নাম : ফজর আলী (পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আহত)

পিতা : মৃত জফির উদ্দীন (পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে নিহত)

গ্রাম : আন্দোল,

ইউনিয়ন : পুটিমারা,

ডাক : পুটিমারা

থানা : নবাবগঞ্জ,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : তৃতীয় শ্রেণী পর্যন

১৯৭১ সালে বয়স : ১৫/১৬

১৯৭১ সালে পেশা : কৃষিকাজ,

বর্তমান পেশা : গ্রাম পুলিশ

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ:

 

প্র: কিভাবে ?

 

উ: আমি সে সময় বাড়িতই থাকিকোথাও বার হইতেও ভয় হয়তখন আমার খুব আমাশা হইছিলোএকদিন রাত ৩টা/৪টার দিকে খানরা আমাদের গ্রাম ঘিরছিলোআমার বাপেরা ছিলো পাঁচ ভাইখান আইছে শুইনা আমরা ঘর থাকি বাইর হইছিছোট চাচা আমার পিছনে খাড়া আছিলোএমন সময় এক খান আসি আমাক ধরি ফেললোএটা দেখি আমার বাপ আর অন্য চাচারা ছুইটে আইসে গেলোখানরা আমাদের আর যাইতে দিলো নাখানরা আমাক প্রশ্ন করছে এই বেডা বল, মুক্তিফৌজ কে ? আমি বলছি, স্যার মুক্তিফৌজ এখানে নাইতখন তারা আমার কথা না শুনি আমাক মাইরপিট আরম্ভ করি দিলোবাপ চাচা সহকারে আমরা পাঁচজন আছিলামআর একজন আছিলো, মোট ৬ জন, আমাদের সবাক লাইন করাইলোলাইন করে আমাক বলিলো কলমা পড়মুক্তির কথা যখন বইলবে না তখন কলমা পড়তখন আমরা লা ইলাহা ইল্লালাহু পড়ে ফেলাইলামকলেমা পড়ার পরে খানেরা ১৪/১৫টা ফায়ার করিলোতারা ফায়ার করার পর আমি ঐ অবস্হায় পড়ি গেলামআমার শরীরে তখন ৪টা গুলি লাইগে গেলোএকটা ডান হাতে, একটা বাম হাতের তলা দিয়ে ডুকছিলোএকটা পেটে লাগছেপেটে ্পিপ কাটি গেছেআরেকটা বাম পায়ের হাঁটুতে ঢুইক্কে গেছিলোগুলি লাগার পর তো পড়ি গেলামতখনও আমার সামান্য জ্ঞান আছিলোদেখি, গুলি করি খানেরা আবার ঘরে আগুন লাইগে দিলোআগুন লাগায় দেয়ার পর আগুন আমার গায়ের উপর পড়ে পড়ে, তখন আমার আঁচ লাগেযখন দেখছি খানরা নাই তখন আমি আসে আসে সরি গেছিআর আমার বাপ চাচা সব যেমন হিন্দু পোড়া হয় ঐ রকম হিন্দু পোড়া হইলোখানরা আমাদের গুলি করি ঘরে আগুন লাগায় দিয়া পাড়ায় ঢুকি আমার এক দাদাকে ওহানেই গুলি করেআমার এক জেঠারে গুলি করছেএইভাবে করতে করতে আমার গ্রামে তারা ৩৫/৩৬ জন লোকরে মারি দিলোমাইরে দেওয়ার পর আবার আগুন লাগাই দিলো প্রত্যেক বাড়িআগুন লাগাই দেওয়ার পর তারা চলি গেলোএইগুলা আমি পরে শুনছিআমাগোরক গুলি করার আগে আমার সাক্ষাতেই কয়েকটা মেয়েছেলেক তারা ধরিলোতাদের ধরি নির্যাতন করছেআমার বাপ সবার বড় আছিলোতিনি খুব অনুনয় বিনয় করিলো খানদের কাছে, কিন্তু ঐ বেডারা শুনেনিনা শুনি আমাগোরক বান্ধিলো, বান্ধার পরে একটুও সময় দেয় নাইদুই মিনিটের মধ্যেই ফায়ার করি মারি দিলোআগুন টাগুন দিয়া চইলে গেলোআমার জীবন বাঁচিলো, আর আমার বাপ চাচা সবাই গুলিতে আর আগুনে পুড়ে শেষআমি ওখানেই শুয়ে আছিলামজ্ঞান আছিলো নাকিন্তু আমি জীবিত ছিলামলোকজন আমাক নাকি উদ্ধার করি এখান থাকি শালখুড়িয়া পর্যন নিয়া গেছিলোআমি সেটা কওয়ার পারি নাএখানে ডাক্তার কবিরাজ নাইমুখলেছ স্যার ছিলো বিরামপুরেরঐ মুখলেছ স্যার  আমাকে দুইটা ইনজেকশন করছিলোইনজেকশন করার পর নাকি আমার জ্ঞান ফিরছেসে বলছে যে, ঠিক আছে, তুমি আমার এলাকার মানুষ, তোমাকে আমি ভর্তি করে দিমুতখন আমার পাড়ার লোকে খুব সাহায্য করেতারা ৫০ টাকা দিয়া দুইজন লোক ঠিক করি খাটিয়ায় করি নিয়া গেলো মিশনেধানবাড়ি মিশনেওখানে কিছুদিন চিকিৎসা করার পর আমাকে করলো কি নিয়ে গেলো ইটালি দেশেওখানে থাকলাম ১৪ দিন১৪দিন থাকার পরে আমাগো ওখান থাকি পাঠায়া দিলো আবার বাংলাদেশেদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ পাঠাইছেঢাকাত থাকি আমি বাড়িত আইছি

