নাম
: মেজর জেনারেল
(অব:) আবু লায়েস মোহাম্মদ
ফজলুর রহমান
পিতা
: মরহুম
মোহাম্মদ তাজর
উদ্দীন সরকার
গ্রাম
: পূর্ব
মোহনপুর,
ডাক
: লক্ষ্মীতলা,
ইউনিয়ন
: শংকরপুর
থানা
: দিনাজপুর
সদর,
জেলা
: দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : এম.এস.সি.,এন.ডি.সি.,পি.এস.সি.
১৯৭১
সালে বয়স : ২১
১৯৭১
সালে পেশা : ছাত্র,
বর্তমান
পেশা : অবসর জীবন
প্র:
১৯৭০ সালের নির্বাচন
এবং তার পরবর্তী
ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে
আপনি কি জানেন
?
আপনার
ছাত্র জীবন এবং
ছাত্র রাজনীতি
সম্পর্কেও কিছু
বলবেন কি ?
উ: ১৯৭০ সালে
যখন নির্বাচন হয়,তখন সারা
দেশ আন্দোলনে,স্লোগানে,মিছিলে উত্তাল
ছিলো। বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান
সেই নির্বাচনে
বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের
মেজরিটির লিডার
হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করেন। তাঁর
দল আওয়ামী লীগ
পূর্ব পাকিস্তানে
২টি ছাড়া সকল আসনেই
বিজয়ী হয়। ’৬৯ সালের
শেষ দিকে আমি আই.এ.
পরীক্ষা দিয়ে পাশ
করে ১৯৭০ সালে
ডিগ্রিতে ভর্তি
হওয়ার অপেক্ষায়
ছিলাম। এ সময়
আমি ছাত্র হয়েও
মূল আওয়ামী লীগ
রাজনীতির সঙ্গে
সমঙৃক্ত হয়ে পড়ি। তখন আমি ছাত্র
লীগের সদস্য ছিলাম
না। এ দিকে ১৯৭০
সাল এসে গেলো। আওয়ামী লীগের
সঙ্গে জড়িত হবার
পর আমি নিয়মিত
আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ, মিটিং মিছিলে
যোগ দিতে থাকি। আওয়ামী লীগের
স্হানীয় নেতা অ্যাডভোকেট
আবদুর রহীম সাহেবের
বাড়ি আমাদের পাশের
গ্রামেই ছিলো। ১৯৭০ সালের
নির্বাচনে রহীম
সাহেব প্রদেশিক
পরিষদের আসনে দিনাজপুর
সদর থেকে আওয়ামী
লীগের প্রার্থী
ছিলেন। পরে
তিনি আওয়ামী লীগ
প্রেসিডিয়াম সদস্য
হন এবং দু’বার এম. পি.
নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে
মুক্তিযুদ্ধের
সময় বাংলাদেশ সরকার
গঠিত জোনাল কাউন্সিলের
চেয়ারম্যান ছিলেন
তিনি। দিনাজপুর
এলাকার সশস্ত্র
যুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বেই
পরিচালিত হয়েছে
বলা যায়। এই সময়টায় আবদুর
রহীম সাহেবের সঙ্গে
আমি নিয়মিত সভা
সমিতিতে যেতে থাকি। এ সময় বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের
উপস্হিতিতেও আমি
আওয়ামী লীগের স্হানীয়
জনসভায় বক্তৃতা
করেছি। আবদুর
রহিম সাহেব ছাড়াও
প্রফেসর ইউসুফ
আলী সহ অন্যান্য
নেতৃবর্গের সঙ্গেও
আমি বিভিন্ন সভাতে
যেতাম। আমরা
কোথাও যাওয়ার আগে
সেখানে পোস্টারিং
এবং লিফলেট বিলি
করা হতো। এ সব পোস্টার এবং
লিফলেটে দিনাজপুরের
আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের
নামের সঙ্গে আমার
নামও লেখা থাকতো। আমি তাঁদের
সাথেই বক্তৃতা
দিতাম। এভাবেই
আমি আওয়ামী লীগ
রাজনীতি এবং নেতৃবর্গের
সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে
পড়ি।
আমি
