নাম
: ডা:
এম. এস. এ. মনসুর
আহমেদ
গ্রাম
:
চরভাগল
ইউনিয়ন
:
গোবিন্দপুর
(দক্ষিণ)
থানা
:
ফরিদগঞ্জ
জেলা
:
চাঁদপুর
১৯৭১
সালে বয়স : ১৯/২০
১৯৭১
সালে পেশা : চিকিৎসা
মহাবিদ্যালয়-এর
দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্র
বর্তমান
শিক্ষাগত
যোগ্যতা :
এম.বি.বি.এস.পি.
এইচ
(যুক্তরাষ্ট্র)
চিকিৎসক
বর্তমান
পেশা : সহযোগী
অধ্যাপক
মেডিক্যাল
কলেজ
চট্টগ্রাম
চিকিৎসা
মহাবিদ্যালয়ের
দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্র
ডা: এম. এস. এ.
মনসুর আহমেদ
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করেন। চিকিৎসকের
অভাবের কারণে
তাঁকে দেওয়া
হয় চিকিৎসার
দায়িত্ব। চিকিৎসক
হিসাবে তিনি
নরসিংগড়,মনতলা, বিশ্রামগঞ্জ,কোনাবন,সালদা
নদী ইত্যাদি
এলাকায় চিকিৎসা
সেবা দিয়েছেন। তিনি আহত
মেজর খালেদ
মোশাররফ,ক্যাপ্টেন
সুজাত আলীসহ
অসংখ্য
মুক্তিযোদ্ধার
প্রাথমিক
চিকিৎসা
করেছেন। ডা: মনসুর
আহমেদ
জানিয়েছেন
তাঁর বিচিত্র
অভিজ্ঞতার
কথা।
প্র:
২৫শে মার্চে
ঢাকায় যখন
ক্র্যাকডাউন
হলো তখন আপনি
কোথায় ছিলেন?
উ:
২৫-২৬শে
মার্চে ঢাকায়
যখন
ক্র্যাকডাউনটা
হলো তখন আমি
চাঁদপুরে। ১৯৭১ সালের
মার্চ মাসের
প্রথম দিকে
চট্টগ্রামে
দাঙ্গা লাগলো
বাঙালি-বিহারি। ঐ দাঙ্গার
পরে আমাদের
মেডিক্যাল
কলেজ বন্ধ হয়ে
গেল। একই
সঙ্গে
মেডিক্যাল
কলেজ
হোস্টেলও
বন্ধ হয়ে গেল। কলেজ
কর্তৃপক্ষ
আমাদের প্রতি
নির্দেশ দিলেন
যে তোমরা যে
যার বাড়ি চলে
যাও। তখন আমি
বাড়ি চলে
গেলাম
চাঁদপুরে। এই সময়
চাঁদপুরে
আমরা সংগঠিত
হওয়ার চেষ্টা
করি।
প্র:
ক্র্যাকডাউনের
পরে আপনি কি
করলেন?
