নাম : অমৃত লাল চক্রবর্তী

পিতা : ঠাকুর জানকিনাথ চক্রবর্তী

গ্রাম : ডাকরা,

ইউনিয়ন : পেরিখালি

থানা : রামপাল,

জেলা : বাগেরহাট (১৯৭১ সালে খুলনা জেলার অন্তর্গত মহকুমা)

শিক্ষাগত যোগ্যতা : ম্যাট্রিক

১৯৭১ সালে বয়স : ৫০/৫১

১৯৭১ সালে পেশা : গ্রাম চিকিৎসক

বর্তমান পেশা : অবসর জীবন

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: সেই সময় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পায় নাইপরে ১৯৭১ সালে তো দেশে যুদ্ধ শুরু হইলোযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাস খানেক পর বাগেরহাটে পাকিস্তানি মিলিটারি আইলোআমাদের এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারিরা আসে নাইবাগেরহাটে মিলিটারি আসার পরে একদিন জানা গেলো যে,গ্রামের হিন্দুদের উপর আক্রমণ হবেমুসলমান বাঙালিরাই নাকি এই আক্রমণ করতি পারেতখন আমরা হিন্দুরা আমাদের বাড়িঘর পাহারা দিতে আরম্ভ করলামআমরা প্রতিদিনই গ্রাম পাহারা দিচ্ছিএ রকম অবস্হায় একদিন সোমবার,সন্ধ্যার পরে জানা গেলো যে,রামপালে একটা মিটিং হইছেসেখানে তারা বলছে হিন্দুরা মালাউন জাত,এদের যা কিছু আছে সে সব লুটপাট করতে হবে

 

প্র: কত তারিখে এই মিটিংটা হয় ?

 

উ: এই মিটিংটা হয় সোমবারবাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের ২ তারিখে বিকাল ৩টা ৪টার সময়সেই মিটিং থাইকে সন্ধ্যায় লোক ফিরে আসলোসেখানে হিন্দু কেউ যায়নিগেছে সব মুসলমানআমাদের গ্রামের কয়েকজন মুসলমান সেখান থাকি ফেরার পর বলে,এইবার মালাউন জাত দেখা যাবেতারা ফেরার ঘন্টা দুই পরে আমাদের গ্রামের বাবর আলি শেখ,তার ভাই তোরাব আলি এবং আরো কয়েকজন লোক আমার বাড়িতে আইছেআমি সে সময় ভিতর বাড়িতে বারান্দায় বইসা আছিআমরা আত্মীয় স্বজন কয়েকজন আলোচনা করতেছি যে,আজকে তো রামপালে মিটিং হইছেসেখানে নাকি আলোচনা হইছে মুসলমানরা হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট করবেপরিস্হিতি তো খুব ভালো নাআমরা এখন কি করবোএমন সময় বাবর আলি আমাদের ডাক দিলোআগে বাবর আলি আমারে ডাক্তার বাবু বইলা ডাকতোআপনি কইরা কথা বলতোসেদিন সে আইসে বলছে যে,অমৃত আছো নাকি বাড়ি ? অমৃত বাড়ি আছো ? আমি বলি,কে ? তাড়াতাড়ি আমি বের হয়ে কাছারিতে গেছিকাছারিতে যাওয়ার পর বাবর আলি আমাদের বললো যে,শোনো,তোমার ভালো ভালো জিনিসপত্র যা আছে তা আমাকে এখনই দিতে হবেআমি বললাম যে,আমার যা কিছু আছে তার সবই আমার কাছে ভালোতুমি যা নিতে চাও নিয়ে যাওআমার আপত্তি নেইসে বললো যে, ওসব বাজে কথাতোমার দামী কি আছে তাই দাওআমি বলি,যা বলেছি তা ঠিকই বলেছি৩০ বছর ধরে আমি ডাক্তারি করি২০ গ্রামের লোক আমাকে ভালো চেনেহিন্দু হোক বা মুসলমান হোক সবায় আমাকে চেনে বা ভালোবাসে বা ভক্তি করেআমি ওদের ভয় করবো কেন ? সেইভাব নিয়া আমি কথাটা বাবর আলিকে বললামপরে সে আমার ওখান থেকে চলি গেলোকোনো কিছু আর  নিলো নাপরে সে আমার এক কাকার বাড়িতে যায়তার বাড়ি আমার বাড়ির উত্তর পাশেবাবর আলি সেখান যাইয়া বলে,কি আছে দেওতারা একটা ট্রানজিস্টার,বদনা আর কিছু জিনিস তারে দিলে বাবর আলি চলে যায়  

