নাম
:
মোঃ
আফাজউদ্দীন
পিতা
:
মৃত
সাঈদউদ্দীন
গ্রাম
:
রঘুনাথপুর,
ইউনিয়ন
:
রামপুর,
ডাক
:
নুরুল মজিদ
থানা
:
পার্বতীপুর,
জেলা
:
দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : এস. এস. সি.
১৯৭১
সালে বয়স : ১৫/১৬
১৯৭১
সালে পেশা : ছাত্র,
বর্তমান
পেশা : বেকার
প্র:
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চ পাক
সেনাদের
আক্রমণ
সম্পর্কে
আপনি কি শুনেছিলেন
?
উ: পরদিন
২৬ মার্চ
রেডিওতে
শুনেছিলাম, ২৫
মার্চ রাতে পাকিস্তানি
সেনারা
বাংলাদেশের
নিরীহ
মানুষের উপর
অতর্কিত
আক্রমণ শুরু
করেছে, বিভিন্ন
শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে
তারা আক্রমণ চালিয়ে
ছাত্রদের
হত্যা করেছে; পুলিশ, ইপিআর
এবং সাধারণ
মানুষদেরও
তারা
নির্বিচারে
হত্যা করছে-
এমন সব কথা
শুনলাম
বিদেশী রেডিও
থেকে।
প্র:
১৯৭১ সালে
পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর
হাতে আপনি
আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?
উ: হ্যাঁ, দেশের
ভিতর যুদ্ধ
করতে এসে
আক্রান্ত
হয়েছিলাম। ’৭১
সালে আমাদের
এই এলাকার
ভালো যোগাযোগ
বলতে ছিলো রেল
গাড়ি। কিন্তু
যুদ্ধের সময়
আমাদের এলাকায়
দেখেছি রেল
গাড়িতে কোনো কম্পার্টমেন্ট
নেই। রেলের
ইঞ্জিনের
সামনে থাকতো
একটা বালু
ভর্তি ওয়াগন। পিছনেও
খালি ওয়াগন। এ রকম
রেলগাড়িতে
করে পাক
সেনারা প্রায়
প্রতিদিনই এই
এলাকায়
অপারেশনে
আসতো। দিনেই
আসতো বেশি। আমাদের অত্র
এলাকায় প্রায়
দিনই পাক
সেনারা আসি
নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার
করতো। তখন
আমরা কয়েকজন
মুক্তিযোদ্ধা
মনে করলাম যে, এটার
কোনো ব্যবস্হা
করা যায় কিনা। তারপর
আমরা ৭ জন
মিলে একটা দল
গঠন করলাম। এখানে
করতোয়া নামে
একটা ব্রিজ
আছে খোলাহাটি স্টেশনের
পাশে। আমরা
সেই ব্রিজের
এক জায়গায়
পজিশন নিলাম
সকাল ৮টার দিকে। রেল লাইন
থেকে কিছু দরে
আমাদের অবস্হান। আমরা সকাল
৮টা থেকে বেলা
১২টা পর্যন্ত
পজিশন নিয়ে
অপেক্ষা করার
পরও দেখি
সেদিন আর খান
সেনাদের রেল
গাড়ি আসে না। তারপর
জোহরের
নামাজের আজান
হলো। সে দিন
আমাদের আর
একখানে খাওয়ার
কথা। খানদের
গাড়ি আসছে না
দেখে যেখানে
আমাদের খাওয়ার
কথা আমরা
সেদিকে রওনা
দেই। স্টেশনের
পূর্ব পাশে
লাইনের পাশ
দিয়ে যাচ্ছি। আমি সবার
পিছনে, এমন সময়
পিছনে
তাকাইয়া দেখি
যে,
পার্বতীপুরের
দিকে রেল
গাড়ির মতো কি
যেন একটা দেখা
যায়। লাইনে
দাঁড়িয়ে সোজা
লক্ষ্য করলাম, মনে হলো
কি যেন একটা
গাড়ির মতো
দেখা যাচ্ছে। তবু মনে
মনে ভাবলাম, এটা
অন্য কিছু হতে
পারে। তারপর
আবার হাঁটা
শুরু করে
দিলাম
সাথীদের সঙ্গে। দশ গজ না
যাইতেই আবার
পিছনে ফিরে
দেখি, নাহ্, ওটা তো
গাড়িই মনে হয়। তখন
সাথীদের ডেকে
বললাম, দেখো তো এটা
গাড়ি না অন্য
কিছু। তারা
দেখে বললো, মনে তো
হয় একটা ট্রেন
আসতেছে। কইতে কইতেই
ট্রেনটা
খোলাহাটি
স্টেশনের কাছে
আসি গেলো। পাক সেনারা
খোলাহাটি
স্টেশনের ফুট
লেনে রেল গাড়িটা
দাঁড় করালো। গাড়িটা
দাঁড় করায়েই
তারা আমাদের
দিকে লক্ষ্য
করে
এলোপাতাড়ি
গুলি শুরু করে
দিলো। আল্লার
ইচ্ছা যে, আমাদের
কারো শরীরে
গুলি লাগে নাই। আমরা
সঙ্গে সঙ্গে
পজিশনে গেলাম। আমাদের
আরো কিছু
সঙ্গী ছিলো আশ
পাশে। গুলির
শব্দ পাইয়া
তারাও চলে
আসলো। তারা
আইসা আমাদের
সঙ্গে যোগ
দিয়া গুলি
করতে লাগলো। আমাদের দল
তখন ভারি হইয়া
গেছে। এক
পর্যায়ে খান
সেনারা
ইঞ্জিনের
সামনের বালু
ভর্তি
ওয়াগনটা
ছাড়াই ইঞ্জিন
আর একটা খালি
ওয়াগন নিয়া
পার্বতীপুরের
দিকে পলাইয়া
গেলো। খানদের
আমরা মারতে বা
ধরতে পারি নাই। আক্রান্ত বলতে-
এভাবেই আক্রান্ত
হইছিলাম।
প্র:
আপনি কেন
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলেন ?
