নাম : আহমদ আলী

পিতা : ইয়াদ আলী

গ্রাম : রঘুনাথপুর (ফকিরের বাজার),  ইউনিয়ন : রামপুর

ডাক : নূরুল মজিদ,  থানা : পার্বতীপুর,  জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : দশম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ৩০/৩২

১৯৭১ সালে পেশা : রাজনৈতিক কর্মী

বর্তমান পেশা : বেকার

 

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, আক্রান্ত হয়েছিলাম

 

প্র: কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন ?

 

উ: আমার বাড়িটা খানেরা পুড়িয়ে দিছিলোতারপর আমি পোড়া বাড়িতে আসি একটা ঘরে ছিলামওরা আবার আসছে বাজারের মধ্য দিয়াআমি জানি নাওরা আমার বাড়িটা আবার ঘিরছিলোতখন আমি একটু ফাঁক পাইয়া দৌড় মারছিলামসামনে একটা আড়া (জঙ্গল) ছিলো তার ভিতর দিয়া দৌড় মারছিপাকিস্তানি সৈন্যরা আমাক গুলি করছিলোকিন্তু আমাক লাগে নাই

 

প্র: আপনি কি তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কাজ করছিলেন ?

 

উ: না, তখনো আমি মুক্তিযোদ্ধা হই নাইসাধারণ মানুষ হিসাবে বাড়ি দেখার জন্য সে দিন আসছিলাম

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের গ্রামে আসতোগুলি করে যাকে তাকে মারতোমেয়েছেলেক ধর্ষণ করতোতারা বহু কিছু করতোএইগুলা সহ্য করতে না পাইরা আমরা দল বাঁধি মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করে ?

 

উ: ২৫ মার্চের কিছুদিন পর থেকে

 

প্র: তারা কিভাবে আক্রমণ করলো ?

 

উ: তারা গাড়ি নিয়া আসতোকখনও বদরগঞ্জ থাইকা আসতো, কখনও পার্বতীপুর থাইকা আসতোআবার কখনও দুইদিক থাইকা একই সময়ে আসতোতাদের মধ্যে কি যোগাযোগ যেন ছিলো! একই সময় দুই দিক থাকিয়া আইসা এখানে নামতোনামিয়া দুই ভাগ হইয়া দুইদিকে যাইয়া গ্রাম বা বাড়ি ঘেরাও করতো

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সেই সময় আপনার এলাকায় আর কি কি করলো ?

 

উ: তারা বহু কিছু করছেআমাদের ধান চাউল নিয়া গেছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিছে এবং গরু বাছুর নিয়া গেছেযা কিছু পছন্দ হইছে সব নিয়া গেছেআর যাকে যখন পাইছে গুলি করছে

 

প্র: আর কি করেছে ?

 

উ: আর তো নারী নির্যাতন করছেখুব নারী নির্যাতন করছে

 

প্র: আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছেন কি ?

 

উ: আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয়নিতবে আমার এক ভাই খায়রুল আলমকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরছিলোতাকে ধরে খুব মারছিলোমারের চোটে মরার মতন হছিলো সে

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে কিভাবে ধরছিলো ?

 

উ: ভারত থেকে যে সব মুক্তিযোদ্ধা আমাদের এখানে আসতো সে তাদের গাইড করতোকোথায় কি করতে হবে, কোথায় মাইন বসাইতে হবে, কোথায় অপারেশন করতে হবে, এই তার কাজ ছিলোএইটা কেমনে যেনো ওরা জাইনা ফেললোমায়ের অসুখ হইছিলোসে দিন সে বাড়িতে আসে এবং মসজিদে লুকাইয়া ছিলোঐ দিন কেমন কইরা যেন খানেরা ওরা কথা জানছেকেমনে জানছে আল্লায় জানে! ঐ দিন ৬০ জন খান এবং বহু রাজাকার আসিয়া তাকে ঘেরাও করেঘেরাও করিয়া ওখানে তাকে ধরেওখান থেকে তাকে পার্বতীপুর নিয়া গাছে লটকাইয়া মারপিট করেমারপিট করার পর ওখান থাকি নিয়া যায় দিনাজপুরদিনাজপুর নিয়া যাইয়া সেখানেও তাকে খুব নির্যাতন করেকয়েকদিন পর তাকে মারবে বলিয়া রামসাগর নিয়া গেছিলোআমি তো তখন ছিলাম ভারতেআমার আত্মীয়-স্বজন বাংলাদেশে যারা ছিলো, তারা সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. বারীর কাছেড. বারীকে পাকিস্তানিরা খুব খাতির করতোড. বারী সম্ভবত ঢাকায় টেলিফোন করছিলেনঢাকা থাকি আবার টেলিফোন করছে রাজশাহীরাজশাহী থেকে দিনাজপুরদিনাজপুরের রামসাগরে যখন ওকে গুলি করতে নিয়া যাবে তখন নাকি সেখানে এক ফ্লাগঅলা গাড়ি যায়ঐ গাড়ি যায়ে ওকে বাঁচায়ওরা তাকে কাপড় দেয়সে তখন উলঙ্গ অবস্হায় ছিলোএভাবে নাকি সে বেঁচে যায়আমি পরে আইসা এই ঘটনা শুনছি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এক মাসের ছিলোএক মাস ট্রেনিং নিয়া আইসা মুক্তিযোদ্ধারা তৎপরতা আরম্ভ করছেআমার ডেইট খেয়াল নাই

