নাম
:
মোঃ ফরিদ
উদ্দিন
গ্রাম
:
লতুয়ামুড়া
ডাক
:
চন্ডীদ্বার
ইউনিয়ন
:
গোপীনাথপুর
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : ১৪
১৯৭১
সালে পেশা : স্কুল
ছাত্র
স্কুল
ছাত্র
মোহাম্মদ
ফরিদউদ্দিন
মাত্র চৌদ্দ বৎসর বয়সে
সামরিক
প্রশিক্ষণ
নিয়ে কসবা,শিমরাইল,চানলা
ইত্যাদি
এলাকার
যুদ্ধে অংশ
নিয়েছেন। তিনি তাঁর
সাক্ষাৎকারে
প্রতিরোধ
পর্বের কথাসহ
বেশ কয়েকটি যুদ্ধের
বর্ণনা
দিয়েছেন।
প্র:
১৯৭১ সালের
মার্চ মাস
সম্পর্কে
আপনি কি জানেন?
উ: তখন
আমার এমন বয়স
ছিল না যে
সবটুকু
উপলব্ধি করতে
পারি। তবে
তখন থেইকা
দেখলাম যে
একটা সংগ্রামী
চেতনা আমাদের
মধ্যে জেগে
উঠছে। এর
পরবর্তীতে
দেখলাম ২৫
মার্চ একটা
রক্তক্ষয়ী
যুদ্ধই শুরু
হয়ে গেল। কসবা পর্যন্ত
পাকিস্তানি
সৈন্য চইলা
আসলো। পাকিস্তানিরা
চইলা আসার পর
দেহা গেল আমার
ছোট্ট
ভাইবোনেরা,মা,বাবা,আত্মীয়-স্বজনসহ
সবাই যার যার
সেফ অবস্হানে
চইলা গেল। পাকিস্তানিরা
এই হান
থেইক্কা সি
এন্ড বি রোড পর্যন্ত
দখল কইরা নিল। বিভিন্নভাবে
শুনতে পাই
এদিকদা মানুষ
মারতাছে,ওদিগদা
এরে ধইরা নিছে,ওদিগদা
মেয়েলোক ধইরা
নিয়া যাইতাছে,উমুক
গ্রামের কয়েক
জনরে মাইরা
ফালাইছে। তখন মানুষ
যার যার সেফ অবস্হানে
যেতে লাগল। এ সময় বিভিন্ন ঘর
থেকে যারা
আঠার,বিশ,পঁচিশ
বছর বয়সের
যুবক তারা
মুক্তিযুদ্ধের
জন্য সংগঠিত
হইতে লাগল। তারপরে
আমাদের এই যে
লিটন,এরপরে
সেলিম
সাহেবের
আব্বা,এই ধরনের
মানুষ
সংগ্রামী
চেতনা নিয়া
আওয়ামী লীগের
সাথে জড়িত
ছিল-তারা যাইয়া
মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্য বিভিন্ন
প্রতিষ্ঠান
থেকে খাবার,বিভিন্ন
ব্যক্তি থেকে
কিছু অর্থ
সংগ্রহ কইরা
একটা
ভলান্টিয়ার্স
বাহিনী গঠন
করলো। দল
গঠন কইরা
মুক্তিযোদ্ধাদেরকে
নিয়া ঐ যে আছিল
বাদশাহ মিয়া
উনি আগে ছিল
ব্রিটিশ
সময়ের একজন
যোদ্ধা; তিনি তাদেরক
নিয়ে যুদ্ধ
শুরু করলেন। চন্দ্রপুরের
বাদশা মিয়া
আমরা শুনছি,উনি ব্রিটিশ
আর্মিতে
চাকরি করার
পরে দেশে আইসা
গেছেন। ৬৫-এর
যুদ্ধের সময়
পাক মুজাহিদ
বাহিনীতে চাকরি
করেছেন। সেই বাদশা
মিয়া মুজাহিদ
ও অন্যরা মিলে
পাকিস্তানিদের
বিরুদ্ধে দুই
তিন দিন আমাদের
এহানে
ডিফেন্স
করেছে। আবার
দেখলাম ঐ যে
দাদুলের
আব্বা উনি
ইপিআর-এ চাকরি
করতো। উনার
মতো এরকম
পুরাতন
যোদ্ধা
কয়জন-যারা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করেছেন,৬৫-এর যুদ্ধও
করেছেন তারা
পাক বাহিনীর
বিরুদ্ধে
মুক্তিবাহিনী
গঠন করতে গেল। তারপরে
এদিগে ছিল
লতুয়ামুড়ার
আবদুল আলীম নামে
এক মিলিটারি। উনি,আবু জাফর খান
মুন্সী,উনারা
মুক্তিযোদ্ধাদের
সংগঠিত করছে। তহন আমরা
তো ছোট মানুষ,আমরা
তহনও যুদ্ধের
সাথে
সম্পৃক্ত হই
নাই। আমি
মা-বাবার সাথে
হিন্দুস্হানে
যাইয়া উঠলাম। কাদির, বি.কম.
