নাম : হারুন অর রশিদ চৌধুরী

পিতার নাম : সাবের আলী চৌধুরী

গ্রাম : নেয়ামতাবাদ

ডাক : নেয়ামতাবাদ

ইউনিয়ন : বিনাউটি

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ২০-২২

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : বি.কম. বি.এড

১৯৭১ সালে পেশা : শিক্ষকতা

বর্তমান পেশা : শিক্ষকতা

 

 

শিক্ষক হারুন অর রশিদ চৌধুরী অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেনতিনলাখ পীর সেতু অপারেশনসহ অসংখ্য অপারেশনে তিনি অংশ নিয়েছেনমুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ চৌধুরী তাঁর সাক্ষাৎকারে বর্ণনা করেছেন যুদ্ধকালীন যন্ত্রণা আর যুদ্ধ জয়ের আনন্দ

 

 

প্র: ২৫ শে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকবাহিনীর আক্রমণের পর আপনি এলাকায় কি ভূমিকা নিয়েছিনে?

 

উ: আমি এলাকার মানুষকে সংগঠিত করেছিতাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছি এবং তাদেরকে বুঝিয়েছি

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?

 

উ: আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণ হচ্ছে,আমরা সুদীর্ঘ সময় সংগ্রাম করার পরও যখন আমাদের দাবিকে মেনে নেয় নাই বরং আমাদের উপর তারা অমানুষিক অত্যাচার অবিচার চালিয়েছে এবং বিশেষ করে মা-বোনদের উপর অত্যাচার অবিচার চালিয়েছে,তখন আমরা আমাদের অসিত্ব রক্ষা করার প্রশ্নে এবং আমাদের নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য আমরা সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম

 

প্র: এই এলাকাতে মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে সংগঠিত হল?

 

উ: এই এলাকাতে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আহ্বানেএখানে ট্রেনিং সেন্টার ছিলআমাদের আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে নাম বলতে গেরে প্রথমেই বলতে হবে অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক এবং অ্যাডভোকেট এমদাদুল বারীর নামউনারা বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ট্রেনিং করাইতআমরা ট্রেনিংতো ভারতে করছি এবং ভারতের আর্মি অফিসার ছিলেন উনারা আমাদেরকে ট্রেনিং করাইছেন

 

প্র: কোথায় কোথায় অপারেশনে অংশ নিয়েছেন তা বলুন?

 

উ: আমার জীবনের প্রথম অপারেশনে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন সাব আমাকে পাঠাইলেন ইন্ডাকশান পার্ট হিসাবে আমাদের নিজ গ্রামেআমরা ভারত থাইকা আইসা নোয়ামুড়ার দিকে নাইমা পরে গোপীনাথপুর আসিআমরা ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাআমি কমান্ডার ছিলাম এবং আমার সঙ্গে ছিল আমার সহকর্মী মোতাহার হোসেন গ্রাম নেয়ামতাবাদমকিব মিয়া গ্রাম নেয়ামতাবাদ,ইউনুছ মিয়া গ্রাম নেয়ামতাবাদ এবং ইদ্রিছ মিয়া সেও ছিল নেয়ামতাবাদ গ্রামেরআমরা গোপীনাথপুর হইয়া নেয়ামতাবাদ প্রবেশ করিনেয়ামতাবাদ এসে আমরা গ্রামটাকে সার্ভে করিতখন সেখানে কোনো পাঞ্জাবি ছিল না এবং গ্রামটা মোটামুটি নিরাপদ ছিলআমরা আমাদের বাড়িঘরও মোটামুটি দেখি এবং সেখানে কোনো জাগাতে পাঞ্জাবিরা অবস্হান করছে কি না সে সম্পর্কে রিপোর্ট গ্রহণ করিতারপ েরআমরা আমাদের গ্রাম থেকে পশ্চিম দিকে চইলা যাই আমদের ঠিক বিলের দিকেতখন সেখানে নৌকা ঘাট ছিলআমাদের গ্রামেরই একজন লোক তাকে আমরা নৌকার মাঠি হিসাবে নেইতার নাম হচ্ছে আবদুল খালেকতার সহযোগিতায় সি. এন্ড. বি সড়কে এবং তিনলাখপীরের কাছাকাছি যাইসেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে,পাঞ্জাবিদের অবস্হান কোথায় কোথায় আছে এবং তাদের মুভমেন্টটা কোন কোন জায়গায় ইত্যাদি জানাআমাদের সঙ্গে নৌকা ছিলনৌকাটা আমরা নিজেরা ধরাধরি করে সি এন্ড বি ক্রস করিনৌকাটা পার করার সঙ্গে সঙ্গেই পাঞ্জাবির গাড়ি এসে পড়েকিন্তু আমাদেরকে সঠিকভাবে তারা লক্ষ্য করে নাইযদি লক্ষ্যে করত,তাহলে নিশ্চয়ই আমরা সেদিন মারা যাইতামআল্লাহর রহমতে সেদিন আমরা বেঁচে যাই এবং সেখান থাইকা খুব তাড়াতাড়ি আবার আমাদের নিজ গ্রামে ফিরে আসিঅর্থাৎ আবার ব্যাক করে সি এন্ড বি ক্রস করে নৌকা সহকারে আবার আমাদের নিজের গ্রামে আমরা পিরে আসিসেই দিন ঠিক সন্ধ্যার দিকে পাঞ্জাবিরা মনে হয় খবর পেল যে নেয়ামতাবাদ,গোপীনাথপুর এই সমস্ত গ্রাম মুক্তিযোদ্ধায় ভরপুরপাঞ্জাবিরা তখন কসবা থেকে এসে আমাদের গ্রামকে বেড় দিয়ে ফেললআমাদের গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ি,জহুরুল হক ভূঁইয়ার বাড়ি,তারপরে অহিদ ভূঁইয়ার বাড়ি,তারপরে জব্বার ভুঁইয়ার বাড়ি এমনিভাবে আপনের আরও অনেকের বাড়িতে তারা আগুন ধরাই দিলআনুমানিক ১০/১২ টা বাড়িঐ দিন আমাদের গ্রামে তেমন কোনো হত্যাযজ্ঞ চালায় নাইতবে ঐ দিন আমাদের গ্রামের একজন বৃদ্ধলোককে তারা হত্যা করেছে এবং গোপীনাথপুর গ্রামের একজন অবসরপাপ্ত সৈনিককে হত্যা করেছেআমাদের গ্রামেরও একজন ব্যক্তিকে সেই দিন তারা হত্যা করেছে যার নাম আবদুর রশিদতারা নারী নির্যাতন সেইদিন করে নাইনা করলেও তারা নারীদের উপর আক্রমণ করেছে বলে আমরা শুনেছি

