নাম : হরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী

পিতা : মৃত অম্বিকাচরণ গাঙ্গুলী

গ্রাম : বেদিতলা, ইউনিয়ন : গঙ্গারামপুর, ডাক : বয়ারডাঙা

থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এস. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ২৬

১৯৭১ সালে পেশা : শিক্ষকতা

বর্তমান পেশা : শিক্ষকতা

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: ১৯৭০ সালে আমি এই এলাকার দেওতলা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতামওই নির্বাচনে একটি ভোট কেন্দ্রে আমি পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করিনির্বাচনে আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগ  প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়দেশের অন্য এলাকাতেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়কিন্তু তখনকার পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী এই নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিতে পারেনিফলে, এই নিয়ে দেশে গন্ডগোল হতে লাগলোআমরা হিন্দুরা তো সবাই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলামতখন ক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে গন্ডগোল শুরু হওয়ায় আমরা হিন্দুরা খুব ভীত হয়ে পড়লামতখন ভয়ে ভয়ে দিন কাটতে লাগলোমনে হলো আবার যানি আমাদের উপর অত্যাচার হয়তখন আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, এখানে সেখানে মারামারি কাটাকাটি হচ্ছেআস্তে আস্তে গন্ডগোল তো চারদিকে দানা বাঁধতে লাগলোওই গন্ডগোল শেষ পর্যন- আমাদের এই পাড়াগায়েও এসে পড়লো

 

প্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতা আপনি শুনেছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, আমি শুনেছিলামতিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হওতখন বাঙালি সবাই তো চাচ্ছিলো যে, দেশে একটা পরিবর্তন আসুকক্ষমতা নিয়ে গন্ডগোল হওয়ায় আমাদের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মধ্যে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছিলো সেটা তখন একটু কমে গেছেশেখ সাহেবের ভাষণের পর আমরা মনে একটু সাহস পেয়েছিলামশেখ সাহেব আমাদের প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেনআমরা তখন বাঁচার জন্যে বাঁশের লাঠি-টাঠি নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলামএছাড়া আমাদের আর তো কিছু ছিলো নালাঠিই আমাদের তখন একমাত্র সম্বল ছিলোসেই সময় আমরা  এখানে একটা কমিটি করেছিলামকি করে আমরা শত্রুর মোকাবেলা করবো সে ব্যাপারে কমিটিতে আলোচনা করতামএভাবেই সবকিছু চলছিলোতারপর তো পাকিস্তানি মিলিটারি ঢাকায় বাঙালিদের উপর ঝাঁপায় পড়লোঢাকার খবর পাওয়ার পর আমরা সন্ধ্যার পর থেকে নদীর পারে যেয়ে থাকতামমিলিটারি যে কোনো সময় আমাদের এখানে আক্রমণ করতে পারে-এই ভয় আমরা করছিলাম

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি জানেন বা কি শুনেছিলেন ?

 

