নাম : মো: আবদুস সামাদ

পিতা : মরহুম বদরুদ্দীন

গ্রাম : দণি চাঁদপুর, বাসস্ট্যান্ড পাড়া, ইউনিয়ন : ... ?

থানা : দামুড়হুদা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা (১৯৭১ সালে কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা)

শিক্ষাগত যোগ্যতা : বি.এ. পর্যন্ত (পরীক্ষায় অকৃতকার্য)

১৯৭১ সালে বয়স : ২০/২১

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : চাকরি

 

 

প্র: নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হলো তারপর তো আমাদের এলাকাও পাক বাহিনী দখল করে নেয়তার আগে কিছুদিন আমাদের এলাকা মুক্ত ছিলো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি চুয়াডাঙ্গায় বোমবিং হয়আমরা আমাদের দর্শনা হল্ট স্টেশনের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখলাম দর্শনা থেকে সেটা ভালোই দেখা যাচ্ছিলোপরের দিন আমরা খবর পেলাম যে, দর্শনার দিকেও পাক আর্মি আসছেতখন আমার কাছে একটা বড় ছুরি এবং একটা বন্দুক ছিলোসেই বন্দুকটা ছিলো আমাদের গ্রামের জলিলদের দোনালা বন্দুক, সেটা আমার কাছে ছিলো আমাদের এলাকায় আমরা একটা প্রতিরোধ বাহিনী করেছিলামতার নেতৃত্বে আমিই ছিলামআমরা ভেবেছিলাম যে, এই অস্ত্র দিয়েই পাক বাহিনীকে আমরা প্রতিরোধ করবো তাদের আমাদের এলাকায় আসতে দিবো না কিন্তু তারা যখন গাড়ি নিয়ে আসলো তখন আমরা কিন্তু তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলাম নাআমরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হই পালিয়ে এলাকাতেই ছিলাম

 

এক পর্যায়ে আমার আব্বা আমাকে বললেন যে, আমি শুনতে পাচ্ছি যারা ছাত্র রাজনীতি করে, যারা যুবক, তাদেরকে পাক আর্মি হত্যা করছে প্রতিরোধ বাহিনী করার ব্যাপারে আমরা তিনজন খুব সক্রিয় ছিলামআমি ছাড়া অন্য দুজন ছিলো আক্কেল আহমদ এবং আহমদ আলী আমাদের এই তিনজনের নাম এখানে কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছিলোএর আগের আরো কিছু ঘটনা আছে দর্শনা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিছু বিহারী থাকতোএই বিহারীদেরকে আমরা ২৫ মার্চের পর আটক করেছিলামপরে কিছু বিহারীকে দর্শনায় মেরে ফেলা হয় তাদের কিছু কবর দেয়া হয় দর্শনায়আর কিছু কবর দেয়া হয় শাহপুর মাঠে বিহারীদের একটা ক্যাম্পে আমরা আটক করে রেখেছিলামপরে তাদেরকে মেরে ফেলা হয় মূলত: ইপিআররাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলো

 

এসব ঘটনার কারণেই আব্বা আমাকে বললো যে, তোমাদের তো পাক আর্মি মেরে ফেলবেতখন আমরা চিন্তা করলাম যে, এদিকে থাকলে তো তারা আমাদেরকে মেরেই ফেলবেঅতএব আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেই হবেঐ সময়ই আবার আবুল কাশেম নামে একজন আমাদের বাড়িতে আসেনতাঁর বাড়ি ছিলো কার্পাসডাঙ্গায়উনি কোথায় যেন চাকরি করতেনঐ আবুল কাসেম সাহেবও সেদিন আমার আব্বাকে বললো যে, আমাকে পাক আর্মি পেলে মেরে ফেলবেএটা শুনে আব্বা আমাকে বললো যে, তুমি এখনই ভারতে চলে যাও আব্বা একথা বলার পর আমি সেদিনই  আমার ছোট ভাইয়ের সাইকেল নিয়ে ভারতে রওনা হইআমার ছোট ভাইয়ের নাম ছিলো আক্তারতখন তার বয়স ছিলো ১৪সে আবার আগেই ভারতে চলে গিয়েছিলো সাইকেলটা সে নিয়ে যায়নি

