নাম : মোঃ আতিয়ার রহমান

পিতা : দানাত আলী ফকির

গ্রাম : প্রসমপুর, ইউনিয়ন : বিরামপুর

থানা : বিরামপুর, জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচ. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ১৭/১৮

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : বেকার

 

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: ১৯৭০ সালে যে নির্বাচন হয় সেটা একটা অবাধ নির্বাচন ছিলোএই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে বাঙালি জাতি তাদের ভাগ্যন্নোয়নের মাধ্যমে সুখ শান্তিতে বসবাস করবার আকাঙ্খা প্রকাশ করেছিলোআর এই আকাক্মখার স্রষ্টা ছিলেন আমাদের মরহুম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানআমাদের দেশের মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলোআওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়নির্বাচনের পরে ক্ষমতা নিয়ে পাকিস্তানিদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়পাকিস্তানিরা কোনোক্রমেই বাঙালি জাতিকে সহ্য করে নাই১৯৪৭ সালের পর থেকেই তারা আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরও আমাদের ন্যায্য অধিকার তারা দিতে অস্বীকার করেতার ফলে দেশে আন্দোলন শুরু হয় এবং আমাদের এই এলাকাতেও মিটিং মিছিল শুরু হয়ে যায়

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

 

উ: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় আকস্মিকভাবে আক্রমণ করেছিলোআমাদের বাঙালি যারা আর্মি-ইপিআর এবং পুলিশে ছিলো তাদের তারা নিরস করে হত্যা করেইউনিভার্সিটির ছাত্রদের হত্যা করেসেদিন রাত থেকে পাক বাহিনী দেশের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করেনিরীহ মানুষদের তারা বিনা অপরাধে, বিনা দন্ডে হত্যা করেনিরস মানুষদের তারা এমনভাবে আক্রমণ করে যে, তাদেরকে সুযোগ দেয় নাই পাল্টা জবাব দেওয়ারএই জাতীয় খবর আমরা পরদিন বিদেশী রেডিও-র মাধ্যমে পেলাম

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: না, আমি সরাসরি আক্রান্ত হই নাই

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: বাঙালি জাতি যাতে নির্বিঘ্নে চলাফেরা এবং সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে সে জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেইমূল যে কারণ তা হলো পাকিস্তানিদের নারী নির্যাতন, নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়াআমি তাদের কার্যকলাপে অতিষ্ট হয়েই মুক্তিযোদ্ধাতে নাম লেখাই

 

প্র: আপনি কোথায় যোগ দিলেন ?

 

উ: আমি সর্বপ্রথমে ভর্তি হই ভারতের পতিরামেভর্তি হওয়ার সঠিক তারিখটা আমার খেয়াল নাইবোধহয় মে মাসের ১২ তারিখ হবেএরপর ওখান থেকে আমি হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য শিলিগুড়ির পানিঘাটাতে যাইপানিঘাটায় এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিপ্রশিক্ষণ শেষে আমাদেরকে পাঠানো হয় বরাহার ক্যাম্পে, ভারতের বরাহার ক্যাম্পেবরাহার ক্যাম্পে আসার পর ৩০ জনের একটা পার্টি করা হয় এবং আমাকে তার লিডার নিযুক্ত করা হয়আমি আমার পার্টি নিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে আসি

 

প্র: কোথায় ঢুকলেন ?

 

উ: বিরামপুরসড়ক পথে আমরা কেটরা নামক এক স্হানে ঢুকিপাকিস্তানিদের সঙ্গে সেখানে আমাদের গুলি বিনিময় হয়এই যুদ্ধে আমরা এক মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে হারাইতারপর আমরা মোহনপুর আসিমোহনপুর ঘাটে একটা বড় ব্রিজ ছিলোসেখানে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়তারপরে দিনাজপুরে ফকিরগঞ্জ নামক একটা জায়গা আছে, সেখানেও আমরা যুদ্ধ করি

   