উ: ২৫ মার্চের ২/৩ দিন পর আমরা শুনলাম যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আক্রমণ করেছেএই খবর শুনে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়িআমরা শুনেছিলাম যে, ওরা হিন্দুদের উপরই নাকি বেশি অত্যাচার করছেমেয়েছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছেহিন্দুদের বাড়িঘর দুয়ারে আগুন দিচ্ছেএই খবর শুনে আমরা বাঁচার পথ খুঁজতে লাগলামএই সময়টায় আমরা বিভিন্ন দিকে যোগাযোগও করেছিলামআমরা বিশেষত হিন্দুরা এখানকার থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে লাগলামতখন আমাদের থানায় যিনি সি. ও. (সার্কেল অফিসার) ছিলেন তার সঙ্গেও আমরা দেখা করলামতিনি আমাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে নাআমরা আপনাদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করবোএকদিন থানার ওসি সাহেব বয়ারডাঙায় একটা মিটিং করলেনসে সময় হিন্দুদের কেউ কেউ গোপনে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছিলোউনি আমাদের বললেন, আপনারা থাকেন, কোনো ভয় নাইআপনারাই আমাদের শক্তিতখন আমাদের মনে একটু ভরসা হলোএই এলাকায় যারা আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন তাদের সাথেও আমরা কথা বললামআমাদের এখানে আবুল সাহেব ছিলেন সবচেয়ে বড় নেতাএকদিন আমরা তার কাছে গেলামঅন্যদের সাথেও আমরা কথা বললামপরে আমরা দেখি যে, তারা অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেনমানে তারা নিজেরাই তখন বাঁচার চেষ্টা করতে লাগলেনকিছুদিন পর থেকে চারদিকের নানা খবর আমরা শুনতে থাকিশুনি যে, এটা হচ্ছে, ওটা হচ্ছেখবর নেওয়ার জন্য আমরা এখানে ওখানে যেতামঐ সময়টায় আমরা যে কি করবো সেটা আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম নাচারদিকের নানা ধরনের খবর শুনে তখন আমাদের খাওয়া ঘুম প্রায় বন্ধ হয়ে গেলোএক পর্যায়ে আমাদের মনোবল ভেঙে পড়লোশত্রুকে প্রতিরোধ টতিরোধের ব্যাপার আর আমাদের মধ্যে থাকলো নাআমরা হিন্দুরা খুব অসহায় বোধ করতে লাগলামএর মধ্যে একদিন আমরা শুনতে পেলাম যে, আমাদের উপর আক্রমণ হবে, আমাদের ঘর-দুয়ার লুট হবে

 

প্র: কিভাবে এ সব খবর পেলেন ?

 

উ: খবরগুলো আমরা বিভিন্ন লোক মারফত পেতে লাগলামআমাদের পাশে ফুলতলা গ্রামনদীর ওপাশে গ্রামটাওই গ্রামের কয়েকজনের কাছ থেকে আমরা জানলাম যে, মুসলিম লীগের লোকজন বিহারী এবং বাঙালি মুসলমানদের এ ব্যাপারে ইন্ধন দিচ্ছেওদের প্ররোচনায় আমাদের উপর আক্রমণ হতে পারেতারা নাকি আমাদের বাড়িঘরে লুটপাট এবং আগুন দিতে পারেএই খবর পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের আশপাশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হলোতখন নদীর ওপারের কিছু হিন্দু আমাদের এই পারে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো

 

প্র: নদীর ওপার বলতে কোন্‌ এলাকা ?

 