 

যাহোক, আমি সেদিনই এক কাপড়ে সাইকেল নিয়ে ভারতে রওনা হলামআমি প্রথম কার্পাসডাঙ্গায় যাই ওখানে যাওয়ার সময় আমার সাথে আলম, বদিউল, শামসুলের ছেলে আওরঙ্গজেব, জসিমসহ আরো কয়েকজন বিহারীর সঙ্গে পথে দেখা হয় আওরঙ্গজেবের বাবা শামসুল জমাদার ছিলোতারা আমাকে তাড়া করেতখন পাক আর্মি ব্রিজের কাছাকাছি পাহারায় ছিলোমানে যে রেলগেটটা আছে, ওখানে যে কেবিনটা আছে, আমাদের এই বড় কেবিনটা, দর্শনা পার হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাওয়ার রাস্তায় ওখানেই ওদের সঙ্গে দেখা হয় আমার সাইকেল তখন ব্রিজের উপরতো ওই ব্রিজটার কারণেই আমি বেঁচে যাইকারণ ব্রিজটা তারা পার হয়ে আসতে আসতে আমি সাইকেলটা খুব জোরে চালিয়ে চলে যাইতারা আসছিলো হেঁটে তারপর আমি ধুপখালির ভিতর দিয়ে লোকনাথপুরের ওখানে গিয়ে উঠি লোকনাথপুর থেকে কাজীপুর দিয়ে অমি কার্পাসডাঙ্গা যাই কার্পাসডাঙ্গা থেকে আমি ঠাকুরপুর বর্ডার পার হয়ে শিমলা দিয়ে বীরপুর উঠি পরদিন বীরপুর থেকে বাসে করে আমি সোজা চলে যাই বানপুর

 

বানপুর গিয়ে আমি একটা ক্যাম্পে উঠি ওখানে ছিলেন আমাদেরই শামসু ভাইতিনি এখন দর্শনার চেয়ারম্যানতখন তিনি চাকরি করতেনতার বাড়ি সুলতানপুরআমি ওনার কাছে গিয়ে উঠিতিনি টেন্ট খাঁটিয়ে একটা ক্যাম্প মতো করেছিলেনতার পাশেই ছিলো মোজাম্মেল হক সাহেবের একটা টেন্ট মোজাম্মেল সাহেব মানে কেরু কোম্পানির কর্মচারি ইউনিয়নের এক্স সেক্রেটারি ওখানে যাওয়ার পর তারা আমাকে বললেন যে, মাজদিয়াতে ক্যাম্প হয়েছেতুমি ওখানে গিয়ে ভর্তি হওতো ঐ রাতে আমি মোজাম্মেল ভাইয়ের টেন্টে খাওয়া দাওয়া করিতার পরদিন আমি মাজদিয়া চলে যাই

 

প্র: মাজদিয়া ক্যাম্পের দায়িত্বে কে ছিলেন ?

 

উ: সরদার ভাইতিনি পরে আর্মিতে গিয়েছিলেনএখন রিটায়ার করেছেনআর ছিলেন হাশেম মোক্তার সাহেবতার পুটুলিতে বাড়ি

 

প্র: ওখানে আপনি কতদিন থাকলেন ?

