নাম:
মো:
ফরিদ মিয়া
গ্রাম
:
মন্দভাগ
ডাক
:
মন্দভাগ
বাজার
ইউনিয়ন
:
কাইয়ুমপুর
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : ২০
১৯৭১
সালে পেশা : টঙ্গি
জুটমিল
শ্রমিক
বর্তমান
পেশা :
অবসরপ্রাপ্ত
সৈনিক
একাত্তরের
শ্রমিক মো:
ফরিদ মিয়া
মুক্তিযুদ্ধের
সূচনালগ্নেই
পাকিস্তানিদের
বিরুদ্ধে
রুখে
দাঁড়িয়েছিলেন। ঢাকার
টঙ্গী শিল্প
এলাকা থেকে
নিজ এলাকা মন্দভাগ
এবং তারপর
ভারতে সামরিক
প্রশিক্ষণ
নিয়ে একের পর
এক অপারেশনে
অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা
ফরিদ মিয়া
যুদ্ধদিনের
নানা প্রশ্নের
জবাব দিয়েছেন
বর্তমান
সাক্ষাৎকারে।
প্র:
১৯৭১ সালের
মার্চ মাসে
আপনার কি মনে
হয়েছিল?
উ: ২৫
মার্চ আমি
টঙ্গিতে
ছিলাম। টঙ্গিতে
একটা ব্রিজ
আছে। টঙ্গি
বাজারের
ব্রিজ থেইকা
সোনাভান
বাড়ির পাশের
ব্রিজ পর্যন্ত
আমরা
শ্রমিকরা
মিলে সেখানে
প্রতিবন্ধকতা
সৃষ্টি করি। কাডের পুল
একটা আছিল
এইডাকে তুইলা
আমরা পাকা পুলের
উপরে দিয়া
প্রতিবন্ধকতা
সৃষ্টি করি। ঐ
মুহুর্তেই
ঐখানে
পাঞ্জাবি আসে। পাঞ্জাবিরা
আমাদের উপরে
বিক্ষিপ্তভাবে
গুলিবর্ষণ
করে। আমরা
বিভিন্ন দিকে
যে যার মতো
পলাইয়া গেলাম। পূবাইল নামেএকটা
গ্রাম আছে। আমি টঙ্গি
থেকে হাইটা ২৭
মার্চ
পূর্বাইল গ্রামে
আসি। তারপর
পূবাইল থেকে
হাইটা ভৈরব পর্যন্ত
আসি। ভৈরব
থেকে লঞ্চে
আমরা অনেকটা
পথ আসি। টাকা
নাই। রাস্তায় রাস্তায়
মানুষে খাবার
দেয়। হাইটা
২৯শে মার্চ
বাড়িতে আইসা
পৌঁছি।
প্র:
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চ পাকিস্তান
সামরিক জান্তার
আক্রমণ
সম্পর্কে কি
শুনেছেন?
উ:
প্রকাশ্যভাবে
যখন আমাদের
উপরে ২৬শে মার্চ
পাঞ্জাবিরা
টঙ্গি ব্রিজে
এসে আক্রমণ
করে এবং
বিক্ষিপ্ত
গুলি ছুড়ে তখন
তো পিছনের
দিকে আমরা আর
তাকাই নাই। আমি পিছনেই
এক কবরস্হানে
প্রায়
ঘন্টাদেড়েক
বসে থাকি। আমরা তখন
বুঝি না এল. এম.
জি. বা
অন্যান্য
অস্ত্র কি বা
কেমন। ঐদিন
তারা গুলি করে
লোক মারছে
অনেক শ্রমিক জান
দিছে। আমি
ওখান থেকে
ভাগছি- যেটা
আমি আগেই বলছি।
প্র:
আপনি কি
যুদ্ধে আক্রান্ত
হয়েছিলেন?
উ: হাঁ,আমি
নিজে যুদ্ধে
আক্রান্ত হইছি
আমার
এলাকাতেই,আমার
গায়ে চিহ্ন
আছে।
প্র:
কিভাবে আক্রান্ত হলেন
আপনি?
