নাম : অঞ্জলি
জোয়ারদার
স্বামী : নিশিকান্ত
জোয়ারদার
গ্রাম :
গোপালখালি, ইউনিয়ন
:
গঙ্গারামপুর
ডাক :
কাশিয়ানগর
থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : অষ্টম
শ্রেণী পর্যন্ত
১৯৭১ সালে
বয়স : ২০/২১
১৯৭১ সালে
পেশা : গৃহিনী
বর্তমান
পেশা : গৃহিনী
প্র: ১৯৭০ সালের
নির্বাচনের
কথা কি আপনার
মনে আছে ?
উ: কিছু তো মনে
আছে। সেই সময়
আমরা নৌকা
মার্কায় ভোট
দিছিলাম। এর কিছুদিন
পর দেশে
গন্ডগোল শুরু
হইয়া গ্যালো। হিন্দুদের
বাড়িতে
লুটপাট আরম্ভ
হইলো। অন্য
জাগার কথা আমি
বলতি পারুম না। কিন্তু আমাগো
এই দিকে
লুটপাট শুরু
হইয়া গ্যালো। আমাগো
বাড়িতে একদিন
খুব সকালে
অনেক মুসলমান আইসা
পড়ে। সেদিন
তখনো আমরা
ঘুমাই ছিলাম। মানুষজনের
হৈ চৈ শুনি
আমরা ঘর থাইকে
বাহির হইয়া
দেখি আমাগো
বাড়িতে অনেক
মানুষ। প্রথম
আমি বুঝতি
পারি নাই যে
তারা লুট করতি
আইছে। তারপর
দেখি কয়েকজন
লোক আমাগো
গরুগুলা নিয়া
যাইতেছে। আমি তখন
বারান্দা
থাইকে নাইমে
ওদের বাধা দিছি। বলছি,
গরুগুলা
নিও না। কিন্তু ওরা কেউ
আমার কথা কানে
নিলো না। আমাদের গরু
নিয়া গ্যালো। তারপর
দেখি আমাগো
গোলার ধান
নিয়া যাতিছে। চেচামেচিতে
তখন সবাই উইঠা
গেছে। বাড়ির
ভিতর এইসব
কান্ড দেইখা
আমরা সবাই
ভয়েতে ঘরের
মধ্যি ঢুকি
পড়লাম। মুসলমানরা
আমাগো গরু
বাছুর, ধান টান
নিয়া চলি
গ্যালো। আমার স্বামী
আর ভাসুর
বলিলো যে, এখানে
আর থাকা যাবে
না। তোমরা
তাড়াতাড়ি
নৌকায় ওঠো। তখন আমাগো
অল্প কিছু
জিনিসপত্র
নিয়া সাজানো বাড়িঘর
ছাইড়ে নৌকা
করি
বয়ারডাঙ্গায়
চলি গেলাম। নৌকা আগেই
ঘাটে ছিলো। ওখান থাইকে
আমরা
ডুমুরিয়া
বাজার হইয়া
চুকনগর গেলাম। নৌকা
চুকনগর
বাজারে
যাওয়ার পর
সবাই নৌকা থাইকে
নাইমে গ্যালো। আমি নৌকার
ভিতরেই
থাকলাম। আমি নৌকা
থাকি নামি নাই। আমার
স্বামীকে
বললাম যে, তোমরা
যাও, আমি
এখন নৌকা
থাইকে নামবো
না। আমাদের
সবাই নৌকা
থাইকে নাইমে
ডাঙায় গ্যালো। কেউ কেউ
খাওয়া-দাওয়ার
ব্যবস্হা করতি
লাগলো।
প্র: আপনি
কি সব সময়
নৌকাতেই
থাকলেন ?
উ: না, নৌকার ভিতর
আমি
ঘন্টাখানিক
ছিলাম। আমার
এবং মাইয়ার
কিছু
গয়নাগাটি
ছিলো সেগুলা আমি
সঙ্গে
আনিছিলাম। নৌকায় ওগুলা
গুছায় নিয়া
আমি ডাঙায়
আইলাম। ডাঙায়
উঠছি মাত্র
একজন আইসে
আমারে বলছে, কি নিয়া
যাচ্ছো ? তা আমি তার
সাথে কোনো কথা
বলি নাই। তার সাথে
কোনো কথা না
বলি আমি
কালিমন্দিরের
সামনে গেলাম। আমাগো
বাড়ির লোকজন
সব ওখানে ছিলো। আমাগো
কিছু
মালপত্রও
ওখানে রাখা
ছিলো। কিছু
জিনিসপত্র
নৌকায় ছিলো। আমি ওখানে
যাওয়া মাত্র
আবার একজন
ঘোড়ায় চড়ি
ওখানে আইসে
বলিছে, তোমাদের তো
অনেক জিনিস !
