নাম
:
গণি মিয়া
গ্রাম
:
মন্দভাগ
ডাক
:
মন্দভাগ
ইউনিয়ন
:
কাইয়ুমপুর
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : তৃতীয়
শ্রেণী পর্যন্ত
১৯৭১
সালে বয়স : ১৪
১৯৭১
সালে পেশা : বেকার
বর্তমান
পেশা : দিনমপুর
চৌদ্দ
বছরের কিশোর
গণি মিয়া
মুক্তিযুদ্ধে
নানাভাবে
সাহায্য
করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের
কাছে গুলির
বাক্স পৌঁছে দিয়েছেন, খাদ্য
পৌঁছে
দিয়েছেন। আর একাজ করতে
গিয়ে তিনি
পাকিস্তানি তৎপরতাও
লক্ষ্য
করেছেন। বর্তমান
সাক্ষাৎকারে
তিনি তাঁর
অভিজ্ঞতার
কথা
জানিয়েছেন।
প্র:
১৯৭১ সালের
২৫শে মার্চ
পাকিস্তানিদের
আক্রমণের পর
আপনি কি
দেখেছেন এবং
কি করলেন?
উ: আমরা
খবর পাইতেছি
যে ঢাকাতে
গোলমাল লাগছে। পাঞ্জাবি
দেশে আসছে। তখনতো আমরা
পাঞ্জাবি
চিনি না। কারণ আমরা তো
তখনও দেখি নাই
পাঞ্জাবি। এমন একটা অবস্হায়
দেখা গেল
আমরার পশ্চিম
দিক থেইকা
মন্দভাগ দিয়া
ভাটি অঞ্চল
থেইকা
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের
বহু বহু
হিন্দু
যাতায়াত
করতাছে। তখন আমরা
অইলাম গরিব
মানুষ। আমরা
তাদের কিছু
ব্যাগ ট্যাগ
নিয়া বর্ডার
পার কইরা
দিতাম। তহন
তারা কিছু
টাকা পয়সা
আমরারে দিয়া
যাইত। এর
কিছুদিন পরই
মনে করেন
বৈশাখের ১ বা
২ তারিখ হবে
শুনলাম যে
কসবা
পাঞ্জাবি
আইছে। সালদা
নদী এলাকায়
গোলাগুলি হইল। প্রথম
তারিখ থেইকা
১৫/২০ তারিখ পর্যন্ত
গোলাগুরি
চাললো আরকি। এরপরে সি
এ্যান্ড বি
থাইকা,কুঠি থাইকা
স্পিডবোট
দিয়া
পাঞ্জাবি আসে
আর লোক দেখলে
মারে। আমরা
গেরামের
মানুষ তখনও
মন্দভাগে। এরপর
পাকসেনা
আমরার
মন্দভাগ
বাজার থেইকা
যাইয়া পাকিস্তানিরা
আমরারে দৌড়ান
দৌড়ান দিল। তখন আমরা যাই
ভাটি অঞ্চলে। গাং পার
অইয়া আমরার এক
আত্মীয়ের
বাড়িতে যামুগা-যহন
এইরকম একটা চিন্তাভাবনা
করছি তখন
বাড়িতে যাইয়া
দেহি যে আবার
পাঞ্জাবি
গুলি করতেছে
মানুষের উপর। আমার ডাইন
হাতে একটা
গুলি লাগছে
তহন। আর বাম
পায়ের কনিষ্ঠ
আংগুলের লগের
আংগুলটা ছিড়া
যাওয়ার পথে
ছিল। এখানেও
একটা গুলি
পড়ছিল। আল্লায়
সেইটা থেইকা
আমারে মুক্তি
দিছে। তবে
আংগুলটা ছোট
হইয়া গেছে। পাঞ্জাবিরা
গুলি করছে
দেইখা আমারে
আর পশ্চিম
দিগেও যাইতে
পারলাম না। তখন আমরা
ভারতে চইলা
গেলাম। আমরার
বর্ডারের
সাথে কোনাবন
একটা
হেডকোয়ার্টার
ছিল। মুক্তিবাহিনীর
হেডকোয়ার্টার। ঐ
হেডকোয়ার্টারের
সামনে একটা
সরকারি স্কুল ছিল। ঐ স্কুলে
আমরা যাইয়া
