নাম
:
কছিমুদ্দীন
পিতা
:
রহিমুদ্দীন
গ্রাম
:
উত্তর শিবপুর,
ইউনিয়ন
:
এলুয়ারি,
ডাক
:
খজাপুর
থানা
:
ফুলবাড়ি,
জেলা
:
দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : তৃতীয়
শ্রেণী পর্যন্ত
১৯৭১
সালে বয়স : ১৮
১৯৭১
সালে পেশা :
কৃষিকাজ
বর্তমান
পেশা : কৃষিকাজ
প্র:
১৯৭০ সালের
নির্বাচন এবং
তার পরবর্তী
ঘটনার কথা কি
আপনার মনে আছে
?
উ: হ,মনে আছে। ১৯৭০ সালে
নির্বাচন
হইলো। আমরা
চাষা মানুষ। আমরা
বলাবলি
করিলাম কাকে
ভোট দিতে হবে। সবাই কয়
নৌকা মার্কায়
ভোট দিতে হবে। লোকজন
সবাই বলে আমরা
নৌকাতে ভোট
দিবো। তখন
আমরা সবাই
মিলি নৌকাতে
ভোট দিলাম। ভোটে আওয়ামী
লীগ জিতিলো। কিন্তু খানেরা
ক্ষমতা দিলো
না। তখন শেখ
সাহেব ভাষণ
দিলো। শেখ
সাহেব ভাষণে
বলিলো, আমার দেশকে
আমরা মুক্ত
করবো। আমি
বাঙালি
বাঁচাবো। এই ধরনের আমি
শুনলাম আর কি। তখন তো
আমার বয়স কম।
প্র:
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চ
পাকিস্তানি
সামরিক বাহিনী
যে আক্রমণ করেছিলো,
সে
সম্পর্কে
আপনি
কিছু
শুনেছিলেন কি ?
উ: হ,শুনছিলাম। তখন
শুনলাম খান
সেনারা নাকি
ঢাকায়
মারাত্মক ধরনের
আক্রমণ করছে। আক্রমণ
কইরা ঢাকার
মানুষজন
বেবাক মাইরা
ফালাইছে। তারপর তো
আমাদের
এখানেও
খানেরা
আক্রমণ শুরু করিলো। আমার
বাড়ির পাশে
খানেদের ক্যাম্প
ছিলো। তাজপুর
গ্রামেও
খানদের একটা ক্যাম্প
ছিলো। ঐ
গ্রামে একদিন
গোলাগুলি
হইলো। এই
সময় খানেরা
একদিন গুলি
করে আমার
বাচ্চাটাকে
মারি দিলো। ২ মাসের
বাচ্চা, মায়ের কোলে
আছিলো। মায়ে
বাচ্চা থুইয়া
পলাইছে। খানেরা
বোধহয় মেয়ে
মানুষরে ধরার
জন্যই আমাদের
গ্রামে
আইছিলো। ওরা বাচ্চার
মায়েরে ধরতে
না পারি
বাচ্চাটাকে
গুলি করে মারি
দিছে। তারপর
ঐ খানেরা যখন
চইলা গেলো তখন
আমরা ইন্ডিয়াত
গেছি। বাচ্চাটা
ইন্ডিয়াত
নিয়ে যাইয়া
মাটি দিছি। ইন্ডিয়াত
যাওয়ার সময়
একটা রাজাকার
আমাক ধরছিলো। কিন্তু আমাক
ছাড়ি দিছে। লোকটা আমাকে
ছাড়ি দিলো। তারপর ঐ মরা
বাচ্চাটাক
কোলে করে
ইন্ডিয়াত
নিয়া মাটি
দিলাম। মাটি
দেওয়ার পরে
আমি ঐখান থেকে
চলি গেলাম বালুরঘাট। বালুরঘাটে
ঘুরে
বেড়াচ্ছি। ওখানে
শুনলাম
কামারপাড়ায়
নাকি
মুক্তিফৌজে লোক
ভর্তি করতেছে। তখন আমি ঐ অবস্হায়, আমার
গায়ে ছিলো
একটা শার্ট, শার্টটায়