 

প্র: আপনাদের অ্যাটাক করার আগে এখানে কি মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়েছিলো ?

 

উ: না, তবে খান সেনারা আমাদের মারি চইলে যাওয়ার পর মুক্তিরা নাকি আইছিলোআমি আইসা এইটা শুনছিখানেরা গ্রামের মানুষজন মাইরে যাওয়ার পর মুক্তিবাহিনী আসি ঘেরাও করছিলোখানদের নাকি তারা আর পায় নাই

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি ?

 

উ: নাআমি করিনিবাড়িতই আছিলামখানেরা এখানে আইসা প্রথম প্রথম আমাগোরক ক্যামেঙাত ধইরা নিয়া যাইয়া কাজ কাম করাইয়া নিছিলোকাজ না করলি সাজা দিতোকাম করলি পাঁচ টাকা দিতোতারপর নিজেই গেছিযাইয়া একটু কাম করলেই পাঁচ টাকা দেয়পরে ভয়ে আর কোথাও যাই নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আর কি করলো ?

 

উ: নারী নির্যাতন করিলোএটা আমরা দেখছি

 

প্র: আপনার পরিবারে কয়জন শহীদ হয়েছে ?

 

উ: বাপ চাচা মিলে ৫ জনবাপের নাম হলো জফির উদ্দীনএক চাচার নাম হলো কলাজউদ্দীন, একজন হলো ইঞ্চি, একজন হলো মোজাহার, আর একজন হলো মঈন উদ্দীন

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: মুক্তিবাহিনী দেখছিযখন যুদ্ধ লাগে তখন তো আমরা ভারতে যাতি পারিনিওটা মনে হয় ভাদ্র মাস হবি

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: ভালো ছিলো

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: রাজাকার আমাদের এহানে ছিলো না

 

প্র: শান্তি কমিটি ছিলো কি ?

 

উ: আমাদের এখানে ওটা হয়নি

 

প্র: যুদ্ধের পর আপনার গ্রামের অবস্হা কেমন ছিলো ? গ্রামে ফিরে এসে কি দেখলেন ?

 

উ: গ্রামে আসি দেখি আমাদের বাড়িঘর সব পুড়ি শেষখালি ঐ মাটির দেওয়াল দেখতি পাছি

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ১২, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৮২