নাম
: অকুর
বেওয়া
স্বামী
: আফছার
আলী মন্ডল (১৯৭১
সালে পাকিস্তানি
সৈন্যদের হাতে
নিহত)
গ্রাম
: প্রাণকৃষ্ণপুর,
ইউনিয়ন : পুটিমারা
থানা
: নবাবগঞ্জ,
জেলা
: দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : নিরক্ষর
১৯৭১
সালে বয়স : ৪০
১৯৭১
সালে পেশা : গৃহবধূ,
বর্তমান
পেশা : গৃহিনী
প্র:
১৯৭১ সালের যুদ্ধের
কথা কি আপনার মনে
আছে ?
উ: হ, মনে আছে। তার আগে ভোট
হইছিলো। তারপর গন্ডগোল
লাগলো দেশত। মনে হয় চৈত্র
মাসে খানরা আইসা
গ্রামত আগুন দিলো। পরে খানরা
আবার আইসে মানুষ
মাইরে ফেলাইছিলো। খান সেনারা
আইসে গ্রামের সব
পুরুষ মাইনষেক
মাইরে ফেলায় দিলো। মনে করেন, বাড়িত থাইক্যা
ভোর হইছে সময় মাইনষেক
ডাইকে নিয়া গেছে। নিয়া যায়ে
তো সবাককে এক জাগায়
জমা করিছে। হামার দেওর একজনা, ভাসুর একজনা, ভাতিজা
একজনা, হামার স্বামী, হামার ব্যাটা, আমার জামাই, সব লুকায়ে
ছিনু। সেই
হান থেকি টানি
বাইর কইরে নিয়া
গেছে। নিয়া
তো ওরা হামাক অত্যাচার
করি আহত করছিলো।
প্র:
খান সেনারা কখন
আক্রমণ করেছিলো
?
উ: এই মনে করেন
রাইত চারটায়।
প্র:
তারা কিভাবে আক্রমণ
করলো ?
উ: সেটা কওয়ার
পারমু না। গ্রাম ঘেরাও করি
ডাইকে নিয়া যায়
বাড়িত থাকি।
প্র:
আপনি কি তখন বাড়িতে
ছিলেন ?
উ: আমি সখন
বাড়িত ছিলাম। মোর একটা ছেলের
অসুক হইছিলো, বাড়িত সেই
ছেলের মাথাত পানি
ঢালছিনু। যখন আইসে ডাইকে
গেলো সখন আমি ছেলেটাক
নিয়া বাইর হয়া
গেছি। বাইর
হয়া হামার ননদরে
ডাকিনু। ননদরে ডাইকা এক
জাগায় লুকাই ছিনু। খানরা ওইহান
থাকি টানি বাইর
করছে। স্বামী, ব্যাটাক, ভাতিজা, দেওর সবাক
নিয়া গেলো। হামাকোরে উপর
খানেরা অত্যাচার
করিলো। তারপর
আগুন লাগাই দিলো। কিছুক্ষণ পর
শুনি গোলাগুলি। সখন যাবার
পারি নাই। পরে অন্য গ্রামের
লোকজন আইসে সংবাদ
দিছে যে সবাক মাইরে
ফেলাইছে। সখন হামরা গেছি। যাওয়ার পর
দেখি হামার স্বামীর
পাঁজরার ওখান দিয়া
ভুড়ি বারাইছে। সখন হামরা
কাপড় দিয়া বান্দাসান্দা
কইরছি। সখন
সে আও করছিলো। ফির আইলো খানেরা। তারা আইসে
যারা মরেনি তাগো
আবার মাইরছে। সখন হামরা
ঐ মুখে দৌড় মাইরিছি। হেরা চইলে
যাওয়ার পর ফির
আইনু। ফিরে
আয়ে দেহি সব মরিছে। স্বামীক নিয়া আইনু। দেওর, ভাসুরকও
নিয়া আইলো। নিয়া আসে মাটি
দেওয়া হইলো। স্বামীরে গুলি
করিছে, ছেলেরে গুলি
করিছে, জামাইয়েক গুলি
করিছে, দেওরেক গুলি
করিছে, ভাতিজাক গুলি
করিছে, ভাসুরেক গুলি
করিছে।
প্র:
এদের নামগুলো বলতে
পারবেন ?
উ: হ, বলবার পারুম। আমার ব্যাটার
নাম হইলো রহমত
আলী, জামাইয়ের
নাম হইলো রহমান
মন্ডল। স্বামীর
নাম হইলো আফছার
আলী মন্ডল। আর আমার দেওরের
নাম হইলো আফতার
আলী মন্ডল, আর ভাসুরের
নাম হইলো আজগর
আলী মন্ডল। ব্যাটা আর জামাই
বাঁইচা গেছে। দাউদপুরের
আব্বাস ডাক্তার
ব্যাটা আর জামাইয়ের
চিকিৎসা করছে। মেলা টেকা
খরচ হইছে।
প্র:
পাকিস্তানি সৈন্যরা
কোথা থেকে এসেছিলো
?
উ: খানেরা
আছিলো বলাহার। ওখান থাকি
এখানে আইছিলো। আইসি তো সবাক
মাইরে ফালাইছে।
প্র:
তারপর আপনারা কি
করলেন ?
উ: বাড়িতেই
আছিনু।
প্র:
পাকিস্তানি সৈন্যরা
মেয়েদেরকে ধরে
নিয়ে গেছিলো?
উ: নিয়ে গেছিলো
তো। ধইরে নিয়ে
গেছিলো। কোথায় নিছিলো
সেটা কওয়ার পারমু
না।
প্র:
ওরা কি কোনো মেয়েকে
গুলি টুলি করে
মারছে ?
উ: দুই জনকে
মারি ফালাইছে।
প্র:
কি নাম তাদের দুইজনের
?
উ: সয়না আর
ছালু।
প্র:
পাকিস্তানি সেনাদের
কোথায় কোথায় ক্যাম্প
ছিলো বলতে পারবেন
?
উ: হ, চরারহাটে আগে
ক্যাম্প করছিলো। প্রথম যখন
আগুন লাগায় দেয়, সেই সময়ত
ক্যাম্প করছিলো। পরে বলাহার
ক্যাম্প করছিলো। সেখান থাকি
কাশিপুর গেছিলো।
প্র:
আপনাদের এখানে
কি মুক্তিযোদ্ধারা
আসছিলো ?
উ: মুক্তিরা
আসছে। মুক্তিরা
খান সেনাদের সাথে
যুদ্ধও কইরেছে। তো একদিন মুক্তিরা
খান সেনাদের সাথে যুদ্ধ কইরে
গেলোগা। তারপরই তো ওরা
আইসা আমাদের মাইরি
টাইরি চইলা গেলো। ম্যালা মাইনষেক
মাইরা ফেলাইলো, আগুন দিয়া
ঘর বাড়ি পুড়াইলো।
প্র:
আপনার কয়জন ছেলে
মেয়ে ছিলো ?
উ: দুইজন ছেলে, চারজন মেয়ে।
প্র:
মেয়েদের বিয়ে দিছেন
?
উ: হ, মেয়েদের বিয়া
দিছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর নাম
: অমরচাঁদ
গুপ্ত অপু
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের তারিখ
: নভেম্বর
০৫,
১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৫৫