নাম : মোঃ আবুল কালাম

গ্রাম : কাইয়ুমপুর

ডাকঘর : মন্দভাগ

ইউনিয়ন : কাইয়ুমপুর

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ১৯

১৯৭১ সালে পেশা : কলেজ ছাত্র

বর্তমান শিক্ষাগত যোগ্যতা : বি.এ. বিএড

বর্তমান পেশা : শিক্ষকতা

 

 

 

মোঃ আবুল কালাম সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননিকিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবদান রেখেছেনএকজন মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে লড়াই করে যে অবদান রেখেছেন-তার চাইতে বেশি কিছু করেছেন বলে তিনি দাবি করেন

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণ সম্পর্কে কি শুনেছেন ?

 

উ: এই ঘটনার কিছু দিন পরেই দেখলাম যে অনেক লোক আমাদের বাড়ির পাশ দিয়া শহর ছাইড়া ওপারে (ভারতে) চইলা যাইতেছেতারা বোধহয় ঘটনা আগেই আঁচ করতে পারছে যে কি হবেতারা মনে হয় শহরে থাইকা বুঝলি যে এই দেশে থাকার মতো তাদের কোনো পরিবেশ থাকবে নাএই ধরনের মনোভাব নিয়াই তারা তিন চার দিন পথ হাইটা ভারতে চইলা যায়তাদের কাছ থেইকা পাকিস্তানিদের হামলার খবর শুনছি,মানুষ মারছে শুনছি

 

প্র: ১৯৭১ সালের স্মরণীয় ঘটনার কথা কি কিছু মনে পড়ে ?

 

উ: ১৯৭১ সালে আমার তিনটা ঘটনাই বেশ স্মরণীয়প্রথম ঘটনা হইল-আমি যখন আমার শ্বশুর বাড়ি কান্দাপুর থেকে আসতেছিলাম,মাঝে চানলা গ্রাম পড়ে সেখানেই ঘটনা ঘটেমাসটা ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসঠিক সকাল ৭টায় কিছু পাঞ্জাবি আইসা চানলা আক্রমণ করছিলতারা আগে থেকে খচর জানছে যে ঐ গ্রামে অনেক হিন্দু আছেতারা গ্রামে আইসা বাড়িঘরে আগুন লাগাইলসেখানে কিছু মন্দির ছিল এবং মন্দিরে মূর্তি ছিলঐসব মূর্তি দেইখা পাঞ্জাবিরা আরো ক্ষেইপ্যা যায়তারা বোধহয় ভাবছে এটা হিন্দুর আড্ডাতারা মন্দির ভাঙল,তারপর অনেক বাড়িঘরে আগুন লাগাইল,লুটতরাজ করলোএকটা বৃষ্টি আসছিল খুব জোরেআমি পশ্চিমদিক থেইকা যাইতেছিল-তারে জিজ্ঞাসা করলাম যে পাঞ্জাবিরা কোথায়? সে কইল চইলা গেছেঐ লোকটা আমাকে ফাঁকি দিল না সত্যি কথাই কইল এইডা আমার বুঝে আইল নাআমি এগুতেছিলামঠিক উত্তর চানলা বাজার থেইকা একটা রাস্তায় উঠার পরেই পাঞ্জাবিরা আমাকে দেখে ফেলে এবং আমাকে ডাক দিলতখন আমি সথ্যিকারভাবেই ভয় পেয়েছিলামমনে হইল আজকা হয়তো আমার আর রক্ষা নাইসাথে আমার এক ভাতিজা ছিলতার বয়স তখন আনুমানিক ৭/৮ বৎসর হবেপাকসেনারা কইল যে এদার আওআমি আসতেছি ঠিকই কিন্তু আমার চৈতন্য বোধহয় তখন ছিল  নাআমাকে নিয়া এরা অগ্রসর অইল বাজারের দিকেআমার সাথে এরা আর বেশি কোনো কথা বলতেছে নাএমন অবস্হায় দেখা গেল যে তাদের সাথের এক পাঞ্জাবি এক লোককে ধইরা নিয়া আইসা বলল যে উস্তাদ ইয়ে মালোয়ান হ্যায়মালোয়ান বলার সাথে সাথে তাকে এমনভাবে তারা আক্রমণ করল যে বলার কথা নয়তাকে হত্যা করল যন্ত্রণা দিয়াতখন কিন্তু আমি আরো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গেলামমনে মনে ভাবছি একে মারার পরই আমাকে মারবেতখন আমি পরপারের চিন্তা করতেছিলামএরপরে হঠাৎ একজন পাঞ্জাবি আমার দিকে ফিরে কয় যে তোম হিন্দু, ইন্ডিয়ামে পাসহোগাআমি কইলাম যে নেহি উস্তা,আমি কসমসে বলতা আমি মুসলমান,সাচ্চা মুসলমানমনে হয় কথাডা বিশ্বাস করছিলআমাকে তারা মুক্তি দিয়েছিলমনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম

