নাম : মোঃ হামদু মিয়া

পিতার নাম : সরদার আলী

গ্রাম : চকচন্দ্রপুর

ডাক : চন্ডিদ্বার

ইউনিয়ন : বিনাউটি

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ২১/২২

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : নবম শ্রেণী পাস

১৯৭১ সালে পেশা : চাকরি (ইপিআর)

বর্তমান পেশা : ব্যবসা

 

 

 

ইপিআর সদস্য মোঃ হামদু মিয়া প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে নিজ এলাকায় এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেনবর্তমান সাক্ষাৎকারে তিনি যুদ্ধদিনের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর ঢাকা আক্রমণের সময় আপনি কোথায় ছিলেন এবং কি করলেন?

 

উ: একাত্তরের ২৫শে মার্চ দিনগত রাত্রে আমি চট্টগ্রাম শহরে ছিলামবর্তমান মন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলাম সাহেব আইসা আমাদেরকে হালিশহরের মর্টার প্লাটুনে বললেন তোমাদের প্লাটুন কমান্ডার কোথায় এবং তোমরা বাঙালি কে কে আছে? তখন অনুমান রাত দশটানায়েব সুবেদার আয়েজ উদ্দিনকে বাসা থাইক্যা ডাইকা আনা হলতার সাথে সাথে হাবিলদার আমীর খসরুরফিক সাবের নেতৃত্বে কোতের ডুপ্লিকেট চাবি বানাইয়া রাখা হইছিলরাত্রে যখন নাকি উনি আইস্যা বলল বলার সাথে সাথে আমরা ২৫ থাইকা ৩০ জন ছেলে প্রথম প্রস্তুতি নেইউনার কথা অনুযায়ী আমরা সকলে একত্রিত হইয়া উইং কোয়ার্টার গার্ডের সামনে বাংলাদেশের ম্যাপ সম্বলিত পতাকা নিয়া ক্যাপ্টেন রফিক সাবের নেতৃত্বে ওয়াদাবদ্ধ হই যে,আমরা দেশের জন্য কাজ করবজয় বাংলার জন্য কাজ করবতারপর সেখান থাইকা রাত্রে আমা জাগায় জাগায় হাতিয়ার নিয়া সবাই ডিফেন্সে পৌছে গেলামরাত্রিতে ক্যাপ্টেন রফিব সাব একটা জীপ নিয়া চইলা গেলেনআমরা পাকসেনাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম নাশেষ পর্যন্ত ১ এপ্রিল তারিখে চট্টগ্রামের হালিশহর ত্যাগ করছিতখন আমরা যার যার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলামইন্ডিয়া যাব কিনা তাও একটা সমস্যাযদি ইন্ডিয়া যাই,না জানি কি হয়তার আগে শুনলাম যে রফিক সাব নাকি বার্মা গেছিল অস্ত্রের জন্যবার্মার তারা অস্ত্র দেয় নাইনানান সমস্যায় পইড়া আমি নিজে ইন্ডিয়া যাই নাইকয়েক দিন হাঁটার পরে ফেনীতে আসলামফেনী থাইকা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি আসলামবাড়ি আসার তিন দিন পর হঠাৎ কইরা কসবা বাজারে পাঞ্জাবি আসছে শুইন্যা মানুঝ জন দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করছেতখন কয়েক জন আইস্যা বলল যে,সেখানে (ভারত) যাওয়া দরকারবি এস এফ-এর তারা ইন্ডিয়ার কোনাবন থাইকা আমাদেরকে গুলি বন্দুক দেবেআমরা সেখানে যাবগেলাম কোনাবনকোনাবন যাওয়ার পরে তখন তারা আমাদেরকে দিতাছে মার্ক থার্ড রাইফেল আর দশ লাউন্ড গুলিতখন আমি বললাম যে,এই দশ রাউন্ড গুলি আর একটা মার্ক থার্ড রাইফেল নিয়া সেখানে যাওয়া কোনো মতেই সম্ভব নাতখন আমি গেলাম নাআমি পিছনে চইলা আসলামতারা অনেকেই গেলসেখানে তারা কয়েক রাউন্ড ফায়ার করছেপাকসেনারা পুরাণ বাজারটা পুড়াইয়া ফালাইল এবং সবাই আইসা ইন্ডিয়া উঠল

 

প্র: আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন বা অংশগ্রহণ করলেন?