উ: আমি
দেশকে
ভালোবাসি। দেশকে
স্বাধীন করার
জন্যই আমি
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করেছিলাম।
প্র:
কিভাবে
অংশগ্রহণ
করলেন ?
উ: পাকিস্তানিদের
অত্যাচারে
অতিষ্ট হয়ে
ভারত চলে
গেলাম। ভারতে
যাইয়া প্রথম
কাটলা ক্যাম্পে
ভর্তি হইলাম। কাটলা
থেকে আবার
পতিরামে
গেলাম। পতিরাম
থেকে আবার
হায়ার
ট্রেনিংয়ের
জন্য পাঠালো
শিলিগুড়িতে। ওখানে ট্রেনিং
নেওয়ার পর চলে
আসলাম
তরঙ্গপুর। ওখান থেকে
আর্মস
অ্যামুনিশন
নেওয়ার পর
আসলাম
পার্বতীপুর-বদরগঞ্জে।
প্র:
কোন্ কোন্
জায়গায় যুদ্ধ
করলেন ?
উ: করতোয়া
ব্রিজ, সাপার ব্রিজ
এবং বদরগঞ্জে
যুদ্ধ করেছি।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করলো ?
উ: মার্চ
মাসে যখন
যুদ্ধ শুরু
হইলো, তার
কিছুদিন পর
থেকেই শুরু
হইলো তাদের তৎপরতা।
প্র:
তারা আপনার
এলাকায়
কিভাবে
আক্রমণ করলো ?
উ: তারা রেল
গাড়িতে আসি
আক্রমণ করে
আমাদের
বাড়িঘর
পোড়াইয়া দিছে। বিহারী আর
রাজাকার-রা
খান সেনাদের
আমাদের এলাকায়
আসার পথের
দিশা দিছে। তাদের
সহযোগিতায়
খান সেনারা
আমাদের
এলাকায় আইসে
আক্রমণ করছে।
প্র:
তারা কিভাবে
আসতো ?
উ: অনেক
সময় ট্রেনে
আসছিলো। অনেক সময়
পায়ে হেঁটেও
আসছিলো।
প্র:
পাক বাহিনী
আপনার এলাকায়
এসে কি করলো ?
উ: এখানে
এসে বাড়িঘর
জ্বালিয়ে
দিলো, নিরীহ
মানুষজন
হত্যা করলো
এবং আমাদের
যার যা ছিলো
সব লুট-পাট
কইরা নিয়া
গেলো। নারী
নির্যাতনও
করলো। এ
সব তো তারা
করছিলো সব সময়।
প্র:
সেই সময় আপনার
পরিবারের কেউ
শহীদ হয়েছে কি
?
উ: না, আমার
পরিবারে কেউ
শহীদ হয় নাই।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন থেকে
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয় ?
উ:
জুন-জুলাইয়ের
দিক থেকে।
প্র:
তখন
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
জনগণের মনোভাব
কেমন ছিলো ?
উ: ভালো
ছিলো। তারা
আমাদের খুব
সাহায্য করছে।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
কারা রাজাকার
ছিলো ?
উ:
রাজাকার ছিলো-
মোসলেম, ছায়েদ, বাকী আর নর
হোসেন।
প্র:
শান্তি কমিটিতে
কারা ছিলো ?
উ: শান্তি কমিটিতে
ছিলো কুখ্যাত
নঈম কাজী আর
বদরগঞ্জে ছিলো
বাঁচা মিয়া।
প্র:
তারা এখন
কোথায় ?