উ: সাততলা, বেতাগা, কুমোরখালি, দিয়াপাড়া, রামপাল, হালিয়া, সতীরাগ--এই সমস্ত এলাকার হিন্দুরা আমাদের এখানে এসে আশ্রয় নিলোতখনও পর্যন্ত আমাদের এলাকাটা নিরাপদ ছিলোকিন্তু সেই নিরাপদ অবস্হাটা পরে আর থাকলো নাএকদিন মুসলমানরা নদীর ওপার আমবাড়িয়া গ্রামে আগুন দিলোওই গ্রামটা আমাদের একদম কাছাকাছিনদীর এপার ওপারএই খবর পেয়ে আমরা কেউ কেউ তখন আমাদের মেয়েছেলেদের পশ্চিম দিকে সরায় দিলামআমরা আরো খবর পেলাম যে, লুটেরাদের সঙ্গে বিহারীরাও যোগ দিয়েছেতারা একের পর এক হিন্দু গ্রামগুলোতে আক্রমণ করছেএটা শুনে আমরা তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করলামকিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো নাতারা আমাদের গ্রামেও একদিন আক্রমণ করলোতখন আমরা আমাদের বাড়িঘর ছেড়ে পশ্চিম পাড়ায় এক বাড়িতে আশ্রয় নিলামআমাদের বাড়িতে কি আছে কি না আছে তা দেখার সময় ছিলো নাগরু, বাছুর, হাঁস, মুরগি বলা যায় বাড়ির সব জিনিসপত্র ফেলে আমরা পুরুষেরা যে যেভাবে পারি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাইবাড়ির কোনো কিছুই আমরা নিতে পারলাম নাএকটা পোটলাও নিতে পারলাম না, শুধু পরনের কাপড়টা ছাড়াঐ অবস্হায় দৌড়ায়ে আমরা পশ্চিম পাড়ায় গেলামঐ পাড়াটা আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকেআমাদের মেয়েরা আগে থেকেই ওখানে ছিলোওখানে রাতে আমরা থাকলামএই পাড়ায় সেদিন হামলাকারীরা এলো নারাতটা আমরা নিরাপদেই কাটালামসকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের পাড়ার অনেকেই তাদের বাড়িতে গিয়ে কিছু চিড়ে মুড়ি নিয়া আসতেছেকিন্তু আমি আর গেলাম নাপশ্চিম পাড়ার আশে পাশে অনেক ছৈ দেয়া নৌকা ছিলোআমি একটা নৌকায় বসে আছিএমন সময় শুনলাম যে খুলনা বা বাগেরহাট থেকে আসা বিহারীরা পাশের ফুলতলা গ্রামের বিহারীদের সাথে নিয়ে আমাদের পাড়ায় আবার এসে গুলি করছেএ দিন বোধহয় মিলিটারিরাও গানবোট নিয়ে আমাদের এলাকায় আসছিলোওদের অবশ্য আমি দেখি নাইকিছুক্ষণ পর দেখি লুটেরাদের দুজন পশ্চিম পাড়ার দিকে আসছেতারা দুজন খাকি জামা গায়ঐ দুই জন বন্দুক নিয়ে এদিকে দৌড়ে আসছিলোআমি তখন নৌকায় দাঁড়ায়েআমি একদম ওদের সামনে পড়ে গেলামওরা দূর থেকেই আমার দিকে বন্দুক তাক করেছেআমাকে গুলি করে করেআমার পিছনে একটা মেয়েতার নাম তৃষ্ণামেয়েটা ওদের দেখে দৌড় দিছেতখন ওরা দুজন আমার দিক থেকে বন্দুক ফিরোয়ে ঐ মেয়েটার পিছনে দৌড় দিলোমেয়েটা তখন শুধু সায়া পরা, ব্লাউজটা গায়, আর শাড়িটা গলায় পেচানোওই অবস্হায় মেয়েটা দৌড়ে লাফ দিয়ে খালে পড়লোআমরাও যে যার মতো নৌকো থেকে লাফ দিয়ে খালে পড়লামখালের ভিতর দিয়ে আমরা মাথা নিচু করে দৌড়ে যাচ্ছিআর ওই দুজন মেয়েটার পিছন পিছন

 

প্র: ঐ মেয়েটার কি হলো ?

 

উ: দেখলাম মেয়েটা খাল থেকে উঠে পাশে এক বাড়িতে ঢুকলোতখন আমাদের প্রত্যেকের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারটা বড় ছিলোএরপর ঐ মেয়ে সম্পর্কে আর কিছু জানতে পারিনিপরে জেনেছি, ওরা মেয়েটিকে আর ধরতে পারেনিসেই মেয়েটা অবশ্য এখনও বেঁচে আছেযাহোক, আমি তখন খালের ভিতর একটা হোগলার বাগানে ঢুকে বসে থাকলামওখানে বসে থাকার সময়ই খালের ওপাশে একটা বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখলামআমার বাড়ির মেয়েছেলেরা সব কে কোথায় গেছে তার ঠিক নাইআমার কোলে আমাদের ছোট মেয়েটাতারপর ওখান থেকে আমি পশ্চিম দিকে রওনা দিলামপরে সাঁতরায়ে একটা বিল পাড়ি দিয়ে বাদামতলা বাজারের দিকে গেলামবাজারের কাছে গিয়ে দেখি সেখানে অনেক লোকজনের ভীড়তারাও সব এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছেবাদামতলা বাজারে গেলে কয়েকজন আমাকে বললো শিগগির দৌড় দেনমিলিটারি এই দিকে এসে গেছেকিছুক্ষণ পর আমি দূরে দ্রুম দ্রুম গুলির শব্দ শুনলামওখানে আমার পরিচিত অনেকে ছিলোতাদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও ছিলেনউনি আমাদের এলাকায় একটা সরকারি অফিসে চাকরি করতেনতার নাম রবীন্দ্রনাথবাড়ি সাতক্ষীরায়উনি তখন সদ্য বিয়ে করেছেনউনাকে আমি বললাম যে, রবি বাবু শিগগির দৌড়োনতাকে দৌড়ানোর কথা বলে আমিও আমার মেয়েটাকে কোলে নিয়ে দৌড় দিলামদৌড়ে সামনে গিয়ে একটা খালে আবার ঝাঁপ দিলামঝাঁপ দিয়ে কোনোভাবে মেয়েটাকে ঘাড়ে নিয়ে ওপার গেলামবাদামতলাতে তখন সমানে দ্রুম দ্রুম গুলি হচ্ছেএর মধ্যে আমি আমার বাড়ির মেয়েছেলেগুলোকে ওখানে দেখলামগুলি টুলি শেষ হলে আমি ওখান থেকে আবার বাদামতলার দিকে গেলামসেখানে যেয়ে দেখি মিলিটারি এবং বিহারীরা অনেক হিন্দুকে মেরে ফেলেছেতার মধ্যে রবীন বাবুও আছেওরা যুবক ধরনের লোকগুলোকেই বেশি গুলি করেছিলো

