নাম : মোঃ চান আলী

পিতা : সমির মন্ডল

মহল্লা :র্বপাড়া,

ইউনিয়ন / পৌরসভা : বিরামপুর,

ডাক : বিরামপুর

থানা : বিরামপুর,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ১৭

১৯৭১ সালে পেশা : ক্ষুদ্র ব্যবসা

বর্তমান পেশা : ক্ষুদ্র ব্যবসা

 

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

 

উ: ঢাকায় যে আক্রমণ হইছিলো, সেইটার কথা বলতে পারমু নাকিন্তু ওই সময় তারা আমাদের এখানেও আক্রমণ চালাইলোএইটা আমার চাক্ষুষ দেখাআমাদের বাড়ির পাশে বিহারীরা চলে আসলোতারপর এখানে খান সেনা আসতে শুরু করলোআমাদের বাঙালিদের মাইর ধইর শুরু করলোতারা বললো, আমাদের কথা শুনতে হবে, আমাদের কথা মতো চলতে হবেআর বিহারীরা আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলোবিহারীরা বললো, এইটা পাকিস্তান, পাকিস্তানই থাকবেএ দেশে কোনো ভোটাভুটি হয় নাইএ দেশে মুজিবুরের কোনো লোক নেইআমরা যা করবো তাই হবে

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আক্রান হয়েছিলেন কি ?

 

উ: খান সেনারা যখন এখানে আক্রমণ করলো তখন ওদের দাবড় টাবড় খাইয়া পালাইয়া গেছিবাড়িঘর ছেড়ে পালাই গেছিসৈন্যরা আমাদের বাড়িঘরে লুটতরাজ করে সব কিছু নিয়া গেছেএরপর আমি ভারতে যাইয়া মুক্তিযোদ্ধাত ভর্তি হলামআমি মনে করলাম, দেশের মা-বোনকে বাঁচাতে হবে এবং দেশকে মুক্ত করতে হবে খানদের হাত থেকেআমি বাবার এক ছেলে ছিলামযদি মারা যাই তবুও আমার দেশ চাইএদের বাঁচাতে আমি জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য চলে গেলাম মুক্তিযোদ্ধাতআমাদের এইখানকার এম. পি. ছিলেন ডা: ওয়াকিলউদ্দীন সাহেবআওয়ামী লীগের এম. পি. ছিলেনতাঁর কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিলাম আমিতারপর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আমি ভর্তি হইয়া গেলামট্রেনিং নিয়া আমরা সরাসরি চলে গেলাম হামজাপুর বর্ডারঐ সাইড দিয়ে খানপুর বর্ডার যেতামওখান থেকেই আমরা খান সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম

 

প্র: আর কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: আর যুদ্ধ করছি তরঙ্গপুরের সাইডে আর হামজাপুরের এই সাইডেএখানে একটা বড় নদী আছে, ভারতের ভিতরে ঐ নদীটাঐ নদীতে নৌকা করে আরো সামনে যাইয়ে আমরা বিরলে ঢুকতামওখানে খান সেনাদের সাথে আমাদের একদিন চরম সংঘর্ষ হয়আমাদের কিছু ছেলে মারা যায় সেখানেআমিও আক্রান্ত হইছিলামকিন্তু কোনো রকমে জীবন বাঁচাইছি

 

প্র: যুদ্ধকালের স্মরণীয় কোনো ঘটনার কথা আপনার মনে পড়ে ?