 

প্র: আপনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন ?

 

উ: সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি নাইসহযোগিতা করেছি বিভিন্নভাবেএকজন মুক্তিযোদ্ধা যা করছে তার চেয়ে আমি অধিক করছি বইলা আমার বিশ্বাস আরকি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করল ? কিভাবে আক্রমণ করল ?

 

উ: এরা বিশেষভাবে চৌমুহনী দিয়ে মানে আমাদের যে কালিয়ারার পুল ছিল এইখান থেকে তারা গুংগুর নদী দিয়া সালদা নদী পর্যন্ত তাদের দখলে নেওয়ার লক্ষ্য ছিলএখানে আসার জন্য পথে প্রথম বাধা দূর করতে তারা এইসব গ্রামে আক্রমণ করলসময়টা ছিল এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিআক্রমণের পর মানুষজন যে যেদিকে পারল পালিয়ে প্রাণে বাঁচতে চাইলস্তেস্তে আমরা ভারতে চইলা গেছিলামবর্ডারের সাথেই রাধানগর ছিলঐখানে গিয়া আশ্রয় নিলাম

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়?

 

উ: মে মাসের প্রথম থেকেই মুক্তিবাহিনী আস্তেস্তে এ দেশে ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্নভাবে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করার জন্য তারা পথ খুঁজে

 

প্র: এদেরকে সংগঠিত করার জন্য কারা নেতৃত্ব দিল?

 

উ: এ দেশের ইপিআর,আনসার যারা আছিল বা আর্মির বাঙালি সদস্য যারা আছিল ছাত্ররা ছিল-তারা সকলে মিলে প্রশিক্ষণ দিতপ্রথমে তাদের আন্ডারেই প্রশিক্ষণ আগায় নিয়া গেছেএই এলাকায় আমাদের মালেক স্যার ছিল, বায়েক স্কুলের বর্তমান হেড মাস্টারউনিই বিশেষভাবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে,কার্ড দেয়ার ব্যবস্হা করছেন

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কি ছিল?

 

উ: সত্যিকার অর্থে প্রথম কিন্তু মনে করছিল যে পাঞ্জাবির সাথে লড়াই করে মুক্তিবাহিনী দ্বারা এ দেশটাকে মুক্ত করা সম্ভব হবে নাএ ধরনের একটা সন্দেহ ছিল তাদেরকিন্তু স্তেস্তে যখন মুক্তিবাহিনী একটু শক্ত হইল এবং বিভিন্নভাবে যখন তাদেরকে একটু আটকায়ে দিল,প্রতিরোধ করলো এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যখন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের হত্যা করতে লাগল-তখন আস্তেস্তে মানুষের মনোবল বাড়লতারা ভাবলো যে এ দেশ স্বাধীন হবে

 

প্র: আপনি বিভিন্ন গেরিলা বা সম্মুখ যোদ্ধাদেরকে কিভাবে সহযোগিতা করেছিলেন?