 

উ: তারপর দিন আমি বাড়িতে রইরামএকদিন আমি রাত্রে বাড়িতে গুমায়ে আছিএমন সময় কিছু লোক মর্টার নিয়া আইস্যা আমার উঠানের মধ্যে মর্টার পাতলকসবা টি আলীর বাড়িতে ফায়ার দিবেতখন আমি শুইয়া থাইক্যা টের পাইলাম যে বাড়িতে লোক জন আনাগোনা করতেছেউইঠা দেখতে পাইলাম কিছু সংখ্যক লোকতখন আমি মনে করলাম যে পাঞ্জাবি আসছে না কে আসছেইন দি মিন টাইম তখন আমাকে ডাকলডাকার পরে যাইয়া আমি বললাম যে,আমি বাড়ির মালিককি করো? লেখাপড়া করিতখন উনি বলল,দেখ আমি মুক্তিবাহিনী তোমার কোনো ভয় নাইআমি কসবা টি. আলীর বাড়িতে ফায়ার দেবএখান থাইকা ফায়ার যাবে কিনাতখন আমি বললাম যে,স্যার এখান থাইকা ফায়ার যাবে নাতিনি বলেন থ্রি ইঞ্চি মর্টারের দূরত্ব কি কইরা জান? তখন উনি নানান কথা দিয়া আমাকে প্যাঁচ দিলেনতখন আমি উনার কাছে স্বীকার করলাম যে আমি ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর একজন সৈনিক এবং মর্টার প্লাটুনেরই সৈনিকতখন উনাদেরকে নিয়া গেলামনোয়াপাড়া এবং আগাপুর যে রাস্তা আইছে যেখানে রেল আইস্যা ক্রসিং হইছে সেই রাস্তার মাথা থাইক্যা কসবা টি. আলীর বাড়িতে ফায়ার দেওয়া হলোআমার সাথে তখন আমার গ্রামের আবদুর রহমান এবং জাহাঙ্গীর এই দুই লোক ছিলসেখান থাইকা ফায়ার শেষ করার পরে উনারা চইলা গেলেনআমি চইলা আসলাম বাড়িতে

 

তার কিছু দিন পরে আমি যাইয়া ক্যাপ্টেন গাফফার সাবের কাছে জয়েন করলামজয়েন করার পরে নিয়া গেল আমাদেরকে আখাউড়াযখন আখাউড়া চেক পোস্টে অ্যাটাক হয় তখন সেই অ্যাটাকে আমরাও ছিলামতার পরই আমাদেরকে ওখান থাইকা মুভ করাই দিল মেলাঘরেমেলাঘর যাওয়ার পর দিদারুল আলম সাবের নেতৃত্বে আমাদেরকে নিয়া গেল গোমতী নদীর দক্ষিণ পাড়ে কুমিল্লা এয়ারপোর্টসেই এয়ারপোর্টে ফায়ার দেওয়ার জন্য আমরা মর্টার প্লাটুন গোমতীর উত্তর পাড়ে থাইকা মর্টার পাতলামউনি একটা ওয়াকিটকি সেট,গেঞ্জি,গামছা এবং একটা কাছি হাতে নিয়া চইলা গেলেন ওপির কাজ করতেসেখান থাইকা উনি যে ডাইরেকশন দিতেন সেই ডাইরেকশন অনুযায়ী আমরা বোম ফালাইতামসেখান থাইকা মেলাঘরে পুনরায় আসছিমেলাঘরে তখন মেজর খালেদ মোশাররফ ছিলেন,গাফফার সাব ছিলেন,সুবেদার মেজর ইদ্রিছ সাহেব ছিলেনএখানে ২/১ দিন থাকার পরে আমার সাথে সাক্ষাৎ হইল আমাদেরই পাশাপাশি গ্রামের সোবহান এর সাথেএর সঙ্গে পুনরায় আমাদেরকে নিয়া গেল রাধানগর ক্যাম্পেরাধানগর ক্যাম্প থাইকা পুনরায় আবার বলল যে তোমাদের যাইতে হবে তোমরা তাড়াতাড়ি তৈরি হওআমরা তৈয়ার হইলামসেখানে আসল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র নেতা আফজল খানআফজল খান আইসা আমাদেরকে চৌদ্দগ্রামের দক্ষিণ পাশে জগন্নাথ দীঘির দক্ষিণ দিয়া নিয়া গেলউনার নেতৃত্বেই আমরা গেলামআমরা পজিশন নিলামদক্ষিণ দিক থাইকা নিলামপাকবাহিনী আসবে এবং ট্যাংকও আসবেসত্যিই ট্যাংক আসলো