 

উ: একদিন আমরা বিরল বর্ডারে গেছিলাম রাত ১২টার দিকেওখানে যাওয়ার পর ওখানকার কিছু রাজাকার আমাদের সম্পর্কে খান সেনাদের খবর দিছিলোআমার সঙ্গে  মুক্তিযোদ্ধা জব্বার আছিলোতার বাড়ি হচ্ছে মাধবপাড়াআমরা হাতিয়ার নিয়ে ঢুকে গেছি স্কুলের ওখানেআমরা তো জানি না যে হঠাৎ করে খানেরা এভাবে চলি আসি আক্রমণ করবেখান সেনারা আসি আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করলোতাদের আক্রমণে টিকতে না পারি  স্কুলের ওখান থেকে ক্রলিং করে আমরা পালিয়ে আসলাম ভারতের ভিতরেতার পরের দিন আমরা স্হানীয় একটা ছেলেকে লাগাইয়া দিলাম ঘটনাটা কি ভাবে ঘটলো তার খোঁজ নেওয়ার জন্যআমাদের সঙ্গে আর্মির এক হাবিলদার সাহেব ছিলোতার বাড়ি ছিলো ময়মনসিংহনাম কবিরতিনি সব সময় আমাদের গাইড করতেনসেও আমাদের কইছে যেভাবে হোক এইটা পাত্তা লাগাইতে হবেখোঁজ নিতে নিতে আমরা ঐ রাজাকারকে ধরছিলামতাক ধরে আমরা এইপারে নিয়ে আসলামহামজাপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসার পরে ইন্ডিয়ান অফিসার আমাদের কাছ থাকি তাক নিয়ে নিলোপরে তার কি হইছে আমরা বলতে পারবো নাআমি আর জানি নাএই ঘটনাটা খুব মনে পড়ে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: মনে হয় খান সেনারা ঢাকায় আক্রমণ করার ১০/১২ দিন যেতেই আমাদের এখানে  আক্রমণটা শুরু করেওরা হঠাৎ করেই রাইফেলের গুলি ফুটাতে ফুটাতে চলে আসেগাড়িত করে চলে আসেআমাদের এখানে রাস্তা তখন পাকা ছিলো নাকাঁচা ছিলোপাক সেনারা আসার পর আমরা গোরস্তানের পাশ দিয়া, ঈদগাও মাঠের সাইড দিয়া পালাইয়া গেলামযার যা ছিলো সবাই সব কিছু থুইয়া পালাইয়া গেলামএখানে বাচ্চু খান নামে এক প্রতাপশালী বিহারী ছিলোতখন ওর অর্ডারে এই এলাকার সবকিছু চলতোওরা এসে আমাদের বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ জ্বালাই দিলোআমরা দর থাইকা দেখি যে আমাদের বাড়িঘরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতেছে

 

প্র: পাকিস্তানিরা আপনার এলাকায় আর কি কি করলো ?

 

উ: আমারই বাড়ির পাশে দুইটা বুড়া ছিলো, তারা পালাইতে পারে নাইওই দুইজনকে ওরা ধরে নিয়া গেছেওদেরকে ধরে নিয়া যাইয়া বেয়নেট দিয়া খোঁচাইয়া মাইরা ফেলছেআরেকটা ছেলে ধরা পড়ছিলো এইখানের কলেজের পাশেছেলেটার নাম ছিলো নুরুলতাক খানেরা ধরছিলোপরে খান সেনারা আমার বাড়ির পাশের আরেক ভাইকে ধরছিলোওরা পালাইয়া যায় নাইওরা বাড়িতে ছিলোনাম মোশাররফওদের ধরি নিয়া গেছিলোতারপর মাইরপিট করি হাত বাইন্দে চোখ তুলি নিছিলো ঐ কাঁঠাল গাছ তলায়সেই কাঁঠাল গাছ এখনও আছে কলেজে

 

প্র: আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: জ্বি না, আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয় নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: আমার এলাকায় আহমদ নামে এক লোক ছিলোআমি তাকে মামা করে ডাকিসে বর্তমানে রিক্সা চালায় খাচ্ছেএকদিন ও আমাকে বললো যে, কি করা যায়, দেশের মধ্যে চরম অরাজকতা শুরু হয়ে গেছেখান সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে দেশ আজাদ করতে হবে আমাদেরতখন তার সাথে আমি ইন্ডিয়ায় গেলামএইটা এপ্রিল মাসের শেষেতারপর ট্রেনিং নিলামআমরা ট্রেনিং নেওয়ার পরই মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়ে গেলো এই এলাকায়