পড়লাম। আমার
আব্বা একটা
উইডেন্টি
কার্ড পাইলো। আমরা
বাংলাদেশের
নাগরিক এবং
মুক্তিযোদ্ধারা
যেন আমরারে
রাজাকার মনে
করে সন্দেহ না
করতে
পারে-এইজন্য
একটা
পরিচয়পত্র
আমাদের
এলাকার
আওয়ামী লীগ
নেতা ফালু
মিয়া সরকার দিলেন। পরিচয়পত্র
শুধু আমাদের
নয়-অত্র
এলাকার অনেক লোকরেই
দিলেন।
আমরা
বর্ডারের লগে
ছিলাম। আমরার
এই দিকদা দিন
রাইত ২৪ ঘন্টা
শুধু গুলি,আর গুলি,গুডুম
গুডুম দুডুম
দুডুম। এখানে
মানুষ ছিল
বেশি। যহন
পাঞ্জাবিরা
সি এ্যান্ড বি
থেইকা বোম
মারে তহন বোম
যাইয়া ভারত
বর্ডারের
কান্দায় পড়ে। তখন মেয়ে
লোকের গর্ভও পর্যন্ত
পইড়া গেছে এই
বোমের শব্দে। তহন
মুক্তিবাহিনীরা
ছোড পোলাপান
হিসাবে আমরারে
কইল যে,তোমরা ভাই
কিছু গুলি
বারুদ লইয়া আস। তখন আমরা
ঐ থ্রি ইঞ্চি
মর্টার,তারপর স্টেন
গানের গুলি
মেগজিনের
বোঝা বইয়া
কাইয়ুমপুরে
দিতাম। তাড়াতাড়ি
কইরা
মন্দভাগেও
দিতাম। এর
কিছুদিন পরেই
আমার আম্মা
চিল্লা
পাল্লা শুরু
করলেন ঘরবাড়ি
দেখার জন্য। আমি মারে
লইয়া বাড়িঘর
দেখতে আসলাম। বাড়িঘরে
আইসা এক রাইত
একদিন রইলাম। থাকার পরে
যহন আবার আমরা
যাইতে লইলাম
তহন আমার মারে
আটকাইছে। তহন
মন্দভাগের
কফিল মিয়া
সরকারের
বাড়িতে পাঞ্জাবি
আছিল। ঐখানে
একজন বাঙালি
আছিল,রাজাকার
বইলা মনে হইল
আরকি। সে
জিজ্ঞাসা
করলো তোমরার
কোন বাড়ি? কই
যাইতাছ? তহন আমরা
কইলাম যে
আমরার এই
বাড়ির
পূর্বদিকে আত্মীয়
বাড়ি যাইতেছি। এরপরে
আমরারে কইল যে
না তোমরা আর
এইদিকে যাইতে
পারবা না। আমরা এখন
গোলাগুলি
করাম। তোমরা
পশ্চিম দিকে
যাও। তহন
আমরা
পশ্চিমদিকে
আইয়া চাইয়া
দেহি যে এইখানে
গোলমাল। ছক্কার মার
বাড়ির এইখানে
গোলমাল। রাত্রে খবর
পাইলাম যে
এইখানে খুব
গোলাগুলি হইছে। সারা রাত
সারা দিন ২৪ ঘন্টা
মন্দভাগদা
গুলির শব্দে
একবারে ঝমঝম করছে। গোলাগুলিতে
মাটি পর্যন্ত
কাঁপছে
মন্দভাগের। তখন
স্কুলে আসলাম। এহানে
আইসা আমাদের
মসজিদের পুল
যে আছে ভাংগা পুল,এইখানদা
দেখি নৌকা
দিয়া শুধু
পাঞ্জাবি যায়
আর যায়। এইডা
মনে হয় ভাদ্র
মাসের ১৫
কিংবা ১৬
তারিখে এ ঘটনা
ঘটছে।
আর
একদিনের ঘটনা। দুইটা
কিংবা আড়াইটা
বাজে পশ্চিম
উত্তর কর্নার
থেইকা দেহা
গেল যে তিন
চারটা বিমান
আসতেছে। আমরা বিমান
চিনতেছি না। তহন আমরার
এইখানে একজন
মুক্তিবাহিনী
আছিল নামটা
আমার স্মরণ
নাই। উনার
কাছে আমরা
জিজ্ঞাসা
করলাম যে
স্যার,এইগুলা কিতা? কয়, চিন্তা
কইর না আমি
ওয়ারলেস কইরা
দেখি এইগুলা
কি?