 

প্রথম ট্যাক আসার পরে কোনো ফায়ার দেওয়া হয় নাইদ্বিতীয় ট্যাংকের সময় ফায়ার দেওয়া হইছে এবং ট্যাংকটা রাস্তার পশ্চিম পাশে পড়া ছিল বেশ কিছু দিনচিটাগাং আসা যাওয়ার পথে আমরা দেখছি স্বাধীনের পরেতারপরে উভয় দিক দিয়া ফায়ার আরম্ভ হইয়া গেল

 

এদিকদা কুমিল্লা থাইকা লোকজন এডভান্স করছে,ঐদিকদা চিটাগাং থাইকা আসতেছে,ফেনী থাইকা আসতেছেতারাও আইসা সামনা সামনি হইছেতখন আমরা গুলি কোন দিক করব না করব ঠিক করতে না পাইরা শুধু নিজের জান বাঁচাবার জন্য আমরা অগ্রসর হইয়া ইন্ডিয়ার ভিতরে যাইইন্ডিয়া যাওয়ার পর আমাদেরকে বলল যে ঠিক আছে তোমরা হাত মুখ ধোও,গোসল দেও,খানা দানা খাইয়া রেস্ট করপরদিন আমাদেরকে এখান থাইকা উঠাইয়া নিয়া গেল বেলুনিয়া চেকপোস্টবেলুনিয়া চেকপোস্ট লওয়ার পর আমাদেরকে দেওয়া হইল এইট্টি ওয়ান মিলিমিটার মর্টারআমরা পুরা পার্টি গেলাম মুন্সীরহাটমুন্সীরহাট ফাস্ট লাইন ডিফেন্সে আমরা যে গ্রামে ছিলাম সেই গ্রামের নামটা আমার স্মরণ নাইমুন্সীরহাট ডিফেন্সে আমরা যে গ্রামে ছিলাম সেই গ্রামের নামটা আমার স্মরন নাইমুন্সীরহাট ডিফেন্সে লাগাতর গুলি চলছেএখানকার মুক্তিবাহিনী নাকি ওয়াদাবদ্ধ আছিল যে এয়ারপোর্ট দখল না করা পর্যন্ত তারা কোনো বিমান সাপোর্ট নিবেনা এবং ভারতের তারাও নাকি বলছে যে তোমরা যদি এয়ারপোর্ট দখল করতে পার তাইলে তোমাদেরকে দেওয়া হবেকাজেই সেই বিমানের আশায় সবাই ওয়াদাবদ্ধ হইয়া সেখানে লড়াই করতে লাগল

 

প্র: যুদ্ধের শেষ দিকে কোন দিক দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকলেন এবং কি দেখলেন?

