলোঐ অফিসের চেরাগ আলী নামে একজন দারোয়ান ছিলোদেখি সে অফিসের গেটে দাঁড়িয়েআমি তখন ইচ্ছা করেই তাকে বললাম যে, চেরাগ আলী তুমি বাইরে কেন ? আমি তাকে ঘটনাটা বলার আগেই চেরাগ আলী বোধহয় বুঝলো যে, আমাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যাচ্ছেআমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পরই বোধহয় চেরাগ আলী আমার আব্বাকে খবর দেয়

 

   আমি যে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতাম তার মালিক ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানি এক পাঞ্জাবিতিনি তখন খুলনায় ছিলেন নামার্চ মাসেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তান চলে যানকিন্তু অপর ২/৩ জন পাঞ্জাবি কর্মকর্তা খুলনাতেই ছিলোএক পাঞ্জাবি কর্মকর্তা আমাকে আগেই বলেছিলো যে, তোমার যদি কোনো সময় কিছু সমস্যা হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খবর দিওআমার আব্বাকে কথাটা জানিয়ে রেখেছিলামআব্বা ফজরের নামাজ পড়েই ঐ পাঞ্জাবি কর্মকর্তার বাসায় গিয়ে আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর দেয়তখন ঐ পাঞ্জাবি কর্মকর্তা আমাকে ছাড়ায় নিয়ে আসে

 

প্র: রাজাকার বা আল-বদররা আপনাকে ধরে কোথায় নিয়ে গেলো ?

 

উ: আমাকে পয়লা নিয়ে গেলো সার্কিট হাউসের মাঠেসার্কিট হাউসের পাশে ওদের ক্যাম্প ছিলোওখানে নিয়ে আমাকে মাঠের মধ্যে বসালোতারপরে তারা রাইফেলটা কক করে আমাকে বলতে লাগলো, তোমার ভাইয়েরা কোথায় ? বলো, নইলে তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবেতাদের বললাম, আমি জানি না তারা কোথায়তারা কেউ বাড়ি থাকে নাতাদের বললাম, আমি একটা পাঞ্জাবি ফার্মে চাকরি করিআমি আমার মালিক এবং অপর কর্মকর্তাদের নাম বললামতখন তারা বললো, ঠিক আছে, সকাল ৭টা পর্যন্ত  আমরা দেখবোতারপর তোমার বিচার করা হবেএরপর তারা আমাকে ক্যাম্পের ভিতর একটা জায়গায় নিয়ে আটকায় রাখলোসকাল ৭টা ৮টার দিকে আমার পাকিস্তানি বস আমাকে ঐ ক্যাম্প থেকে ছাড়ায় নিয়ে আসেতার নাম ছিলো শফিক

 

প্র: রাজাকার বা আল-বদররা আপনাকে যেখানে আটকিয়ে রেখেছিলো সেখানে আর কেউ আটক ছিলো কি ?

 

উ:  হ্যাঁ, আমাকে তারা যে রুমে আটকায়ে রাখলো সে রুমের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ জন লোক ছিলোতাদের বেশিরভাগ সাধারণ লোকতারা সবাই কাঁদছিলোতাদের কাঁদা দেখে এক সময় আমার মনে হয়েছিলো যে আমাকেও বোধহয় ওরা মেরে ফেলবেতখন আমার মানসিক অবস্হাও তাদের মতো হয়েছিলোমৃতু অনিবার্য এটাই ধরে নিয়েছিলাম

 

প্র: শোনা যায় খুলনার আল-বদর ক্যাম্প অফিসার্স ক্লাবের ওখানে ছিলো ?

 

উ: না, আসলে এখন যেখানে পঙ্গু হাসপাতাল হয়েছে, সেখানেই ছিলো আলবদর ক্যাম্পসকালে দেখতে পেলাম মওলানা শামসুর রহমান আসার পর সমস্ত আলবদররা লাইন দিয়ে দাঁড়ালোসে তাদের সালাম গ্রহণ করলোসে তাদেরকে বিভিন্ন রকম নির্দেশ দিলোকিন্তু কি নির্দেশ দিলো সেটা আমি শুনতে পারিনি

 

প্র: শোনা যায়, ঐ সময় অনেক মহিলাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঐ ক্যাম্পে আটকিয়ে রাখা হতোএ রকম কিছু দেখেছিলেন কি ?