সাব আমাদের
একটা লিস্ট
করলো। লিস্ট
কইরা
ভলান্টিয়ার্সে
নিল আবদুল
হাইসহ। মে
মাসে
আমাদেরকে
স্যার বলল যে,তোমরা
একটা ট্রেনিং
কইরা লও। আমরা ছোট
খাট্ট একটা
ট্রেনিং নেই
দেবীপুরে। সেটা ২৪/২৫
দিনের
ট্রেনিং ছিল। আমাদের এই
দলে ৬০/৬৫ জন
ছেলে ছিল।
প্র:
ট্রেনিং শেষে
কোথায় আসলেন?
উ: আমরা
আবার
ভলান্টিয়ার্স
কেন্দ্রে
ফিরে আসছি।
প্র:
আপনি কি ’৭১
সালের যুদ্ধে
আক্রান্ত
হয়েছিলেন?
উ:
ডিসেম্বরের
শেষ পর্যায়ে আক্রান্ত
হয়েছিলাম।
প্র:
আপনি কিভাবে
আক্রান্ত
হলেন?
উ: প্রথম আক্রান্ত
হই কসবাতে,গুলিতে। ডিসেম্বরের
ফাষ্টে দিয়া
মনে হয়
পাঞ্জাবিরা মাইন
টাইন পাতছে। মাইন
উঠাইতে যাইয়া
এডির একটার
ভিতরে একটা পিন
ছিল। আগে
আমরা পিনগুলি
খুলে নিতাম। খুইল্যা
এডি ব্যাগে
থুইয়া দিতাম। একটাতে বোধহয়
পিনডা বাকি
ছিল। পরে এটা
হঠাৎ কইরা
ব্রাস্ট হইয়া
গেছে। তখন
আমি কিছু আর
বলতে পারি নাই। আমার যারা
সাথে ছিল তারা
হসপিটালে
নিয়া ভর্তি
কইরা দিয়া আইল। আমার
চারটা আঙুলই
চলে গেল।
প্র:
আপনি
যুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করলেন কেন?
উ: যুদ্ধে
অংশগ্রহণ
করেছি মা
বোনের ইজ্জত
রক্ষা করতে,নাগরিক
অধিকার রক্ষা
করতে এবং
মানুষ হিসাবে বেঁচে
থাকার অধিকার
রক্ষা করতে।
প্র:
আপনি কত নম্বর
সেক্টরে
ছিলেন?
উ: ২
নম্বর
সেক্টরে।
প্র:
আপনারা কোন
কোন জায়গায়
যুদ্ধ করেছেন?
উ: আমি
যুদ্ধ করেছি
কসবা,তারপরে
মিশরাইল,চানলা এসব
জাগায়।
প্র:
প্রথম দিন
আপনি কোন
জাগায় যুদ্ধ
করলেন?
উ: প্রথম
দিন আমাদের
কসবাতেই
যুদ্ধ করছি। আমরা
১৭/১৮ জন
মুক্তিযোদ্ধা
আমাদের
কমান্ডারের
নেতৃত্বে
রওয়ানা দিলাম। কসবা বয়েজ
স্কুল দিয়া
উত্তর দিকে
কসবা স্কুলের
শিক্ষকদের যে
বাসভবনগুলো
আছে,সেখানে
আমরা অবস্হান
নিলাম। পাকিস্তানিরা
একটা গাড়ি
দিযা আসছে। মনে হয় ৮/১০ জন
সৈন্য ছিল। আমরা আমাদের অবস্হান
থেইক্কা তখন
আমাদের একটা
রামিয়ান
এস.এল.আর ছিল-সেটা
দিয়া শর্ট
করলাম। আমাদের
সাথে আর একটা
এল এম জি ছিল
আমার পার্শ্ববর্তী
যোদ্ধার। তিনি ১০০
রাউন্ড গুলি
করলেন। গুলি
করার পর দেহা
গেল এহান থেকে
তারা নাইম্মা
পশ্চিম বরাবর
যতটুকু সম্ভব রাস্তাডার
পশ্চিম ছাইড
দিয়া ড্রেন
ছিল-সেখানে
তারা আত্মরক্ষা
করলো। ঐ
ড্রেন
থেইক্কা
নাইম্মা তারা
আবার এদিগে যহন
গুলি আরম্ভ
করছে তখন আমরা
আস্তে আস্তে প্রায়
রাত ১০টা সাড়ে
দশটা নাগাদ
পিছাইয়া চইলা
আসলাম। এইভাবে
চুপি চাপি
যাইয়া আমরা পাকিস্তানিদের
বিরুদ্ধে
পরিচালনা
করছি। তারপর
জুন-জুলাই মাস
আইলো। তখন
আমরা আস্তে আস্তে ভিতরের
দিগে চলে
যাওয়ার
সিদ্ধান্ত নিলাম। কমান্ডার
আমাদেরকে
নিয়া ভিতরে
চলে যাইতো। কিছু কিছু
রাজাকার
আমাদেরকে
সহযোগিতা
করতো।
প্র:
যারা
সহযোগিতা
করছে তাদের
কয়েক জনের নাম
বলতে পারেন?
