নাম
: মোঃ
আবদুর রউফ সরকার
পিতা
: মোঃ তছিউদ্দীন
সরকার
গ্রাম
: ২নং
ওয়ার্ডভূক্ত,
ইউনিয়ন
: খয়েরবাড়ি,
ডাক
: খয়েরবাড়ি
থানা
: ফুলবাড়ি,
জেলা
: দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : অষ্টম শ্রেণী
১৯৭১
সালে পেশা : চাকরি,
বর্তমান
পেশা : চাকরি (স্কুলে
চতুর্থ শ্রেণীর
কর্মচারি)
১৯৭১
সালে বয়স : ২৪
প্র:
১৯৭১ সালের মার্চ
মাসে আপনার কি
মনে হয়েছিল ?
উ: আমি সে সময়
থার্ড ইস্ট বেঙ্গল
রেজিমেন্টের সৈনিক
ছিলাম। নির্বাচনে
বঙ্গবন্ধুর দল
বহু ভোটে জিতলেও
পাকিস্তানিরা
ষড়যন্ত্র করে তাকে
ক্ষমতা দিচ্ছিল
না। ৭ মার্চ
বঙ্গবন্ধু নির্দেশ
দিলেন যার যা কিছু
আছে তাই নিয়ে প্রতিরোধ
গড়ে তোল। তার এই নির্দেশ
শুনে আমাদের মধ্যে
সাহস বেড়ে গেল। এ সময় হঠাৎ পাকিস্তানিরা
আমাদের হাতিয়ার
ক্লোজ করতে লাগলো। রেজিমেন্টে
আমরা যারা বাঙালি
ছিলাম তারা সবাই
বলাবলি করছিলাম, এটা কি ব্যাপার। প্রথম দিকে
আমরা কিছুই বুঝতে
পারছিলাম না। পরে মনে হলো, একটা ভয়াবহ
সময় হয়তো আসছে
আমাদের সামনে। তখন রেজিমেন্টে
আমরা যারা বাঙালি
ছিলাম তারা সংকেতের
মাধ্যমে সংঘবদ্ধ
হয়ে পাকিস্তানিদের
প্রতিহত করার জন্য
বদ্ধপরিকর হলাম।
প্র:
১৯৭১ সালে আপনি
কোথায় অবস্হান
করছিলেন ?
উ: তখন আমি
সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে
ছিলাম।
প্র:
১৯৭১ সালে আপনি
আক্রান্ত হয়েছিলেন
কি ?
উ: হ্যাঁ, আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম।
প্র:
আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করলেন
?
উ: আমি বেঙ্গল
রেজিমেন্টে ছিলাম
এবং আমাদের উপর
শুরু দায়িত্ব ছিল। জনগণকে রক্ষার
স্বার্থেই আমরা
আমাদের এই গুরু
দায়িত্ব পালন করেছি।
প্র:
আপনাদের উপর পাকিস্তানিরা
কখন আক্রমণ করলো
?
উ: ২৫ মার্চের
পরেই। সেই
সময় ধরেন, পাবর্তীপুর, ফুলবাড়ি, চরকাই এবং
হিলিতে আমাদের
পাকিস্তানিদের
সংগে লড়তে হয়েছে। প্রথম অবস্হায়
তাদের সংগে লড়ে
আমরা পিছু হটে
যাই।
তাদের
সাথে আমাদের প্রথম
সংঘর্ষ হয় সৈয়দপুরে। তারপর ফুলবাড়িতে
আমরা শেলটার নেই। সেখানে পাকিস্তানিদের
সাথে আমাদের যুদ্ধ
বা গুলি বিনিময়
হয়নি। কিন্তু
তারা আমাদের অবস্হানের
উপর একনাগাড়ে শেলিং
করতে থাকে। আমাদের কাছে ভারী
কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। তাই তাদের
ব্যাপক শেলিংয়ে
আমরা আবার পিছু
হটতে বাধ্য হই। সীমান্ত পার হয়ে
ওপারে ভারতে যাই।
প্র:
সেই সময় আপনাদের
বেঙ্গল রেজিমেন্টের
কতজন সৈনিক আহত
ও নিহত হয়েছিল
?
উ: হ্যাঁ, অনেক আহত
ও নিহত হয়েছেন। না হলেও শতাধিক
সৈনিক আমাদের মারা
গেছে।
প্র:
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনী আপনার এলাকায়
আর কি কি করলো ?