উ: তখন
আমাদের সমমনা
ছাত্র,আওয়ামী
লীগের
নেতৃবৃন্দ ও
অন্যান্যরা মিলে
চাঁদপুর শহরে
ট্রেনিং-এর
ব্যবস্হা করে। তারপর আমরা
চাঁদপুর
আনসার ক্লাব
মাঠে একজন আনসার
অ্যাডজুডেন্টের
নেতৃত্বে
প্যারেড পিটি
শুরু করলাম। আমরা ডামি
থ্রি নট থ্রি
রাইফেল নিয়ে
রোজ প্যারেড
পিটি করতাম। এর মধ্যে
চাঁদপুরে
একদিন বিমান
হামলা হলো। মেশিনগান
থেকে ওরা চাঁদপুর
শহরে গুলি
চালালো। তারিখটা মনে
নেই। সম্ভবত
এপ্রিলের
প্রথমার্ধে। বিমান হামলার
পর মনে হলো
পূর্ণ সামরিক
প্রস্তুতি ছাড়া
এভাবে পাকিস্তান
বাহিনীর সাথে
সম্মুখ
যুদ্ধে
মোকাবেলা করা সম্ভব
না। এরমধ্যে
আমরা শুনলাম
যে পাকিস্তানিরা
চাঁদপুর দখল
করতে আসছে। তখন আমি গ্রামের
বাড়িতে চেল
গেলাম। গ্রামের
বাড়িতে গিয়ে
অপেক্ষা
করছিলাম যে আবার
কিভাবে
সংগঠিত হওয়া
যায়। এর
মধ্যে আমরা
খবর পেলাম যে
অনেক ছাত্র,যুবক
ভারতে চলে
গেছে ট্রেনিং
নেয়ার জন্য। আমি ভেবে
পাচ্ছিলাম না
কিভাবে কার
সঙ্গে ভারতে
যাবো
ট্রেনিংয়ের
জন্য। এরমধ্যে
গ্রামের বাড়িতে
দুটো মাস কেটে
গেল। জুনের
প্রথম দিকে
আমাদের
বাড়িতে শহীদ
ভাইয়ের
ছোটভাই রফিক
আসলো। রফিক
এসে আমাকে
জানালো ভাই
এসেছেন
আগরতলা থেকে। আমাদের
বাড়িতে তিনি
কালকে আসবেন
আমাকে নিতে। এটা শুনে
আমি বেশ খুশি
হলাম। আব্বা
তখন বাড়িতেই
এবং উনিও থানা
আওয়ামী লীগের
নেতা হিসাবে
থানাতে
যোগাযোগ
রক্ষা
করছিলেন। এই সময়ের
মধ্যে
চাঁদপুর শহর
আর্মি দখল করে
নিয়েছে। আমি আব্বাকে
বললাম যে শহীদ
ভাই আসবেন। উনি আমাকে
নিয়ে যাবেন। তখন আব্বা
বললেন যে ঠিক
আছে আমিতো চাই
যে তুমি দেশের
সচেতন নাগরিক
হিসাবে দেশের
খেদমত কর,ট্রেনিং-এর
জন্য ভারতে
যাও। শহীদ
ভাই পরের দিন
আসলেন। আগরতলার
উদ্দেশ্যে
লুঙ্গি পরলাম,আর একটা
সাদা রংয়ের
শার্ট গায়ে
দিয়ে শহীদ ভাইয়ের
সাথে বাড়ি
থেকে বের হয়ে
গেলাম। সেটা
কত তারিখ চিল
তা আমার মনে
নেই।
প্র:
আপনি আগরতলা
গিয়ে কি
দেখলেন?
উ: আমরা
যেখানে
বর্ডার পার
হলাম সেখানে
ভারতের সেই
গ্রামের নাম
দুর্গাপুর। সেখান
থেকে উত্তর
দিকে আগরতলার
দিকে জঙ্গল কাদা
ভেঙ্গে পায়ে
হেঁটে গেলাম
কাঁঠালিয়া। সেখান
থেকে জিপে করে
গেলাম আমরা
সোনামুড়া। এরপূর্বে
সম্ভবত গেলাম
মতিনগর। মতিনগর যেয়ে
আমরা
মুক্তিযোদ্ধাদেরকে
খুঁজেছি। শহীদ ভাই
চিনেন সব। আমিতো উনার
ফলোয়ার। সোনামুড়া
গিয়ে
দেখি যে অনেক
বাঙালি ওখানে আছে। অনেক
মুক্তিযোদ্ধা
যুদ্ধে
যাওয়ার জন্যে
ভিড় জমাইছে,লোকে
লোকারণ্য। মুক্তিযোদ্ধা
প্লাস
শরণার্থী। আমরা ওখানে
আর থাকি নাই। সোনামুড়া
থেকে আমরা
বাসে করে
সন্ধ্যার আগে
রওয়ানা দিলাম। আগরতলা
যেয়ে পৌঁছলাম
সন্ধ্যার পরে
আনুমানিক ৭টা
হবে। আগরতলায়
যেয়ে একটা
ডিগ্রি কলেজে
উঠলাম। সেখানে
যেয়ে দেখলাম
অসংখ্য
বাঙালি যুবক,ছাত্র-কলেজের
ছাত্র,ইউনিভার্সিটির
ছাত্র ওখানে
সব অপেক্ষা
করছে। আমাদের
লিডাররা মাঝে
মাঝে আসেন। আবদুল
কুদ্দুস মাখন,আ.স.ম.