 

প্র: আপনি নিজে কখন থেকে তৎপরতা শুরু করেন ?

 

উ: আমি বোধহয় পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করার মাস খানেক পরে চলে গেছিতারপরে ওখানে এক মাস ট্রেনিং নেওয়ার পরে দেশে আসিয়া তৎপরতা আরম্ভ করছি

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে আপনার এলাকার জনগণের মনোভাব কেমন ছিল ?

 

উ: খুব ভাল ছিলোতারা সহযোগিতা করতোখাবার দিতোজায়গা দিতো এবং সঙ্গে থেকে কাজও করতোআমাদের হাতিয়ার এবং ভারী মালপত্র বহন করতো, এখানে ওখানে পৌঁছে দিতোজনগণ খুব করে সহযোগিতা করছিলো

 

প্র: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আপনাদের বিরোধিতা করেছিলো কারা ?

 

উ: বিরোধিতা করেছিলো ঐ যে একটা দল আছিলো, তাদের আমি আইজ পর্যন্ত দেখতে পারি নাতারা হইলো ঐ জামাতী ইসলামওরা বিরোধিতা করছেওদের আমি কেয়ামত পর্যন্ত দেখতে পারবো না

 

প্র: স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল-বদরদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: হ্যাঁ, অনেক ধরা হইছিলোঅনেকগুলাক মারছি আমরা

 

প্র: আপনি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কোন্‌ এলাকায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: ফকিরের বাজার, খোলাহাটি থাকি পার্বতীপুর পর্যন্ত আমার এলাকা ছিলোআবার এখান থাকি গুড়গুড়ি, লালদীঘি পর্যন্ত যুদ্ধ করছিআর ঐ দিকে বদরগঞ্জের বাচ্চা মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ করছি

 

প্র: আপনি সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ কোথায় করেছেন ?

 

উ: ভয়াবহ যুদ্ধ হইছিলো আমাদের সাকোয়ার ব্রিজের ওখানে যে বিল আছে সেখানে

 

প্র: সেখানে কিভাবে যুদ্ধ হয়েছিলো ?

 

উ: সেখানে খান সেনাদের সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা হয়ঐ দিন আমাদের এক ছেলে শহীদ হছিলোআনোয়ারুল হক তার নামসে বাপ মায়ের একমাত্র সন্তা

 

প্র: সে কিভাবে শহীদ হলো ?

 

উ: সে পজিশন নিছিলো উপরেগুলি আইসে সরাসরি তার মাথায় লাগছিলো

 

প্র: আপনারা কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ?

 

উ: সে দিন আমরা বোধহয় ৪০ জনের উপরে ছিলামমুক্তিযোদ্ধাদের তিন চাইরটা দল আছিলো

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্য কতজন ছিলো ?

 

উ: ওদের কথা আমরা বলতে পারবো নাওরা কতজন ছিলো সেটা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে নাকারণ তারা আড়ালে ছিলো এবং নাগালের বাইরে ছিলো

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যদের সে দিন আপনারা হতাহত করতে পেরেছিলেন কি ?

 

উ: তা জানি নাতাদের ভিতর কি হইছে না হইছে জানি নাতবে ওরা যুদ্ধের পর চলে গেছে

 

প্র: আপনারা  তাদের কোনো ক্যাম্প দখল করতে পারছিলেন ?

 

উ: বহু করছি ঐ দিকেসীমান্তের ঐ দিকেএ দিকে তাদের কোনো ক্যাম্প ছিলো নাওরা তো পার্বতীপুর, বদরগঞ্জে থাকতোঐ দিকে আমরা বহুগুলা ক্যাম্প দখল করছিএকদিন এক ঘটনা ঘটলো...

 

প্র: কি ঘটনা সেটা ?