 

উ: এ রকম কিছু আমার নজরে পড়ে নাইআমি শুনেছি অফিসার্স ক্লাবে মেয়েদের আটকে রাখা হতোঐ জায়গায় তারা আমাকে নেয়নি

 

প্র: ঐ দিন সকালে পাকিস্তানিরা কি শুধু আপনাকে ছেড়ে দিলো না সবাইকে ছেড়ে দিলো ?

 

উ: শুধু আমাকে ছেড়েছেআর কাউকে ছাড়েনিতাদের পরে কি হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে কেন গেলেন না ?

 

উ: আমার মা ছিলো, ঘরে তিনটা বোন ছিলোবৃদ্ধ বাপ ছিলোসংসারে আর্নিং মেম্বার আমি একলাই ছিলামআমার ছোট ভাইয়েরা সবাই ইয়াং ছিলোতারা তো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিছেতাদের সবার পরামর্শেই আমি এখানে থেকে গেলাম পরিবারের দেখাশোনা করার জন্যে

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনী আপনার এলাকায় কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: ২৭ মার্চের পর পাকিস্তানিরা এই এলাকায় আসেপাকিস্তানিরা বলতে আর্মি আসেখুলনা এসেই কয়েকটা গাড়িতে করে তারা টহল দেয়া শুরু করে আর মাইকে আমাদের রাস্তায় বের না হওয়ার জন্যে নির্দেশ দেয়প্রথম দিকে প্রায় টাইমে এখানে কার্ফু থাকতোওরা বলতো যে, কোনো দুষকৃতিকারীর খবর পেলে তাদের ক্যাম্পে যেন খবর দেওয়া হয়রাজাকার এবং আলবদর বাহিনী গঠিত হওয়ার পর পাক সেনারা পরের দিকে আমাদের মহল্লায় খুব একটা আসতো নাসার্কিট হাউসের সামনে কুমুদ ঘোষের বাড়িতে রাজাকার ক্যাম্প ছিলোতার পাশেই আলবদর বাহিনীর ছোট একটা ক্যাম্প ছিলোআবার ওদিকে কবরখানার মোড়ে ভুতের দালানে রাজাকার ক্যাম্প ছিলোসেজন্য এদিকটায় বড় একটা আর্মি আসতো নারাজাকার এবং আলবদর বাহিনী এখানে সব সময় থাকতোখুলনা শহরে পাকিস্তানিরা একচুয়ালি আক্রমণ করে দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায়তখন ওখানে তাদের কিছুটা প্রতিরোধ করা হয়পয়লা প্রতিরোধ হয় ইপিআর ক্যাম্প থেকেইপিআর ক্যাম্পের ওখানে যখন প্রতিরোধ হয় তখন আমরা তাদের জন্য রুটি, ডাল, চিড়ে, মুড়ি, গুড়, ডাব ইত্যাদি পৌঁছে দিতামতখন বাঙালি ইপিআর-পুলিশ মিলে তাদের মোকাবিলা করছিলোখুলনার কিছু কিছু এলাকা তখনও মুক্ত ছিলোকিন্তু সেটা স্বল্প সময়ের জন্যতারপর গোটা খুলনা পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়

 

প্র: তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকা কি ছিলো ?

 