 

রাত্রি ১০টার সময় আবার তিনজন লোক আমার কাছে আসলোএরাও মুসলমানচন্দ্রখালি বাড়িতারা তিন ভাই--হামেদ ফকির, জবেদ ফকির আর মোবারক ফকিরওরা তিন ভাই আমার কাছে আইসে বললো যে,আমাদের পাঠায় দিছে সাহেব আলি ফকিরসে লোক আওয়ামী লীগ সমর্থকআমাদের হিন্দুদের আগে থাইকাই খুব সাহায্য করতোউনি এই তিনজনরে পাঠায় দিছে আর বলছে,তোমরা ডাক্তার বাবুর বাড়িতে যাওদেখো তার বাড়িতে যেন অত্যচার বা লুট না হয়ওরা আইসে আমাকে সে কথা বললোআমি তাদের বললাম,আমার বাড়িতে সোয়া শমন ধান আর ৪০ মন চাউল আছেঅনেক থালা বাটি-টাটি আছেতখন কাঁসার থালা টালা আমাগো খুব বেশি ছিলোআমি তাদের বললাম, আমার সবই তোমাদের কাছে থাকলোআমি খুব সকালে এখান থাকি চলি যাবোআমার বাড়িটা তোমাদের হাতে থাকবেওরা বললো যে,আমরা তো আছি,দেখা যাক কি হয়রাত্রিতে কোথাও যাবেন নাযদি যান সকালেই যাবেনআমরা আপনার এখানে থাইকা রাত্রিবেলা পাহারা দিবোযাতে কেউ আপনার কোনো ক্ষতি না করতি পারেতাদের কথায় আমি বাড়ি থাকলামরাত্রিতে আমার আর ঘুম হইলো না        

 

