নাম : হারুন-অর রশিদ শেখ

পিতা : তসিমউদ্দীন শেখ

গ্রাম : মহেশ্বরপাশা,

ডাক : দৌলতপুর

থানা : দৌলতপুর,

জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : নবম শ্রেণী

১৯৭১ সালে বয়স : ২৭

১৯৭১ সালে পেশা : রেস্তোরাঁ শ্রমিক

বর্তমান পেশা : ক্ষুদ্র ব্যবসা

 

 

প্র: ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়েছিলোতখন বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান ছিলোসেই নির্বাচনের কথা এবং তার পরবর্তী ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা কি আপনার মনে পড়ে ?

 

উ: কিছু তো আমার মনে পড়েসেই নির্বাচনের সময় ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলোনির্বাচনে শেখ সাহেবের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইলোআমরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করছি,আওয়ামী লীগকেই ভালোবাসছিশেখ সাহেবের এক কথায় তখন আমরা জীবন দিতেও রাজি ছিলামসেই সময় আমাদের শেখ সাহেবরে সরকার গঠন করতে দেওয়া হইলো নাশেখ সাহেবরে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা না দেওয়ায় দেশে আন্দোলন শুরু হইছিলোএখানেও আন্দোলন হইছে দেখছিকিন্তু আমি তাতে যোগ দিতে পারি নাইতখন আমার মালিকের কাজ করতে হইতোসেই সময় এখানে মানিকতলায় গণি মিঞা নামে একটা লোক ছিলোতার হোটেলে (রেস্তোরাঁ) আমি কাজ করতামআমরা তো তখন সব দেখছিএকদিন আমি ভোরবেলা দোকানে আইসা চুলা ধরাইয়া পরাটা ভাজার খোলা কেবল চুলায় দিছিচুলায় দিয়া আমার মনে হয় দশ থাকি পনেরোটা পরাটা নামাইছি,এমন সময় এখানে মিলিটারিদের গাড়ি আসলোগাড়ি আইসা ঐ কোণাটায় দ্রুম দ্রুম ফায়ার করলোবন্দুকের গুলি আমার সামনে দিয়া ঘরের কাঠের বেড়া ছেদা হয়া চইলা গেলোতখন আমি লাফ দিয়া চকির নিচে সান্ধাইছিএর ভিতর আমার মালিক আসছেমালিক আসছে পর আমরা দুজন ফটাফট দোকান বন্ধ কইরা দিছিআমরা যেখানে লুকাইছি সেহান থাইকা কিছুক্ষণ পর দেখি মিলিটারিরা সামনে রেল গেটের কাছে গেলোওখানে যাইয়া আবার ফটাফট গুলি করিছেতারপর খুলনার দিকে মিলিটারিরা গাড়ি নিয়া রওনা হইছেশোনা গেলো আমাদের হাতেম শেখের গায়ে গুলি লাগিছেমিলিটারিদের গুলিতে সে মারা গেছেমিলিটারি গেছে পর আমরা উনারে দেখতে গেলামহাতেম শেখ এখানে আওয়ামী লীগের লোক ছিলোতখন সবার মধ্যে হায়-হুতাশ শুরু হলো কেডা কিভাবে বাঁচবে

 

প্র: পাকিস্তান সেনা বাহিনী আপনাদের এখানে এসে কি করলো ?

 

উ: ওরা তো প্রচুর ক্ষতি করিছেপরে ওরা গাড়ি নিয়া আসি রোডের পার্শ্বে বাড়ি ঘরে,দোকানে ঐ এক ধরনের পাউডার আছে,সেই পাউডার মাইরা গুলি দিছেতৎক্ষণাৎ ঘরবাড়ি,দোকানপাট জ্বইলা উঠছেমানুষ গুলি কইরে মারছেওরা লোকজন ধইরে যেভাবে নির্যাতন করছে সে কথা বলার মতো নাএকজন কারও ঠ্যাং ধরছে,একজন হাত ধরছে,ধরে ইচ্ছামতো মাইরপিট কইরা গুলি কইরা মাইরা দিছেএইভাবে ওরা অত্যাচার করিছে

 

প্র: সেই সময় পাক বাহিনীর হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: মিলিটারির হাতে না,রাজাকারদের হাতে হইছিমিলিটারি এখানে আইসা খুব অত্যাচার শুরু করলে আমার মালিক একদিন দোকান বন্ধ  কইরা দিলোকোন মাসে বন্ধ করছে সেটা আমার মনে নাইএখন যে বাড়িতে থাকি সেই বাড়িটাতেই আমি তখন ভাড়া থাকতামপরে ওই বাড়িটা আমি কিনছিএই বাড়িতে আমার পরিবারও থাকতোআমার স্ত্রী তখন এখানে ছিলো নাসে গেছিলো বাপের বাড়িমালিক দোকান বন্ধ করে দিলে আমি শ্বশুর বাড়ি যাইতে ছিলাম