ছিলো রক্ত,ঐ অবস্হায়
গেলাম। যাওয়ার
পরে ঐখানে
আমাক ওরা
আটকাই দিলো। আটকাইয়া
দিয়া বলিলো,তুমি
কোথা থাকি
আসছো ? আমি
বললাম যে,আমি
বাংলাদেশ
থাকি আসছি। তারা বলে
তোমার শার্টে
রক্ত কেন,কতগুলা
লোক মারছো ? আমি
বললাম যে,ভাই,আমি
কোনো লোক মারি
নাই। তো ওরা
বলে কেন তোমার
শার্টে রক্ত ? আমি বলি,ভাই,আমার বাচ্চাকে
মাইরা দিছে
খানেরা। মরা
বাচ্চাটা
কোলে করে
ইন্ডিয়া নিয়া
আসি মাটি দিছি। ওর শরীর
থেকে শার্টে
রক্ত লাগছে। কিন্তু তারা
আমার এ কথা
বিশ্বাস
করিলো না। তারা আমার
চোখ বান্দিলো। চোখ
বান্দি ওদিক
নিয়া গেলো। ঐ দিক নিয়া
যাওয়ার পরে
সেখানে এক
রাত্র থাকিলাম। সেখানে থাকার
পরে আল্লার কি
ইচ্ছা,এক অফিসার
আসি চোখ
বান্দা
দেইখ্যা আমাক
আবার বাইরে
নিয়া আইলো। আমাক সে
বলিলো,তোমার এই অবস্হা
কেন ? তোমার
বাড়ি কোথায় ? আমি কই
আমার বাড়ি
বাংলাদেশ। তারপর আমার
চোখ খুলি দিয়া
সে আমার সব
কথা শুনিলো। সব শুনিয়া
ঐখানেই আমাক
একটা লুঙ্গি,একটা শার্ট
আর একটা
গেঞ্জি দিলো ঐ
অফিসার। আর ঐ রক্ত
মাখা শার্টটা
তারা ফালাই
দিলো। ৩
দিন পর আমি
ওখান থাকি
আবার ক্যাম্পে
আসি। সেখানে
আসার পরে
মুক্তিফৌজে
আমার ট্রেনিং
শুরু হইলো। ট্রেনিং শেষ
হইলে ঐখান
থাকি আমরা আউট
হইয়া কাটলা ক্যাম্পে
আইলাম। এইখান
থেকে আবার
গেলাম শিলিগুড়ি
পানিঘাটায়। হায়ার
ট্রেনিং
ওখানে ২৮ দিন
করিলাম। এর পরে ওখান
থেকে আসিলাম
বলাহার ক্যাম্পে। বলাহার ক্যাম্প
থাকি আসি
ফাস্টে আমরা
অপারেশন
চালাইছিলাম দেবীপুর। আমরা মোট
১০ জন। আমাদের
সঙ্গে চিরির
বন্দরের ছিলো
দুইজন। আমরা
এখানে যুদ্ধ
করলাম কয়দিন। তারপর
এখান থাকি
আমাদের আবার
ক্লোজ করি
নিয়া গেলো। বলাহার
থাইকা আমাদের
১২ জনের একটা
পার্টি কইরা
দিলো। ১২
জনে এক
প্লাটুন। আমাদের
পাঠাইলো আরেক
জায়গাত। সেইখানে
তুমুল যুদ্ধ
হইলো। জায়গার
নাম মনে নাই। কঠিন
যুদ্ধ,সকাল
সন্ধ্যা আমরা
যুদ্ধ করি। তাতে আমাদের
দলের এক ছেলে
নিহত হয়। আমার সঙ্গে
ছিলো
ফুলবাড়ির
মালেক,গোপাল,শচীন, তপন,জব্বার,আবদুল
হামিদ,আবদুল বারী
এবং লুৎফর। বাকিগুলার
নাম মনে নাই। যুদ্ধ
করার সময় তপন
মারা গেলো। ওর লাশটা
আমরা
কোনোভাবেই
আনতে পারি নাই।
প্র:
সে সময় আপনি
পাকিস্তানি
সৈন্যদের
হাতে আক্রান্ত
হয়েছিলেন
কি ?