এই এইগুলা কি
বিক্রি করবা ? তখন আমি বলি
না।
প্র:
আপনারা
চুকনগর
বাজারে কখন
পৌঁছেছিলেন ?
উ: মনে হয় সকাল
নয়টার দিকে। ওখানে
যাইয়া সব
রান্না করিলো। আমরা
খালাম। কিছুক্ষণ
পরেই আমাগো
রওনা হওয়ার
কথা ছিলো। আর তখনই তো গোলাগুলি
শুরু হইলো। গুলিগালা
শুরু হলি
কয়েকজন
মুসলমান
আমাদের বলিছে
যে,
তোমাদের
কোনো ভয় নাই। পরে একজন
টুপিঅলা লোক
আইসে বলিলো, তোমরা
শ্লোগান দাও।
প্র: কি
শ্লোগান দিতে
বলেছিলো
আপনাদের ?
উ: সে আমাদের
আল্লাহু আকবর
আর কি শ্লোগান
যেন দিতি কইলো। সব আমার
মনে নাই। তখন আমাদের
সব পুরুষ
লোকরা
শ্লোগান দিলো। তারপর সেই
টুপিঅলা লোক
সবাইরে লাইন
হতি কইলো। একটু পর ওরা
আইলো।
প্র: কারা
আসলো ?
উ: মিলিটারি।
প্র: কয়জন
এসেছিলো ?
উ: আমাগোর
জাগায় দুই জন। ওই দুই জন
আইসে সব
পুরুষদের এক
জায়গায় ডাইকে
নিলো। আর
আমাদের
সরাইয়া দিলো। তারপর ওরা
গুলি করিলো। গুলি করলি
আমি পিছন ফিরি
দেখি যে শেষের
লাইনে সেও বসি
আছে।
প্র: কে
বসে আছে ?
উ: আমার স্বামী। তখন পটপট
করি গুলি
হতিছে। মনে
হয় আমার
স্বামী গুলি
লাগার আগেই
কাত হইয়া ওখানে
পড়ি গ্যালো। আমি পিছন
ফিরি ওটা
দেখলাম। মিলিটারিরা
গুলি টুলি
কইরে অন্যদিকে
চলি গ্যালো। দেখলাম যে, খোকার
বাপ (স্বামী)
লাশের মধ্যি
পড়ি আছে। মিলিটারিরা
গুলি কইরে চলি
গেলে আমি
করলাম কি, ওখানে
যায়ে ওনারে
(স্বামী)
টাইনে তুললাম। সে বেহুস
হইয়া ছিলো। মরে নাই। তারপর তারে
কালি
মন্দিরের
কাছে নিয়া
আইসে একটা
গর্তের মধ্যে
বইসে পড়লাম। গুলিগালা
শেষ হইয়া গেলি
আমি গর্ত
থাইকে বাহির
হইয়া দেখি
একজন মহিলা
গুলিতে মরি
গ্যাছে। মহিলাটার
ছোট বাচ্চা
পাশেই খেলা
করতিছে। আমি
মন্দিরের
মধ্যি আমার
শাশুড়ি আর বড়
মাইয়ার তালাশ
করিলাম। দেখি আমার
শাশুড়ি
মন্দিরের
একটা কোণায়
আমার মাইয়ারে
নিয়া বসি আছে। আমার
শাশুড়ির কাছে
একটা বড়
বোঁচকা। সেই বোচঁকার
মধ্য তার
জিনিসপত্র। সে ওটা
আগলায় বসি আছে। আমি তারে
কইলাম, চলো মা,
তাড়াতাড়ি
আমাদের এখনই
যাতি হবি। আমাদের উনি
ওই বোঁচকা
টানাটানি
করতি লাগলেন। আমি কইলাম,
ফালাও
মা ওই বোঁচকা। আগে
আমাদের
বাঁচতি হবি। আমি তারে
নিয়া হাঁটা
ধরিলাম। মন্দির
থাইকে বাহির
হইয়া দেখি
মহিলারা সব
কানতেছে আর
হাতের শাখা
ভাঙতেছে। আমরা ঐদিকে
চলি গেলাম। ঐদিকে
যাওয়ার পর
কয়েকজন
আমাদের বলিলো
যে,
তোমরা
কোথায় যাচ্ছো ? তাদের
কথা শুইনা আমি
আবার ভয় পাইয়া
গেলাম। আমাদের
সঙ্গে তো কোনো
পুরুষ লোক নাই। তারপর
দেখি আমার
শাশুড়িও নাই।
প্র:
আপনার স্বামী ?