   

আমার শ্বশুর বাড়ি ছিলো মাদারীপুরএখান থেকা আমি সকাল দশটায় রওয়ানা দিছিতখন লঞ্চ নাই,গাড়ি নাই,কিছুই নাইবারাকপুর থেকা খেয়া পার হইয়া ওপারে গেছিওপার থেকা হাঁইটা যখন গোপালগঞ্জে গেছি,তখন বেশ রাত হইছেওখানে একটা প্রাইমারি স্কুল আছেওই স্কুলে আমি আশ্রয় নিলামদেখি স্কুলে কয়েকটা বেঞ্চটেঞ্চ আছেএকটা বেঞ্চের উপর আমি শুইয়া রইলামঅনেক রাতে পাঁচজন লোক আইসা আমারে উঠাইয়া জিগাইছে,এই তোমার বাড়ি কোথায় ? আমি কিছু বলার আগেই তারা ওখান থেকে আমারে জোর কইরা নিয়া গেছে গোপালগঞ্জ টাউনের ভিতরেকিন্তু সেখানে তারা আমারে কোনো অত্যাচার করলো নাআমি সবকিছু ঠিক ঠাক বলার পর তারা আমারে একটা আশ্রয় দিছেরাতটা ওখানেই থাকলামপরদিন ভোরে গোপালগঞ্জ থেকে আবার হাঁটা দিছি মাদারীপুরের দিকেপথে এক জাগায় যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়া গেলোওই জাগায় আমি রাতটা রইলামওখানে একটা কালিঘর আছেকালিঘরের সামনে কয়েকটা বেঞ্চি ছিলোএকটা বেঞ্চির উপরে আমি শুইয়া রইছিও জাগায় আমার কোনো অসুবিধা হয়নিপরদিন ওখান থাইকা হাঁইটা আবার রওনা হইলামআমার হাতে একটা কেমি ঘড়ি ছিলোআর টাকা ছিলো ১৩শআমি ঘড়িটা একটা রুটির ভিতর বাইধা নিছিভাবছি কেউ দেখলে ঘড়িটা নিয়া যাবেটাকাটাও রুটির ভিতরে রাখছিরুটি,হাতঘড়ি আর টাকাটা একটা রুমালের মধ্যে বান্ধাসকাল আটটার দিকে মিঠাপুর আইছিওখানে কিছু লোক আমারে আটকাইলোওরা বোধহয় রাজাকারওরা আমারে দেইখা ডাক দিছেডাক দিয়া বলছে,এই,তুমি কোথায় যাচ্ছো ? আমি জায়গার নাম বলছিআমার হাতের মধ্যে রুমালের পোটলাটা দেইখা ওরা আমার হাত সেটা কাইড়া নিয়া খুলছেখুইলা দেখে ওর ভিতর টাকা,ঘড়ি আর রুটিরুটিটা ওরা ফেলায়ে দিলোতহন আমি বললাম যে,ভাই,আমি ক্ষুধার্ত লোকতোরা রুটিটা ফেলাই দিলিএই কথা বলাতে ওরা তখন আমারে বেত দিয়া পিটাইলোওদের একজনের পায়ে বুটবুট পায়ে সে আমারে মারলো লাথিদুই-তিনডা লাথি মারলোমাইরা বললো,এই শুয়োরের বাচ্চা,দৌড় দেতখন ওখান থেইকা আমি দৌড় দিয়া পলাইলামএইভাবে আক্রান্ত হইছিলাম আর কি

 

প্র: আপনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন ?

 

উ: নাআমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি নাই

 

প্র: কেন করেননি ?

 

উ: করিনি ...., ঐ সময় আমি বিবাহিত ছিলামআমার পরিবার ছিলোসে জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি

 

প্র: যুদ্ধের সময় আপনি কোথায় ছিলেন ?

 

উ: এই জায়গায়ই বেশি ছিলাম

 

প্র: পাক বাহিনী এখানে আর কি করলো ?

