নাম : মোঃ আবদুর রশীদ

পিতা : কফিল উদ্দীন

গ্রাম : আন্দোল,

ইউনিয়ন : পুটিমারা,

ডাক : পুটিমারা

থানা : নবাবগঞ্জ,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : নবম শ্রেণী পর্যন

১৯৭১ সালে বয়স : ১৬/১৭

১৯৭১ সালে পেশা : নবম শ্রেণীর ছাত্র, 

বর্তমান পেশা : বেকার

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আপনি  আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিয়া যুদ্ধ করতে আসার সময় আমি আক্রান্ত হয়েছিলামট্রেনিংপ্রাপ্ত হইয়া আমরা যখন ভারত থেকে বাংলাদেশের ভিতর ঢুকার চেষ্টা করছিলাম তখন আমরা আক্রান্ত হইএটা হিলি বর্ডারেরেল গেইট পার হয়ে আসার টাইমে ১৫/১৬ জন খান সেনার হাতে আমরা আক্রান্ত হইআমরা বাংলাদেশে রেকি করার জন্য আসতেছিলামআমাদের এই দিকে বড়তলা এবং দাঙ্গাপাড়ার মাঝখানে রেলের একটা ব্রিজ আছেসেখানে পাকিস্তানিরা পাহারায় ছিলোআমরা ব্রিজের কাছাকাছি আসার পরে দেখি সেখানে দুই জন লোক বসাআমরা মনে করছি দুইজন লোক হয়তো রাজাকারতারা ডিউটি করতেছেআমরা বাংলাদেশের ভিতরে ঠিকই ঢুকতে পারবোমাত্র দুজন লোক দেখার পর আমরা আরও আগাইয়া আসিআগাইয়া আসার পরও দুইজনকেই শুধু দেখা যায়এরপর আমরা রেল লাইন পার হইকিন্তু রেল লাইন পার হইয়াই দেখি খান সেনাতারা প্রায় ১৫/১৬ জন আমাদেরকে চতুর দিক দিয়া ঘিরে ফেললোতারপর তো আমরা নিরুপায় তখন

 

প্র: আপনারা কয়জন ছিলেন ?

 

উ: আমরা ছিলাম ২৪/২৫ জনের মতোআমরা দেখতেছি আমাদের জীবন তো বাঁচে নাআমরা ওদের অ্যাম্বুসে পড়ে গেছিতখন আমরা পজিশনে গেলামপজিশনে যাওয়ার পর আমরা কিছুক্ষণ গোলাগুলি করিগোলাগুলি চলা অবস্হায় দেখলাম উত্তর সাইড দিয়া রাস্তাটা ক্লিয়ারপিছু হটতে হটতে আমরা উত্তর দিকে চলে যাইউত্তর দিকে দাঙ্গাপাড়া হয়ে আমরা চলে আসি ভিতরেআমরা ব্যাক করে পিছনের দিকে আর যাইতে পারিনিআশ্চর্যের ব্যাপার এমন বিপদের মাঝেও আমাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: দেশের জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলামআমি প্রথম ইন্ডিয়ার মধুপুরে যাইওখানে একদিন থাকার পরে আমাদেরকে পাঠানো হলো পতিরামওখানে একদিন থাকলামওখানে থাকার পরদিন ডাইরেক্ট ট্রেনিংয়ের জন্য চলে গেলাম শিলিগুড়িতেওখানে ট্রেনিং নিয়ে আমাদের আবার পাঠানো হলো রাঙের মাররাঙের মার থেকে আবার ২১ জনের পার্টি করে আমাদের বাংলাদেশে অপারেশনের জন্য পাঠানো হলো

 