আমার এক কাকা ছিলো,তার নাম কিরণ চক্রবর্তী,তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেনপরদিন মঙ্গলবার সকালে আমি বারান্দায় বসি আছি,তিনি আমাকে দেইখাই দ্রুত আমার কাছে আসলেনকাছে আসি আমার হাত ধরি কাঁইদা ফেললেন আর বললেন,ও ভগবান ! ভগবান ! তুমি এখনও এখানে বইসা আছো ? শিগগির যাওআমাদের সবাই চলি গেছেতার কাছেই জানতি পারলাম যে, গ্রামে হিন্দু কেউ বাড়িতে নাইবৃদ্ধরা ছাড়া সবাই চলি গেছে বাজারের কাছেতখন আমার মেজ ভাইকে বললাম, ভাই এখন কি করা হবেসে বললো,তাহলে চলেন বড়দা আমাদেরও যাতি হবেআমি আমার ভাইরে বললাম,আমার একটা কাজ আছে,আমাদের নতুন কাঁসার থালা আছে ৫০ খান,আর পুরনো অনেক কাঁসার থালাএই থালাগুলো আমি লুকায়ে রাখবোতখন আমার একটা ঘরে মেঝের মাটি খুঁড়ে থালা বাসনগুলো তার ভিতরে রাইখে মাটি দিয়া ঢাইকা রাখলামআমার আর এক কাকা ছিলেন লক্ষ্মীকান- নাম করেউনি বললেন যে,আমি বাড়ি থাকি কোথাও যাবো নাদেখা যাক কি করে আমারেতিনি বাড়ি থাকলেনআমাদের ১০ খান বড় মাটির ডাবরে (বড় মাটির পাত্র) খেজুর গুড় ছিলোযাওয়ার আগে আমার সেই ১০ খান খেজুর গুড়ের ডাবর কাকার বাড়িতে রাইখে দিলামতারপর সবাইরে নিয়া বাজারের দিকে  গেলামআমরা সেইখানে আছিওখানে সবাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে যে এখন কি করা হবেপরে সিদ্ধান- হইলো আমরা সবাই চইলা যাবো ইন্ডিয়ায়এখানে আর আমাদের থাকা চলবি না, থাকে আর করবো কি ? ওখানে থাকতিই বাড়ির খবর শুনলামআমাদের অনেক কিছু লুট হয়া গেছেএই খবর পাইয়া আমরা তখনই ভারতে রওনা হলামহাঁটতি হাঁটতি আমরা কাঁটাখালি গেলামসেখানে একটা বড় খাল আছেনৌকায় পার হতি হয়ওখানে যাওয়ার পর  কিছু লোক খেওয়ায় আমাদের খাল পার করে দিতি ধরলো, আর কিছু আমাদের যাতি নিষেধ করলোএর ভিতরে আমরা কিছু ওই পার চলে গেছিতখন বাঁশতলির এক হাজি সাহেব আর কয়েকজন বললো, আপনারা যাইয়েন নাহাজি সাহেব বললেন,ডাক্তার বাবু আপনাদের যাওয়া লাগবে না,যাইয়া কাজ নেইআপনাদের সব তো লুট করে নিয়ে গেছেআমার ধান,চাউল আছেআপনাদের যা কিছু প্রয়োজন আমার ওখান থেকে আমি দেবো,আপনি সব লোক নিয়া বাড়ি চলে আয়েনআপনারা যার যার বাড়ি থাকেনআমিই আপনাদের সব দিবোআপনাদের নিরাপত্তার ব্যবস্হাও করা হবেতখন আমরা আবার বাড়ি আসলামভাড়া বাড়িতে আছিপরদিন আসার পর আমার ভগ্নিপতি রশিকলাল চক্রবর্তী আর নীরদ মন্ডল আমাকে বললো যে, দাদা এইখানে আর থাকা চলবে নাআমরা কি করে এখানে থাকবো আর কোথায় কি করবোআমাদের তারা চাউল ডাউল দেবে বললো,কিন্তু একদিন মাত্র দিলো,ওই দুটো চাউল ডাউলে আমাদের তো গোটা গ্রামের মানুষ বাঁচবে নাতারা এ গ্রাম বাঁচাতে পারবে না,একটা ফাকি জুকি আমাদের সঙ্গে করা হচ্ছেকাজেই চলেন,আমরা নৌকো করে চলে যাইআমি নৌকো আনতে যাচ্ছি,নৌকো করে আমরা চলে যাবো ভারতেআমি বলি,আচ্ছা বেশএটা হলো বুধবারের কথাবৃহস্পতিবারের দিন যাওয়ায় অসুবিধে আছেশুক্রবারে আমরা রওয়ানা দেবোঐ দিন আমরা এক সঙ্গে অনেকে যাবোঘাটে অনেক নৌকোশুক্রবার হচ্ছে ৬ জ্যৈষ্ঠনৌকো একখান আমরা ভাড়া করিছি ১৪০০ টাকায়নৌকোয় সব জিনিসপত্র তোলা হলোএই সাধারণ জিনিস সব

   

এ দিকে আমার যে ১০ খান খেজুর গুড়ের পাত্র ছিলো তা থেকে চাইরখান গ্রামবাসী সবাইরে দিয়া দিলামগ্রামবাসী ওই ঘরামী বাড়ি বসে দুটো ভাত পাক করে ওই গুড় আর দুধ দিয়ে সবাই খ্যালোযার যেখানে পাক করতে ইচ্ছা হয় সে সেখানে পাক করে খ্যালোএটা বৃহম্পতিবারখাইয়া ওদিন আমরা বাড়িতেই থাকলামপরের দিন ৬ জ্যৈষ্ঠ সকালে আমরা বাড়ি থেকে এই বাজারে আসলামশুধু আমাদের গ্রামের মানুষ না,নানা গ্রামের মানুষ আগে থাকেই ওখানেকচুপুরিয়া হইতে আরম্ভ করে সুন্দরবনের কাছের কচু বোন,ঘাসের ডাঙ্গা,গেওয়া তলা,কাঁটাখালি সহ বিভিন্ন গ্রামের লোক ওখানে আসছেআমার ভগ্নীপতি রশিকলাল চক্রবর্তীর ভাই নয়া ঠাকুরউনি খুব সাধু প্রকৃতির লোক ছিলেনসবাই তানাকে খুব ভক্তি করতো,ফকির ছিলেনতন্ত্র মন্ত্রের কাজ খুব ভালো জানতেনরোগব্যাধির চিকিৎসাও করতেনযা বলতেন তাই হতোতার কারণে বহু লোক আসলো ওখানে যে ওখানে গেলি আমরা সবাই বাঁচবোতারপর নৌকো করে আমরা নদীর ভিতর দিয়া ভারতে চলি যেতি পারবোওনাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবোএই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন এলাকার লোক তাদের ফ্যামিলি নিয়া ওইখানে আইছেআমাদের গ্রামের লোকজন তো ওখানে আছেইসব মিলে কয়েক হাজার লোক ওখানে