 

উ: মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ার ব্যাপারে আমার একটা পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ছিলযার জন্য আমি ব্যক্তিতভাবে যুদ্ধে যেতে পারি নাইকিন্তু আমি সক্রিয় সহযোগিতা করেছিআমি সক্রিয়ভাবে তাদের সাথে কাজ করেছিএকদিনের ঘটনার কথা বলি: সালদা নদীতে এরা আসল পর বলল যে আপনার যাইতে হবেআমি চইলা গেলামমুক্তিবাহিনীর এই দলে কিছু ছাত্র,কিছু ইপিআর-এর লোক ছিলবেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকও ছিলকিন্তু এরা প্রকৃত পরিচয়টা দিত নাতবে জানতামনৌকায় উঠার পর আস্তেস্তে খবর নিলাম সবযারা ছাত্র তাদের সাথে আমার আলাপ আলোচনা হল,একটা সম্পর্ক হইয়া গেল,একটা পরিচয় হইয়া গেলএদের থেকে জানতে পারলাম ইপিআর-এর লোক আছে,বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক আছেতারা রাস্তায় যাইয়া সালদা নদী এলাকায় পাঞ্জাবিরা আস্তানা গাড়ছে এখানে আক্রমণ করবোআক্রমণটা ছিল তখন ত্রিমুখীপূর্ব দিক দিয়াও ছিল,আর এদিক দিয়া কিছু গাংয়ের ওপার,আর গুংগুর নদীর উত্তর পাড়ে ছিলউত্তর পাড়ের ডিফেন্সের সাথেই আমরা জড়িত ছিলামতখন দেহা গেল যে ভারত থেকে অনেক বোম্বিং করা হলোএলাকা একদম ধুমা হইয়া গেলআমরা মনে করলাম যে পাঞ্জাবি বোধহয় একদম শেষ হইয়া গেছেকিন্তু যখন পূর্ব দিক থেইকা জয়বাংলা আওয়াজ হলো তখন পাঞ্জাবিদের রাইফেল গর্জন কইরা উঠলোবুঝা গেল তাদের কিছুই ক্ষতি হয় নাইএখানে পাঞ্জাবিদের কতটুকু ক্ষতি হইছে জানি না কিন্তু ইন্ডিয়ান সৈন্য বেশ মারা গিয়েছিলআমার নৌকায় যেগুলা পার হইল সেখানে মৃতই হইবে ৩০/৩২ জনের মতোআহত অনেকসরাসরি কিছু ইন্ডিয়ান ফোর্স এখানে ছিলএখানে আরেকটা বিষয় যে এখানে কিন্তু ইন্ডিয়ান ফৌজই বেশি আহত হইল,মুক্তিবাহিনীর আহত হবার খবর আমরা পাই নাইকিন্তু ১২টার পর দেখা গেল যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক সৈনিক সরাসরি একদম পাঞ্জাবিদের বাংকারের মুখে যাইয়া গুলি চালাল এবং এর ফলে বেশ কয়েকজন পাঞ্জাবি নিহত হয়এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম শফিউল্লাহতাঁর বাড়ি অইল বরিশালতাঁর পরনে ছিল একটা সাদা প্যান্ট এবং গায়ে একটি এক্সারসাইজ গেঞ্জিসে কমান্ড শুনে নাইতাঁর যাওয়ার কথা ছিল নাএইভাবে ছয় বার আক্রমণ করার পর এখান থেকে সইরা পড়ছিল পাঞ্জাবিরা অর্থাৎ সালদা নদী ছাড়তে বাধ্য হইছিল আরকিঅনেক পাঞ্জাবির লাশ বাংকারে পাওয়া গেছিলএইভাবে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে গেছি-তাঁদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করছি

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎতার গ্রহণের তারিখ : ১ নভেম্বর, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৫৮