উ: পাকিস্তানিরা
আমাদের এলাকায়
নারী নির্যাতন, লুটপাট
এবং অত্যধিক খুনখারাবি
করেছে।
প্র:
আপনার পরিবারের
কেউ শহীদ হয়েছে
কি ?
উ: হ্যাঁ, আমার এক
জেঠাতো ভাই শহীদ
হয়েছেন।
প্র:
কিভাবে শহীদ হলেন
তিনি ?
উ: ওনাকে লাইন
ডিউটি করার জন্য
ডেকে নিয়ে খান
সেনারা হত্যা করে।
প্র:
আপনার এলাকায় কখন
থেকে মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু হয় ?
উ: জুন-জুলাই
থেকে মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা আবার শুরু
হয়।
প্র:
নতুন করে মুক্তিযুদ্ধে
আবার কিভাবে আপনি
অংশগ্রহণ করলেন
?
উ: পাকিস্তানিদের
আক্রমণে পিছু হটে
সীমান্ত পার হয়ে
আমরা প্রথমে গঙ্গারামপুরে
যাই।
সেখানে
একটা ইয়ুথ ক্যাম্প
হয়। আমরা সেখানে
যোগ দেই। এরপর ইয়ুথ ক্যাম্প
থেকে আমাদেরকে
রায়গঞ্জ-কালিগঞ্জ
হয়ে একেবারে ছয়
নম্বর সেক্টরে
নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২৮দিন
হায়ার ট্রেনিং
করার পর আমাদের
দেওয়ানগঞ্জে নিয়ে
আসা হয়। এখানে
একদিন রাখার পর
আমাদের চিলাহাটি
থেকে শুরু করে
আপনার মির্জাগঞ্জ
পর্যন্ত অপারেশনের
দায়িত্ব দেয়া হয়। দলে আমরা ২২০জন
ছিলাম। এক কোমঙানি। এখানে আসার
পরপরই একদিন সকাল
নয়টার দিকে ভারতীয়
সেনাবাহিনীর মেজর
চৌহান সাহেব আমাদের
কমান্ড করলো যে, আপনারা
পজিশনে যান। মেজর সাহেব
আমাদের উইং কমান্ডার
বাশার সাহেবকে
এ কথা বললেন। তখন তিনি আমাদেরকে
পজিশনে যেতে বলেন। পজিশনে যাবার
আগে ৮জন মুক্তিযোদ্ধাকে
রেকি করার জন্য
পাঠানো হয়। এদিকে আমাদের
দিকেও একই সময়ে
পাকিস্তানিরা
অ্যাডভান্স করে
আসছিল। সেটা
আমরা বুঝতে পারি
নাই।
যে ৮জন
রেকি করতে বেরিয়েছিল
তারা সরাসরি তাদের
সামনে পড়ে যায়। খান সেনারাও
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে
অগ্রসর হচ্ছিলো। আমরা ভাবলাম
এরাও আমাদের লোক। হয়তো তারা
বি.এস.এফ. বা ভারতের
সেনাবাহিনী। রেকি করতে
যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের
তারা বলে আপ কৌন
হ্যায়। তখন
মুক্তিযোদ্ধারা
বলে হাম মুক্তিবাহিনী
হ্যায়। তো, আপ কোন হ্যায়
? তখনই ফ্লাগ
উড়িয়ে পাকিস্তানিরা
ওদের চারদিক দিয়ে
ঘিরে ফেলে হ্যান্ডস
আপ করায় এবং ওদের
ধরে ফেলে। মীর্জাগঞ্জের
হাটখোলার বাঁশঝাড়ে
এবং খেতের আইলসহ
বিভিন্ন জায়গায়
আমরা পজিশনে গেলাম। সেখানে পাকিস্তানিরা
আমাদের উপর সাঁড়াশি
আক্রমণ শুরু করে। তাদের এই জোরালো
আক্রমণ আমরা প্রতিহত
করতে পারি নাই। না পারার কারণে
রেকি করতে যাওয়া
৮ ছেলে এবং আরেকজন
ওখানে মারা গেল। মোট ৯জন ওখানে
মারা যায়। মেজর চৌহান সাহেব
আমাদের অর্ডার
দিলেন পিছনে হট। কিন্তু আমাদের
তিন দিকেই তখন
ব্লক। পশ্চিম
দিক দিয়ে কোনরকম
করে একটা বিলের
ধার দিয়ে আমরা
পলায়ন করলাম। আমরা যেতে
যেতে মীর্জাগঞ্জের
বহুদূর পশ্চিমে
আপনার দেবীগঞ্জের
পাশে বিরাট এক
বাঁশবন পাইলাম। সেই বাঁশবনের
মধ্যে আমরা যাইয়া
সব জড়ো হই। এখানে গণনা হওয়ার
পর নয়টা ছেলেকে
আমরা পাই নাই।
প্র:
তখন মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে জনগণের
মনোভাব কেমন ছিল
?
