নাম
:
আলেক ভূঁইয়া
পিতার
নাম : মোঃ আবুল
হোসেন ভূঁইয়া
গ্রাম
:
সায়েদাবাজ
ইউনিয়ন
:
বিনাউটি
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : ২৬
১৯৭১
সালে
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : অষ্টম
শ্রেণী
১৯৭১
সালে পেশা : চাকরি,সেনাবাহিনী
বর্তমান
পেশা :
অবসরপ্রাপ্ত
বেঙ্গল
রেজিমেন্টের
নায়েক আলেক
ভূঁইয়া ২৫ শে
মার্চ রাতে বগুড়ার
পাক এমুনেশন
ডিপোডে
পাহারারত
ছিলেন। ২৭ শে মার্চ
বগুড়াতে
পাকিস্তানিদের
বিরুদ্ধে
অস্ত্র ধরে
ডিসেম্বরে
বিজয় অর্জন
পর্যন্ত তিনি
লড়াই করেছেন। আলেক
ভুঁইয়া কসবা
এবং
কুমিল্লার
লড়াইয়ের কথা
যেমন
বলেছেন-তেমনি
শরণার্থী,কুমিল্লা
সেনানিবাস আর
নিজ গ্রামের
কথাও জানিয়েছেন।
প্র:
২৫শে মার্চের
আক্রমণের পর
আপনি কি করলেন?
উ: সেটা
আমরা অবশ্য
সেনাবাহিনীতে
থাইকা পুরাপুরি
জানি নাই। আমি তখন
সৈয়দপুর
সেনানিবাসে
ছিলাম। ঐখান
থাইকা
ডিউটিরতভাবে
গেছিলাম
বগুড়ার আড়ীয়াবাজারের
অ্যামুনেশন
ডিপো পাহারা
দিতে। সেখানে
পাক
সেনাবাহিনীও
ছিল,আমরা
বেঙ্গল
রেজিমেন্টের
লোকও ছিলাম। পাক
সেনাবাহিনীর
২২ জন
লোক ছিল। ক্যাপ্টেন
নূর ছিল পাঠান
এবং তার
নেতৃত্বেই আমরা
ছিলাম। তখন
আমি পাক
আর্মির একজন
নায়েক ছিলাম। ওখানে দস্তর মতো
বাঙালিদের
সাথে
পশ্চিমাদের
যুদ্ধ হয়। ২জন লোক তারা
নিহত হইছে
যুদ্ধ কইরা ২৭
মার্চে। তারা একজন
ছিল পাঞ্জাবি
আর একজন ছিল
বেলুচি। বেলুচি যে
ছিল সে
হাবিলদার। তার নাম ছিল
গোলজার। বাকি যে
সতেরো জন ছিলো
তারা
আত্মসমর্পণ
করে ক্যাপ্টেন
নূরসহ। তাদের
আইন্যা
জেলখানায়
রাখা হয়।
প্র:
আপনি কিভাবে
মুক্তিযুদ্ধে
জড়িয়ে পড়লেন
বা অংশগ্রহণ
করলেন?
উ: আমার
মুক্তিযুদ্ধ
এখান থেকেই
শুরু হইল। বগুড়া
আড়ীয়াবাজার
থাইকা তাদেরে
সারেণ্ডার করানোর
পর
অস্ত্রগুলাতো
আমাদের হাতেই
আছে। তখন
আমরা
কাটাখালির
ব্রিজে চইলা
যাই। আমরা
ছিলাম প্রায়
পঁয়ত্রিশ জন
লোক। এই
পঁয়ত্রিশ
জনের মধ্যে
একজন নায়েব
সুবেদার ছিল
কাশেশ বইলা
নাম। সে
বাংলাদেশ
আর্মিতে
অনারারি
ক্যাপ্টেন হইয়া
পেনশন পাইছে। নোয়াখালী
বাড়ি ছিল। তাঁর
নেতৃত্বে
আমরা চইলা
