নাম : মো: আবদুল আলীম

গ্রাম : কাশিররামপুর

ডাক : সালদা নদী

ইউনিয়ন : বায়েক

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ৩৫

১৯৭১ সালে পেশা : গৃহস্হি

বর্তমান পেশা : গৃহস্হি

 

 

 

মোঃ আবদুল আলীম অস্ত্র হাতে লড়াই করেননিকিন্তু তিনি পথ-ঘাট চিনিয়ে,খাবার-দাবার দিয়ে পাকিস্তানিদের অবস্হান সম্পর্কে খবরা-খবর জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেনআবদুল আলীম তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন বর্তমান সাক্ষাৎকারে

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হামলার পর আপনি আপনাদের এলাকায় কি দেখলেন বা কি করলেন?

 

উ: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন এলাকা আক্রমণ করেকসবা থানার বায়েক ইউনিয়ন এলাকাতেও ওরা বাই রোড গাড়ি নিয়ে আমাদের বায়েক গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং গ্রামে ঢুকে বাড়িতে বাড়িতে আগুন দিয়া বহু ঘরবাড়ি জ্বালায়ে দেয়বহু লোকজন মেরে ফেলেএকটি ঘরে প্রায় ৫০/৬০ জন লোক ছিলতাদের প্রত্যেককে মেরে ফেলেছেসেখান থেকে আল্লার কুদরতে একটা লোক বেঁচে যায়এখনও তিনি জীবিত আছেনতারপর মজিদ ডাক্তারের বাড়িতে আক্রমণ করেতাঁর ঘরে গুলি ছুঁড়ে এবং বোম ফাটায়সেখানে তার স্ত্রীও আক্রান্ত হয়কিছু দিন পূর্বে সে মারা গেছেতারপর এক হিন্দু বাড়ি,হিন্দুর বাড়ি মুসলমানে নিয়েছিলসে অতি বৃদ্ধ নাম ছিল তমিজুদ্দিন সরদারউনি আমারই আপন নানা ছিলেনকাছে যেয়ে উনারা বললো যে তোমরা দুই নাতি নাকি মুক্তিবাহিনীতে আছে? উনি বুড়ো মানুষ উনি কিছু বলতে পারলো নাউনি তাদের ভাষাও বুঝে নাএরপর তারা ব্রাশ মেরে আমার নানার ডান পা-টা একবারে করি মধ্য থেকে ছিন্ন করে ফেলেছিলনানা ইনে-কাল করলোসে খবর পেয়ে আমরা পরদিন যেয়ে নানার লাশ ওখান থেকে পা বিহীন অবস্হায় নিয়ে এসে ভারতে দাফন করলামপাকসেনারা নয়নপুর গ্রামেও ঢুকে পড়লোঐখানে যাইয়া তারা আস্তানা গাড়লো,বাংকার করলো এবং ঐখানে তারা স্হায়ীভাবে পজিশন নিয়ে বসলোগ্রামটাকে তারা জ্বালিয়ে দিল

 

 

প্র: যখন ভারতে গেলেন তখন কার আন্ডারে ছিলেন এবং কি করলেন?

 

উ: তখন ভারতে আমাদের মুক্তিবাহিনীর মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন গাফফার সাহেবযিনি ওখানে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ছিলেনউনার মাধ্যমে আমরা ওখানে যাই এবং সুবেদার ফরিদ সাহেব,সুবেদার বেলায়েত হোসেন সাহেব উনারা ছিলেনউনারা আমাদেরকে জায়গা করে দেনতারপরে ওখানে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে আমরা কয়েকজন লোক নিযুক্ত হলাম শরণার্থীদেরকে রিসিভ করার কাজে মানে তাদেরকে আইনা তাদের সঠিক জায়গা অর্থাৎ ক্যাম্পে ক্যাম্পে পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্হা করিএই কাজ করার জন্য আমাকে এখানে রেখে দিলেনআমার ছোট ভাই ছিলেন আবদুর রহমান মাস্টারউনিও আওয়ামী লীগের একজন নেতা ছিলেনউনি গকুলনগর ইয়থ ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ছিলেনওখানে মুক্তিবাহিনীদেরকে ট্রেনিং দিতেনট্রেনিং দিয়ে তারা লোকগুলোকে বাংলাদেশে পাঠাইত বা আমাদের কাছে পাঠাইতোআমরা তাদেরকে বাংলাদেশের রাস্তা দেখাইয়া দিতাম

 

প্র: তখন আপনারা ভারত সরকার থেকে কি কি সাহায্য পেলেন?

 

উ: আমরা ভারত সরকার থেকে অস্ত্র পেয়েছিখাদ্য পেয়েছিকাপড় পেয়েছি,ঔষুধ পেয়েছি এবং যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছি ভারত সরকার যতটুকু পারছে ততটুকু সাহায্য আমাদেরকে করেছে

 

প্র: আপনি কি একজন মুক্তিযোদ্ধা?

 

উ: অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করি নাইতবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহকর্মী হিসাবে ছিলাম,কাজ করতাম

 

প্র: আপনি মুক্তিবাহিনীকে কিভাবে সাহায্য করতেন?

 

উ: ধরেন তাদেরকে খানা পিনা খাওয়াইতাম,তাদেরকে রাস্তাঘাট দেখাই দিতামতাদের খবরা খবর দিতাম এবং তাদের দেখাশুনা করতাম

 

প্র: আপনার এলাকায় কারা কারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল?

 

উ: আমার এলাকায় আমি ছিলাম,আমার ভাইতো ওখানে কমান্ডার ছিলেনআমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের কুল্লাপাথরের আবদুল করিম সাহেব,এখনও উনি আছেনউনি উনার নিজস্ব জায়গাতেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দাফন করবার জন্য একটু জায়গা দিলেনমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হইলে আমরা ঐখানে নিয়ে দাফন করতামউনিও আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন

 

প্র: মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কি ছিল?

 

উ: মুক্তিবাহিনীর প্রতি জনগণের খুব উদার প্রাণ ছিলজনগণ মুক্তিবাহিনীকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতোতাহাদের মনোভাব ছিল অবশ্যই মুক্তিবাহিনীরা একদিন আমাদের দেশকে স্বাধীন করবেআমরা একদিন না একদিন স্বাধীন হবোস্বাধীন দেশের পতাকার তলে দাঁড়াতে পারবোএই বিধায় তাদের ছেলেপেলেগুলো মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ার জন্য এবং মুক্তিবাহিনীর খাওয়া দাওয়ার জন্য যে যেইভাবে পারছে সাহায্য করছে,উৎসাহিত করেছে

 

প্র: আপনার এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিল কি?

 

উ: কিছু কিছু ধরা হয়েছিলধরা হওয়ার পরে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন তখন উনি উদার প্রাণে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেনসাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে দিলেনক্ষমা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এই সমস্ত লোক রেহাই পেয়ে যায়

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি অবস্হা দেখলেন?

 

উ: গ্রামের অবস্হা তখন খুবই শোচনীয় ছিলকারো ঘর ভাঙা,কারো বাড়িঘর নেইরাস্তাঘাট,পুল,স্কুল,মসজিদ সব ভাঙাএকটা হাহাকার রব,চতুর্দিকে কেবল হাহাকারমানুষের ঘরে খাবার ছিল নাখানা দানা কোনো কিছুই ছিল নাএমন পরিস্হিতিতে মানুষ একবারে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল-তাদেরকে সাহায্য যতটুকু পারছে সরকার করেছেআমরাও সহযোগিতা করেছি এলাকার লোকজনের জন্য

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : এইচ. এম. ইকবাল

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২৮ আগস্ট ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা- ৪