উ: আক্রান্ত
মানে
? হিলিতে
যুদ্ধ করতে
যাইয়া আমার
একটা চোখ নষ্ট
হয়া গেছে। হিলিতে মাইন
বার্স্ট করি
খানদের গাড়ি
মারতে যাইয়া
ওখানে পশ্চিম
পাশে একটা
বাঁশের ঝাড় আছে,ঐ
বাঁশের ঝাড়ের
কঞ্চি লাগি
চোখটা আমার
একদম নষ্ট হয়া
গেছে। চোখটা
দিয়া এখন একদম
দেখতে পাই না। আমাকে তখন
চিকিৎসা করলো
রায়গঞ্জে। ৭ দিন
চিকিৎসা
চালালো। চিকিৎসার পর
ক্যাম্পোত গেছি।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করলো ?
উ: পাকিস্তানিরা
প্রথম
রাত্রবেলা
আক্রমণ করছে। তারিখটা
অতো মনে নাই। ওটা
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠি
মাসের দিকে
হবে। তারা
আসি ঐ তো
চারিপাশ দিয়া
গুলি ফুটাইছে।
তখন
আমরা তো নিরস। ওরা গুলি
করতেছে। কাউক
মারতেছে। কাউক ধরতেছে। কাউক
নয়নপুরে নিয়ে
যাইয়ে মারিলো। আমার
সামনে খানেরা
এইখানে একদিন
২২ জনক মারি দিছে। এগুলান
দেখি আমার
আতঙ্ক কাটি
গেছে। এটা
আপনার বড়াইয়ে।
প্র:
খান সেনারা আপনার
এলাকায় আর কি
কি করলো ?
উ: তারা
বাড়িঘর
জ্বালি দিলো। যারা
আওয়ামী লীগ
করে তাদের
বাড়িগুলান
আগে পুড়ি দিলো। মহিলাদের
উপর নির্যাতন
করিলো।
প্র:
সেই সময় আপনার
পরিবারের কেউ
শহীদ হয়েছে কি
?
উ: আমার
পরিবারে শহীদ
খালি আমার ঐ
বাচ্চাটা হইছে। বাচ্চাটার
নাম ছিলো বেগম। মেয়ে ছিলো।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন থেকে
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয় ?
উ:
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠি
মাসে তো যুদ্ধ
শুরু হইলো। তারপর
শ্রাবণ মাস
থাকি
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয়। আমরা
ঐখান থেকে
ট্রেনিং নিয়া
আসার পর যুদ্ধ
করিলাম। তার আগেও
ইপিআর,আনসাররা
এখানে যুদ্ধ
করিছিলো।
প্র:
তখন
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
সাধারণ জনগণের
মনোভাব কেমন
ছিলো ?
উ: আমার
এখানকার জনগণ
কতেকজন ভালো
করছে। কতেকজন
আবার
মুক্তিবাহিনীর
বিরোধিতা
করছে। খজাপুরের
আম্বিয়া আমার
ভাইকে ধরি
দিছিলো। ভারত যাওয়ার
আগে নদীর
পাশের জমিতে
আমি ধান আবাদ
করছিলাম। আমার ভাই
একদিন আমাকে
দেখবার আসে
কাটলা ক্যাম্পে। আমার
ভাইটা তখন ছোট। আমার
ভাইকে বলিলাম,ভাই
বাংলাদেশে
তুমি আমার
ধানটা দেখি
আইসো, ধান
নাকি ভালো
হইছে। আর
ধানটা যদি
পাকে তাহলি
কাটিকুটি
নিয়ে আসিস। আমাদের
পরিবার
অসহায়ভাবে
এখানে আছে। তখন আমার ভাই
ধান দেখার
জন্য দেশে আইছিলো। এই
খজাপুরের
এহান দিয়া
যাইতেছিলো। জলপাইতলি ক্যাম্পে
তখন খানেরা
ছিলো না। বেজাই মোড়ে
খান ছিলো। আমার ভাইয়ের
নাম দেলোয়ার। খজাপুরের
আম্বিয়া আমার
ভাইরে খানদের
কাছে ধরি দিলো। ঐখানে
বাবুদের একটা
বাড়ি আছে,সেই
বাবুর বাড়ির
যত টিন,কাঠ ছিলো-
সেগুলা আমার
ভাইয়ের হাতে
খুলাই নিছে। নেওয়ার
পরেও আমার
ভাইকে তারা আর
ছাড়ি দেয় না। তখন আমার
এই গ্রামে
একটা বুড়া লোক
ছিলো। তার
নাম হইলো সৈয়দ
ডাক্তার। সেই ডাক্তার
বৃদ্ধ মানুষ, কিন্তু খানের
সাথে খুব মিশে। সে ভালো
মানুষ ছিলো। সে আমার
ভাইকে দেখে
বলিলো, তুই কেন এঠে ? আমার
ভাই কয় যে,আমাকে
ধরে নিয়ে আসছে। সৈয়দ
ডাক্তার কয়, কে ? আমার
ভাই কয় যে, আম্বিয়া। তখন সৈয়দ
ডাক্তার কয় যে
এদিকে আয়। আমার সাথে আয়। তখন আমার
ভাইকে ঐ বুড়া
ডাক্তার
উদ্ধার করি নিয়া
আসে।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
কারা রাজাকার
ছিলো ?