গেলাম
কাটাখালি ব্রিজ,রংপুর
থাইকা আরও
পাকসেনা আসবে
তাদের ঠেকানোর
জন্য। রংপুর
থাইকা
সেনাবাহিনী
আসল ট্যাংক
নিয়া,গোলন্দাজ
বাড়িনী নিয়া,বহুত
কিছু শক্তি
নিয়া তারা আসল। তাদের
ঠেকাইবার মতো
কোনো ক্ষমতা
আমাদের নেই। আমাদের
কাছে ভারী
কোনো অস্ত্র
ছিল না। কেবল
লাইট মেশিন
গানের উপরে আস্হা রাখা
যায় না। তখন
আমরা
ছত্রভঙ্গ হই
তাদের
আর্টিলারি
এবং ট্যাঙ্কের
চাপে। এরপরে
আস্তে আস্তে আমরা
ক্লোজ হইছি
কিছু লোক। হওয়ার পরে
আমরা যুদ্ধ
করতে করতে নদী
পার হয়ে জামারপুর
আসলাম। জামালপুর
দিয়া
ময়মনসিংহ
দিয়া আপনার টু
সেক্টরে আইসা
গেলাম। টু
সেক্টরে
আসলাম আমরা
প্রায় জুনের
দিকে। টু
সেক্টরে আইসা
কসবাতে আমি
পুরা যুদ্ধই
করলাম। ক্যাপ্টেন
আইনউদ্ধিন
ছিল,ক্যাপ্টেন
গাফফার ছিল। ক্যাপ্টেন
আইনউদ্দিন
নাইন বেঙ্গল
গড়ে তুলবেন। তিনিই তার
নেতৃত্ব
দিলেন। টু
সেক্টরের
যুদ্ধ মনে
করেন আখাউড়া
এবং কসবা কসবাতে
বেশি হইছে। কসবাতে আমি
দুইটা
অ্যাটাক করছি।
প্র:
কসবা যুদ্ধের
কাহিনী বলেন? এরপর
আপনি কি করলেন?
উ: কসবাতে
অ্যাটাক হইল
শবে-বরাতের
দিন। শবে
বরাতের দিন
আমরা কসবা
স্টেশন
আক্রমণ করি। সেই
আক্রমণে
আমাদের দুইজন
লোক শহীদ হইছে। পাক
সেনাবাহিনীরও
জ্জ জন প্রাণ
হারাইছে। তারপরে তারা
জাগা চাইড়্যা
দিয়া গেছে। আমরা জাগা
ক্যাপচার করি। দুই রোজার
দিন আবার কসবা
পুরান বাজার
এবং স্কুল
আক্রমণ করি। আমরা
সাকসেসফুল
হইছি। জাগাও
আমরা
ক্যাপচার
করছি। আমরার
দুই একটা লোক
কিছু হতাহত
হইছে। প্রচণ্ড
যুদ্ধ। তারাতো
ডিফেন্সে ছিল। তারা
যেখানে বইসা
ছিল,সে
জাগা থাইক্যা
আমরা হটাইছি। তারা তখন
জাগা ছাইড়া
দিয়া নতুন
বাজারে চইরা গেল
গাঙ পার হইয়া। গাঙ এর
সাইডটা আমরা
পুরা
ক্যাপচার
কইরা নিলাম। তারপর পাঁচ-ছয়
রোজার মধ্যে
আমরা
ইন্ডিয়ান
আর্মির কাছে কায়গাটা
হ্যান্ডওভার
করি। তখন
আমরা
ইন্ডিয়ার
ভিতরে চইলা
যাই। ইন্ডিয়া
থাইকা পুরা
নাইন বেঙ্গল
একত্রিত হইয়া
সোনামুড়া
হইয়া আবার
আমরা
কুমিল্লা রেল
লাইন দিয়া
কুমিল্লা
ক্যান্টনমেন্ট
অ্যাটাক করি।
প্র:
আপনি
শরণার্থীদের
সীমান্ত
অতিক্রম
কিভাবে
সহযোগিতা
করেছেন?