আবদুর রব,মেজর
হায়দার আসতেন। যা হউক,রাতটা
ওখানে আমরা কাঠালাম। রাত্রে
খাবার দিল
আনুমানিক
১০টা ১১টার
দিকে। খাবারের
করুণ অবস্হা। আর রাত্রে
যখন শুতে
গেলাম দেখি
গায়ের সাথে গা
ঠাসাঠাসি
হচ্ছে। চিত
হয়ে শুতে
এদিকে ধাক্কা
লাগে ওদিকে
ধাক্কা লাগে। কাত হয়ে শুলে
একটু ঠিকমত
শোয়া যায় এমন
অবস্হা। মেজর
হায়দার এসে
আমার পরিচয় জানলেন। পরিচয়
দিলাম যে আমি
মেডিক্যাল
কলেজের দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্র। হায়দার
ভাই বললেন যে
তাহলে তুমিতো
ডাক্তার হিসাবে
কাজ করতে পারো। আমাদেরতো
ডাক্তারের
অভাব।
পরদিন
উনারা আমাকে
নিয়া গেলেন
নরসিংগড় মুক্তিযোদ্ধা
শিবিরে। এখানে
ক্যাম্প
প্রধান ছিলেন
তখন
ক্যাপ্টেন হারুন। অ্যাকচুয়েলি
উনি
লেফটেন্যান্ট
ছিলেন। বিকালে
হারুন সাহেব
আসলেন। উনার
সাথে পরিচয়
হলো। প্রথম
রাত্রে থাকার
ব্যবস্হা হলো
নরসিংগড় একটা
প্রাইমারি
স্কুলে। বিছানা-পত্র
কিছুই নেই। দুইটা লম্বা
টুল একত্রে
জোড়া দিয়ে। মাথার নিচে
দেওয়ার মত
বালিশ ছিল না। মশারিও
নাই। আমার
নিজের
পুটুলিটাই
মাথায় দিয়ে
সেদিন আমি শুইলাম। আমি আবার
শহীদ ভাইকে
বলে এসেছি
বিকাল বেলায় যাব। আমি মনে
হয় পরের দিন
যেতে পারি নাই। তার পরের
দিন গেছি
আগরতলায় শহীদ
ভাইয়ের সাথে দেখা
করতে। কিন্তু শহীদ
ভাইকে যেয়ে
আমি আর পাইনি। যেয়ে শুনি
আগের দিন
উনাকে নিয়া
গেছে ট্রেনিং-এ। শহীদ
ভাইয়ের সাথে
আর আমার দেখা
হয়নি। এরপরে
উনি
বাংলাদেশে
যুদ্ধ করতে
এসে অক্টোবর
মাসের ১৩
তারিখে মারা
গেছেন। উনি
শহীদ জাভেদ
হিসাবে এখন
আমাদের
এলাকায় পরিচিত। যাক সেটা,এরপরে
আমি আবার ফিরে
গেলাম
নরসিংগড়ে। আনুমানিক
জুনের ২০/২৫
তারিখের দিকে
আমি নরসিংগড়ে
জয়েন করলাম। তখন থেকে
এখানে ছিলাম
আনুমানিক
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। হারুন
সাহেবের সাথে
থাকাকালীন
শিংগারবিলে অনেকগুলো
অপারেশন
হয়েছে। সেগুলা
আমি স্বচক্ষে
দেখেছি। এখানে
অনেকগুলো
পাকিস্তান
আর্মিকে,প্যারামিলিশিয়াকে
শিংগারবিল
এলাকা থেকে,বাংকার
থেকে ধরে নিয়ে
আসা হয়েছে। কিছু কিছু
পাঞ্জাবির
ডেডবডিও আনা
হয়েছে। বিভিন্ন
অপারেশনে
মুক্তিযোদ্ধারা
অনেক পাকবাহিনীকে
জীবিতও ধরে
নিয়ে এসেছে। আমার মনে
আছে একটা
পাঠান ছেলেকে
ধরে নিয়ে এসেছিল। হারুন