প্র: বাংলাদেশের কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: বাংলাদেশে আমরা হিলিতেই বেশি যুদ্ধ করেছিআমরা হিলিতে প্রথমে যখন আসি তখন হিলিতে কিন্তু ভয়াবহ অবস্হা ছিলোএকদিকে খান সেনা আবার অন্য দিকে ইন্ডিয়ান  সোলজারআমরা হিলিতে আসার পর আমাদের সোজা ডিফেন্সে নিয়ে গেলোআমরা বাংকারে থাকলামওখান থেকে রেকি করার জন্য আমাদের আর একদিন বাংলাদেশের ভিতরে পাঠানো হলোখান সেনাদের অবস্হা এবং অবস্হানটা দেখার জন্য আমরা আসছিভিতরে আইসে রেকি করে আবার চলে যাইদুই তিন দিন রেকি করার পরে আমাদের আবার ডিফেন্সে নিয়ে যায়নির্দেশ দেওয়া হয় টার্গেটে ফায়ার করার জন্যএক দিন এক রাতের মতো আমরা বাংকারের মধ্যে থেকে ফায়ার করছিকিন্তু আমরা খান সেনাদের হটাতে পারি নাইআমরা ওখান থেকে অর্থাৎ হিলি থেকে আবার ব্যাক করে পিছনে চলে যাইএর কয়েকদিন পর আমাদেরকে আবার পাঠানো হয়আমরা হিলিতে আবার ডিফেন্স করে বসিসেখানে প্রায় ৭ দিনের মতো পাকিস্তানিদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়লাগাতার ৭ দিনরাতেও গোলাগুলি বন্ধ ছিলো নাহয়তো এক আধ ঘন্টা বন্ধ থাকতোকিন্তু তারপর আবার শুরু হতোবর্ডারে ইন্ডিয়ান সোলজার যারা ছিলো তারাও শেলিং করতো পাকিস্তানিদের বাংকারেশেলিংয়ে যখন পাকিস্তানি সেনারা নিরুপায় হয়ে গেলো তখন বোধহয় তারা পিছনের দিকে হটে গেছেএই সুযোগে আমরা ভিতরে ঢুকে পড়িআমরা ভিতরে ঢুকে পড়ায় খান সেনাদের হাতে আবার আমরা আক্রান্ত হইআমরা মুক্তিযোদ্ধারা ছিলাম সামনেপিছনে ছিলো ইন্ডিয়ান সোলজারআমরা সামনে চলে গেছিপিছনে ইন্ডিয়ান সোলজারআমরা অলরেডি সমঙর্ণ ঢুকে গেছিএমন সময় পিছন দিক থেকে কয়েকটা খান সেনা মেশিন গানের গুলিতে অনেকগুলান ইন্ডিয়ান সোলজারকে মারি ফেলাইলোআমরা মুক্তিযোদ্ধারা অনেক আগে চলে গেছি তাই কেউ মারা যাইনিমুক্তিযোদ্ধা যারা ছিলো তারা কিন্তু তখন কেউ মারা যায়নিপিছনে ইন্ডিয়ান সৈন্য অনেক ছিলো, তারা মারা পড়লোখান সেনাদের প্রকৃত অবস্হান কেউ জানতে পারে নাইআমরাও রেকি করার সময় আসলে সঠিক সংবাদ সংগ্রহ করতে পারি নাই

 

প্র: খান সেনারা কোথায় ছিলো ?

 

উ: ওরা পিছনে একটি বাংকারেই ছিলোইন্ডিয়ান সোলজার অনেক মারা যাওয়াতে আমরা অন্য দিক দিয়া ব্যাক করে চলে গেলাম আবার ইন্ডিয়াওখানে যাওয়ার পর ঘটনা সব খুলে বলা হলোতখন তারা আবার রেকি করতে পাঠাইলো কোন্‌ কোন্‌ বাংকার থেকে গুলি হলোযখন সেই বাংকার তারা খুঁজে পাইছে তখন সেই বাংকারে ইন্ডিয়ান সোলজাররা গরম পানি দিলোগরম পানি দিয়া খান সেনা সবাইকে বাইর করছিলো তারাবাংকারে মেয়েও ছিলো ১৪ জনমেয়েগুলাকে পরে ইন্ডিয়াতে পাঠাই দেওয়া হইছিলোঐ মেয়েগুলার উপর খান সেনারা নির্যাতন চালাইতো