 

আমাদের দ্বিতীয় অপারেশনটা ছিল তোলাই শিমুল-এর দিকে,চরনাল বাজারের দিকে,সাবেক কসবাচরনাল বাজারের দিকেও আমরা গিয়েছি এবং সেখানেও আমরা বিশেষ করে পাক সেনাদের অবস্হান কোথায় কি আছে এইগুলি জানার জন্যই আমাদের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আউনউদ্দিন সাব আমাদেরকে পাঠাইছিলেন

 

তারপরে আমাদের আবার শুরু হয়ে গেল বিশেষ করে ব্রিজ ভাঙ্গার স্কিমআমাদেরকে প্রথমেই দিয়েছে তিনলাখপীর ব্রিজএই তিনলাখপীর ব্রিজকে ধ্বংস করতে আমাদেরকে তিন বার এটেম নিতে হয়েছেপ্রথম এটেমে আমরা পারি নাইপ্রথম এটেমটা মনে হয় আমরা আগস্ট মাসের দিকে নিয়েছিসফল হয়েছি আমরা সেপ্টেম্বর মাসের দিকেআক্রমণটা রচনা করেছি আমরা ৫৬ জন সহকারে এবং আমাদের সঙ্গে একজন সুবেদার মেজর ছিলেন নাম সিরাজুর ইসলামউনি বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকউনার বাড়ি হইল কসবা থানার মজলিশপুরউনার নেতৃত্বে আমাদেরকে পাঠাইছিলেনতিনলাখপীর ব্রিজে অবস্হানরত পাকিস্তানিদের আক্রমণ করার জন্য এসেছিলেনতিনলাখপীর ব্রিজের পূর্ব পাশে যে গ্রামটা সেটা বিনাউটিসেই বিনাউটি গ্রামে আমরা রাত্রের বেলা অবস্হান করিসেখানে ৫টা নৌকা ছিলএকটা নৌকাতে এক্সপ্লোসিভ পার্টি আর চারটা নৌকাতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের আর্মস এন্ড এমুনিশন নিয়া ছিলামসেখানে আমাদের কমান্ডার সাব একটু ইতস্তত হয়ে পড়লেন যে,ব্রিজে আমরা কে প্রথম  রেকি করবোবিলম্ব হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত কিছুক্ষণের মধ্যেই পাঞ্জাবিরা এসে পড়লোযার ফলে আমরা তিনলাখপীর ব্রিজ আক্রমণ করার মতন সুযোগ পাই নাইশেষ পর্যন্ত আমরা ঐ দিন বিনাউটি গ্রাম থেকে আমাদের নিজ ক্যাম্প মনতলীতে ফিরতে বাধ্য হয়েছিদ্বিতীয় এটেমেও ঠিক এমনিভাবে আমরা ব্যর্থ হয়েছিতৃতীয় এটেমে আমরা সফল হয়েছিসেই দিন নায়েব সুবেদার ছিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা এসেছিএইটা আমাদের সেপ্টেম্বর মাসে লাস্ট এটেম ছিলছিদ্দিকুর রহমান সাহেব এবং আমাদের ছাত্রনেতা পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ওসমানও আমাদের সাথে ছিলেনতৃতীয় দিন এই দুই জনের নেতৃত্বে নায়েব সুবেদার ছিদ্দিকুর রহমান এবং এই ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর ওসমান এদের নেতৃত্বে আমরা সেই দিন তিনলাখপীর ব্রিজ ধ্বংস করিধ্বংসের পূর্বে উনারা ২ জন ব্রিজ রেকি করেছেনকারন পাঞ্জাবি বা রাজাকার আলবদররা কোথায় কি অবস্হানে আছে তা দেখার জন্যতারা রেকি করে আবার ফিরে আসছেনআমরা তখন বিনাউটি গ্রামেই ছিলামএই ব্রিজের কাছাকাছি গ্রামসেখানে উনারা নিজেরা এসে আমাদেরকে নিয়ে মার্চ করায়ব্রিজ আক্রমণ করতে গিয়ে এক্সপ্লোসিভ পার্টি তাদের কাজ করেছেআর আমরা যারা নাকি প্রটেকশন পার্টি ছিলাম আমরা ২টা দলে বিভক্ত ছিলামএকটা দল আমরা ব্রিজের দক্ষিণ দিকে প্রটেকশন পার্টি হিসাবে ছিলাম আর উত্তর দিকে আর এক প্রটেকশন পার্টি ছিল এবং মাঝখানদা এক্সপ্লোসিভ পার্টিতাদের কাজ তারা করেচেআমরা ১৫ মিনিটের ভিতরে তিনলাখপীর ব্রিজকে ডেসট্রয় করেছি১০/১২ জন রাজাকার সেদিন আত্মসমর্পণ করেছেআমরা তাদেরকে নৌকা করে নিয়া আসছি আমাদের ক্যাম্পেতারপরে ক্যাম্পে আইন্যা তাদের থেকে বিভিন্ন খোঁজ খবর নিয়েছিতাদেরকে আমরা মারি নাইক্যাম্পে নিয়া যাওয়ার পরে তারা আমাদের অধীনস্হ হয়েছেআমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং তারা শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাতে পরিণত হয়েছে