সাহেবের
ওখানে
ক্যাম্পে
থাকাকালীন দেখেছি। পরে বোধহয়
তাকে
বি.এস.এফ-এর
কাছে বা
ইন্ডিয়ান আর্মি
কাছে
হ্যান্ডওভার
করা হয়েছিল। শিংগারবিল
এলাকায়
থাকাকালীন
সময়ে একবার আমার
মনে আছে যে
একদিন রাতে
হঠাৎ করে খুব
ব্রাশফায়ার
হচ্ছে। ব্রাশ
ফায়ার হচ্ছে
আমাদের
ক্যাম্পকে
লক্ষ্য করে। তখন
সবাইকে হারুন
সাহেব
নির্দেশ
দিলেন শেল্টার
নিতে। তখন
আমরা ক্রলিং
করে সবাই একটা
বাংকারে যেয়ে
আশ্রয় নিলাম। খুব সম্ভব
পাকবাহিনী
অথবা ওদের
সহযোগী যারা তারা
এসে হামলা
করার চেষ্টা
করেছিল
আমাদের ক্যাম্পের
উপরে। আমরা
কেউ আহত হই
নাই। তবে
অনেক
গোলাগুলি
হয়েছিল। ক্রলিং করতে
যেয়ে আমার দুই
কনুই ছিঁড়ে
গিয়েছিল।
সেপ্টেম্বর
মাসের প্রথম
দিক পর্যন্ত
এখানে ছিলাম। তারপরে
আমাকে এখান
থেকে নেওয়া হল
মনতলায় হেডকোয়ার্টারে। মনতলা
হেডকোয়ার্টারে
অর্থাৎ
ব্যাটেলিয়ান
হেড
কোয়ার্টারে
আমাকে প্রমোশন
দেয়া হলো। প্রমোশন না
আসলে যেখানে
দরকার সেখানে
যেতে হয় আরকি। নরসিংগড়ে
আরেকজন
ডাক্তার ছিল
মহসীন বলে। ডেন্টাল
কলেজের ছাত্র। সে ছিল
সেকেন্ড
ইয়ারের। আমিও ছিলাম
সেকেন্ড
ইয়ারের। ঐ মহসীন কিন্তু মেডিক্যাল
কলেজের ছাত্র
বলে পরিচয় দিত। যাক,সেও ডাক্তার
হিসাবেই কাজ
করতো। আমি
ওখান থেকে চলে
আসলাম আর
মহসীন সাহেব
ওখানে থেকে
গেলেন। আমি
চলে গেলাম
আইনউদ্দিন
সাহেবের
হেডকোয়ার্টারে। ব্যাটেলিয়ান
হেডকোয়ার্টার
তখন মনতলা। মনতলাতে
গিয়ে
আইনউদ্দিন
সাহেবের
ব্যাটেলিয়ানের
ডাক্তার
হিসাবে জয়েন
করলাম। এখানে
আমাদের
প্রধান কাজ
ছিল
ইমারজেন্সি
চিকিৎসা
দেওয়া এবং
প্রাথমিক
চিকিৎসা দেয়া। ডাক্তারিটা
হলো মোস্টলি
ম্যালেরিয়ার
চিকিৎসা
মাইনোর এলিমেন্টস। জ্বরের
চিকিৎসা আর
বেশি অসুবিধা
হলে পেট
ব্যথার
চিকিৎসা। আরও বেশি
অসুবিধা হলে
নির্দেশ ছিল
জিপে করে রোগীকে
হাসপাতালে
নিয়ে যাওয়া। আমরা
আগরতলা
হাসপাতালে
রোগীদেরকে
নিয়ে যেতাম। নরসিংগড়
থেকেও আগরতলা
হাসপাতালে
নিয়ে যেতাম। আর বাকি
রোগীগুলো
যেগুলো আমরা
পারতাম সেগুলোর
চিকিৎসা
করতাম। ঐ
সময় তো অনেক
মাস হয়ে গেল। জুন মাস
থেকে জুলাই
আগস্ট-সেপ্টেম্বর। সেপ্টেম্বর
মাসের
মাঝামাঝি
মোটামুটি
ডাক্তারিতে
একটু হাস এসে
গেছে চিকিৎসা
করতে করতে। আর একটা কথা,আইনউদ্দিন
সাহেবের
এইখানে
থাকাকালীন