   

পরদিন শুক্রবারের দিনকেউ পাক করতিছেকেউ খাচ্ছে,কেউ স্নান করে আইছেদুপুরেই আমাদের রওনা হওয়ার কথাকিন্তু আমার ভগ্নিপতি রশিক লাল আমারে বললো যে,এক নৌকোয় তোমাদের সবার যাওয়া হবে নাআমি আরো একখান নৌকো আনতে পাঠাইএকটাতে তোমাদের সব লোক ধরতিছে নাবিকাল বেলা আমরা রওনা হবোরশিক লাল চলি গেলোআমি তার বাড়িতেএমন সময় বেলা ১টার দিকে হঠাৎ গুলি আরম্ভ হইলোএই গুলি প্রথমে বাজারের দিকে হইলোযখন গুলি হয় তখন আমি ঠাকুর বাড়ির ভিতরে, স্নান করে গামছা পরে কেবল আইছিওই অবস্হাতেই কাছারি ঘরের কাছে আইসে দেখি যে,ওখানে একটা লোকরে কে যেন মাইরা ফেলিছেচারদিকে রক্ততা দেখে আমার ভয় লাগি গেলোআর বাজারের ওখানে গুলি হচ্ছেবহুলোক রাইফেল আর ছোরা নিয়া আইতেছেআমার কোলে মেজ ভাইয়ের মেয়ে শোভাআমি বড়যাহোক,কাছারি ঘরের ওখানে যখন গেছি তখন দেখি যে সে ওখানে দাঁড়ানোতখন তাড়াতাড়ি ওরে কোলে নিছিতারে কোলে নিয়া কোনদিকে যাবো ভেবে পাচ্ছি না,কোথায় যাবো কি করবো ? চারি দিকে গুলি হচ্ছেএমন সময় আমার সেই সেজো ভাই কুমুদ রঞ্জন চক্রবর্তী আইসে আমারে বললো যে,বড়দা ওকে আমার কাছে দেনআর আপনি শিগগির কোনো এক দিকে চলে যানআমি বলি,না তুই-ই কোথাও পলা,ও আমার কাছেই থাকুককুমুদ বলে যে,না বড়দা ওকে আমার কাছে দিনওকে কোলে নিয়া আপনি কোথায় যাবেনআপনি তো নিজেই চলতি পারেন নাআমার কাছে দিনতখন শোভাকে দিলাম ওর কাছে,তারপর আমি ওখান থাকি দৌড় দিলামযাওয়ার সময় দেখি রশিক লাল চক্রবর্তী এবং রথীকান- চক্রবর্তীর বাড়ির উত্তরে রক্ত আর রক্তএকটু দূরে মানুষের লাশ আর লাশতার ভিতর দিয়াই পলাচ্ছিএকটা বাড়ির রান্নাঘরের ওখানে দেখি অনেক মেয়েছেলে জমাএকটা লোক বন্দুক হাতে তাদের কি যেন বলছেতখন সৃষ্টিধরের ভাইয়ের বাড়ির ওখানে  গেলামওই বাড়ির ৪/৫ নল দূরে গিয়া দেখি একটা বড় কাঠের স্তুচলা করা কাঠতাড়াতাড়ি তার ভিতর মাথা ঢুকোয় দিয়ে বসে পড়িএমন সময় দেখি ওখান দিয়ে যাচ্ছে আমার এক খুড়তুতো ভাই নীরঞ্জন চক্রবর্তীকাঁটাখালি তার বাড়িসে হাত দিয়া পেট চেপে ধরে যাচ্ছেরক্ত বেরুচ্ছেআমারে দেখে বলে,বড়দা এখানে কি করেন ! আপনি শিগগির এখান থেকে চলি যানওখানে মাথা গুঁজলে কি হবেদেখেন আমার অবস্হাআমি তখন ওকে বলি এই অবস্হায় তুই কোথায় যাবি ? দক্ষিণ দিকে একটা কাঁটার বাগান আছে, ওই বাগানের ভিতর যাইয়া তুই শুয়ে পড়এই বলে আমি ওখান থেকে কিছু দুরে একটা পুকুরের ভিতরে নামি গেলাম

 

প্র: আপনার ওই খুড়তুতো ভাইয়ে&