যুদ্ধের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা যেটা আজও আমার মনে আছে, সেটার কথা বলতে পারিঘটনাটা হলো ফুলবাড়ি থেকে পশ্চিম-দক্ষিণে একটা গ্রামে থাকার সময়আমরা বিশেষ এক সত্রে জানতে পারলাম যে, পাক বাহিনী এই এলাকায় এসে মেয়েদের উপর অত্যাচার করে এবং বিভিন্ন জিনিস লুটপাট করে নিয়ে যায়তখন আমরা কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বেচ্ছাসেবক মিলে প্রায় দুই থেকে আড়াই শজন যোদ্ধা দাদুল নামক এক স্হানে রাত আনুমানিক দুইটা আড়াইটায় পৌঁছে পাকিস্তানিদের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে থাকিভোরে আমরা দেখতে পেলাম কয়েকজন খান সেনা  এগিয়ে আসছেসকাল আনুমানিক পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার দিকে স্পষ্ট দেখলাম ১০/১৫ জন খানসেনা আসছেআমরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকিউভয় পক্ষে তুমুল গুলি বিনিময় হয়সে অভিজ্ঞতা ছিলো ভয়াবহএখান থেকেই আমরা বেশ কয়েকজন খান সেনাকে ধরতে পেরেছিলামবাকিরা পালিয়ে যায়

   

খান সেনাদের সাথে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমি আমার ছেলেদেরকে একত্রিত করে গুণে দেখি যে, একজন নাইসে আমারই সহপাঠী এবং আমার আপন ভাগিনানাম মাজহারআমার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলো, মনে হলো, হয়তো আমি তাকে হারিয়েই ফেললামআমাদের মধ্যে একটা হতাশা সৃষ্টি হলোবেশ কিছুক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করার পর আমরা তাকে খুঁজতে বের হলামসেও আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলো বলে মনে হলোতার সঙ্গে পথে আমাদের দেখা হয়তখন আমরা সবাই স্বসির নি:শ্বাস ফেললামসে জানালো যে, সে একটা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো এবং তার পাশেই ছিলো কয়েকজন খান সেনাতারা সেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট-বিড়ি খাচ্ছিলো বোধহয়কিন্তু ঘটনাচক্রে তারা তাকে দেখতে পায় নাইযদি খানেরা তাকে দেখতে পেতো তাহলে তার কি অবস্হা হতো সেটা এক আল্লাহ পাকই জানেনএই যুদ্ধে দুই/তিন জন খান সেনা আমাদের গুলিতে মারাও যায়তিন জন খান সেনা আহত অবস্হায় আমাদের হাতে ধরা পড়েতাদের আমরা ক্যাম্পে নিয়া আসিসেখান থেকে আমরা তরঙ্গপুর ক্যাম্পে পাঠাইয়া দেইওখান থেকে তাদের আবার রায়গঞ্জে পাঠাইয়া দেওয়া হয়আমাদের পক্ষে কোনো হতাহত হয় নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: আমার এলাকাতে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করেছিলো বোধহয় এপ্রিল মাসেবিহারীরা প্রথমে আমাদের এলাকাতে প্রবেশ করেতারপর খান সেনারা আমাদের এলাকায় আসেবিহারী এবং পাক সেনা প্রবেশ করার পরে তারা বাড়িঘর জ্বালানো শুরু করেতারা যেখানে যে লোকজনকে পায় ধরে মেরে ফেলেএদেরকে প্রতিহত করার জন্য আমরা চেষ্টা করিকোথাও কোথাও আমরা ব্যারিকেড দেইকিন্তু সে ব্যারিকেডে কোনো ফল হয় নাইতারা ক্রমান্বয়ে দলবল ভারি করে এবং অত্যাচার আরো বাড়াতে থাকেমেয়েছেলেদের ধরে তারা অত্যাচার নির্যাতন, ধর্ষণ করেবিভিন্ন খারাপ কাজে তারা লিপ্ত হয়ে পড়ে

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: না, আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয়নি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: আমাদের এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় পাক সেনারা আক্রমণ করার আনুমানিক দুই থেকে আড়াই মাস পরতার আগেও কিছু তৎপরতা ছিলোপ্রথম দিকে এলাকার লোকজন একত্রিত হয়ে পাক সেনাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: জনগণ মুক্তিবাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেখাবার সংগ্রহ করে দিয়েছেঅন্যান্য সাহায্য করেছেতারা এদিক সেদিক গুলি আনা নেওয়া করেছেতাদের জীবননাশের হুমকির পরও আমাদের তারা লুকিয়ে রাখছেএই ধরনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে তারা সাহায্য করছে মুক্তিযোদ্ধাদের

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় রাজাকার কারা ছিলো ?

