নাম : গীতা রানী জোয়ারদার

স্বামী : মনোজ জোয়ারদার (১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত)

গ্রাম : গোপালখালি, ইউনিয়ন : গঙ্গারামপুর, ডাক : কাশিয়ানগর

থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ২৫

১৯৭১ সালে পেশা : গৃহিনী

বর্তমান পেশা : গৃহিনী

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা কি আপনার মনে আছে ?

 

উ: মনে আছেসেই সময় আমরা নৌকায় ভোট দিছিলামনির্বাচনে শেখ সাহেব জিতিছিলোকিন্তু খানেরা শেখ সাহেবরে ক্ষমতা দেয় নাইতারপর তো দেশে গন্ডগোল শুরু হইলোভোটের ৩/৪ মাস পর খানেরা আমাদের দেশে খুব অত্যাচার আরম্ভ করিলোতখন খালি চারদিকে শুনতি লাগলাম গন্ডগোল চলতিছেআমাদের বাড়িতে অবশ্য তখনো কোনো অসুবিধা হয় নাই  আমাদের এলাকাতেও তেমন কিছু তখনো হয় নাইআমরা বাড়িতেই থাকতামকিন্তু শুনতাম যে, এ জায়গায় লুট হচ্ছি, ও জাগায় ওটা হচ্ছিতারপর হঠা একদিন আমাদের এখানেও সেটা শুরু হইলোবৈশাখ মাসের শেষের দিকে একদিন শুনতি পালাম আমার বাপের বাড়ির দিকে লুট হচ্ছিতার কয়েকদিন আগে আমার স্বামী কুমিল্লা থাইকে ছয় সাত দিন হাঁইটে বাড়ি আইছেসে সময় আমার স্বামী কুমিল্লায় ট্রেনিংয়ে ছিলোবাড়ি আইসে সে আমারে বলছে যে, বিভিন্ন জাগার অবস্হা যা দেখে আসছি তাতে এখানে আর থাকা যাবে না

 

প্র: এপ্রিল মাসে, অর্থা বৈশাখ মাসেই আপনাদের এই এলাকায় লুটপাট শুরু হয়েছিলো কি ?

 

উ: আমাদের এখানে তখনও শুরু হয়নিশুনতাম যে, দূরে হচ্ছেআমার স্বামী দেওতলা স্কুলে মাস্টারি করতোকুমিল্লা থাইকা আইসা উনি আর স্কুলে যান নাইকুমিল্লা থাইকা বাড়ি আসার ২/৩ দিন পর দেওতলার খলিলের ভাই এবং আরো কয়েকজন আমার স্বামীরে বললো যে, মাস্টার চলো, এখান থেকে চলি যাইখলিলের ভাইয়ের সঙ্গে যারা ছিলো তাদের মধ্যে একজন আর্মিতে ছিলোতার নামটা আমি ভুলে গেছিওনারা একসঙ্গে ছোটবেলায় লেখাপড়া করছেনঐ আর্মি আর খলিলের ভাই বার বার বলছে যে, মাস্টার চলো, চলি যাই, এখানে থাকা যাবে নাউনি বলছেন, তোমরা যাও, আমি একটু দেরি করে যাবোআমি আমাদের ফ্যামিলি নিয়ে যাবোআমার স্বামী ওনাদের সঙ্গে যাইতে রাজি হন নাইখলিলের ভাই আর ঐ আর্মি সাহেব একদিন ইন্ডিয়া চলি গেলোসে খবরও আমরা পাইলামপরে আমরা শরীকের সবাই মিলি এক সঙ্গে চলি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম

 

প্র: যখন আপনারা যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন তখন আপনাদের এই এলাকার অবস্হা কেমন ছিলো ?