উ: ভারতে
আমরা ২১ দিন
ট্রেনিং করি
২৮ জন ছেলে। ট্রেনিং করার
পরে আমরা কসবা
আসি। কসবা
পুরান
বাজারকে
পাঞ্জাবির
হাত থেকে দখল করি। ফোর
বেঙ্গল ছিল
কসবা। তখন
আমাদের ২৮
জনকে ফোর
বেঙ্গলে
পোস্টিং দেয়। এইখানে
আমি ছিলাম
গোয়েন্দা
বিভাগে। আমার তখন
স্বাস্হ্য তেমন
ভালো ছিল না। খবরাখবর
নেওয়ার জন্য
কখনো ঘাস কাটা,কখনো
গরু রাখার নামে
রেকি করতে
যেতাম। রেকি
করতে গিয়ে
একবার
পাঞ্জাবিরা
জেনে ফেলে। জেনে ফেলার
পরে আমাদের
উপরে তারা
থ্রি ইঞ্চ মর্টার
ছোঁড়ে। মর্টারের
গোলা গাছের
গোড়ায় পড়ার
পরে আমার বুকে
এবং পিঠে লাগে। চিকিৎসা
করে ভালো হইছি। কিন্তু সেই দাগ
এখনো বহন করছি।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করল। কিভাবে
আক্রমণ করল?
উ: প্রথমত
তারা কসবা আসে। কসবা
থেইকা রেকি
পেট্রোল
যেটাকে বলে
তারা কসবা
থেকে গাড়ি
যোগে কাঁচা রাস্তা দিয়া
নয়নপুর
বাজারে আসে। মাসটা হবে
মনে হয় এপ্রিল। আসার পথে
প্রতিরোধে
সামান্য
অস্ত্র নিযে
এগিয়ে আসে
মুজাহিদ,আনসার,ইপিআর,ছাত্র-শ্রমিক। দু-একজন
বাঙালি
সৈনিকও
ছিলো-যারা
বেঙ্গল রেজিমেন্টে
কাজ করেছে। তখন ঐ
মুহূর্তে
আমাদের যা ছিল
তাই নিয়ে
তাদের উপরে
যতটুকু সম্ভব
করছি। কিন্তু আমরা
টিকতে পারি
নাই।
প্র:
আপনার এলাকায়
পাকিস্তান
বাহিনী এবং
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা
সম্পর্কে
কিছু বলবেন?
উ: পাকিস্তানিরা এই
এলাকায় শক্ত
ডিফেন্স বা
প্রতিরক্ষা গড়ে
তোলে-যার ফলে
মুক্তিযোদ্ধারা
কিছুতেই তাদেরকে
ক্রস কইরা
ভিতরে প্রবেশ
করতে পারতো না। কিন্তু কিছু
কাল পরে
মুক্তিযোদ্ধারা
নানা কৌশলে ভিতরের
দিগে আসত এবং
ভিতর থেকে
তারা কিছুটা
কাজ করতো। আসলে মঈনপুর,কামালপুর
এবং
মন্দভাগ-এই
অঞ্চলগুলা
ছিল নদীসংলগ্ন
এলাকা এবং
প্রচর
জঙ্গলময়। ফলে
মুক্তিযোদ্ধাদের
গেরিলা যুদ্ধ
করতে বেশ
সুবিধা হতো। ফোর
বেঙ্গলের বি
কোম্পানি ছিল
কাইয়ুমপুর-মঈনপুরের
দায়িত্বে। আমাদের ফোর
বেঙ্গলের
একটা এম.জি
ছিল যা কাইয়ুমপুর
এবং মঈনপুরের
মধ্যে যে একটা
ঈদগা আছে
সেখানে
রাইখা-সেখান
থেইকা পাঞ্জাবি
হেডকোয়ার্টার
মঈনপুরের উপর
আঘাত হানতো
সকাল
সন্ধ্যায়। ফোর
বেঙ্গলের যে
এম. জিটা
ছিল-সেটার
কমান্ডার ছিল
তৎকালীন
ল্যান্স
নায়েক জালাল-যার
বাড়ি
সন্দ্বীপ। সে ছিলো আমার
ডিটাসমেন্ট
কমান্ডার। পাঞ্জাবিদের
আমরা আসা
যাওয়া দেখলেই
এম. জি. দিয়া
ফায়ার কইরা
এনগেজ রাখতাম। তারা
মঈনপুর থেকে
কাইয়ুমপুর
আসতে পারে নাই। আমরা
তাদেরকে আসতে
দেই নাই। আমরা
প্রতিরোধ করে
রাখছি। যুদ্ধের
শেষের দিকে
চৌমুহনী থেকে
আর্টিলারির
শেল মাইরা
আমাদের পাঁচ
সাতজন লোককে
তারা একেবারে
ছিন্নভিন্ন
কইরা দেয়। গরু আনতে
গিয়া তারা
সম্পূর্ণ শেষ
হইয়া যায়। যেদিন তারা
এখান থেইকা
চইলা যায়
আমরাও তাদের সাথে
সাথে উইথড্র
কইরা ভারত
দিয়া চিটাগাং
এর উদ্দেশ্যে
রওয়ানা দিই
ভারতীয় ট্রাক
বাস নিয়া। পাকসেনারা
পিছু সরে
বাংলাদেশের
ভিতর দিয়া আর
আমরা
ইন্ডিয়ার
ভিতর দিয়া যাই।
প্র:
আপনার
এলাকাতে কি
বাড়িঘর
পুড়াইছে?