উ: এরা একচুয়ালি নিজেরা না এসে আল-বদর বা রাজাকার দিয়ে লোকজন ধরিয়ে নিয়ে যেতোপাক বাহিনী যাদেরকে ধরতে বলতো তারা সেই সেই লোককে ধরে নিয়ে যেতোহতভাগ্য ঐ সব লোককে পরে ফরেস্ট ঘাটে বা কাস্টম ঘাটে এনে রাতের অন্ধকারে হত্যা করতোগল্লামারিতে খালের ওখানে পাক বাহিনী অনেক লোককে হত্যা করেছেখুলনা বাজারে যে সমস্ত দোকান ছিলো সে সব দোকান তারা লুট করেরাস্তায় কোনো জোয়ান ছেলে দেখলে তাকে তারা ধরে নিয়ে যেতোহঠা করে কোনো হিন্দু যদি রাস্তা দিয়ে ধুতি পরে যেতো তাহলে তার মৃত্যু ছিলো অনিবার্যযে বুঝতো না, বা জানতো না-এমন অনেকেই ধুতি পরে শহরে এসেছেফলে, তাদের বিপদও হয়েছেএকদিন দুপুর বেলায় সাউথ সেন্ট্রাল রোডের সামনে দিয়ে এক হিন্দু ভদ্রলোক ধুতি পরে যাচ্ছিলোতখন সার্কিট হাউস থেকে পাক সেনারা তাকে দেখতে পায়সঙ্গে সঙ্গে দুজন সেনা এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়ঐ ভদ্রলোককে তারা নিকটবর্তী একটি টোলের ভিতর নিয়ে গিয়ে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করেটোলে তখন সংস্কৃত পড়ানো হতোপরে আমরা লোকটাকে মৃত অবস্হায় পড়ে থাকতে দেখেছিসুজাদ হোসেন মোক্তার সাহেবের ছেলে আনোয়ার হোসেন আনুকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায়আফতাবউদ্দীন আহমদ সাহেবের ছেলে নুরুল ইসলাম মন্নুকেও ধরে নিয়ে যায়আমাদের এখানে ফজলুর রহমান নামে এক দর্জি ছিলোতার ভাগ্নে মান্নানকে ধরে নিয়ে যায়আমাদের এখানে ভুবন ভদ্র মুহুরী বলে এক লোক ছিলেনতার এক ছেলে, ডাক নাম মনাতাকে ধরে নিয়ে যায়পাক বাহিনী এদেরকে ধরে নিয়ে টুটপাড়া খালের ওখানে বা কাস্টম ঘাটে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেনুরুল ইসলাম মন্নুর লাশটা পাওয়া গেছিলোআর কারো লাশ পাওয়া যায়নিপাক বাহিনী আরও কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেছেএখন তাদের নাম আমার মনে নাইতাদেরও ওরা মেরে ফেলছিলোআমার মনে হয় আমার এলাকার ভিতর থেকে যুবক ছেলেপেলেদেরকেই ওরা বেশি ধরছে

 

প্র: আপনি  যাদের নাম বললেন তাদের সবাইকে কি পাক বাহিনীই ধরেছিলো ?

 

উ: বেশিরভাগকে ওরা নিজেরাই ধরেছেকয়েকজনকে রাজাকার, আল-বদররা ধরেছেরাজাকার আল-বদররা ধরে ওদের হাতে তুলে দিতো

 

প্র: এখানে রাজাকার আল-বদর বা আল-শামস্‌দের ক্যাম্প কোথায় ছিলো ?

 

উ: ভুতের দালানে ছিলো এখন যেটা আনসার ক্যাম্প বা বি. ডি. আর. ক্যাম্প বলেআল-শামস-এর ক্যাম্প ছিলো ফেরিঘাটের কাছেআর আল-বদর বাহিনীর ক্যাম্প ছিলো সার্কিট হাউসের সামনে প্রমোদ ঘোষের বাড়িতে এখন যেটা পঙ্গু হাসপাতালএ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ওদের আস্তানা ছিলোযেমন রূপসা ঘাটে ওদের একটা আস্তানা ছিলোতারপরে গল্লামারিতে ছিলোখালিশপুর  অঞ্চলে ছিলোখালিশপুর অঞ্চলে বিহারী বেশি ছিলোবিহারীরা প্রথম দিকে প্রচুর বাঙালি হত্যা করেএই সংবাদ আমরা পরে জানতে পারিআমি যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম সেটা একটা শিপিং কোম্পানিআমি একদিন মংলা পোর্টে গেছিতখন মংলা পোর্ট থেকে যাওয়া আসার অন্য কোনো যান বাহন ছিলো নাএকমাত্র রকেট আর লঞ্চ  আমি লঞ্চে না এসে রকেটে যাওয়া আসা করতামরকেটকেই সেইফ মনে করতামএকদিন রকেটে দিনের ১১টা/১২টার দিকে আমি আসছিতখন বটিয়াঘাটা থেকে একদম রকেট ঘাট পর্যন্ত নদীতে প্রচুর লাশ দেখতে পেলামপরের দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, দৌলতপুর-খালিশপুর মিল এলাকার বাঙালিদেরকে বিহারীরা মেরে নদীতে ফেলছেআমার মনে হয় কয়েক শ লাশ হবে

 

প্র: পাক বাহিনীর ক্যাম্প কোথায় ছিলো ?

 

উ: পাকিস্তানিদের ক্যাম্প ছিলো একচুয়ালি সার্কিট হাউসেএখানে মূলত: অফিসাররা থাকতোআর ক্যাম্প বলতে যেটা বুঝায় যেটা সৈন্য বাহিনীর ক্যাম্প সেটা ছিলো চরের হাটেএ দুটাই তাদের মেইন ক্যাম্প ছিলো