সময়ে আমাদেরকে
আইনউদ্দীন
সাহেব খুব
ভালো ব্যবহার
করতেন। অফিসারের
মর্যাদাই উনি
আমাদেরকে
দিতেন। একইভাবে
ডাক্তার
হিসাবে
জোয়ানরাও
আমাদেরকে
অফিসার
হিসাবে
সম্মান করতো।
প্র:
মনতলাতে কোনো
উল্লেখযোগ্য
ঘটনার কথা মনে
পড়ে কি?
উ:
মনতলাতে
যাওয়ার পরে
অক্টোবর
মাসের ২২
তারিখে
আমাদের একটা
প্রোগ্রাম
ছিল যে কসবা
দখল করবো। এর আগে
আইনউদ্দিন
সাহেব ২১
তারিখ বা খুব
সম্বব ২০
তারিখে আমাকে
নিয়ে ঐ
এলাকাটা রেকি
করতে
গিয়েছিলেন। অবশ্য
প্রথমে আমি
বুঝতে পারি
নাই। কারণ
উনি আমাকে আগে
থেকে বলেননি। আমি
ভেবেছি আমি
গিয়েছি এমনি
উনার সঙ্গী
হিসাবে। এরপরে আমাকে
উনি ২১ তারিখে
বললেন যে
ডাক্তার সাহেব
কালকে
সকালবেলা
আমরা কসবা যাব। কসবায়
আমাদের একটা
অপারেশন আছে। আমি বললাম
ঠিক আছে
অসুবিধা নাই। ২২শে
অক্টোবর
সকালে আমরা
ভোর সাড়ে
চারটার দিকে
রওয়ানা দিলাম। আমি,কর্নেল
খালেদ
মোশাররফ,ক্যাপ্টেন
সুজাত
আলী-সুজাত আলী
সাহেব। হলেন
আওয়ামী লীগের
এম. পি
(কুমিল্লার
দেবীদ্বার
থেকে ১৯৭০
সালে নির্বাচিত)
এবং মেজর
আইনউদ্দিন
সাহেব-এই
চারজন উনার
জিপে করে
রওয়ানা দিলাম।
আমরা মনতলা থেকে এসে পৌছলাম এটা নির্দেশ ছিল যে খালেদ মোশাররফ সাহেব এসে পৌছবেন এবং পৌছার পরে আক্রমণটা অর্থাৎ আমাদের এদিক থেকে শেলিংটা শুরু হবে। আমরা একটু দেরি করে ফেলেছি। আমরা জিপ থেকে নামার পূর্বেই আমাদের পক্ষ থেকে শেলিং শুরু হয়ে গেছে। খালেদ মোশাররফ সাহেব এবং আইনউদ্দিন সাহেব টিলার উপর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। আমরা জায়গায় পৌছার একটু আগেই টাইম যেহেতু ফিক্সড করা ছিল-তাই প্রথম শেলিং ইন্ডিয়া থেকে শুরু হলো কসবা পুরান বাজারের উপরে। আমাদের টার্গেট হলো কসবা পুরাণ বাজার দখল করা। প্রথম শেলিং শুরু হওয়ার পরে শব্দ শুনে আমি একটু সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম। কেননা খুব গল্প করতে করতে পাসাচিলাম এর মধ্যে প্রচন্ড শব্দে একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম যে শেলিংটা আমাদের পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে। তখন আমরা আরেকটু সামনে আগাইলাম। আগানোর পরে জিপ থেকে আমরা ৪ জন নামলাম। নামার পরে দেখি যে ঐ মহসীনসহ আরও কয়েকজন মেডিক্যাল টিম নিয়া আমার জন্যে অপেক্ষা করতেছে। আমি আসলাম। আমাকে আইনউদ্দিন সাহেব বললেন ডাক্তার সাহেব এই মেডিক্যাল ক্যাম্প আপনার দায়িত্বে। আপনি সবকিছু দেখাশোনা করবেন। মহসনি সাহেবও আছে। দুইজনে মিলে আপনারা ম্যানেজ করবেন। আর উনারা মেডিক্যাল টিমটার জন্য যে স্হান নির্ধারণ করলেন সেটা হলো বি.