নাম : হাফিজুর রহমান

পিতা : মরহুম আবদুর রব

গ্রাম : দামুদর, ইউনিয়ন : দামুদর, ডাক : দামুদর

থানা : ফুলতলা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এম. কম.

১৯৭১ সালে বয়স : ২৮

১৯৭১ সালে পেশা : চাকরি এবং শ্রমিক রাজনীতি

বর্তমান পেশা : চাকরি এবং শ্রমিক রাজনীতি

 

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমার নিজের সম্পর্কে কিছু কথা বলতে হয়১৯৭০ সালে আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাসানী ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলামআবার গোপনে এম. এল. (মাকর্সবাদ-লেলিনবাদ) পার্টির সাথেও যুক্ত ছিলামতখন এম. এল. পার্টির অনেকেই প্রকাশ্যে ভাসানী ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলোআমি ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. কম. পাশ করার পর প্লাটিনাম জুট মিলে চাকরি নেইচাকরির পাশাপাশি শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হইতখন আমি পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের হয়ে কাজ করতামআমি বর্তমানে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির খুলনা জেলা কমিটির সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য

 

   ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে এক বিরাট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়জলোচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য কারণে ভাসানী ন্যাপ এবং চীনপন্হী অন্যান্য দল সেই সময় নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো১৯৭০ সালের নির্বাচন আমরা বর্জন করেছিলামতারপরও নির্বাচন হয় এবং মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে ভোট প্রদান করেনির্বাচনে আওয়ামী লীগ তকালীন পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে

 

   সত্য কথা বলতে কি, রাজনৈতিক কারণেই তখন আমরা নির্বাচন সম্পর্কে তেমনভাবে ভাবিনিতখন আমরা সশস্ত্র লড়াই এবং নকশালবাড়ির আন্দোলনের সাথেই বেশি সম্পর্কিত ছিলামআমরা তখন মনে করতাম যে, শ্রেণী শত্রু খতমের মধ্যদিয়েই সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়  করা যাবে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হবেকিন্তু মানুষ আমাদের আহ্বানে সাড়া দিলো নাতারা শেখ মুজিবকেই তাদের নেতা হিসাবে বেছে নিলোযাহোক, নির্বাচনের পর শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের গণ পরিষদের অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানালেনপাকিস্তানিরা ৩ মার্চ পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করেও তারা সেটা স্হগিত করে দেয়তখন শেখ মুজিবুর রহমান আবার নতুন করে ম্যুভমেন্ট শুরু করেনশেখ মুজিব নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিলেও তখন আমার মনে হয়েছে যে, এই ম্যুভমেন্ট টুভমেন্ট আসলে কিছু না, আওয়ামী লীগ তদানীন্তন পাকিস্তান গভর্নমেন্টের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টাতে আছে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তাদের সমঝোতা চেষ্টা

 

   ১৯৭১ সালের মার্চ মাসটা খুবই উত্তপ্ত ছিলোপাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দেওয়ায় তখন আন্দোলন চলছিলোশ্রমিকরাও সেই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলোশ্রমিকরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতেও যোগ দেয়আমার মনে আছে, আমাদের মিলের লকারে রাইফেল ছিলোআমাদের সিকিউরিটিদের কাছ থেকে আমরা জোর করে সেই রাইফেলগুলো নিয়ে নেইসেই রাইফেল দিয়ে এখানকার শ্রমিকদের ট্রেনিং দেওয়া হয়সেই ট্রেনিংয়ে আমি, মোতাহার সহ আরো কয়েকজন ছিলামঅনেকে তখন ট্রেনিং গ্রহণ করেশেখ মুজিবুর রহমান সাহেব তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে সব কিছু বন্ধ করে দেওয়ার কথা বললেও এখানকার কোনো কোনো মিল মার্চ মাসেও চালু ছিলোযে সব মিল চালু ছিলো সেসব মিলে বিহারী শ্রমিক বেশি ছিলোআমাদের মিলের গোডাউনে চাল ছিলোআমরা রেশনে অনেক কিছু কিনতে পারতামগোডাউনের চাল এবং অন্যান্য জিনিস আমরা তখন শ্রমিকদের মধ্যে বিলি করে দেইতখন এসব যে আমরা করছিলাম সেটা কিন্তু পরিকল্পিত ছিলো নাএক সময় ভেবেছি পুলিশ হয়তো আমাদের আক্রমণ করতে পারেসে জন্য আমাদের প্রোটেকশন দরকারতখনও কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে যে একটা কম্প্রোমাইজ হতে পারেআমি যেহেতু এম. এল. (মাকর্সবাদ-লেলিনবাদ) রাজনীতির সাথে ছিলাম সে জন্য আমাদের রাজনীতির সাথে মিলিয়েই সব কিছু ভাবতামসাধারণভাবে আর কোনো ভাবনার অবকাশ আমার ছিলো নাআমি তখনো মনে করতাম যে, আওয়ামী লীগ যেভাবে চাইছে সেভাবে সাধারণ মানুষের মুক্তি হবে নাকিন্তু তখন সাধারণভাবে যে দাবি ছিলো তার সাথেও আমাদের থাকতে হতোইনফ্যাক্ট আমরা তখন দ্বৈত অবস্হানে ছিলাম