উ: দেশ
স্বাধীন
হওয়ার পর নঈম
কাজী
দিনাজপুরে ভাইগে
যায়। ওখানে
সে আত্মগোপন
করে ছিলো। তাক ধরা
হইছিলো। ১৯৭৫ সালের
পর সে রেহাই
পাইছে।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
আপনার গ্রামের
অবস্হা কি
দেখলেন--
স্কুল, বাড়িঘর, ব্রিজ, মসজিদ-মন্দির
এগুলো ?
উ: আমাদের
এই খোলাহাটির
ভেতরে খান
সেনা, বিহারী
আর রাজাকাররা
যে অন্যায়
অত্যাচার করছে
সেটা
বোধহয় অন্য
জায়গায় হয়নি। আমাদের
এলাকার
গ্রামগুলোর
কিছু কিছু
বাড়ি তারা ৩/৪
বার করে
পুড়ায়ে দেয়। কিছুই ছিলো
না আমাদের। ভিটেমাটি
একেবারে
নিশ্চিম করে
দিছিলো। রাত পোহালেই
তারা আমাদের
এলাকায় আসে
অত্যাচার
শুরু করছে। মানুষজন সব
অতিষ্ট ছিলো
তাদের
অত্যাচারে।
প্র:
যুদ্ধকালের
কোনো ঘটনার
কথা কি আপনার
মনে পড়ে- যা
আজো আপনার
স্মৃতিতে
উজ্জ্বল হয়ে
আছে ?
উ: আমরা
একদিন সাপার ব্রিজে
রাজাকার ধরতে
আসি। আমরা
মনে হয় ৭৫
জনের মতো
ছিলাম। আমরা
৭টা ভাগে ভাগ
হইলাম। একেক
গ্রুপে ১০ জন, ১১ জন
করে ছিলাম। এভাবে গ্রুপ
ভাগ করে একেক
গ্রুপকে একেক
দায়িত্ব
দেওয়া হয়। আমরা কয়েকজন
সাপার
ব্রিজের এ
পাশে পজিশন
নিলাম রাতের
বেলা। কিছুক্ষণ
পর দেখি যে, দু’জন লোক
যাচ্ছে ফকিরা
বাজারের রাস্তা
দিয়ে। আমাদের
সঙ্গে আফজাল
প্রফেসর বলে
একজন ছিলো। তিনি আমাদের
বললো, তোমরা
লাইন পার হয়ে
পজিশন নাও। এমন সময় দেখি
ঐ দু’জন
লোক আমাদের
দিকেই আসতেছে। প্রফেসর
সাহেব বললো যে, ওরা যেই
হোক কাছাকাছি
যখন আসবে তখন
তাদেরকে আমরা
হল্ট করাবো। তারা যখন
কাছাকাছি
আইছে তখন
প্রফেসর
সাহেব বললো, ‘হল্ট’। আমাদের
একটা পাস
ওয়ার্ড ছিলো। হল্ট বলার
সঙ্গে সঙ্গে
তারা পাস
ওয়ার্ডটি বলছিলো। কিন্তু
প্রফেসর
সাহেব সেটা
বুঝতে পারেন
নাই। বুঝতে
না পারাতে
তিনি আমাদের
ফায়ার করতে
বললেন। আমরা
ফায়ার শুরু
করলে ঐ দু’জনও
আমাদের উপর
ফায়ার শুরু
করে। শুরু
হয়া যায় তুমুল
ফায়ার। আমরা
দৌড়াদৌড়ি করে
যে সেখানে
পারি পজিশন
নিলাম। ফায়ার
চললো ১৫/২০
মিনিট অনর্গল। ওরা দু’জন আর
আমরা ১০/১১ জন। কিছুক্ষণ
পর দেখি যে, আমার এক
সহযোদ্ধা ভাই
গুলি লাগি পড়ে
গেছে। গায়ে
হাত দিয়া দেখি
যে,
সে
মারা গেছে। একটা
স্টেনের
ব্রাশ সম্পূর্ণ তার
মাথায়
লাগেছিলো। গোলাগুলি
বন্ধ হলে আমরা
তাকে ওখান
থেকে নিয়া আসি। আসলে ওই
দু’জনও
মুক্তিযোদ্ধা
ছিলো। প্রফেসর
সাহেব পাস
ওয়ার্ড বুঝতে
না পারার কারণে
আমরা নিজেরাই
ওখানে যুদ্ধ
করছি, সেমসাইড
আর কি এবং এ
জন্য একজনকে
প্রাণ দিতে হলো। এ রকম
অনেক সেম সাইড
সে সময়
হয়েছিলো।
প্র:
আপনার অস্ত্র কি করলেন ?
উ: দেশ
স্বাধীন
হওয়ার পর আমার
অস্ত্র
আমি
পার্বতীপুর
থানায় জমা
দিয়েছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : আবদুল
কাইয়ুম
সাক্ষাৎকারের
তারিখ : নভেম্বর ২৫, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৯০