 

উ: তখনও আমাদের এখানে কিছু হয় নাইকিন্তু শুনতি লাগলাম, নিকটে নিকটে লুটপাট চলতিছেযেদিন আমরা চলি যাবো সেদিনই আমাদের গ্রামে হঠা লুটপাট শুরু হইলোআমার স্বামী যাওয়ার দুই দিন আগে বলছিলেন যে, কিছু চিড়ে বানাওপথে ছেলেপেলে সব খাবেআমার মেয়েটার তখন আঠারো মাস বয়সআর ছেলেটা তার চেয়ে একটু বড়আর একটা মেয়ে তার বড়স্বামী আমারে বললো যে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরে নিয়া অনেক পথ যাতি হবে তো ! চিড়ে না হলি ওদের বাঁচানো যাবে নাআগের দিন আমি আমাদের এখানকার একজনরে ডাকি চিড়ে কুটলামপরদিন সকাল বেলা ঘুম থাইকে উঠি কিছু কাজ কাম করি ছেলেমেয়েগুলারে উঠাইলামরাতের বেলা ওরা কেউ কিছু খায়নিসকালে ওদের দুটো খাওয়াই দিয়াই আমি ভাত চুলোয় দিছি যে, ভাত খাইয়া আমরা রওনা হবোএমন সময় দেওতলা থাইকে কিছু মুসলমান আইসে আমাদের বাড়ি ভইরা গেলোওরা কেউ আমাদের গোলার উপর উঠি ধান নামাতি লাগলো, কেউ গরু ছাগল নিয়া যাতি ধরিলোআমাদের কেউ ওদের বাধা দিলো নামুসলমানরা আমাদের গরু ছাগল আর ধান নিয়া চলি গেলোওরা অবশ্য আমাদের ঘরে ঢোকে নাইআমার এক দেওরের নাম নিরঞ্জনআর এক জনের নাম চিত্তরঞ্জনওরা তখন একটু বড়মুসলমানরা অন্য দিকে চলি যাওয়ার পর আমি ওদের বললাম যে, তোরা শিগগির ঘরের জিনিসপত্র নৌকায় নিয়ে রাখবাড়ির পশ্চিম পাশের জলায় আমাদের নৌকা রাখা ছিলোনৌকায় সব দরকারী মালামাল আমরা উঠোয় নিলামস্বামী বললো, শান্তি আমার সার্টিফিকেটগুলো শুধু নাওছেলেমেয়েগুলারে ঠিক মতো নিয়ে চলোআর দেরি করার সময় নাইআমার ডাক নাম শান্তিযাহোক, আমরা তাড়াতাড়ি নৌকায় উঠিলামতারপরে নৌকা ছাইড়ে দিলোআমাগোর শরীকের সবাই আমরা রওনা দিলামপরে মুসলমানরা আমাদের গ্রামে আর কি করিলো সেটা আমি জানি না

 

প্র: যারা আপনাদের বাড়িতে লুট করতে আসছিলো তাদের কাউকে আপনি চিনেছিলেন কি ?

 

উ: দেওতলা থাইকে যারা আসছিলো তাদের মধ্যে খলিলের এক আত্মীয় ছিলোশুধু তারে চিনছিলামতখন তো আমরা মান সম্মান নিয়া সরে পড়তি পারলি বাঁচি

 

প্র: তারপর কি হলো ?

 