 

উ: আমি একদিন এক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গেছিলামআমাকে সেখানকার কমান্ডার আটকাইলোআটকাইয়া আমাকে ফ্রন্ট ফাইটে পাঠাইয়া দিলোআমার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গার মুক্তিযোদ্ধা ছিলোফকিরাবাজারের আমি একাই ছিলাম সেই দিনআমার সঙ্গে এক মুক্তিযোদ্ধা যার পরনে প্যান্ট ছিলো আর পায়ে কাপড়ের জুতারাইফেল বগলে নিয়া ফায়ার করতে করতে আমরা বাংকারের দিকে যাচ্ছিঐ ছেলেটির যে কখন গুলি লাগছে, সেটা আমরা কেউ জানি নাতার শরীর থেকে রক্ত জুতার উপর দিয়া গড়ি পড়ছে সেও তা জানে নাটেরও পায়নিআমরা যখন বাংকারের কাছে গেছি তখন ছেলেটা ধরা পড়ে গেলোধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জান বেরিয়ে গেলসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো

 

প্র: এ ঘটনা কোথায় ঘটেছিলো ?

 

উ: সেটা ফুলবাড়িতেজাগার নাম আমার এখন খেয়াল নাইপাকিস্তানিদের একটা বাংকার দখল করতে ক্যাম্প কমান্ডার আমাদের নিয়ে গেছিলো

 

প্র: আর কোথায় ভয়াবহ যুদ্ধ করেছেন আপনি ?

 

উ: আর একটা ভয়াবহ যুদ্ধ হইছিলো খোলাহাটির পূর্বপাশেওখানে যে নদী আছে, তার উপর ব্রিজ ছিলো সেই ব্রিজটা আমরা ভাঙতে গেছিলামআমরা ওখানে ডাটা স্লাব লাগাইছিলামকটেজ নিয়া গেছিলামআগুন লাগাই দিছিতারপরে ব্রিজটা উড়ি গেছেঅলরেডী আমরা ব্রিজটা ভাংগি দিছিতহন পাকিস্তানি সৈন্যরা দুইদিক থাকি গাড়ি নিয়া আসি আমাদের ধাওয়া করছিলোকিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি হয় নাইআরেকটা ভয়াবহ ঘটনা, সেটা হলো: একদিন ভোরের সময় নুরুল মজিদ-নুরুল হুদা হাইস্কুলের সামনে বাঘগড় নামে একটা পাড়া ছিলোসেখানে বাঘগড়ের এক ছেলেক, ওর নাম আমার এখন খেয়াল নাই, পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরি নিয়া আসি চোখ দুইডা তুলি নিয়া খালে ফেলাইছিলোআমরা এইটা শুনিয়া খুব ভোর বেলা সেখানে খান সেনাদের অ্যাটাক করছিলামবহু রাজাকারও ছিলোআমরা এক রাজাকারকে ধরছিযুদ্ধের সময় দুইদিক থেকে ওদের আরো সৈন্য আসেতারপরও তারা আমাদের সঙ্গে পারে নাইপরে ওরা ভাগি গেছেযাওয়ার আগে ছেলেটাক ওরা মারি ফেলছেওরা যাবার পর আমরা ঐ ছেলেটাকে নিয়ে আসিখান সেনারা তার কল্লা কাটি ফেলাইছিলো

 

প্র: দেশ যখন স্বাধীন হয় সে সময় আপনি কোথায় ছিলেন ?

 

উ: দেশ যে দিন স্বাধীন হয়তার আগের দিন আমরা লালদীঘিতে গেছিলামলালদীঘিতে রাজাকারদের বড় সব লীডার ছিলোতাদের বাড়ি ঘেরাও করছিলামওটা হলো রংপুরের বদরগঞ্জ থানায়সেখানে যাইয়া শুক্কু পাইকার নামে এক রাজাকার লীডার ছিলো তার বাড়ি আমরা ঘেরাও করছিলামওখান থাকি যখন আসি তখন রঘুনাথপুরে রাইত প্রায় শেষ হয়া যায়আমরা ওখানে শেলটার নিছিলাম এক বাড়িতেসকালে ভোর ভোর সময় ঘুমাইছিকিছুক্ষণ পরে প্লেন আসছিলোতখন আমরা আবার বাইর হইয়া গেছিযখনই প্লেনের শব্দ পাইছি তখনই হাতিয়ার নিয়া বাইর হইয়া গেছিতখন আমাদের কোনো ভয় ছিলো নাবাইর হইয়া দেখছিলাম কেউ কোথাও আছে কি নারাজাকার টাজাকার সব তো তখন গায়েব হয়া গেছেতখন আমরা ওদের খুঁজি বেড়াতামতারপর ওখানে এক জঙ্গলের ভিতর থাইকা এক রাজাকারকে ধরি নিয়া আসলামঐ রাজাকারকে ধরার পর ওখান থাকি গেলাম একদম ঐ গড়পুকুর হাটেগড়পুকুর হাটে ঐ রাজাকারকে আমরা মারি দিছি

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে আপনার এলাকার অবস্হা আপনি কি দেখলেন ?

 

উ: সব একদম বিধ্বস্তকিছু নাইআমাদের ঘরবাড়ি তো সব মাটির