নাম : মোঃ আবদুল মালেক

পিতা : নজিব উদ্দীন

গ্রাম : খাকনগর,

ইউনিয়ন : দরিরামপুর,

ডাক : মধ্যপাড়া

থানা : পার্বতীপুর,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : নিরক্ষর

১৯৭১ সালে বয়স : ২২

১৯৭১ সালে পেশা : কৃষিকাজ,

বর্তমান পেশা : শ্রমজীবী

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা কি আপনার মনে আছে ?

 

উ: হ,মনে আছেতখন তো দেশে যুদ্ধ লাগিছিলোখানরা আমাদের দেশে যেখানে সেখানে আক্রমণ করিলোতারা অনেকদিন আমাদের দেশোত থাকিলোআমাদের এখানেও খানরা আইছিলোএকদিন আমাদের গ্রামের মজিদ মিয়া আমারে খানেগোর কাছে ধরি নিয়া যাতি ধরছিলোখানরা নাকি তাক বলছিলো যে,জোয়ান ছেলে দেনজোয়ান ছেলেপেলেক তারা নাকি রাজাকার বানাবেতখন তো আমরা আর থাকতে পারি নাআমাদের একদিন ডাক দিলো মজিদ মিয়া,তারপর বলিলো যে, খানেরা জোয়ান লোক চাতিছেখানেরা চাচ্ছে তোমাদের মতো কয়েকটা জোয়ান ছেলে রাজাকারে যাক,যাবেন বাহে ? আমি বলি,আমরা ওখানে যাবো নাযে দিন মজিদ মিয়া বলিছে সে রাতেই আমরা চলি গেছি বাড়িত থাকি

 

প্র: কোথায় চলে গেলেন ?

 

উ: ঐ ভারতেভারতে যাইয়া আমাদের গ্রামের যে মোতালেব মুক্তিযোদ্ধা আছিলো,তার সঙ্গে দেখা করছিওতো আগে গেছেসে আমাক মুক্তিযোদ্ধাত ভর্তি করাইলোআমার কমান্ডার আছিলো কয়সাররংপুর তার বাড়িকিন্তু আমার বাড়ির পাশেই তার গ্রামটাট্রেনিং নিলাম ওখানে ১৭ দিন, ঐ পতিরামেআর শিলিগুড়ি যায়া ২৫ দিনতারপর আমাগোরক পাঠাইয়া দিলো বাংলাদেশে

 

প্র: মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের কোন ‌কোন ‌জায়গায় আপনি যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: বাংলাদেশে আমরা যুদ্ধ করছি আমবাড়িতদিনাজপুরের আমবাড়িতেআমবাড়ি থাকি আপনার এই মধ্যপাড়া এলাকা পর্যন্তআমরা গেরিলা আছিলামএ দিকেই আমরা আছিলামহামলা করছি ২০ নম্বর পুলএটা ফুলবাড়িতফুলবাড়িতও আমি ছিলামওখানে আলাউদ্দীন ভাই ছিলোতারপর কামরান-মজনু ছিলোআছিলাম ৬৪ জনদুই গ্রুপ মিলিয়া আমরা যুদ্ধ করছি আর কিএকদিন আমবাড়ির ওখানে একটা খানের গাড়ি আমরা মাইন দিয়া উড়াইছিকয়েকজন মিলি অপারেশনটা করছি,একটু সন্ধ্যার দিকেখানরা বোধহয় দিনাজপুর থাকি আসতেছিলোবহুদূরে দেখা যায় খানদের গাড়ি আসতেছেএটা দেখিয়া আমরা সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় মাইন সেট করিছিদুই পাশে দুইটা১০/১৫ মিনিট পর খানেদের গাড়ি আসি গেলোআমরা তো তার আগেই রাস্তার পাশে লুকাইয়া আছিলামআল্লার রহমতে মাইন বার্স্ট হয়া গেলো খানদের গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গেদুই জন খান সেনা আহত হইছিলোআমরা ওগুলাক ধরি নিয়া আসছি১৩ জন খান ছিলো একটা গাড়িতেঐ অপারেশনের পর আমরা চলি গেলাম ফির ভারতেআমরা ঐ অপারেশনের পর থাকি মধ্যপাড়ার এদিকে আছিলাম বেশি