ছাত্র রাজনীতির
সঙ্গে বিশেষত:
ছাত্র লীগের সঙ্গে
জড়িত হলাম আরো
পরে। মাদ্রাসায়
পড়ার সময় আমি জমিয়তে
তলাবায়ে আরাবিয়ার
সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ১৯৬৭ সালে
আমি পূর্ব পাকিস্তানের
জমিয়তে তলাবায়ে
আরাবিয়ার ভাইস
প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এর আগে আমি
জমিয়তে তলাবায়ে
আরাবিয়ার দিনাজপুর
জেলার প্রধান ছিলাম। এটা ফাজিল
পরীক্ষার সময়। যখন ফাজিল
পাশ করে দিনাজপুর
শহরে এসে কলেজে
ভর্তি হলাম তখন
দেখলাম যে,দেশের যে
মূল রাজনীতি এবং
স্বাধিকার আদায়ের
জন্য যে আন্দোলন
চলছে সেটার মূল
ভূমিকায় আওয়ামী
লীগ। ছাত্র লীগও
এ ক্ষেত্রে একটা
বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তখনই আমি উদ্যোগী
হলাম ছাত্র লীগের
রাজনীতির সঙ্গে
সমঙৃক্ত হতে। ছাত্র লীগের
সঙ্গে কিভাবে সমঙৃক্ত
হবো তা ঠিক করতে
পারছিলাম না। কেননা ইতোমধ্যে
আমি মূল দল আওয়ামী
লীগের সঙ্গেই সমঙৃক্ত
হয়ে পড়েছি।
১৯৭০
সালের শেষের দিকের
কথা। আমাদের ওখানে
আমতলি বাজার নামে
একটা জায়গা আছে, এটা ফুলবাড়ি-দিনাজপুর
রোডে। সেই
বাজারে আমি একদিন
বেড়াতে গেছি। সেদিন সেখানে
কয়েকটি ছেলে উপস্হিত হয়ে আমাকে
বললো, আপনাকে
ফুলবাড়ি যেতে হবে। আমি ওদের জিজ্ঞাসা
করলাম তোমাদের
কে পাঠিয়েছে। ওদের একজন
বললো নবাব এবং
মনসুর পাঠিয়েছে। একটু চিন্তা
করছিলাম ওদের সঙ্গে
যাবো কি যাবো না। শেষ পর্যন্ত
আমি ওদের সঙ্গে
ফুলবাড়ি চলে গেলাম। ফুলবাড়ি যাওয়ার
পর একটা ঘরের মধ্যে
আমাকে প্রায় বন্ধ
করে রাখা হলো। কিছুক্ষণ পর
এক দর্জি এলো, সে আমার
কাপড় চোপড়ের মাপ
নিলো। তারপর
আমার নতুন জুতাও
এলো। রাতের মধ্যেই
নতুন জামা-কাপড়
তৈরি হয়ে গেলো। আমার কাছে
ফুলবাড়ি কলেজের
একটা ফর্মও নিয়ে
আসা হলো। তাদের কথা মতো
আমি সেই ফর্মে
স্বাক্ষর করলাম। আসল ঘটনা জানতে
পারলাম আরো পরে। আমাকে অলমোস্ট
হাইজ্যাক করে সেখানে
আনা হয়েছে এই কারণে
যে,
তখন
ফুলবাড়ি কলেজে
ছাত্র ইউনিয়নের
ভালো সংগঠন ছিলো। তারাই সেখানকার
ছাত্রদের নেতৃত্ব
দিতো এবং ছাত্র
সংসদ নির্বাচনে
পুরো প্যানেলে
জিততো। ফুলবাড়ি
কলেজের বেশিরভাগ
ছাত্র ছিলো ফুলবাড়ির
পশ্চিম অঞ্চলের। আমার বাড়িও
ফুলবাড়ির পশ্চিম
অঞ্চলের কাছাকাছি। ফুলবাড়ি কলেজের
ছাত্র লীগের ছেলেরা
চিন্তা করেছে যে, যদি আমাকে
ফুলবাড়ি কলেজে
ডিগ্রিতে ভর্তি
করানো যায়, তা হলে হয়তো
পশ্চিমাঞ্চলের
ছাত্রদের উপর প্রভাব
বিস্তার করা যাবে। তাছাড়া তখন
বিভিন্ন জায়গায়
বক্তৃতা দেওয়ায়
আমার একটু পরিচিতিও
ঘটেছে। আর এ
কারণেই আমাকে ফুলবাড়ি
নিয়ে আসা হয়েছে। যাহোক, ঐ রাতের
মধ্যেই আমি ফুলবাড়ি
কলেজে ভর্তি হয়ে
গেলাম। পরদিন
মিছিল সহকারে সবাই
কলেজে আসলাম। সেই সময় আবার
ফুলবাড়ি কলেজের
ছাত্র সংসদ নির্বাচনও
ছিলো। আমি
ছাত্রলীগের পক্ষ
থেকে ‘ভিপি’ পদের জন্য
নমিনেশন পেপার
সাবমিট করলাম এবং