উ:
নামগুলি তো
সঠিক মনে নাই। আমার তহনত
বয়স অত্যন্ত কম ছিল। আমার
কমান্ডাররা
বলছে খানা আন,খানা
আনছি। আমরারে
হাতিয়ারটা দে,দিছি। আমরার
হাতিয়ারটা
পরিস্কার কর,করছি-এই
ধরনের
কার্যকলাপে
আমরা ব্যস্ত ছিলাম। আমাদেরকে
কমান্ডাররা
তাদের সন্তানদের
মতই দেখতো। তহন আমরা
কোনো সময় যদি
ঘুমাইয়া গেছি
তহন কমান্ডার
ঘুম থেকে
টাইন্না
আইন্নাও খাওন
দিছে। আবার
যুদ্ধেও
নামছি। কম
বয়সী
ছেলেপেলেরাও
মুক্তিযুদ্ধে
যাচ্ছে-এইডা
প্রচার হওয়ার
পর শুনলাম পাকসেনারা
৫০/৬০ জন কম
বয়সী ছেলেকে
কসবাতে মাইরা
ফেলছে।
প্র:
মুক্তিযুদ্ধের
সময় আপনি কোথায়
বড় যুদ্ধ
করলেন?
উ:
শিমরাইলের
যুদ্ধডা বেশ
খারাপ ছিল। ঐ দিন আমরা
রোড দিয়া
এগিয়ে যাচ্ছি। এই রোডটা
তহন আবার নীরব। কোনো দিন
এসব জাগায়
পাঞ্জাবি
থাকছে আবার
কোনো দিন
থাকছে না। যারা
সহযোগিতা
করতো, আমাদের
যে স্পাই,তারা
গিয়া খবরটা
আনছে। খবর
পাওয়ার পর
আমরা গেছি আপনার
তালতলা দিয়া। যাইতে
যাইতে রাইত
প্রায় ১০টা
সাড়ে ১০টা হইল। পেডে
ক্ষিধার অস্হির। তখন যে
গণ্যমান্য
ব্যক্তিরা
ছিলেন,তারা বাড়ি
থেকে কিছু
খাবার টাবার
সংগ্রহ করলেন। আমরা
খাইলাম। এদিকে
গ্রামের
উত্তর অংশ
দিয়া
পাকসেনারা পশ্চিম
দিকে নৌকা
নিয়া আসতাছে
সেটা আমরা
জানতে পারি
নাই। তারপর
আমাদের উপর
হামলা করছে। ২/৩ জন লোক
মারা গেল। কে মারা গেল
ইডা আমরা
নির্দিষ্ট
কইরা বরতে পারব
না। তহন তো
জান বাঁচানো
ফরজ।
প্র:
আপনাদের
এলাকায়
পাকিস্তানি
সামরিক বাহিনী
নারীদের উপর
যে অত্যাচার
চালাইছে-সে
সম্পর্কে কি
কিছু বলবেন?
উ:
পরবর্তীতে জানতে
পারছি যে অনেক
নারীর উপর
নির্যাতন অইছে। লতুয়ামুড়া
গ্রামের হাজি
আবদুল
জব্বারের এক মেয়েকে
ধরে নিয়ে
গেছিল। নাম
নূরজাহান।
প্র:
আপনাদের
গ্রাম বা
এলাকায়
রাজাকার কারা
ছিল?
উ: আমাদের
গ্রামে নজীব
আলী,তারপর
চন্দ্রপুরের
বজলুর রহমান
মাস্টার,আবদুল
আসিফ ভূঁইয়া,খলিল
উল্লাহ
ভূঁইয়া এরা
রাজাকারদের
নেতা ছিল।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারীর
নাম : এইচ. এম. ইকবাল
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : ২৮ অক্টোবর
১৯৯৬
ক্যাসেট
:
কসবা
২৫