উ: তখন বেশিরভাগ
জনগণ মুক্তিবাহিনীদের
ভালবেসেছিলেন
এবং সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু রাজাকার
বা আল-বদর এই ধরনের
যারা ছিল, তারা ভাল
ছিল না। তাদের
সংগে বিভিন্ন স্হানে
আমাদের সংঘর্ষ
হয়েছে।
প্র:
আপনার এলাকায় রাজাকার, আল-বদর বা
আল-শামস কারা ছিল
?
উ: আমার জানা
মতে যারা মুসলিম
লীগ সমর্থক ছিল
তারাই রাজাকার
আল-বদর ছিল।
প্র:
এই সকল স্বাধীনতা
বিরোধীদের ধরা
হয়েছিল কি ?
উ: স্বাধীনতা
বিরোধীদের আমরা
কিছু আটক করেছিলাম। অল্প মারপিট
আমরা হয়তো তাদের
করেছিলাম। এরপরে আর কোনরকম
শাস্তি তাদের হয়
নাই।
প্র:
তারা ছাড়া পেল
কিভাবে ?
উ: এ ব্যাপারে
আমাদের উপর কোন
নির্দেশনা ছিল
না। সে কারণে
এবং দেশেরই ছেলেপেলে
হিসাবে আমরা তাদের
ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু যুদ্ধ
চলাকালে তারা কিন্তু
আমাদের ক্ষমা করে
নাই।
প্র:
কোথায় কোথায় আর
কিভাবে যুদ্ধ করেছেন
?
যুদ্ধের
স্মরণীয় ঘটনা দুই
একটি বর্ণনা করেন
?
উ: আমরা ডোমার, গোমনাতী
থেকে শুরু করে
ডিমলা, তারপর কিশোরগঞ্জ, হাতিবান্ধায়
পাকিস্তানিদের
সঙ্গে যুদ্ধ করি। আমাদের সবচেয়ে
বড় যুদ্ধ ছিল চিলাহাটি
বর্ডারে। ওখানে আমাদের
তিনদিন তিনরাত
পাকিস্তানিদের
সংগে আমাদের মোকাবিলা
করতে হয়। এই যুদ্ধে আমাদের
শতাধিকের মত মুক্তিযোদ্ধা
হতাহত হয়। পাকিস্তানিদেরও
অনেক ক্ষয়ক্ষতি
হয়। আমাদের
প্রবল আক্রমণে
টিকতে না পেরে
পাকিস্তানিরা
ওখান থেকে পিছু
হটে ডোমারে চলে
আসে।
তারপর
আমরাও ডোমার পর্যন্ত আসি। ওখানে পাকিস্তানিদের
সঙ্গে সকাল ৮টায়
থেকে রাত ১২টা
পর্যন্ত আমাদের
সংঘর্ষ হয়। রাত ১২টা-১টার
পর অন্তত: ঘন্টাদুয়েক
তাদের দিক থেকে
আর কোন গুলির শব্দ
না পাওয়ায় আমরা
আমাদের গোলাগুলি
বন্ধ করি। গোলাগুলি বন্ধ
করার পর বিভিন্ন
দিক থেকে লোকজন
আসা শুরু করে। তখন জানতে
পারলাম যে, ঐ বেটারা
ডোমার থেকে সৈয়দপুরে
পালাইয়া গেছে।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনার
অস্ত্র কি করলেন
?
উ: যুদ্ধের
শেষে নীলফামারিতে
আমাদের সাব হেড
কোয়ার্টার ছিল। সেখানে আমি
আমার অস্ত্র জমা দিয়েছি। এরপর আমি সিলেটে
চলে যাই। সেখানেই আমাদের
থার্ড ইস্ট বেঙ্গল
রেজিমেন্ট অবস্হান
করছিল। সেখানে
গিয়ে আমি রিপোর্ট
করি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী
: ভবেন্দ্রনাথ
বর্মণ
সাক্ষাৎকার গ্রহণের
তারিখ : অক্টোবর ১৯, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৭