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: খুব ভালো ছিলোঅনেকে আমাদের বলতেন, তোমরা যাও, আমার ছেলেকেও পাঠাবোআমার ভাতিজাকেও পাঠাবোখান সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে এদেরকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবেতাদেরকে তাড়িয়ে দিতে হবে যে করেই হোকরক্তের বিনিময়ে হলেও তাদের হাত থেকে আমাদের এ দেশকে মুক্ত করতে হবে

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: আমার গ্রামের ভিতর রাজাকার ছিলোরেল লাইনের পাশে কতকগুলো বিহারি ছিলোতারা সব পাকিস্তানিদের দালাল ছিলোআর ঐ যার নাম বললাম বাচ্চু খান, ঐ বেডায় ছিলো খুব ক্রিমিন্যালআর ছিলো নদীর ঐ পারে ফজলা রহমান চেয়ারম্যানসে ছিলো রাজাকারের হেডফজলা চেয়ারম্যান এলাকার ভিতরে জ্বালাইয়া দিছে সবকিছু  রাজাকার সবার নাম আমার জানা নাইরাজাকার বেশি ছিলো বিহারীরাওদের সঙ্গে তো আমাদের বাঙালিদের সমঙর্ক না থাকার মতোই ছিলোসে জন্য ওদের নাম তেমন জানি নাযুদ্ধের সময় এখানে বিহারীদের দাপট খুব বেশি ছিলো

 

প্র: বাঙালিদের মধ্যে ?

 

উ: বাঙালিদের মধ্যে এই এলাকায় রাজাকার কম ছিলোবিহারীরাই এই অঞ্চলে বেশি দাপট দেখাইছেবাঙালি দুই একজন ছিলো পিস কমিটি আর রাজাকারেবাঙালিদের মধ্যে ছিলো ফজলা চেয়ারম্যানফজলা চেয়ারম্যান মানুষকে দাবড়াইয়া ধরতোধইরা নিয়া আইসা মাইরা ফেলাইতো

 

প্র: এই সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: এদের ধরা হয় নাইএরা আত্মগোপন করেছিলোকোথায় ছিলো জানি নাধরা পড়ে নাই এরা

 

প্র: যুদ্ধের শেষে ফিরে এসে আপনার এলাকার কি অবস্হা দেখলেন ? এলাকার স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ, ব্রিজ, বাড়িঘর- এগুলোর অবস্হা কেমন দেখলেন ?

 

উ: এখানে আইসা দেখি যে বাড়িঘর কিছু নাইসব তো ওরা লুটতরাজ করি নিয়া গেছেটিন টুন যা ছিলো সব নিয়া গেছেশুধু আমার নয় প্রত্যেকেরগ্রাম ছাফ করে তারা সবকিছু নিয়া গেছেলুট করার পর বাড়িঘরে আগুন দিছে  ঘরের মাটির দেওয়ালের মাটি শুধু এইখানে পাওয়া গেছেস্কুল ভাঙা, স্কুলের টিন ফুটো, গুলি লাইগা ছিদ্র-ভিদ্র হয়ে গেছেব্রিজ কালভার্ট এইগুলাতো সব উড়ানোব্রিজ ওরাও ভাঙছেআমাদের হাতেও আক্রান হইছেব্রিজ, কালভার্ট কার্যক্ষেত্রে আমাদেরও উড়াইয়া দিতে হইছে

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: আমার অস্ত্র তো দিনাজপুরেই আমরা জমা দিয়া দিছি

 

প্র: আপনি কত নম্বর সেক্টরে ছিলেন ?

 

উ: সেভেন সেক্টরেআমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ১৫, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৮৪