উ: সে পিছনে
ছিলো।
প্র:
আপনার শাশুড়ি ?
উ: আমাদের
সঙ্গেই তো
মন্দির থাইকে
রওনা হইছিলো। পরে দেখি
যে,
উনি
আমাদের সঙ্গে
নাই। উনি তো
বুড়ি মতো
ছিলেন। তখন
কোথায় যে
গেলেন !
প্রাণের ভয়ে
আমি আর খোঁজ করিলাম
না।
প্র:
তারপর আপনার
শাশুড়ির কি হলো
?
উ: আমরা তো তখন
তার খোঁজ
পাইলাম না। প্রাণের ভয়ে
আমরা চলি
গেলাম। শেষে
শুনলাম যে,
উনি
বাড়ি চলি
গ্যাছেন অন্য
লোকের সঙ্গে।
প্র:
আপনার শাশুড়ি
কি বাড়ি ফিরে
যেতে পেরেছিলেন
?
উ: হ,
বাড়ি
চইলা গেছিলেন। সে খবর
আমরা কয়েকদিন
পর পাইছি।
প্র:
আপনারা ওখান
থেকে কোথায়
গেলেন ?
উ: কৃষ্ণনগর
গেলাম। কৃষ্ণনগরে
যাইয়া আমরা
থাকলাম
কয়েকদিন। আমাগো সঙ্গে
কিছুই ছিলো না
শুধু পরনের
কাপড় ছাড়া। সেই জাগাতে
লোকজন আমাগো
ডাইকে নিয়া
গ্যালো এ বাড়ি
ও বাড়ি। ঐ
জাগায় ২/৪ দিন
থাকার পরে
আমরা
বাগডাঙ্গায়
চইলে গেছি।
প্র:
বাগডাঙ্গায়
গিয়ে কি করলেন
?
উ: বাগডাঙ্গায়
আমরা কিছুদিন
থাকলাম। ওখানকার
মানুষ আমাদের
আশ্রয় দিছিলো। তারা
আমাদের খাবার
দিতো। সেটা
খাইয়া
কোনরকমে দিন
পার করতাম।
প্র:
তারপর ?
উ: তারপর
ইন্ডিয়া চলি
গেলাম। ইন্ডিয়াতে
তো আমাগো বহু
কষ্ট করতি
হইলো। একটা
প্লাটফর্মে
আমরা থাকতাম।
প্র: কিসের
প্লাটফর্ম ?
উ: স্টেশনের
প্লাটফর্ম। ওই জাগায়
আমরা থাকতাম। তারপর
আমার শ্বশুর
ওখানে মারা
গ্যালো। আমার
স্বামীর অসুখ
হইলো। তার
পা ফুলে
গ্যালো। ছেলেটারও
অসুখ হইলো। খুব কষ্ট
করতি হইছে
আমাগো।
প্র:
চুকনগরে
আপনাদের
পরিবারের
কতজন শহীদ হয় ?
উ: ৮ জন।
প্র:
আপনারা দেশে
ফিরে এলেন কখন
?
উ: যুদ্ধের
শেষে।
প্র: বাড়ি
এসে কি অবস্হা
দেখলেন ?
উ: আইসে দেখি
ঘরের চালটা
শুধু আছে। অন্য কিছু
নাই। বেড়া,
দরজা-জানালা
একটাও নাই। ওর নিচেই
কিছুদিন আমরা
থাকলাম। তারপর আস্তে আস্তে
সব আবার হইলো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর
নাম : মাহবুবুর রহমান
মোহন
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : জুন ১৭, ১৯৯৭
ক্যাসেট
নম্বর : ৬৬