 

উ: ওখানে আমি ১৫/১৬ দিন অবস্থান করিএ সময় সামান্য কিছু ট্রেনিং হয়এর মধ্যে একদিন ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব আমাকে তার ওখানে ডেকে নিয়ে বললেন যে, দুধপাতিলা গ্রামে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্প করেছেকি পজিশনে তারা আছে সেটা তুমি দেখে এসোতার নির্দেশ অনুযায়ী আমরা তিন জন সেটা দেখতে যাইআমার সঙ্গে ছিলো সোনা মিয়া এবং রুস্তম আলী আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রেকি করাসে সময় আমাদের কোনো অস্ত্র দেয়নিখালি হাতেই আমরা সেখানে রওনা হই বাংলাদেশে ঢুকে আমি আমারই এক ভগ্নীপতির বাড়িতে রাতে অবস্থান করি পরদিন সকালবেলা আমি দুধপাতিলা গ্রামের ভিতরে যাই দুধপাতিলা গ্রামের ভিতরে রাস্তার ধারে একটা কাঁঠাল বাগান আছেসেই কাঁঠাল বাগানে আমি আর্মিদের বাংকার দেখলামতখন সোনামিয়া আমার সঙ্গে ছিলো রুস্তম অসুস্থ হয়ে পড়েছিলোতার ডায়রিয়া মতো হয়েছিলো দুধপাতিলায় সব দেখেটেখে একদিন পর আমরা ভারতে চলে যাই ভারতে যাওয়ার সময় আমার বোন আমাকে কিছু টাকা দেয়আমি তাকে বলছিলাম যে আমার কাছে টাকা পয়সা নাইআমার চলতে খুব অসুবিধা হচ্ছেতো সে কিছু টাকা আমাকে দেয়

 

যাহোক, আমি ভারতে গিয়ে ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজ সাহেবকে সব রিপোর্ট করি রিপোর্ট করার পর তিনি কি করেছেন সেটা আমি আর বলতে পারবো না তারপর আরো কয়েকদিন মাজদিয়া ক্যাম্পে থাকলামএর মধ্যে সেখানে আমার ছোট ভাইটাও চলে আসেতখন থেকে আমরা দুই ভাই একসাথে থাকলাম কয়েকদিন পর আমাদেরকে বিহারে ট্রেনিংয়ের জন্য নিয়ে যায়তার আগে আমাদের কল্যাণীতে নেয় কল্যাণীতে আমাদের কয়েকটা গ্রুপে ভাগ করা হয় তারপর ওখান থেকে আমরা ট্রেনিংয়ে যাই

 

প্র: আপনারা কখন ট্রেনিংয়ে গেলেন ?

 

উ: তখন জুন মাসের শেষ অথবা জুলাই মাসের প্রথম দিক হবে

 

প্র: আপনাদের কত দিনের ট্রেনিং হলো ?

 

উ: ট্রেনিং হয়েছিলো ৩৫ দিন

 

প্র: কি কি ট্রেনিং নিলেন ?

 

উ: নিয়মিত পি. টি. প্যারেড তারপর তো অস্ত্রের ট্রেনিং রাইফেল, স্টেনগান, তারপরে এস.এল.আর, এল.এম.জি. তারপর টু ইঞ্চ মর্টার-এইগুলোর ট্রেনিং হয়েছিলো তারপর গ্রেনেড ছোঁড়ার ট্রেনিং হয় সবচেয়ে বেশি ট্রেনিং হয় এক্সপ্লোসিভেরমাইন, অ্যান্টি ট্যাংক মাইন এ গুলির উপর বেশি ট্রেনিং হয়েছিলো আমাদেরকে ট্রেনিংয়ের সময় একটা কথা বেশি বলতোতারা বলতো, তোমরা পাক আর্মিকে মারবা, কিন্তু একই সঙ্গে পালানোর পথও খোলা রাখবাহিট অ্যান্ড রান পদ্ধতি আর কিতুমি যদি ধরা পড়ো তাহলে তুমি তো মুক্তিযুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা আর রাখতে পারবা নাঅতএব তোমার পালাবার রাস্তাটা অবশ্যই তুমি পরিষ্কার রাখবা ওখানে আমাদেরকে ট্রেনিং দিতো ইন্ডিয়ান আর্মি

 

প্র: ট্রেনিং শেষ করে আপনি কোথায় এলেন ?