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: আমার এলাকায় পাকিস্তানিরা প্রথম আক্রমণ করছে এপ্রিলের দিকেওরা প্রথমে ক্যাম্প করলো আপনার বিরামপুরতারপরে বিজুলেঅনেক পরে করলো চরারহাটেখান সেনারা এ দিকে আগেই বাড়িঘর সব পোড়ায় দিছেএলাকায় নারী নির্যাতন করছিলোআমাদের এখানে চরার হাটে খান সেনারা অনেক লোকজন মারছেসেটা অবশ্য অনেক পরেঘটনার একদিন আগে আমরা ওখানে একটা অপারেশন করছিলামসেটা ছিলো বিজুলেওখানে আমরা ৭ জন খান সেনাকে মারিখান সেনারা বোধহয় বিরামপুরের দিকে যাচ্ছিলোআমরা হল্ট করছিলাম কাঞ্চিঘাট নামে একটা গ্রামেআমার যে ডেপুটি কমান্ডার ছিলো তার বাড়িতে আমরা ছিলামআমরা ছিলাম ৫ জনপাশের গ্রামে আমাদের আরও মুক্তিযোদ্ধা ছিলোওরা ছিলো বোধহয় ৭ জনআমরা দুপুরে গোসল করার টাইমে বাহির হইয়া দেখি খান সেনারা যাচ্ছেআমাদের কাছে এই সময় হাতিয়ার পত্র ছিলো নাতখন আমরা গোসল করা বাদ দিয়া চলে যাই যে বাড়িত আমরা ছিলামঐ বাড়িত আমাদের হাতিয়ার পত্র ছিলোহাতিয়ার আনি খালি গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে আমরা রাস্তার উপরে না উঠে সাইডে থাকলামতখন ওরা রাস্তা দিয়ে যাইতেছিলো৫ জন খান সেনা যাচ্ছে গরুর গাড়িতে, আর দুজন হাঁটিওরা গরুর গাড়ি নিয়ে যখন যায় তখন আমরা ঐ রাস্তার ধারেই অ্যাম্বুস পাতি বসি ছিলামওরা যখন আমাদের রাইফেলের রেঞ্জের ভিতর আইসে গেছে, তখন আমরা ফায়ার করে দিছিফায়ার করার সঙ্গে সঙ্গে একটা খান কিন্তু ওখানেই পড়ে গেলোআর ৬ জন রাস্তার দক্ষিণ সাইডে পজিশন নেয়পাশেই ধানের জমি ছিলোসেই ধানের জমির ভিতর তারা ঢুকে যায়তারপর তো গোলাগুলি ওখানে করিতাদের কিন্তু প্রথমে আটকানো যায় নাইআমরা ওখানে তো মনে করেন ৫ জন ছেলেতারপর কাছেই আমাদের যে ছেলেগুলা ছিলো তাদেরকে আমরা খবর দিলামআরো মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আসলোওরা আসার পরে চতুর দিক দিয়া আমরা ওদের ঘিরে ফেললামপ্রায় এক মাইল দর দিয়ে আমরা ঘিরে ফেললামসাধারণ লোকজনও কিছু আইলোগোলাগুলি করার পর আমরা ঠিক আছরের টাইমে ওদের ৫ জনকে ধরিআর একজন পালাইয়া গেলোআমরা তো ঐ পাঁচজন খানকে মারি ফেললামআর আগে তো একটা মারা গেছেতাদের হাতিয়ারগুলা নিলামএরপর আমরা ওখানে আর হল্ট না করে চলে গেলাম চার মাইল দরেআমরা মনে করলাম যে, রাত্রে এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়কারণ এখানে যখন খান সেনা মারা হলো তখন তারা তো এ খবর পাবেইআর একজন তো পলাইয়া গেছেসে তো বোধহয় খবর দেবেতাই আমরা ওখান থেকে চার মাইল পিছনে চলে গেলামপিছনে সরে বইদেহার গ্রামে সেল্টার নিলামবইদেহার গ্রামে আমরা তখন আছিপরদিন বেলা ১১টার দিকে খবর পাইলাম খান সেনারা সেখানে দুইটা গ্রামের লোককে বাঁধি মারি ফেলছেওখান থেকে পালাই যাওয়া লোক আমাদের এই খবর দিলোখান সেনারা  রাতের বেলা আইসে দুইটা গ্রাম ঘিরে লোকজনকে মারি দিলো  আমরা যেখানে ছিলাম সেখান দিয়া আমাদের গ্রামের একজন লোক দৌড় মারি যাইতেছিলোআমি তখন রাস্তার ওপর দাঁড়াই ছিলামআমি তাক দেখি আটকাইলামতার তখন অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্হাতাক জিগাইলাম কি ব্যাপারতখন সে কইলো সব ঘটনা

 

প্র: খান সেনারা সেই দিন কতজনকে হত্যা করেছিলো ?