উ:
শরণার্থী
নৌকাতে মনে
করেন শত শত
লোক আসে। পার
করুইন্যা লোক
আছে। তারা
পার করে। তারা পয়সার
মাধ্যমে পার
করে আর কি। এই যে আদম
ব্যাপারি আছে
না,এই
টাইপের। শরণার্থীরা
আদম
ব্যাপারিই
বলতো। তারা
ইন্ডিয়া পার
করত আরকি। যখন কোনো শরণার্থী
নিয়া আসছে তখন
সে ইন্ডিয়া
পর্যন্ত পার
করত টাকার
বিনিময়ে। রাজাকাররা
এই কাজ করছে। শরণার্থী
নৌকা মনে করেন
৫০/৬০টা করে
নৌকা যাইয়া
ব্রিজটার
পশ্চিম পাশে
একটা বাড়ি আছে
ফাঁকা মাঠের
মধ্যে,সেখানে আর
কোনো বাড়ি নাই,ভিটি
বাড়ি
নারিকেল-টারিকেল
গাছ আছে,ঐ বাড়িটার
চতুর্দিক
দিয়া যাইয়া
নৌকাডি লাগে। এরপরে ছনু
মিয়া ছিল
ছতরার সে ছিল
রাজাকার। এরা যাইয়া
ওদের থাইকা
পয়সা লইত,লইয়া
সাইরা পাস দিত। পাঞ্জাবিরা
যখন এদিগদা
ট্যুর দিয়া
যাইত গা তখন
হেরা লাইন দিত
নৌকাডিরে
পয়সার
বিনিময়ে পার
করার জন্য। একদিন
ছনুমিয়ারা
যখন গেল রাত্রে
তখন আমরার
নৌকাডিরে
সরাইয়া
সরাইয়া চিপায়
নিয়া লাগাইছি। অন্ধকারের
মধ্যে হয়ত
বুঝতে পারে
নাই যে আমরার
মুক্তিবাহিনীর
নৌকা। রাজাকাররা
ঐ দিগদা আইছে
হেরারথে টাকা
নিত,তারপর
সংকেত দিত। সংকেতে পার
হবে। ওরা
আসছে পরে হঠাৎ কইরা
আমরা গিয়া
সামনে
দাঁড়াইছি
অস্ত্র লইয়া। যখন
দাঁড়াইছি
তখনতো
রাজাকাররা
এক্কেরে হায়
হুতাশ
দেখাইছে
এহনতো শেষ। আমি বলছি
তোমাদেরতো
আমরা জানি। তোমরা হিরু
মিয়ার লোক,তোমরার
বাড়ি ছতরা; তোমরার
আত্মীয়-স্বজন
সব আছে ছতরা। তোমরার
আত্মীয়-স্বজন
বাল-বাচ্চাও
আছে। তোমাদেরতো
আমরা কিছুই
করি না। করলে
যে কোনো সময়
করতে পারি। তবে আমরা
মুক্তিবাহিনী
এইভাবেই আসবো। কোন সময়
আসবো এইডা কেউ
কইতে পারবে না। তবে তোমরা
বাঙালি হইয়া
যদি এইটা কর,রাজাকারি
কর তোমাদের
সবংশে মাইরা
দিব। তোমাদের
সপরিবারে
ধ্বংস করব না। তুমি
রাজাকারি কর,অসুবিধা
নাই। তখন
তারা কয় হাঁ, হাঁ,বলেন। আপনে যা
কন,তাই করব। তখন আমি
বললাম যে ঠিক
আছে,রাজাকারি
করো। শরণাথীরার
লগে আচরণ
খারাপ কইরো না। আর আমরা
যদি বলি,আমাদের
গোলাবারুদ,মুক্তিবাহিনী
আইবো যাইবো
এইডা ঠিক মতো
পাস দিবা। কোনো ক্ষতি
করতে পারবা না। তখন
জামালরে আর ঐ
ছেলেটারে
তুইলা দিলাম
এদের কাছে। এরারে তোমরা
ইন্ডিয়া
পর্যন্ত পার
করবা তোমাদের
দায়িত্বে। যদি তাদের
কোনো কিছু হয়
তাইলে তোমরা
কিন্তু সপরিবারে
ধ্বংস হইয়া
যাইবা। তারপর
তারা আমাদের
নৌকা পার করছে
ভালোভাবেই। যখননি ছনু
মিয়া দেশ
স্বাধীনের
পরে সারেন্ডার
করে আমার ভাই
মাতম মিয়ার
কাছে তখন আমি
আমার ভাই মাতম
মিয়ারে বলছি
যে,ছনু
মিয়ারে
কিন্তু মাইরো
না,হেরা
আমাদের কথা
মতো কাজ করছে
সব সময়ই। হেরা
রাজাকার বটে
কিন্তু হেরা
কাজ কইরা গেছে,আমাদের
মুক্তিবাহিনীর
উপকার কইরা
গেছে।
প্র:
আপনি ঢাকার
দিকে কবে
গেলেন?