উ: তারপর আমরা ঐ খালের ভিতর দিয়া নৌকা বাইয়া চলি গেলাম বয়ারডাঙ্গাভাতের হাড়িটা এক ফাঁকে আমি চুলা থাইকা নামায়ে রাখছিলামসেই ভাতের হাড়িটা আমি সঙ্গে নিছিলামআমাদের কেউ খায় নাইওই ভাত আমরা বয়ারডাঙ্গায় খাইলামবয়ারডাঙায় আমরা দুই দিন ছিলামবিভিন্ন জাগার লোক আইসে ওখানে জমা হইছেওরাও সব হিন্দুদুই দিন ওখানে থাকার পর নৌকা আবার ছাড়িলোতারপর মাইলামারার বান্ধের (বাঁধ) কাছে যাইয়া আমরা এক রাত থাকিলামরাতের বেলা আমরা ডাঙ্গায় থাকিরান্না-বান্না করতি হয়তারপরে মাইলামারাত থাইকে আবার নৌকো ছাড়িলোওখান থাইকে ডুমুরিয়ার বাজারে যাইয়ে আমরা এক রাত থাকিলামঐখান থাইকে পরের দিন সকালে নৌকা ছাইড়ে আমরা চুকনগর বাজারে গেছিসে সময় সকাল ১০টা কি ১১টা বাজেআমাদের নৌকায় আমরা মেয়েছেলে সবমেয়েছেলেগুলোরে নৌকায় উঠোয় দিয়া ২/৩ জন নৌকা বাইতোআর আমাদের পুরুষগুলান নদীর পার দিয়া নৌকার পিছন পিছন হাঁইটা আসতোচুকনগর আইসে আমার স্বামী আর শ্বশুর বলছে যে, সারারাত আমরা ঘুম পারতি পারিনিক্ষুধাও লাগিছে খুবসকালে না খায়া গেলি আমরা তো হাঁটতি পারবো নাস্বামী বলছে যে, তাড়াতাড়ি ভাত রান্না করোআমাদের সঙ্গের একজন রান্না বান্না করতিছেআর আমরা ওখানে ঘুরি বেড়াতি লাগলামআমরা তখন চুকনগর বাজারের পূর্ব দিকে আছিভাত রান্না হলি আমরা ৪/৫ জন করি সব খাতি বসলামআমাদের খাওয়া দাওয়া শেষ হইছে-এমন সময় দূরে ফট ফট শব্দআমি আমার স্বামীরে জিজ্ঞাসা করিলাম ওটা কিসের শব্দসে বলে ওটা কিছু নাতখনই স্বামী আমারে বলে, একটু জল এনে দাওআমি এদিক সেদিক ঘুরি টুরি তারে একটু জল আনি দিলামএমন সময় ওখানে একটা গাড়ি আইলোসেই গাড়ি থাইকে কয়েকজন লাফ দিয়া নামিলোহাতে সব অস্ত্রপাতিপোশাক সবার অন্য রকমআমাদের ছেলেটা তখন স্বামীর কোলেওরা আইসেই আমার স্বামীরে কইছে কোল থাইকে বাচ্চা নামায় দেওরা ২/৩ বার কওয়ার পরে উনি কোল থাইকে বাচ্চা  নামায় দিলোআমি, আমার শাশুড়ী, আমরা সব পিছনে দাঁড়াইয়া রইছিআমার স্বামী কোল থাইকে ছেলেটারে নামায় দিলি আমি ওরে কোলে তুলে নিছিতারপর ওরা সব পুরুষ মানুষগুলানরে ওখানে লাইন করাইলোতারপর গুলি কইরা দিলোআমাদের সামনেই গুলি কইরা দিলো

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যদের দেখে তো অনেকেই পালিয়েছিলোআপনার স্বামী পালালেন না কেন ?

 

উ: আমরা দেখতেছিলাম যে কারা যেন আসতিছেসেই সময় আমাদের লোকগুলা বোধহয় বুঝতি পারে নাইসেজন্য দৌড়ায়ে পালায় নাইকিন্তু আমাদের আশপাশের অনেকে আগেই দৌড়ে পালায় গেছেআমাদের এরা কেউ দৌড়াতে পারে নাইআর তখন তো ২/৩ জন মিলিটারি সেখানে আইসে গেছেতখন এরা সব দৌড়ায় যাবে কোন জায়গায় ?

 

প্র: তখন বাজারে কত লোক ছিলো ?

