নাম : মো : জালাল উদ্দীন

পিতা : মৃত  আবদুল জলিল মন্ডল

মহল্লা : গৌরিপাড়া (থানা পাড়া),

পৌরসভা : ফুলবাড়ি,

ডাক : ফুলবাড়ি

থানা : ফুলবাড়ি,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : দশম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ১৯

১৯৭১ সালে পেশা : শিক্ষানবিশ দলিল লেখক

বর্তমান পেশা : দলিল লেখক

 

 

 

প্র: আপনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁ

 

প্র: কেন অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: বাংলার মাটিকে শত্রু মুক্ত করার জন্যমা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য

 

প্র: আপনি কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: আমরা ট্রেনিং নিয়া আইসা ফুলবাড়ি এলাকাতেই যুদ্ধ করছিআমাদের টার্গেট ছিলো মাদিলা, মোহনপুর,ফুলবাড়ি এবং কেটরা ক্যাম্প এলাকাআমাদের দলের কমান্ডার ছিলো আবদুল হাইডেপুটি কমান্ডার ছিলো শওকতএকদিন ফুলবাড়ি থানার আলাদীপপুর ইউনিয়নের মেলাবাড়িতে খান সেনাদের হাতে আমরা ঘেরাও হয়ে যাইআমরা ৩০/৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলামখান সেনারা আমাদের ঘিরে ফেললোবিকাল বেলা,সন্ধ্যার ঠিক আগের ঘটনাখান সেনারা সুসজ্জিত ছিলোওদের কাছে মর্টারও ছিলোআমাদের কাছে ছিলো হালকা অস্ত্রমাত্র একটা এল.এম.জি., ৫টা স্টেনগান আর কয়েকটা থ্রি নট থ্রি রাইফেলআমার কাছে ছিলো থ্রি নট থ্রি রাইফেলআমরা তো মনে করলাম মৃত্যু অবধারিতঅবস্হা বেগতিক দেখে আমরা ফায়ার না করে পিছনে হটতে থাকলামআমরা কোনো রকমে নিচু ধানি জমি দিয়ে পানিতে নেমে গেলামপানিতে অসম্ভব জোঁকআমরা সাঁতরিয়ে একটু দূরে সরে গেলামদূরে খান সেনাদের দেখা যায়কিন্তু তারা আমাদের রাইফেলের গুলির রেঞ্জের অনেক বাইরেওরা না হলেও এক/দেড় হাজার গজ দূরেওখান থেকে ফায়ার করে লাভ নাইওখান থেকে আমরা যাচ্ছি অন্যত্র,বাকুরা গ্রামের পাশ দিয়াতখন দেখি যে সেখানেও খান সেনাওই গ্রামটাও তারা ঘেরাও দিয়া আছেআমরা তখন আর ঐ গ্রামের দিকে গেলাম নানা যাইয়ে ধানের জমির ভিতর দিয়ে জামগ্রাম হয়ে ভেরম গ্রামের দিকে গেলামএটা একদম বর্ডারের ধারেসামনে একটা নদীনদী পার হয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়া চলে গেলাম

    আমরা যুদ্ধ করলাম না,কারণ আমাদের যে সব অস্ত্র ছিলো সেই অস্ত্র দিয়া সরাসরি যুদ্ধ করা সম্ভব ছিলো নাযুদ্ধ করলে আমরা সবাই মারা পড়তামওদের গুলি আমাদের মাথার উপর দিয়ে বকের ঝাঁকের মতো যাচ্ছিলোআর আমরা গুলি করলে ওদের কাছাকাছিও যেতো কিনা জানি নাতখন আমি কমান্ডারকে বলেছিলাম যে,এই অবস্হায় যুদ্ধ করা সম্ভব নাগুলি করলে আমরা সবাই মারা পড়বোচলেন আমরা ওখান থেকে সরে যাইযা হোক,পরদিন আবার রুদ্রানি গ্রামে খান সেনা এসে হাজিরকিন্তু সেখানে আমরা ছিলাম নাখান সেনারা সেখানে ঘোরাঘুরি করে চলে যায়

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: মনে হয় ২৯/৩০ মার্চ হবেখান সেনারা পার্বতীপুরের দিক থেকে আক্রমণ করলোপানাহার পুকুরে ওদের মর্টারের গোলা পড়তে লাগলোতখনও ওরা ফুলবাড়িতে আসে নাইআমরা সেই সময় ফুলবাড়ি থানার ওখানে উপসি'ত ছিলামকিছু লোকজন বললো, খান সেনারা ফুলবাড়ির দিকে পায়ে হেঁটে আসছে,আর ফায়ার করছেতখন আমরা যে যার বাড়ি চলে গেলামযাইয়া যে যা পারি তাই নিয়া আমরা পশ্চিম দিকে ছুটলামপ্রথমে দক্ষিণ দিকে গেলাম, তারপর পশ্চিম দিকেপ্রথম দিন এসে তারা কোনো বাড়িঘরে আগুন দেয় নাইশুধু গোলাগুলি করলোএই সময় তারা সামান্য প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং চলে যায়পরে এপ্রিল মাসে এসে তারা ফুলবাড়ি দখল করে নেয়তখন লোকজন মারছে,বাড়িঘরে আগুন দিছেযারা আওয়ামী লীগ করতো তাদের বাড়িঘর খান সেনারা ধ্বংস করে দিছেএকদম মাটির সাথে মিশিয়ে দিছেআমার বাড়িটাও তারা ধ্বংস করে দিছে 

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: হ্যাঁ,আমার ভাই শহীদ হয়েছেতার নাম আবদুস সালামআমার ছোট ভাইগাড়ির ড্রাইভার ছিলো

 

প্র: কি ভাবে শহীদ হলো ?