 

উ: ট্রেনিং শেষ করে আমরা আবার আসি কল্যাণী কল্যাণী থেকে আমাদেরকে কৃষ্ণগরে নিয়ে যায় কৃষ্ণনগর থেকে আমরা বাংলাদেশে ঢুকে অপারেশন শুরু করি

 

প্র: কৃষ্ণনগরের কোথায় ?

 

উ: কৃষ্ণনগর হর্টিকালচারে ক্যাম্প ছিলোওখান থেকে প্রথমে আমরা ১০ জনের গ্রুপ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকিআমার উপর একটা গ্রুপের দায়িত্ব দেয়আমার গ্রুপে তখন আমি সহ ছিলো ১০ জন আমাদের সকলকে তখন অস্ত্র দেওয়া হয়নি৬ জনকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিলো আমাকে দিয়েছিলো স্টেনগানআর কিছু গ্রেনেড দেওয়া হয়েছিলো আমাদেরকেওসব নিয়ে আমরা বাংলাদেশের ভিতরে আসি

 

প্র: কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আপনারা এসেছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো ট্রেন উড়ানো, ব্রিজ ভাঙাআমরা একবার পুলিশের ওপর হামলা করে বেশকটা রাইফেল নিয়ে এসেছিলাম এজন্য আমাদের কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি

 

প্র: তারা কি বাঙালি না অবাঙালি ?

 

উ: বাঙালি পুলিশ আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো তাদেরকে ভয় দেখাবো যেহেতু তারা বাঙালি সেহেতু তাদেরকে আমরা মারবো নাতো আমরা ওদিকে গেলামআমার সঙ্গে ছিলো মুজিবুর, ভাদু, সদর, সুজা তারপর মফিজ বলে একটা ছেলে ছিলোআমরা রাতের অন্ধকারে কাদার মধ্য দিয়ে ঘটনাস্থলে গেলামঐ পুলিশ ফোর্স ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে থাকতোসেটা একটা বড় ঘর ওখানে গিয়ে দূর থেকে দেখি সে ঘরের দরজা, জানালা আটকানো চিন্তা করছি আমরা কি করবোআমরা ওখানে অপো করছিলামইন দি মিন টাইম দেখি যে, একটা ঘোড়ার গাড়ি আসছে ঘোড়ার গাড়িতে হ্যারিকেন জ্বালানো রয়েছেসেটা দেখে ভাবলাম ঘোড়ার গাড়িতে আবার কে আসছে ! এতো রাতে এখানে কে আসবে তাহলে পুলিশরা কি কাউকে ধরে নিয়ে আসছে ? তখন চিন্তা করলাম যদি সত্যি তারা কাউকে ধরে নিয়ে আসে তবে তাকে আমাদের বাঁচাতে হবেতো ঘোড়ার গাড়ির পিছনে পিছনে আমরা এগিয়ে গেলাম ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসের সামনে ঘোড়ার গাড়িটা দাঁড়ালোদেখি যে, ঐ এলাকার চেয়ারম্যান ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামলেনতার নাম মতিয়ার রহমানতিনি একাই ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে ঘরের দরজায় নক করলেনতাকে দেখে পুলিশরা দরজা খুলে দিলো চারদিকে অন্ধকারআমরা তার ঘোড়ার গাড়ির পিছনে পিছনে ওখানে গিয়েছিআমি ঢুকবো কি ঢুকবো না এই চিন্তা করছিইন দি মিন টাইম আমার ছোট ভাই আমার পাশ দিয়েই ঘরে ঢুকে পড়েতখন আমি চিন্তা করলাম যে, যদি ওখানে পুলিশ না থেকে আর্মি থাকে তাহলে তো বিরাট বিপদ হবেযদিও আর্মি থাকার আলামত আমি দেখলাম নাতখন আমিও বাধ্য হয়ে সবাইকে নিয়ে ঐ ঘরে ঢুকে তাদেরকে হান্ডস আপ করালাম পুলিশ সব হতভম্ব হয়ে হাত তুলে দাঁড়ালোতখন রাইফেলগুলো সব আমরা নিলাম এবং তাদের যে গুলিগুলো ছিলো সেগুলোও আমরা নিয়ে নিলাম পাশেই আর একটা ঘর ছিলোসে ঘরে ঢুকে দেখি যে, একজন পুলিশ চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইফেল একটা ঠিকই তার হাতে আছে কিন্তু সে থর থর করে কাঁপছিলোআমরা তার হাত থেকে রাইফেলটা কেড়ে নিলামএরপর সব পুলিশদের আমরা বললাম যে, আপনারা বাঙালি, পাকিস্তান আর্মিদের সঙ্গে না থেকে মুক্তিযুদ্ধে চলে যানআমরা আপনাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়েছি এটা পাক আর্মি জানতে পারলে আপনাদের বিপদ হতে পারে।  চেয়ারম্যানকে আমরা কিছু বলিনিসেও থর থর করে কাঁপছিলো