 

উ: সেটা তো আমি কইতে পারুম নাআমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই তো প্রায় ৭০০/৮০০ শলোকসবখানে লোক গিজগিজ করতিছিলোঅস্ত্র হাতে যারা আইছিলো তারা পুরুষ যাদের পাইলো তাদের সবাইরে লাইন করাইয়া গুলি করিলোওই লাইনে শুধু আমার স্বামী নাআমার সেজো দেওর, তারপর আমার শ্বশুর ছিলোআমি আর আমার শাশুড়ী মিলিটারিরে অনেক অনুরোধ করিলাম ওদের না মারার জন্যকিন্তু ওরা কিছুই শুনিলো নাসবাইরে মারার পর আমার শাশুড়ী আর আমি কইতে লাগলাম যে, আমাগো সবাই তো মারা গেছেআমাগোও তোমরা তালি গুলি করো, আমরা করবো কি ? কিন্তু ওরা চলি গেলোআমাদের আর কিছু কলো নাআমার সেজো দেওরের নাভিতে গুলি লাগিছিলোসে তখনও জ্যান- আছিলোসে জল জল বলি চেঁচাচ্ছিলোআমি আর আমার শাশুড়ী দৌড় দিয়া গিয়া জল আইনা তার মুখে দিছি  তারপর তো সেও মারা গেলোওখানে জ্যান- কোনো পুরুষ লোক নাইশুধু আমরা কয়েকজন মায়েলোকআমরা কান্দাকাটি করতেছি--এমন সময় আমার ছোট দেওর ওখানে আইলোকিছুক্ষণ পর আরো কিছু পুরুষ লোক ওখানে আইলোতারা কতি লাগলো আর এখানে দেরি করার সময় নাইতারা আমাদেরে ধরি বান্ধি জোর করি নিয়া গেলো

 

প্র: আপনার স্বামী, শ্বশুর এবং দেওরের লাশ কি করলেন ?

 

উ: ওখানেই পড়ি থাকিলো

 

প্র: পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন কতজন লোককে ওখানে হত্যা করেছিলো ?

 

উ: সব তো আমি দেখি নাইআমি যেখানে ছিলাম সেখানেই অন-ত পঞ্চাশ-ষাটজন তো হবিযাওয়ার পথে আরো অনেক লাশ দেখিলামআমি তো গুণে দেখি নাইচারদিকে শুধু মানুষের লাশ আর লাশযাওয়ার সময় শুনিলাম মিলিটারিরা চইলা গ্যাছে

 

প্র: চুকনগর বাজার থেকে আপনারা কোথায় গেলেন ?

 

উ: আমরা ঐখান থাইকে হাঁটা শুরু করলামকৃষ্ণনগর গ্রামে যাইতে যাইতে আমাদের সন্ধ্যা হইয়া গেলোসেই জাগায় আমরা রাতে থাকিলামপরের দিন সকালে এ বাড়ি ও বাড়ি থাইকে আমাদের খাইতে ডাকিলোআমরা তখন দশ জন মানুষপুরুষ মানুষ মাত্র দুইজনছোট দেওর আর আমার এক ভগ্নিপতিআর সব মেয়েছেলে

 

প্র: পাকিস্তানি সেনারা সেদিন মেয়েদেরকে হত্যা করেনি ?

 

উ: নাআমি আর আমার শাশুড়ী কইছিলাম আমাদেরও গুলি করোআরো অনেক মেয়েছেলেও ওদের বলিছেকিন্তু ওরা আমাদের গুলি করে নাই

 

প্র: তারপর কি করলেন ?

 

উ: আমার ভগ্নিপতি বলছে যে, আমি বাগডাঙ্গায় থাইকে এক সময় পড়াশুনা করিতামওখানে হরিপদ বাবুদের বাড়িতে আমি ছিলামওনাদের অবস্হা বেশ ভালোওখানে গেলে হয়তো আমরা আশ্রয় পাবোদুই দিন পর সকালে আমরা বাগডাঙ্গায় হরিপদ বাবুদের বাড়িতে গেলামওখানে যাওয়ার পর হরিপদ বাবুর ছোট ভাই আমাদের বলছে, বর্ডারের অবস্হা এখন ভালো নাখোঁজ খবর না নিয়া ওদিকে যাওয়া যাবে নাতোমরা এখানে থাকোবর্ডারের অবস্হাটা একটু ভালো হোক, তখন তোমরা যাইও

 

প্র: তখন আপনারা কি করলেন ?

 

উ: ওখানেই থাকিলামওনারা আলাদা র&#