 

প্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতা আপনি শুনেছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, শুনেছিকারণ তখন তো শেখ মুজিবুর রহমানই দেশের নেতাফলে সবাই তাঁর ভাষণ শুনেছিলোতাঁর ভাষণ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীষণ আলোড়ন তুলেছিলোতিনি সেদিন তাঁর বক্তৃতায় বললেন, তোমাদের যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবাকিন্তু আমরা যাঁরা বাম রাজনীতি করতাম তাঁরা কিন্তু তাঁর ঐ কথাকেও একটা ফাঁকিবাজি বলে মনে করেছি

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছিলেন বা কি জানেন ?

 

উ: তখন তো আমরা সব সময় রেডিওর কাছে থাকতামখবর শুনতাম যে কি হচ্ছে, না হচ্ছে২৬ মার্চ সকাল বেলায় রেডিওতে শুনলাম যে, ঢাকায় পাক বাহিনী আক্রমণ করেছেতখন আমার মনে হলো, পাকিস্তানিদের এই আক্রমণ কোনো অবয় মেনে নেওয়া যায় নাএর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হওয়া দরকারতখন আমরা শ্রমিকদের কাছে গেলামতাদের বললাম যে, পাক বাহিনী সাধারণ মানুষের উপরে আক্রমণ করেছেএর বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবেআমরা শ্রমিকদের নিয়ে সেদিন একটা মিছিল করলাম এই খালিশপুরেআমরা তখন গাছ কেটে রাস্তায় ফেললাম যাতে পাক বাহিনী যশোর থেকে না আসতে পারেভাঙা ইটের টুকরো ছাদের উপরে রাখা হলো তাদের বিরুদ্ধে এগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্যএরপরই পাক বাহিনী যশোর থেকে খুলনা এলোতখন আমরা আর টিকতে পারলাম না

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আমি সরাসরি আক্রান্ত হই নাইতবে বিপদে পড়েছিলামআগেই বলেছি আমরা নকশাল রাজনীতির সাথে ছিলামআমরা রাজাকার আর মুক্তিবাহিনী দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিশেষ দিকে একবার পাক বাহিনীর কাছে ধরা পড়েছিলামঅবশ্য পরে ছাড়া পেয়েছি

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনী কখন খুলনা আক্রমণ করে ? তারা এসে কি করলো ?

 

উ: সঠিক তারিখটা আমি ভুলে গেছিসম্ভবত: মার্চ মাসের ২৭/২৮ তারিখে তারা আক্রমণ করেএপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এই এলাকা ছেড়ে আমি চলে গেছিপাক বাহিনী খুলনায় কি করেছে সেটা আমি সঠিক জানি না

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন কি ?

 

উ: নাআমি নকশালদের সঙ্গে ছিলামআমরা রাজাকারদের সঙ্গেও লড়াই করেছি, মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়াই করেছিরাজনৈতিক আদর্শগত কারণে আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাইনিআমরা তখন এই অঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের লড়াই করেছিসেটা আর এক ইতিহাস

 

প্র: দেশ স্বাধীনের পর খুলনায় ফিরে এসে কি অব দেখলেন ?

 

উ: আমি আমার মিল এলাকায় ফিরে এসেছি ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতেখুলনায় এসে মনে হলো যে, অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে গেছেচারদিকে কেমন একটা থমথমে ভাবকিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রাণচাঞ্চল্য ছিলো যে, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিকিন্তু তাদের মধ্যে স্বজন হারানোর দু:খও ছিলোসে সময় অনেক শ্রমিক মারা গেছেআমাদের মিলেরই অনেকে মারা গেছেতাদের সবার নাম আমার মনে নাইশুধু হেমায়েতের কথা আমার মনে পড়েশুনেছিলাম, তাকে বিহারীরা বয়লারের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলোসে এবং আরো অনেকে মিলে কাজ করার জন্যে আসছিলোকাজ না করলে তাদের উপায় ছিলো নাদেশ স্বাধীনের পর আমরা ফিরে এলামকিন্তু নকশাল রাজনীতি করার কারণে আমরা তখন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলাম

 

 

 

সাক্ষাকার গ্রহণকারীর নাম : মাহবুবুর রহমান মোহন

সাক্ষাকার গ্রহণের তারিখ : মার্চ ২২, ১৯৯৭

ক্যাসেট নম্বর : ৫৫-৫৬