 

উ: আমার গ্রাম থেকে অল্প দক্ষিণে একটা গ্রাম আছেগ্রামটা বেশ বড়গ্রামটার নাম ভেনাপাড়ঐ গ্রামে একজন কুখ্যাত রাজাকার ছিলোঐ গ্রামের শতকরা ৭৫ ভাগই ছিলো রাজাকারঐ গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার ছিলো ফজলে রহমানতার নেতৃত্বে অত্র এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি হয়বহু লোকজন তার হাতে মারা যায়অনেক নিরীহ লোকের বাড়িঘর সে জ্বালিয়ে দিয়েছেএমন কি আমি যখন মুক্তিযোদ্ধায় ছিলাম তখন সে আমার বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে বাড়িটা ভিটায় পরিণত করেতার নেতৃত্বে খান সেনা আর রাজাকাররা বিভিন্ন স্হানে হামলা করেবিরামপুরে বেশ কিছু বিহারী বাস করতোতারা খানদের সঙ্গে সহযোগিতা করতোসৈয়দপুর থেকে কিছু বিহারীকেও তারা ভাড়াটিয়া হিসাবে নিয়া আসছিলোতারাও দলবদ্ধ হয়ে গ্রামে গ্রামে হামলা করতো

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: এটা আমাদের গ্রামে ছিলো না

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি অবস্হা দেখলেন ?

 

উ: যুদ্ধের শেষে গ্রামে এসে যে করুণ দৃশ্য দেখতে পেলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়আমার এখানে গ্রাম বলতে কোনো কিছু ছিলো নাগ্রাম এবং মাঠ একই পর্যায়ে ছিলোশুধু উঁচু নিচু এইটুকুই পার্থক্য ছিলোমাঝে মাঝে দুই একটা বাড়ি অবশ্য ছিলোকিন্তু সেগুলাও ভাঙাচোরা অবস্হায় ছিলোনা ছিলো দরজা, না ছিলো জানালা, না ছিলো কোনো প্রকার টিনএই অবস্হাতে কোনো কোনো বাড়ির মাটির দেওয়াল দাঁড়িয়ে ছিলো

 

প্র: স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ ?

 

উ: স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদের অবস্হা ঐ একইমাটির দেওয়ালের স্কুলগুলার চিম ছিলো না

 

প্র: ব্রিজ  ?

 

উ: ব্রিজ সব ভাঙাম্পূর্ণ ব্রিজ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিলোযোগাযোগের ব্যবস্হা বলতে কিছুই ছিলো না

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: দেশ স্বাধীনের পর আমি বগুড়া স্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দেইআমার কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর শরণ সিং বাথসংক্ষেপে এস. এস. বাথতাঁর কাছে আমি অস্ত্র জমা দেইতারপরে সেখান থেকে দুইদিন পর আমি পুনরায় দিনাজপুর আসিসেখানে একটা মিলিশিয়া ক্যাম্প করা হয়বাড়ি থেকে ঘুরে এসে আমি সেখানে যোগদান করিসেই মিলিশিয়া ক্যাম্পে আমি আনুমানিক ২০/২২ দিন থাকিক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের কাছ থেকে আমি আমার যুদ্ধের সনদপত্র গ্রহণ করিতারপর ১৯৭২ সালে আমি বিডিআর বা বাংলাদেশ রাইফেলস্‌-এ যোগদান করিবিডিআরে আমি ৯ বছর চাকরি করেছিবর্তমানে আমি বেকার অবস্হায় আছি

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ :  নভেম্বর ১৫, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৮৪