 

প্র: এটা কোন মাসের ঘটনা ?

 

উ: খুব সম্ভব সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা

 

প্র: পরবর্তীতে সেই পুলিশদের কেউ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো কি ?

 

উ: হ্যাঁ, বেশিরভাগ আমাদের অনুরোধে ভারতে গিয়েছিলো তাদের সাথে আমার দেখাও হয়েছিলোএরপর শাহপুর ব্রিজটা আমরা মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেই ব্রিজটা উড়িয়ে দেওয়ার পরে আমরা ওখান থেকে আর এক গ্রামে গেলাম সেখানে আমরা শাহাদত ডাক্তারের বাড়িতে থাকিওখান থেকে পরদিনই চলে যাই অন্যত্র একদিন পর আমরা শুনলাম, পাকিস্তান আর্মি রাজাকারদের সহায়তায় শাহাদাত ডাক্তারের বাড়িতে আক্রমণ করেছে এবং তার বাড়ি থেকে একজনকে ধরে নিয়ে গেছেতার নাম আলমখবর পেয়ে আমরা তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলাম কিন্তু আমরা তাকে উদ্ধার করতে পারি নাই আলমের কাছে একটা রাইফেল ছিলোসে রাইফেলটা তাকে আমরাই দিয়েছিলাম পুলিশদের কাছ থেকে যে রাইফেলগুলো আমরা কেড়ে নিয়েছিলাম তার একটা আলমকে দিয়েছিলামপাক আর্মি ঐ রাইফেল সহ তাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেএরপর ঐ দিনই আর একটা ঘটনা ঘটে

 

প্র: কি সেই ঘটনা ?

 