 

উ: যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা শুভপুর ব্রিজ থাইকা হাটহাজারী পর্যন্ত যাইযাওয়ার পথে দেখছি রাস্তায় রাস্তায় অনেক লোক বোমের সাথে উইড়া গেছেরাস্তায় পোতা ছিল এন্টি ট্যাংক মাইনএন্টি পারসনাল মাইনআমরা হাটহাজারীতে দুই রাত্র কাটাইলামআমাদের কোনো নির্দেশ আসে নাএরপর একদিন ভোরবেলা ঘুমের াইকা উইঠা সুবেদার জব্বার সাব ওয়ান ব্যান্ড না টু ব্যান্ড ফিলিপস একটা রেডিও ছিল উনার,উনি যখন রেডিওডা অন করল তখন চিটাগাং সেন্টার থাইকা কে বা কাহারা বলতেছে তা আমি বলতে পারি নাচাটগাঁয়ের ভাষায় বলতাছেতরা আছনা আরার দেশ স্বাধীন ঐযেএদত পাকবাহিনী নো আছে,এত্তোন চলি গেছে,এরারে উত্তাই তে ঔবই এরাও সেলেন্ডার করছে,তোরা আইছওনা আরার দেশ স্বাধীন অইছেআরা মুক্তি পাইছিএই কথা শোনার পর তখন যে কয়েক জন ছাত্র ছিল আমাদের সাথে তারা হৈ হৈ কইরা জয় বাংলা জয় বাংলা বইলা চিটাগাং-এর ছেলেপেলেগুলা কইল বাড়িত যাইবসবাই তারা দৌড় দিলদৌড়ের সাথে সাথে আমার চোখের সামনে কয়েকটা ছেলে আকাশের সাথে উইড়া গেল এন্টি ট্যাঙ্ক মাইনেফোর বেঙ্গল তখন বাধা দিল যে কেু এরকম হুড়াহুড়ি ছুটাছুটি কইরা যাবে নাযাওয়ার দরকার নাইকেউ লুটপাট করবা নাকেউ কোনো জিনিসে হাত দিবা নাযার যার জাগায় আমরা যেভাবে নিমু সেভাবে যাবাতখন মাইন প্লাটুন আনলমাইন প্লাটুন আনার পরে রেকি েিক করার পরে আমরা হাটহাজারী ইউনিভার্সিটিতে (চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি) কয়েকদিন অবস্হান করছিইন্ডিয়ান ফোর্স চিটাগাং শহরে যাইয়া ঢুকলচিটাগাং শহরে ঢুকার পর আমাদেরকে এখান থাইকা নিয়া গেল আমাদের কমান্ডার সাবের কাছেবিজয়ের সাথে সাথে আমরা চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে পুরা ফোর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাপ্টেন গাফফার সাবের নেতৃত্বে একত্রিত হই

 

প্র: বাড়িতে কখন আসলেন এবং বাড়ির অবস্হা কি দেখলেন?

 

উ: তারপর সেখান থাইকা একত্রিত হওয়ার পর আমি বলাম যে,স্যার আমার বাড়ি বর্ডারে আমাকে ছুটি দেওয়া দরকারকারণ আমার মা বাপ ইন্ডিয়াতে ছিল এবং আমার বাড়িঘরও পুইড়া গেছে সংগ্রামেআমাকে ছুটি দেওয়া দরকারতখন উনি আমাকে দশ দিনের ছুটি দিলেনকোনো লাইন নাইবাস নাই,ট্রাক নাইকোনো কিছু নাইআমি দুই দিনে আমার বাড়িতে আইসা পৌছলামসেদিন আমার মা বাপও ইন্ডিয়া থাইকা আসছেবাড়িতে কোনো ঘর নাইঘর না থাকা অবস্হায় কোনোরকম পুড়া ঘরের মধ্যে আমরা অবস্হান করছিআমার বাড়িতে সাতটা ঘর পোড়া গেছিলতখন আমাদের এলাকার রিলিফ কমিটির যে চেয়ারম্যান ছিলেন উনার কাছে বলা হইল পর উনি বলছেন তোমার ছেলে চাকরি করে,তোমাকে কিছু দেওয়া হবে নাযাক,যেভাবেই হোক দুঃখ কষ্টের মধ্যে আমরা আবার বাংলাদেশে এস্টাবলিশ হইছি

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৮৮