এস.এফ. ক্যাম্পের যে পাহাড়টা ছিল সে পাহাড়ের পিছনে। সেটা অবশ্য উন্মুক্ত খোলা জায়গা ছিল। কোনো শেল্টার নাই। তিনি বলেন যে আপনারা এখানে থাকেন। মেডিক্যাল ক্যাম্পের উদ্দেশ্য হলো আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়ে যারা আসবে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য যত কাছাকাছি থাকা যায়। কিন্তু আমার বিচারে দেখলাম যে এই স্হানটা উপযুক্ত নয়। আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। কারন বি.এস.এফ ক্যাম্পতো পাকবাহিনীর টার্গেট হবেই। তখন ন্যাচারেলি বি.এস.এফ ক্যাম্পের উপর গোলা এসে যদি পড়ে তা হলে সেটার ভিকটিম তো আমরাও হতে পারি। আমি আশঙ্কা করেছি কিন্তু কিছুই করবার ছিল না। আমরা ওখানে অপেক্ষা করলাম। কর্নেল খালেম মোশাররফ,ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সাহেব এবং আইনউদ্দীন সাহেব উনারা ঐ পাহাড়ের উপরে উঠে গেলেন বি. এস. এফ. ক্যাম্পে। বি. এস. এফ ক্যাম্পের উপরে যে বাংকার সেই বাংকার থেকে উনারা নির্দেশ দিচ্ছেন। আমরা এইদিকে অপেক্ষা করছি। প্রথমতো একচেটিয়া ভারতের দিক থেকে কসবার উপরে ফায়ার হয়। আমাদের লোকরা যাতে কসবা দখল করার জন্য যেতে পারে,যেন কভারেজ পায় সেইজন্য ফায়ার দেওয়া হচ্ছে। এরপরে পাকবাহিনী তাদের প্রথম ধকলটা কাটিয়ে উঠার পরে তারা মোটামুটি পাল্টা শেলিং শুরু করলো। কসবার পশ্চিমে কুঠি এবং আরও কিছু জায়গা থেকে পাকবাহিনী তাদের শেলিং শুরু করলো,পাল্টা শেলিং। এভাবে তারা যখন শেলিং শুরু করলো তখন প্রচুর আর্টিলারি শেল এসে এই বি.এস.এফ ক্যাম্পের উপরে,কসবার উপরে পড়তে শুরু করলো। তখন আমরা লক্ষ্য করলাম যে বি.এস.এফ ক্যাম্পে তারা যে টার্গেট গুলা করে সেগুলা অনেক সময় ক্যাম্প পার হয়ে আমাদের কাছাকাছি এসে পড়ে। হঠাৎ করে দেখলাম যে আমাদের প্রায় ২০ গজ দূরে একটা শেল মাটিতে এসে পড়লো এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো। তারপরে অনেক ধুলাবালি উঠে,