নাম : লোকমান হোসেন মন্ডল

পিতা : মৃত বিরাজউদ্দীন মন্ডল

গ্রাম : গণিপুর,

ইউনিয়ন : এলুয়ারি,

ডাক : খজাপুর

থানা : ফুলবাড়ি,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ২০

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : কৃষিজীবী

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আপনি কি আক্রান্ত হয়েছিলেন ?

 

উ: না,আমি প্রথমেই ভারতে চলে গেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: দেশকে শত্রু মুক্ত করার জন্যই আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি

 

প্র: কিভাবে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: আমি প্রথম কাটলা ক্যাম্পে ভর্তি হইপরে কাটলা ক্যাম্প থেকে হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য শিলিগুড়িতে যাইশিলিগুড়িতে ট্রেনিং নিয়ে তরঙ্গপুরে আসিসেখান থেকে আবার বাংলাদেশের ভিতরে যুদ্ধ করার জন্য আসি

    বাংলাদেশে আসার পর খানদের সঙ্গে প্রথম যুদ্ধ হইছিলো আমাদের এই এলাকার মধ্যেইখানরা এখানে প্রায়ই হাটে আসতোআমাদের দুই জন মুক্তিযোদ্ধা একদিন তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়তখন খানরা পাল্টা আক্রমণ করেখানরা সংখ্যায় বেশি ছিলোদুই মুক্তিযোদ্ধা বেগতিক অবস্হায় পড়ে একজনকে দিয়ে আমাদের খবর দেয়সংবাদ পেয়ে আমরা ঐখানে পৌছে গেলামসেখানে আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করিএই লড়াইয়ে ওখানে এক পাবলিক নিহত হয়ঐ হাটেই তার পানের দোকান ছিলোআমরা আমাদের দুই মুক্তিযোদ্ধাকে সেখান থেকে অতি কৌশলে বের করে আনিসেদিন আমাদের দলের কেউ আহত বা নিহত হয়নি

 

প্র: এরপর কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: ধলেশ্বরীতেসেখানে খান সেনাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়খানেরা সংখ্যায় ছিলো বহুআমরা মুক্তিযোদ্ধারা তিন দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ চালাইসকাল ৮টা থেকে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আমাদের মোকাবেলা হয়শুনছি, ঐ মোকাবেলাতে পাক সেনা কয়েকটা মারা গেছেকিন্তু তাদের লাশ পাইনিএই লড়াইয়েও আমরা জয়ী হইআমাদের কেউ মারা যায় নি

 

প্র: আপনার এলাকা কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: এপ্রিল মাসে আমাদের এলাকায় হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে এসে তারা আক্রমণ করেআমাদের পাশে তো ভারত রাষ্ট্রআমরা তখন বাঁচার জন্য বর্ডার পার হয়ে গেলামতাদের অত্যাচারে আমাদের এখানকার বেশিরভাগ লোক ভারতে চলে গেছিলো

 

প্র: তারা আপনার এলাকায় আর কি কি করলো ?

 

উ: খান সেনারা আমাদের এলাকায় অনেক লোককে মারে এবং মেয়েদের উপর অত্যাচার করেবাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়মেয়েদের পেলে তাদের ধরে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করেঅনেক সময় তাদের নির্যাতন করে মারে

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: না,আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয় নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: আমার এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় জুলাইয়ের দিক থেকেতখন থেকেই আমাদের এই এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা পর্ণভাবে শুরু হয়এই এলাকায় পাক সেনাদের বড় ধরনের ক্যাম্প ছিলো এবং এখানেও অনেক যুদ্ধ হয়

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: আমরা যারা মুক্তিবাহিনী ছিলাম তাদেরকে বিভিন্নভাবে জনগণ সহযোগিতা করছিলোযেমন আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যাপার ছিলোজনগণ আমাদেরকে থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা করছিলো এবং আমাদেরকে হেফাজতে রাখছিলোআমরা জনগণের আশ্রয়ে থেকে পাক সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিআমরা জনগণের যথেষ্ট সাহায্য সহানুভূতি পেয়েছি

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় রাজাকার কারা ছিলো ?

 

উ: আমাদের গ্রামে তেমন রাজাকার ছিলো নাপার্শ্ববর্তী গ্রামে অনেক রাজাকার ছিলোসেই গ্রামের নাম খজাপুরএই খজাপুরে অনেক রাজাকার ছিলোযেমন- খজাপুরে স্বরস্বতীপুর নামে একটা পাড়া আছে, সেখানকার লোকজন মুক্তিবাহিনীদের ভাত খেতে দিয়ে খানদেরকে খবর দেয়খান সেনারা ঐ পাড়া ঘেরাও দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যায়রাজাকারদের নামগুলা আমার সঠিক জানা নাইতবে ঐখানে ঐ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছিলো

 

প্র: শান্তি কমিটি কি আপনার এলাকায় ছিলো ?

 

উ: হ্যাঁ, শান্তি কমিটি ছিলোবালুপাড়ার জব্বার সাহেব শান্তি কমিটিতে ছিলেনউনি প্রাক্তন চেয়ারম্যানমারা গেছেন

 

প্র: স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: জ্বী না, ধরা হয়নিরাজাকার একজনকে খালি ধরা হইছিলোসে আমার গ্রামেরতার নাম আবদুল হামিদওকে ধরে তরঙ্গপুরে নিয়ে যাওয়া হয়তারপর তাকে সেখান থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে এসে আপনার গ্রামের অবস্হা কি দেখলেন--স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, ব্রিজ-কালভার্ট-এ সব কি অবস্হায় ছিলো ?

 

উ: গ্রামে ফিরে এসে বেশিরভাগ বাড়িঘর পোড়া দেখলামকারো বাড়িতে কোনো ছাউনী ছিলো নাখান সেনারা একেবারে সব পুড়ে টুড়ে শেষ করে দিয়েছিলোতারপরে ঘরের আসবাব পত্র, জিনিসপত্র কোনো কিছু নাইকালভার্ট সবগুলো ধ্বংস ছিলো

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: আমার অস্ত্র আমি জমা দিছি দিনাজপুরে

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ০৪, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৭৫