উ: যখন
আমরা
কুমিল্লা
ক্যান্টনমেন্ট
ক্যাপচার করি
এবং ক্যাপচার
করার পরে
কুমিল্লাতে
যখন নাকি
সালেন্ডার
হইয়া গেল পুরা
পাক সেনাবাহিনী
তখন
ক্যান্টনমেন্টে
আমরা ঢুইকা
গেলাম,ইন্ডিয়ান
আর্মিও ঢুইকা
গেল। এর কিছু
দিন পরে সংবাদ
পাওয়া গেল যে,ঢাকাতে
যে মিরপুর আছে
সেই মিরপুরে
১১/১২ নম্বরে
বিহারীরা খুব
উত্তেজিত। বিহারীদের
কাছে কোনো
সেনাবাহিনী
ঢুকতে পারতেছে
না এত অস্ত্র
দিয়া গেছে পাক
সেনাবাহিনী। তখন আমরা
শুনতে পাইলাম
যে একটা
কোম্পানি ঢাকার
উদ্দেশ্যে
রওয়ানা দিছে।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
কারা কারা
শহীদ হয়েছে?
উ: ৩৮ জন
মারা গেছিল
আমাদের
গ্রামে যেদিন
আমরা তিনলাখ
পীর আক্রমণ
করছিলাম। আক্রমণ
কইরাতো আমরা
গ্রামডা
ছাইড়া চইলা
যাই। তখন
পাঞ্জাবিরা
বিকাল বেলা এই
গেরামে আইয়া উঠছে। এছাড়াও
এরা যে
আর্টিলারি
মারছিল তাতে
মরছিল। আমার
চাচতো ভাই
ইদ্রিছ বইলা
নাম আছিল সে
এবং আমা রআর
এক ভাই লাগে
সম্পর্কে
আবদুল্লাহ
কইরা নাম আছিল
এরা দুইজন এবং
খোকন এই ৩ জন
হেরা নৌকা
দিয়া
যাইতেছিল। হেরা সাধারণ
পাবলিক। হেরা নৌকায়
যখন ব্রিজের
ওখানে গেছে
তখন পাঞ্জাবিরা
দেইখ্যা গুলি
শুরু করছে। তখন তারা
মারা যায়।
প্র:
কুমিল্লা
ক্যান্টনমেন্টে
ঢুকে কি অবস্হা দেখলেন?
উ:
ক্যান্টনমেন্ট
যখন আমরা
ক্যাপচার
করছি,তহন
প্রায় ৫শ মেয়ে
লোক আমরা
বাহির করছি
যেগুলানের
প্রায় সব
গুলাই ছিল
বাঙালি
সৈনিকদের
ফ্যামিলি। সৈনিকরা
আইসা পড়ছে
যুুদ্ধে। কিন্তু তাদের
ফ্যামিলিতো
পাক
সেনাবাহিনীর
লগে ছিল। তারারে
আটকায়া
ইস্পাহানি
স্কুলে সব
ঢুকাইছিল। তাছাড়া মনে
করেন আবার
অনেকরে
মাইরাও ফেলছে। আমরা দেশ
স্বাধীনের
পরে
কোয়ার্টারগুলার
মধ্যে গিয়া
দেখছি অনেক
মানুষের হাড়
পইড়া রইছে। মানুষের
সঙ্কাল পইড়া
রইছে। আমরা
ইস্পাহি
কলেজের পাশে
একটা গর্ত
দেখছিলাম,যে
গর্তটার
মধ্যে সৈনিক
মনে করেন
প্রায় ৫০/৬০ জন
হইবো। তাদের
ইউনিফর্মডা
পরা আছে,মানে দিব্বি
কাঁচা মানুষ। কবে এদের
মাডি দিয়া
রাখছে,নয়মাস আগেই
না ৩ মাস আগেই
কইতে পারি না।
প্র:
অত্র এলাকাতে
কোথায় কোথায়
গণকবর আছে?
উ: অত্র
এলাকাতে
গণকবর মনে
করেন,আমাদের
সাথে যারা ছিল,আমাদের
এই টু-সেক্টরে,আমাদের
এই নাইন
বেঙ্গলের
আন্ডারে বা
ফোর বেঙ্গলের
আন্ডারে
যুদ্ধ করছে
তাদের
কুল্লাপাথর
মাডি দিছে,খিরনালে
দিছে,লক্ষ্মীপুরে
দিছে। এইডিতো
আমাদের হাতেই
দিছি কবর।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : জহিরুল
ইসলাম স্বপন
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ২৬ ডিসেম্বর
১৯৯৬
ক্যাসেট
:
কসবা- ৯৬