    তারপর ডিসেম্বর মাসে আমরা তখন আনন্দবাজারের দিকে আছিএ সময় একদিন দেখতেছি বিমান আসতেছেতখন আমরা ধারণা করিলাম এটা বোধহয় খানেদের বিমানআমরা বহু ছেলে ছিলাম সেদিন ওখানেমুক্তিযোদ্ধা সবএটা সকালবেলায়কেউ মুখ ধুইতাছে,কেউ ঘুম পাড়তেছেএমন সময় বিমানের শব্দআমি দেখি যে,দুইটা বিমান আসতেছে এই দিকে,হাটের উপরতখন মনে হইলো আমাদের আর বুঝি বাঁচোন নাইপরে জানিলাম,ওটা আমাদের বিমানআমাদের একজনের কাছে রেডিও আছিলোকিছুক্ষণ পরে সেই রেডিওত শুনি যে,দেশ স্বাধীন হইতে যাচ্ছে২/৩ দিনের মধ্যেই নাকি দেশ স্বাধীন হইবেপরে আবার দেখতাছি দূরে রাস্তায় ধূলা উড়তাছেওটা দিনাজপুরের দিকে,পার্বতীপুর সাইডেতখন আমরা ফুলবাড়ি এলাকায় চলি গেলামফুলবাড়ি এলাকায় যাইয়া দেখি সেখান থাকি অনেকেই পালাইতেছেযেগুলা খারাপ লোক আছিলো তারা পালাইতেছে নিজ নিজ বাসা বন্ধ কইরেযারা খানেদের সহযোগিতা করছিলো সেগুলা কেউ নাইতাদের বাসা সব বন্ধতারপরে দেখি খানরাও নাইওখানে খানদের আমরা পাইলাম নাপরে তো ওখান থেকে চলি আলাম ফের পার্বতীপুরেপার্বতীপুর যাইয়া আমরা প্লাটফরমের পূর্ব সাইডে থাকলামপার্বতীপুরে খানদের সঙ্গে রাত্রে ফির গোলাগুলি হইছে ঘন্টা তিনেক ধরিতারপর গোলাগুলি বন্ধ হয়া গেলোপরে জানছি কয়েকটা খান আছিলো ওখানেমনে হয় ওই কটা পলাইতে পারে নাইগোলাগুলিতে সেগুলাই মারা গেছেআমরা লাশ পাইলাম অনেকগুলারখান সেনা আর বিহারীরকয়েকটা রাজাকারও আছিলোপার্বতীপুর স্টেশনের পশ্চিম সাইডে বিভিন্ন জায়গায় ওদের বাংকার আছিলোবিমান থাকি ওদের উপর বোম ফেলছিলোকেউ বোমে মরলোকেউ আমাদের গুলিতে মারা গেলো

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন কেন ?

 

উ: বিপদের জন্য করছিতখন তো আমাদের খুব বিপদছেলেদের দেখলেই খান সেনারা ধরি নিয়া যায়ধরি নিয়া মারধর করেকাউক কাউক গুলি করি মারে,কাউক কাউক রাজাকার বানায়আমাদের তো বাঁচতি হবিযদি মরি তো বাংলাদেশের জন্যই একটু চেষ্টা করি মরিআমাদের যখন আরও ভাইয়েরা গেছে তা হলে আমরাও যাই--এ ভাবেই গেলাম

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করলো ?

 

উ: যখন যুদ্ধ লাগছে তখনএটার সঠিক সময়টা আমার খেয়াল নাইবাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের পর করিছে মনে হয়

 

প্র: কিভাবে আক্রমণ করলো ওরা ?

 

উ: প্রথম দিন ওরা মনে করেন রাত্রে আইছেতারা গ্রামটারে ঘিরি কয়েকটা বাড়ি ঘর পুড়ায়ে দেয়খানেরা আনন্দবাজারের দিক দিয়া যাইয়া বাড়ি ঘর পুড়াইছে বেশিআমরা তখন আনন্দবাজারের ঐ দিকেই ছিলামতখনো আমরা ভারতে যাই নাইসেই দিন যাকে সামনে পাইলো তাকে মারিলোযার উপর দয়া হইলো তাকে মারিলো নাতারপর থাকি যাকে তাকে যখন তখন গুলি করি মারে মুখের সামনেএই রকম বহু অত্যাচার খানেরা করিলোমা বোনেরও ক্ষতি করছেআমার চোখের সামনেই খানেরা সন্ধ্যা নামে এক মেয়েকে ধরিছিলোনাবালিকা মেয়ের উপর অত্যাচার করিলো ওরাখারাপ কাজ করিছেসেটা বলা যায় নামেয়েটা ওদের অত্যাচারে শেষ পর্যন্ত মারাই গেছে