উ: আমার
নিজেরই
বাড়িঘর
পাঞ্জাবিরা
ভাইংগা চুইরা
শেষ কইরা দিয়া
গেছিল। অন্যান্য
বাড়িও
পুড়াইছে।
প্র:
এই এলাকায় নারী
নির্যাতন কি
রকম হইছে?
উ: আমাদের
এইখানে
পাঞ্জাবিরা
নারী
নির্যাতন করার
সুযোগ পায় নাই। কারণ এটা
বর্ডার এলাকা। আমাদের
এলাকা বর্ডারের
কাছে হওয়ায়
যতটুকু সম্ভব
হইছে তাদেরকে
বর্ডার এলাকা
দিয়া ভারতে
পার করা হইছে।
প্র:
যুদ্ধের সময়
মুক্তিবাহিনী
এবং পাকবাহিনী
উভয় পক্ষে
গালাগালি
করতো শুনেছেন?
উ: হাঁ,খুব
গালাগালি করত। আমাদেরকে
বিশেষ কইরা
তারা গালি দিত
ইন্দিরার
বাচ্চা বইলা। আমরা
পাকসেনাদের
বলতাম
লেন্ডির
বাচ্চা। তারা বলতো,তোরাতো
ইন্দিরার
বাচ্চা। আমরাতো
রোজার ঈদের
সময় তাদেরকে
আপ্যায়ন করছি
মাইক দিয়া। তাদের আর
আমাদের মধ্যে
মাত্র পাঁচ
সাতশ গজ ডিফারেন্স
শুধু
জমিনগুলা। ঐ পাশে
পাঞ্জাবি আর এ
পাশে আমাদের
ডিফেন্স পুরাপুরি। আমরা
অস্ত্র দিয়া
ডিফেন্স লাগাইয়া
রইছি তারা যেন
আসাতে না পারে। আমাদের
উদ্দেশ্য
তারা যেন রেল
লাইন ক্রস করতে
না পারে। অর্থাৎ
আমাদের
কাইয়ুমপুর
যেন তারা না
আসতে পারে। পাকিস্তানিদের
হেডকোয়ার্টার
ছিল মঈনপুর। মন্দভাগ
বাজার পর্যন্ত
ছিলো তাদের
এরিয়া। মঈনপুর
স্কুলেই ছিল
তাদের
কোম্পানি
হেডকোয়ার্টার। আর
কোম্পানি বা
অন্য কোন
কোম্পানি
কোথায় ছিল এটা
আমার জানা নাই।
প্র:
তখন এই এলাকার
হিন্দুদের অবস্হা কেমন
ছিল?
উ: আমাদের
এলাকার লোকতো
আছেই। বিভিন্ন
এলাকা থেকেও
যদি ঐ
মুহুর্তে
হিন্দু আসছে
তাইলে আমরা
মনে করতাম
আমাদের চেয়েও
তাদের বিপদ
বেশি। যেহেতু
পাঞ্জাবিরা
মানুষ ধরে
আগেই
জিজ্ঞাসা
করতো তুমি কলেমা
পড়। হিন্দুরাতো
কলেমা জানতো
না। মুসলমান
অথবা
হিন্দুদেরকে
উলঙ্গ করে চেক
করত। তাই
তারা যদি কোনো
মতে আমাদের
এলাকায় আইসা
পৌঁছতে পারছে
তাহলে ঐ
মুহূর্তে
আমাদের
সবকিছু দিয়েই
তাদেরকে আমরা
সাহায্য করছি
এবং ভারত পর্যন্ত
নিয়া
পৌঁছাইছি।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
আপনি কি দেখলেন? মসজিদ,মাদ্রাসা,ব্রিজের
অবস্হা কি
দেখলেন আইসা?
উ:
যুদ্ধের
প্রায় ছয় সাত
মাস পরে আমি
বাড়িতে পনের
দিনের ছুটিতে
আসি। আইসা
তখনও দেখলাম
সব বিধ্বস্ত,কিছুই
নাই। ঘর-বাড়ি
রাস্তাঘাট
ব্রিজ সব
ধ্বংস। মুক্তিযুদ্ধের
সময় সেই যে
ট্রেনিং শেষে
চতুর্থ বেঙ্গলে
যোগ দিলাম-সেই
থেইকা রইয়া
গেলাম-চাকরি
করলাম।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : জহিরুল
ইসলাম স্বপন
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ১১ ডিসেম্বর
১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর
কসবা-৫৭