উ: আমার
গ্রামে
রাজাকার তেমন
ছিলো না। রাজাকার
ছিলো সংখ্যায়
বেশি খজাপুর। এক নম্বর
ছিলো আম্বিয়া। এরপর
পাকুন,তারপরে
জালাল, তারামদ্দি। তারপর আরো
রাজাকার ছিলো। সবার নাম
এখন মনে
পড়তেছে না। কয়েকটাক
মুক্তিযোদ্ধারা
মারি দিছে। বাংলাদেশ
স্বাধীনের
পরে আমি আসি
আম্বিয়াক ধরছিলাম। তখন
আম্বিয়া কইলো,ভাই
আমার তো করার কিছু
নাই। খানেরা
আমাক হুকুম
করছে। যার
জন্য তোর
ভাইকে ধরছি। সে কয় যে
ভাই এটা আমার
ভুল হয়ে গেছে। তখন আমার
গ্রামের
মানুষ সবাই
বলিলো, যা হবার হইয়া
গেছে। তোমার
ভাই তো মরে
নাই। দেশও
স্বাধীন হইছে। তাদের
কথায় বাধ্য
হইয়া আমি
আম্বিয়াকে
ছাড়ি দিলাম। ঐ
আম্বিয়ার উপর
এখনও আমার রাগ
আছে।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
শান্তি
কমিটি
ছিলো কি ?
উ: শান্তি কমিটিতে
কারা ছিলো
জানি না,তবে কমিটি
ছিলো।
প্র:
স্বাধীনতার
পর স্বাধীনতা
বিরোধীদের ধরা
হইছিলো কি ?
উ: ওদের
ধরা হয়নি। বাংলাদেশ
স্বাধীনের
পরে কেউ ধরেনি। বাংলাদেশ
স্বাধীনের
পরে শেখ সাহেব
পাকিস্তান থাইকা
আসি ওদের তো
সাধারণ ক্ষমা
দিলেন। তাতে
করে ওদের আর
ধরা হলো না। কাউকে ধরে
নাই।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
এসে আপনি এলাকার
কি অবস্হা
দেখলেন ? স্কুল-মাদ্রাসা,মসজিদ-মন্দির,ব্রিজ
কেমন ছিলো ?
উ:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
আসি দেখলাম যে,আমার
বাড়িত কিছু
নাই। টিন টুন, ঘরবাড়ি, গরু
বাছুর কিছুই
নাই। সব
জ্বালি দিছে। ভাঙি চুরি
সব শেষ করে
দিছে খানেরা। যে আওয়ামী
লীগ করে তার
বাড়িঘর শেষ। শিবপুর
স্কুলের টিন
টুন কিছু ছিলো
না। তার
বাদে এখানকার
ব্রিজটা ভাঙা
ছিলো। খানেরা
মন্দির
কোনোটাই রাখে
নাই। সব
জায়গায়ই আগুন
টাগুন দিছে। আর বিশেষ
কইরা যারা
আওয়ামী লীগ
পার্টি করছে তাদের
বাড়ি খানেরা
বেশি কইরা
পুড়াইছে।
প্র:
আপনার অস্ত্র কি
করলেন ?
উ: আমার অস্ত্র বলাহার
ক্যাম্পে জমা
দিছি। একজন
সিং আমার
ক্যাপ্টেন
ছিলেন। তাঁর
কাছে জমা দিছি। তারপর
যুদ্ধের শেষে
বাড়িতে আসলাম। আসি দেখি
বাড়িঘর নাই। তখন
মানুষের কাছে
বাঁশ টাশ
চাইয়া নিয়া ঘর
তুলছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : আবদুল
কাইয়ুম
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : নভেম্বর ০৪, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৭৫