 

উ: ও যাচ্ছিলো রংপুরেরংপুরে যাওয়ার পথে কুশরা খালি গ্রাম পার হয়ে লক্ষ্মীপুর রেল গুমটির ওখানে রাজাকাররা তাকে ধরেরংপুরে আমার এক বোন ছিলোসে তার কাছে যাচ্ছিলোআমার বাবা-মা ইন্ডিয়া ছিলোসেও ইন্ডিয়া ছিলোকাউকে কিছু না বলে সে ওখান থেকে এলাকায় এসে রংপুরে যাচ্ছিলোযাওয়ার পথে লক্ষ্মীপুর রেল গুমটিতে তাকে রাজাকাররা ধরে খান সেনাদের কাছে নিয়া যায় এবং বলে এ মুক্তিযোদ্ধার ভাইএ ঘটনা ঘটে আমরা যে দিন খান সেনাদের ঘেরাওয়ে পড়ছিলাম তার তিনদিন পরখান সেনারা আমার ভাইটাকে থানায় নিয়ে যাইয়া খুব নির্যাতন করছেঅত্যাচার করার ৩/৪ দিন পর কোথায় নিয়া যাইয়া মেরে ফেলছে কেউ জানে নাসন্ধান করেও আমার ভাইয়ের লাশ কোথাও পাওয়া যায়নিতবে দেশ স্বাধীনের পর একটা খবর পাইছিলাম যে,এখানে মোতালেব মিয়ার যে বাগান আছে সেখানে নাকি খান সেনারা আমার ভাইকে গুলি করে মারছেওখানেও আমরা খুঁজছিকিন্তু লাশ পাই নাই

 

প্র: আপনার এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা কখন থেকে শুরু হয় ?

 

উ: এখানে মুক্তিবাহিনী গঠন শুরু হয় মে মাস থেকেতখন বা তার কিছুদিন পর ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়া আসি এবং তার পর থেকেই আমরা তৎপরতা শুরু করি

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: জনগণ আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করছেজনগণ আমাদের স্হান দিতোখাবার দিতোযাদের ঘরে ভাত থাকতো না তারা তখনই চুলা ধরাইয়া চাউল ভাজে দিতোআমাদের সঙ্গে রাখার জন্যও চাউল ভাজা দিতোচাউল ভাজা কয়েকদিন ধরে রেখে খাওয়া যেতোএমন কি আমরা যেখানে থাকতাম সেখানে গোপনে যাইয়া পর্যন্ত তারা খাবার দিয়া আসতো

 

প্র: আপনার এলাকায় রাজাকার কারা ছিলো ?

 

উ: রাজাকার তো অনেকেই ছিলোতাদেরকে আমরা ভাই হিসেবে, বাঙালি হিসেবে তেমন কিছু বলিনি বা করিনিশুধু আমার ভাইকে যে রাজাকার ধরিয়ে দিয়েছিলো কেবল তাকে ধরে নিয়ে এসে থানায় দিছিলামওর নাম ইনসানইনসানের সঙ্গে আর কারা ছিলো জানি নাসে আমার ভাইকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করছিলো এই প্রমাণ আমি পাইছিলামসেই ধরছিলো আমার ভাইকেআরো রাজাকার ছিলোতাদের নাম আমার স্মরণ নাই

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: শান্তি কমিটিতে মোহাম্মদ হোসেন ছিলোসে এখন বেঁচে নাইএকজনের নাম আনোয়ার হোসেনসে এখন সৈয়দপুর থাকেআফতাব ডাক্তার ছিলোআর একজন ছিলো, সিন্ধুর ঘাটার আবদুস সামাদতারপরে ফজলুর রহমান, হাতেম ছিলোশান্তি কমিটিতেও অনেকে ছিলোএখন কেবল এদের নামগুলা শুধু মনে পড়েহাতেম মিয়াও সৈয়দপুরে থাকেফজলু মিয়া, সামাদ মিয়া বাড়িতে আছে

 

প্র: এই সব স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: না,সবাইকে ধরা হয়নিকয়েকজনকে ধরা হয়েছিলো

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে এসে এলাকার কি অবস্হা দেখলেনস্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি কি অবস্হায় ছিলো ?

 

উ: গ্রামে এসে দেখি কারো বাড়িঘর নাইগোটা গ্রামে দু/তিনটা ঘর ভালো ছিলোকোনোটা পোড়া, কোনোটা ভাঙাবাজারটা কিছুটা ভালোদোকান টোকানগুলা ঠিক আছেমসজিদটা মাটির ছিলো, সেটা দেখলাম ঠিক আছেমসজিদটার কোনো ক্ষতি হয় নাইএখানে দুটা মন্দির ছিলোএকটা মন্দির ভাঙাকালি মন্দিরের ঘরটা আছে কিন্তু কোনো মুর্তি নাইব্রিজগুলা ভাঙাকিছু মুক্তিযোদ্ধারা ভাঙছেকিছু আবার খান সেনারাও ভাঙছে

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: আমার অস্ত্র তরঙ্গপুরে জমা দিছিওখানে জমা দিয়া বাড়ি আসছিতারপর মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ দিছিমিলিশিয়া ক্যাম্প বন্ধ করে দিলে আবার বাড়ি আসছি

 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : নভেম্বর ০৮, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৭৮