 

উ: খান সেনারা আমাদের গ্রামের সারাই পাড়াতে মারছে প্রায় ৩৪ জন আর প্রাণকৃষ্ণপুরে মারছিলো ৬০ জনের মতোঐ লোকের কাছ থেকে সব খবর শুনার পরে আমি বললাম যে, তুমি এখানে থাকো, এখন তো দিনের বেলা, এখন আমাদের যাওয়া সম্ভব না, আমরা রাত্রে যাবোতারপর ঐ লোকটাকে নিয়া আমরা রাত্রি বেলা আবার ঐ গ্রামে গেছিআমরা তখন ২০/২২ জন ছেলেগ্রামে যাইয়া দেখি গ্রামের অবস্হা করুণগ্রামে কোনো পুরুষ লোকজন নাইযারা বাঁচি ছিলো তারা ভয়ে পাতারে অর্থাৎ দুই গ্রামের মধ্যবর্তি বিরাট ধানের জমিতে চলে গেছেবাড়িতে থাকার মতো তো কোনো পুরুষ লোক নাইঐ ডালা জমিতে সব চলে গেছেতখন দেখি যে ছোট বাচ্চা-কাচ্চা আরমেয়েছেলে দুই একটা আছেতাদের কাছে শুনি যে, আমাদের গ্রামে যাকেই পাইছে তাকেই খান সেনারা মারছেতারপর ওখান থেকে চলে আসলাম প্রাণকৃষ্ণপুরেপ্রাণকৃষ্ণপুরে আসি দেখি এই গ্রামেও কোনো লোক নাইশুধু মেয়েছেলে আছে দুএকজনতারা কান্নাকাটি করতেছেতারা আমাদের দেখে বললো, খানরা মাটি কাটার কথা বলে লোকজনকে নিয়া যায়া এক জায়গায় বসায়ে ফায়ার করে মারছেতাদের লাশগুলা ওখানেই ছিলোখানেরা চলে যাওয়ার পর অন্য গ্রামের লোকজন আইসা পরে তাদের মাটি দিছেআর যারা আহত হইছিলো তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস'া করা হইছিলো চিকিৎসার জন্য

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: শহীদ হইছে আমার এক দাদা, নিজের না অবশ্য, সম্পর্কের দাদাতার নাম হচ্ছে আবদুল গফুরখান সেনারা তাক গুলি করে মারছেআর আমার বাড়ির পাশে আমার এক চাচাতো ভাইকেও খানেরা মারছেযুবকদেরকেই বেশি মারছেআপনার ১৫ বছরের উপরে যারা ছিলো তাদেরকেই বেশি মারছে আর কি

 

প্র: খান সেনারা আপনাদের এলাকার মহিলাদের উপর অত্যাচার করেছিলো কি ?

 

উ: হ্যাঁ, মহিলাদের উপর অত্যাচার তো করছেইখানেরা মহিলাদের উপর অত্যাচার করছে অনেক

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: এটা জুন থেকেই শুরু হয়আমাদের ওখানে জুন থেকেই শুরু হয়

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: প্রথম তো জনগণের মনোভাব খুব একটা ভালো ছিলো নাজনগণ মনে করতো যে, সামান্য ট্রেনিং নিয়া এরা কি কাজ করবেপরে যখন দেখলো যে, না এরা ঠিকই কাজ করতেছে তখন তাদের উৎসাহ জুটলোতখন থেকে তারা আমাদের আশ্রয়-খাবার দিতে লাগলো

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: আমাদের গ্রামে কোনো রাজাকার ছিলো নাতবে বোয়ালদায় ছিলো

 

প্র: বোয়ালদায় কে কে ছিলো নাম মনে আছে আপনার ?

 

উ: নাম একটা আমার মনে আছেসেটাকে আমরা ধরছিলামওর নাম গোলজারতারে ধরে হাতিয়ার পাতি নিয়া ওকে আবার ছাড়ি দেওয়া হইছে

 

প্র: এখানে শান্তি কমিটি ছিলো কি ?

 

উ: হ্যাঁ, ছিলোশান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলো আব্বাসওকে আমরা যুদ্ধের সময় মাইরা ফালাইছি

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি অবস্হা দেখলেন ?

 

উ: আমি যুদ্ধের শেষে তো গ্রামে আসছিলামগ্রামের অবস্হা তো তখন করুণবাড়িঘর কারো ছিলো নাসব তো পুড়ে শেষগ্রামে আসি দেখি কারো হয়তো ছেলে নাই, কারো হয়তো বাবা নাই, কারো হয়তো স্বামী নাই, সে এক &