তহন
উনি ওয়ারলেস
কইরা কইল যে
এইগুলা
জয়বাংলার
বিমান। সাথে
সাথেই আবার
কইতাছে যে না
এইডা পাকিস্তানি
বিমান,তোমরা
তাড়াতাড়ি
যাইয়া জান
বাঁচাও। এই কথা বলতে
না না বলতেই
মন্দভাগের আর
কিছু রাখে নাই। ধূলিসাৎ
কইরা লাইছে
বিমানের বোমে। চারটা
বিমান। যেদিন
বিমানে বোম
ফালাইছে ঐদিন
ছিল শুক্রবার। একদিনের
বোমে মনে করেন
লতিফ
মেম্বারের এক
ভাই,নাম
আছিল রাজা
মিয়া উনি মারা
যায়। আর
মকবুল মিয়ার
দুই ছেলে। এক ছেলের নাম
আছিল ফরু আর
এক ছেলে রবি। এই ছেলে
মারা গেল এই
দিনের বোমে। আর
আমাদের
এলাকায়
খলিফা আলীর এক
ছেলের নাম অইল
মতিউর রহমান, আর এক
ছেলের নাম অইল
জামাল। এই
দুই ছেলে
বিমানের বোমে
মারা যায়। আর বাকি দুই
ছেলে আছে অচল অবস্হায়। লতিফ
মেম্বারের
শরীরে মাংস
নাই। একবারে
ছিড়া গেছে
বোমে। এরপরে
মনে করেন মধু
মিয়ার দুই
ছেলে মারা যায়। একজনের
নাম আছিল
নওয়াব মিয়া,আর
একজনের নাম
আছিল আবদুল
আলীম। আবদুল
আলীম আমার
ক্লাসমেট ছিল। আর
বর্তমানে
ইব্রাহিম
নামে এক ছেলে
আছে। হেও
হাঁটতে পারে
না,পাও
ল্যাংড়া। দুই ভাই মারা
গেল। আর এক
ভাই অচল। আর আমার
চাচীর কানের
মধ্যে একটা
গুলির টুকরা পড়ছিল। আরও বহু
মানুষের
শরীলে
অস্ত্র-শস্ত্র
পড়ছে। প্রায়
পঁচিশ
ত্রিশটা
বাড়িঘর এই
বিমানের বোমে
একবারে ধ্বংস
হইয়া গেছে। আমরার
প্রাইমারি
স্কুল টিনের
ছিল। এইটার
আধাডা পইড়া
গেছে বোমে। আর একটা বোম
ফালাইছে দুই
বা তিন কুয়া
মাডি উঠছে। রমজান মাসের
কিছু পরে
পাঞ্জাবিরা
এহেন থেইকা
সইরা যায়,আবার
আসে। তখন
রমজানের ঈদ। ঈদের দিন
রাত্রে আমরার
এই এলাকার
অর্থাৎ
কাইয়ুমপুরের
এবং
মন্দভাগের
বহু মানুষ মারা
যায়। এই সময়
হাজার হাজার
মানুষ
চিল্লাপাল্লা
কইরা ভাটি
অঞ্চল দিয়া
ভারতে চইলা
যায়।
কিছুদিন
পরে আল্লায়
দিলে সকাল
প্রায় আটটা সাড়ে
আটটা বাজে। তখন আমরা মুক্তিবাহিনীর
হেডকোয়ার্টারে
ছিলাম। কাদির
সাব টপ কইরা
বললো-উনার
বাড়ি
নোয়াখালী ছিল,এখন
আমরার আর চিন্তা
নাই। তোমরা
যার যার
বাড়িতে
যাওয়ার ব্যবস্হা
কর। আল্লায়
দিলে আমরার
দেশ স্বাধীন
হইছে। পাঞ্জাবিরা
সারেন্ডার
করছে। এরপরে
মনে করেন আমরা
বাড়িঘরে
আসলাম। দেশে
আইসা দেখলাম
যে আমরার
মন্দভাগের
কোনো হাল নাই। ছনের ঘর
যারার ছিল
সেইডি পুইড়া
লাইছে। টিনের
ঘর যারার ছিল
এইডিও পুইড়া
লাইছে। আর
বাকি যা কিছু
আছিল বোমে
টোমে শেষ হইয়া
গেছে। বাড়িঘরে
আবার আড়া
জঙ্গল অইয়া
আছে।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : জহিরুল
ইসলাম স্বপন
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ১১ অক্টোবর
১৯৯৬
ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৫৮