উ: রাতে এক গ্রামে আমি রাস্তায় হাঁটাহাটি করছিলামআমরা সবাই খালি গায়ে ছিলামশুধু হাফ প্যান্ট পরাদল নেতা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আমার একটা নির্দেশ ছিলো যে, রাতে বাইরে থাকলে কেউ তোমরা জামা গায় দিবা না বিশেষত: সাদা গেঞ্জিসাদা গেঞ্জি কারো গায়ে থাকলে আমরা মনে করতাম যে, সে আমাদের লোক নাতো রাতের অন্ধকারে সেদিন আমি হাঁটছিএক সময় হঠাৎ শব্দ পেয়ে আমি সতর্ক হলামএকটু পর দেখি যে, আমার পাশ দিয়ে সাদা গেঞ্জি গায়ে একজন হেঁটে যাচ্ছেতখন আমি তাঁকে খপ করে জাপটে ধরে ফেলিআমার হাতে ছিলো স্টেনগানের ম্যাগজিন কাঁধে স্টেনগানসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি সেই স্টেনগানের ম্যাগজিন দিয়ে তার মাথায় আঘাত করিসে তখন পড়ে গেলোএটা ঘটলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ম্যাগজিনের আঘাত খেয়ে পড়ে গেলো পর সে চিৎকার করে উঠে বলছে, ভাই আমাকে আর মেরেন না, আমি নবীএই নবী আবার আমাদের দলেরই একজন সদস্য ছিলোতখন তাকে আমি বললাম, তুই গেঞ্জি গায়ে দিলি কেন ? সে বললো, ভাই আমার খুব শীত লাগছিলো, তাই গেঞ্জি গায়ে দিয়েছিআমি বললাম, তোদের না নিষেধ করেছি গেঞ্জি গায়ে দিবি নানবীর মাথায় আমি খুব জোরে আঘাত করেছিলামফলে রক্তরণ শুরু হয়েছিলো তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে গেলাম একটা ফার্মে সেখানে একজন লোকই ছিলোতার নামটা আমার এখন মনে নাইএখনও সে সেখানে চাকরি করেতার বেশ বয়স হয়ে গেছেতাকে বললাম কিছু  টুকরা কাপড় এবং পানির ব্যবস্থা করতেআমি নবীর মাথাটা ওখানে ব্যান্ডেজ করে দিলামঐ লোকটা আমাদের দুজনের জন্য খাবারও এনেছিলোআমরা দুজনই খুব ক্ষুধার্ত ছিলামআমরা তার দেয়া খাবারটা খেয়ে গ্রামের ভিতর গেলাম পরদিন দিন রাতে ডোঙ্গায় করে নবীকে নিয়ে আমি বাওর পার হয়ে বানপুর গেলামবাকি সঙ্গীরাও আমাদের সঙ্গে ছিলোযে রাইফেল গুলো পুলিশদের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সেগুলো ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাছে জমা দিলাম ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব বললেন, রাইফেলগুলো সুবেদার মেজর শওকতের কাছে জমা দিতেওখান থেকে আমাদের গাড়িতে করে কৃষ্ণনগর পৌঁছে দেয়া হলো কৃষ্ণনগর গিয়ে শওকত সাহেবের কাছে আমরা অস্ত্রগুলো জমা দিলাম

 

প্র: এরপরে আপনি আর কোথায় অপারেশন করলেন ?

 

উ: তারপরে আমাদেরকে নিজ নিজ জেলায় অপারেশন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়তখন আমাদের আবার নিয়ে গেলো বানপুরে বানপুর যাওয়ার পরে আমাদেরকে ইপিআরদের সঙ্গে দিলো তাদের সঙ্গে আমরা প্রথম অপারেশন করি ধোপাখালিএই অপারেশনের সময় মনসুর বলে ইপিআর-এর একজন আমাদের নেতৃত্ব দেনতিনি সেদিনের জন্যে আমাদের কমান্ডার ছিলেনআমরা রাতের অন্ধকারে বানপুর থেকে হেঁটে ধোপাখালি গিয়ে পজিশন নেই সেদিন আমার হাতে ছিলো একটা এস.এল.আর.কথা ছিলো সিগনাল পেলে আমরা গুলি শুরু করবোএক সময় আমাদেরকে সিগনাল দিলো ফায়ার করারআমরা ফায়ার দেওয়ার সাথে সাথেই পাকিস্তান আর্মি জবাব দেয়তারা এমনভাবে বৃষ্টির মতো ফায়ার শুরু করলো যে আমরা আর কেউ মাথা তুলতে পারছিলাম না পিছনের দেওয়ালে সেই গুলি লাগছে দেওয়ালের মাটির চাপড়া এসে আমাদের কারো কারো উপর পড়ছিলোমাটি আমাদের প্রায় ঢেকে দিচ্ছে