নির্বাচনে আমার
প্যানেল বিজয়ী
হলো। আর এভাবেই
আমার ছাত্র লীগের
সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
এরপর
তো শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। আমি মুক্তিযুদ্ধে
সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ
করি। মুক্তিযুদ্ধের
ঘটনা বলার আগে
আমাকে আবারো একটু
পিছনে ফিরে যেতে
হবে।
১৯৬৬
সালে আমি যখন ফাজিল
পড়ি তখন একদিন
আমাদের বাড়ির পাশেই
একটা জায়গা, যেখানে এখন
সেচ প্রকল্পের
একটা স্লুইস গেট
নির্মিত হয়েছে, জায়গাটাকে
আমরা খুটা সাঁকো
বলতাম, সেখানে দাঁড়িয়ে
আছি। এটা আমাদের
গ্রামের বাড়ি থেকে
হাফ কিলোমিটার
দরে। সময়টা ছিলো বিকেল
বেলা। হঠাৎ দেখি একটা
আর্মির জীপ গাড়ি
সেখানে এসে থামলো। জীপ থেকে ইউনিফর্ম
পরা একজন অফিসার
নামলেন। ঐ অফিসার ইশারায়
আমাকে তার কাছে
ডাকলেন। আমি তার কাছে যাওয়ার
পর তিনি বললেন, আমরা এখানকার
কিছু ছেলেকে মুজাহিদ
বাহিনীতে ভর্তি
করে ট্রেনিং দেবো, তুমি কি
এই বাহিনীতে যোগ
দেবে। তার
আগে অবশ্য তিনি
আমাকে বেশ কিছু
প্রশ্ন করলেন। আমি তার প্রশ্নের
জবাব দিলাম। এরপর তিনি
আমাকে বললেন, তুমি মুজাহিদ
বাহিনীতে যোগ দাও। ১৯৬৫ সালে
ভারত পাকিস্তান
যুদ্ধের পর পাকিস্তান
সরকার মুজাহিদ
বাহিনী গঠন করেছিলো। যাহোক, তখন আমি
তাকে চিনি নি। কোন্পর্যায়ের
অফিসার, সেটাও বুঝিনি। পরে তার পরিচয়
জেনেছি। তখন তিনি লে: কর্নেল
ছিলেন। পরে
কর্নেল হন। নাম আবদুল জব্বার। ফোর বেঙ্গলের
কমান্ডিং অফিসার
ছিলেন। আমাদের
এখানে বড়াইপুরে
একটা মাইনর স্কুল
ছিলো। নাম
ছিলো বড়াইপুর মাইনর
স্কুল। আমি
প্রথম ঐ স্কুলেই
পড়েছি। এরপর
মাদ্রাসাতে। এখন ঐ স্কুল
হাই স্কুল হয়ে
গেছে। স্কুলের
নাম হয়েছে বড়াইপুর
হাই স্কুল। যাহোক, তিনি আমাকে বড়াইপুর
স্কুলে আসতে বললেন। তিনি আরো বললেন, তোমাকে মুজাহিদ
বাহিনীর ক্যাপ্টেন
হিসেবে ট্রেনিং
দেয়া হবে। মুজাহিদ বাহিনী
স্হায়ী বাহিনী
হিসেবে থাকবে। আমি ভাবলাম
ভালোই তো। আমি বাড়িতে এসে
বাবা মাকে সব কথা
বললাম। তাঁরাও
রাজী হয়ে গেলেন। আমি মুজাহিদ
বাহিনীতে চলে গেলাম। মুজাহিদ বাহিনীর
ট্রেনিংও শুরু
হলো। আমরা ছিলাম
প্রায় ১৫০ জন। এক কোম্পানি। ট্রেনিং হলো
তিন মাসের। ট্রেনিং নিয়ে
আমি মুজাহিদ ক্যাপ্টেন
হলাম। তারপর
পাসিং আউট প্যারেডও
হলো। কিন্তু ঐ
চাকরিতে আমি আর
জয়েন করিনি। পাকিস্তান
আর্মি আমাদের ট্রেনিং
দেয়। সেনাবাহিনীর
একজন ক্যাপ্টেন
প্রত্যক্ষভাবে
এই ট্রেনিংয়ের
সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাদের সঙ্গে
যে ক্যাপ্টেন ছিলেন
তার নাম মতীন। তিনি পরে ব্রিগেডিয়ার
হন। বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার
পর আমি যখন সেনাবাহিনীতে
কমিশন নিয়ে ১০
ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এ
জয়েন করি তখন তিনিই
আবার আমার কমান্ডিং
অফিসার হন, এ এক অদ্ভুত
যোগাযোগ।