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয় নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: খানেরা আক্রমণ করার মাস দুই পর হতে মনে করেন যে,আমাদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা আইছেএটা মনে করেন শ্রাবণ মাসে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভালো চোখে দেখছেযখন মুক্তিবাহিনী আসি এখানে যুদ্ধ শুরু করিলো তখন জনগণ খুশি হইছেআর যারা খান সেনার পক্ষে আছিলো,তারা আমাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখিছেতখন কোথায় আছে মুক্তিযোদ্ধা,কার ছেলে মুক্তিযোদ্ধায় গেছে--এইগুলা খবর তারা খানদের দিছে

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় রাজাকার কারা ছিলো ?

 

উ: রাজাকার আমার এখানে ছিলো,মানে কয়েকজন ছিলোঐ যে বললাম না,খানরা মজিদ মিয়াক লোক দিতে বলছিলোমজিদ মিয়া জোয়ান জোয়ান যারা আছিলো তাদেরক ধরি নিয়া যাইয়া রাজাকার বানাইছেকিন্তু ওরা আমাদের সহযোগিতা করিছেতারপর তো একদিন ওদেরও নিয়া যাইয়া আমরা মুক্তিবাহিনীত ভর্তি করাইছিপতিরামে ভর্তি করাইছিপতিরামে আমাদের ক্যাম্প আছিলোপরে এরাও ফ্রন্ট ফাইটে গেছেআমার বাড়ির পূর্ব পাশের পাড়ায় এক রাজাকার আছিলোসে যুদ্ধের সময় আমার হাতে একদিন ধরা পড়ছিলোতারে চাইছিলাম মারতেপারলাম না পাবলিকের জন্যতারা বলিলো যে,যদি গোলাগুলি করি তাইলে ক্ষতি হবে এলাকারযদি ১টা মারি, তাইলে খানরা মারিবে ১০টাতখন আমি চিন্তা করি আর মারিলাম না

 

প্র: আপনার এলাকায় শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: আছিলো কটাতবে নদীর ঐ পারে বেশি ছিলোআমার এখানে কম ছিলোওই দিকে একটা গ্রামের পরেই রংপুরওখানে বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার ছিলোএকজনের নাম ছিলো মুসাআর এখানে ছিলো মজিদ মিয়া

 

প্র: যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে এসে আপনার গ্রামের বা এলাকার স্কুল-কলেজ, মসজিদ, বাড়িঘরের অবস্হা কেমন দেখলেন ?

 

উ: ফিরে দেখি কারো মনে করেন বোইন হারায় গেছেকারো মনে করেন মা হারায় গেছেভাই হারায় গেছেএইরকম অবস্হাআমাদের গ্রামে বাড়ি ঘরের বেশি একটা ক্ষতি হয় নাইতারপর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব কমান্ডার আছিলোতার বাড়িটা খানরা পুড়ি দিছেআরও কয়েকটা বাড়ি পুড়ি দিছেলুটপাট করছেএগুলা রাজাকার আর বাচ্চু খাঁর পার্টি করিছেবাচ্চু খাঁ বিহারী আছিলোহেরা অনেক বাড়িঘর পুড়ায় ফেলায়ছে, লুটপাট করি সব নিয়া গেছেআমার এদিকে কালভার্ট বা ব্রিজের তেমন কোনো ক্ষতি হয় নাই

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: জমা দিছিতারপর আমাদেরকে পাঠাইলো দিনাজপুরেক্যাপ্টেন শাহরিয়ার ওখানকার কমান্ডার আছিলোউনার আন্ডারে থাকিলামবোধহয় দুই মাস মতোন সেখানে আছিলামতারপর একদিন কমান্ডার বলিলো যে, তোমরা বাড়ি যাওআবার যখন সরকারের দরকার হবে তখন তোমাদের ডাকবেহঠাৎ ঘোষণা হইছে যে,এই ক্যাম্প থাকবে নাতারপর বাড়ি আইলামসার্টিফিকেট কেউ পাইছে,কেউ পায় নাই

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : অক্টোবর ৩০, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৭০