 

উ: ওরা এখানে ক্যাম্প করছেএহেনে হামিদা মঞ্জিল ছিলোঐ জাগায় ওরা একটা ক্যাম্প করলোওখানে রাজাকারও ছিলোরাজাকারের কয়েকটা গ্রুপ ছিলোরাজাকাররা বিভিন্ন এলাকার যুবতী মেয়ে টেয়ে ধরে এনে ক্যাম্পগুলোতে মিলিটারিদের কাছে দিতোআর সন্ধ্যার পর রাজাকাররা বেরোয়ে লোকজনকে মারধর করে তাদের টাকা পয়সা কাইড়া নিতোদোকান থেকে মালামাল নিয়া যাইতোরাজাকাররাও অস্বাভাবিক অত্যাচার করছেমিলিটারিরা এখানে দোকান পাটে আগুন-টাগুন ধরাই দিছেমানুষের টাকা পয়সা কাইড়া নিছেসোনা অলংকার নিছে

 

প্র: পাকিস্তানি বাহিনী এই অঞ্চলে কখন এসেছিলো ?

 

উ: সঠিক তারিখটা আমার মনে নাইযতদূর আমার মনে পড়ে ওরা আসছিলো ২৭ কি ২৮ মার্চ তারিখেআগের রাত্র থেকে ওরা আসা শুরু করছেখুব সম্ভব ওরা যশোরের দিক থেইকা আইছেওরা যখন যায় তখন তো এখানে কেউ ওদের বাধা দেয় নাইওদিকে ফুলবাড়ি গেটে দিছেফুলবাড়ি গেটে সমিলের কাঠ ছিলোঐ কাঠগুলা লোকজন রোডের উপর দিয়া দিছিলোএই পাশে একটা সড়ক ছিলোওখানে একটা ব্রিজ ছিলোলোকজন ঐ ব্রিজটা ভাইঙা দিছিলোমিলিটারিরা আইসা করলো কি,গাড়ি থেইকা নাইমা নিজেরা কাঠ সরাইয়ে দিছে ! যে কালভার্টটা লোকজন ভাইঙা দিছিলো ওর উপর ওরা কি যেন দিলো ! ওদের গাড়িতে এক ধরনের জিনিস ছিলোওটা কালভার্টের উপর দিয়া তারা গাড়ি পার করলো

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছিলো কি ?

 

উ: না,আমার পরিবারের কেউ শহীদ হয়নি

 

প্র: সেই সময় মানিকতলা,দৌলতপুর,খুলনা এবং খালিশপুর অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা ছিলো কি ?

 

উ: ছিলোমুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হইছে মিলিটারি আসার কয়েক মাস পর থেকে

 

প্র: মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে এই এলাকার জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: মুক্তিবাহিনীর উপর জনগণের খুব শ্রদ্ধা ছিলোজনগণ মুক্তিবাহিনীরে খুব সহযোগিতা করছেআমরাও গোপনে করছি

 

প্র: এই এলাকায় শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনীতে কারা ছিলো ?

 

উ: এই এলাকায় পিস্‌কমিটির চেয়ারম্যান ছিলো মাহতাব সাহেবউনি বর্তমানে মৃততারপর আরো কয়েকটা লোক ছিলোতাদের নাম আমার এখন মনে নাই

 

প্র: যুদ্ধকালের আর কোনো ঘটনার কথা আপনার এখন মনে পড়ে কি ?

 

উ: আমরা কয়েকটা লোক স্বাধীনের পর গেলাম খালিশপুরকাশিপুর থেকে লিবার্টি হলের একটু এপাশে আমরা প্রথম গেলামওখানে একটা বাড়িএকতালা বিল্ডিংঐ বাড়ির ভিতর ঢুকে দেখি সেখানে দশ থেকে পনেরোটা লাশশুধু পুরুষদেরসবার গলা কাটাচাকু দিয়ে গলা কাইটে দিছেকারো পরনে প্যান্ট, কারো পরনে গামছাকারো পরনে লুঙ্গি আছেলাশগুলো এক জায়গায় দলা করাওখান থেকে বের হয়ে গেলাম চিত্রালীর সামনেওখানে একটা মাঠ আছেঐ মাঠের ভিতর যেয়ে যা দেখলাম সেটা সহ্য করার মতো নাকয়েকশলাশ মাঠের চারদিকে ছড়ানো ছিটানোএখানে এক পাগল ছিলোসে সব সময় ন্যাংটা থাকতোএকদিন এখানে মিলিটারি আসছে গাড়ি নিয়েতখন ওই ন্যাংটা পাগলা মিলিটারির গাড়ির সামনে যাইয়া দুই তিনটা বাড়ি দিছে গাড়িতেতখন মিলিটারিরা গাড়ি থেইকা নাইমা ওখানেই তারে গুলি করছে 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : ফজলে খোদা

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : মার্চ ২৯, ১৯৯৭

ক্যাসেট নম্বর : ২৫