 

প্র: রবীন বাবুর স্ত্রীর কি হলো ?

 

উ: সে বেঁচে ছিলোওখানে কান্নাকাটি করছেআমার পরিচিতদের মধ্যে ফুলতলার এক ডাক্তার বাবুকেও মিলিটারি বা বিহারীরা ওখানে হত্যা করেছেএকটু পর খবর পেয়ে রবীন বাবুর বাবা এলেনতিনি রবীন বাবুর লাশ দুজন মিলে কোলে করে ধরে একটা বাগানের ভিতরে নিয়ে গেলেনতারপর আমি ওখান থেকে আবার পশ্চিম দিকে রওনা হলামযাওয়ার পথে আমার বাড়ির মেয়েছেলেদের সঙ্গে নিলামএরপর গেলাম মাঠভাঙা গ্রামেএই গ্রামটা আমাদের বৈঠাঘাটা থানার মধ্যেইমাঠভাঙা গ্রামের পশ্চিম পাশে একটা চরসেখানে বিরাট বিরাট শোলা বনতার ভিতরে গিয়ে দেখি আমাদের অঞ্চলের হাজার হাজার লোক সেখানে আশ্রয় নিয়েছেআমি আর ওখানে দাঁড়ালাম নাহেঁটে সামনে এগোয়ে মাইলামারা খেওয়া ঘাট পার হয়ে আমার স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চা এবং অন্য মেয়েদের একটা বড় নৌকায় তুলে দিলামঐ নৌকা চুকনগর বাজারে যাবেওদের নৌকায় তুলে দিয়ে আমি হেঁটে চুকনগর রওনা হলামবাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্হা আমাদের আর ছিলো নাখালি হাতেই আমরা সব ভারত রওয়ানা হয়েছি

 

   মাইলামারা থেকে হেঁটে ডুমুরিয়া বাজার হয়ে পরদিন সকালে আমি চুকনগর বাজারে পৌঁছলামচুকনগর গিয়ে জানতে পারলাম আমার স্ত্রী এবং অন্যরা রাতেই চুকনগরে পৌঁছে গেছেভোরেই আবার ওখান থেকে হেঁটে ঐ দলের সঙ্গেই ইন্ডিয়ার দিকে রওনা দিয়েছেআমি চুকনগর বাজারে পৌঁছার পর পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আমার দেখা হলোআমাদের গ্রামের একজন আমাকে বললো যে, আপনার স্ত্রী তো ভোরেই চলে গেছেউনি আমাকে আরো বললো যে, আপনার স্ত্রী আমাকে বলে গেছে, আপনার সঙ্গে দেখা হলে যেন বলি যে, আমরা রওনা হয়ে গেছি