 

প্র: শরণার্থীরা কিভাবে সীমান্ত অতিক্রম করতো?

 

উ: এটা মোটামুটি জলপথ ছিলবহু শরণার্থী এই জলপথ দিয়া ভারতের দিকে যাইতপাঞ্জাবিদের অত্যাচারে মানুষের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়লোতাই তারা রাত্রের বেলা চুপে চুপে পালিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেসেখানে পাঞ্জাবিরা যথেষ্ট নির্যাতন করেছে

 

প্র: এই এলাকায় রাজাকারদের ভূমিকা কি ছিল?

 

উ: রাজাকাররা পাঞ্জাবিদের কাছে খোঁজ খবর দিতসাহায্য সহযোগিতা পাঞ্জাবিদেরকে করেছে,বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে তারা রাস্তাঘাট চিনাইছেআবার কোন সময় মুক্তিযোদ্ধারা কখন আসবে,কোথা দিয়া আসবে সে সম্পর্কে ওয়াকেবহাল করাইছে পাকসেনাদেরকেএই এলাকার জামাতে ইসলামের নেতা ডাক্তার করিম সাব ছিলেনআর মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন জহিরুল হক বি.এ.এককালে তিনি ভাসানী ন্যাপের নেতা থাকলেও ন্যাপ নেতা হিসাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষে ছিল নাসংগ্রামে পাকসেনাদের পক্ষেই ছিল

 

প্র: যুদ্ধের শেষ দিনগুলির কথা বলুন?

 

উ: আমাদের যাত্রা ছিল সেই যে কুসুমবাড়ি দিয়ে আখাউড়া হয়ে তারপর আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবতার পর আমরা ভৈরব যাবএমনিভাবে আমাদের ভৈরক পর্যন্তই জয় করার ডিরেকশন ছিলআমরা আখাউড়া জয় করেছিআখাউড়া জয় করতে পহেলা ডিসেম্বর থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর পর্যন্ত লাগছেতারপরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অগ্রসর হয়েছিল ৮ই ডিসেম্বরব্রাহ্মণবাড়িয়া শত্রু মুক্ত হওয়ার পরে আমরা বৈরবের দিকে রওয়ানা হই ১২/১৩ ডিসেম্বর হবেএমনিভাবে আমরা ভৈরব গিয়ে ভৈরবকে শুত্রু মুক্ত করিসেখান থাইক্যা আমরা ফিরে আসিতারপরে ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের এলাকার এলাকাও মুক্ত হয়েছে এবং সারা বাংলাদেশ শত্রু মুক্ত হয়েছে

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২০ ডিসেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর  কসবা- ৯২