নাম
:
মোঃ জামিল
পিতা
:
তজিমউদ্দীন
মন্ডল
গ্রাম
:
মিরপুর,
ইউনিয়ন
:
কাজিহাল,
ডাকঘর:
জামগ্রাম
থানা
:
ফুলবাড়ি,
জেলা
:
দিনাজপুর
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : নিরক্ষর
১৯৭১
সালে বয়স : ২৭
১৯৭১
সালে পেশা : কৃষি,
বর্তমান
পেশা : শ্রমিক
প্র:
১৯৭১ সালের
কথা কি আপনার
মনে পড়ে ?
উ: হ। পাক সেনারা
আমাদের দেশে
তখন হুজ্জত
শুরু করে দিছিলো। সৈয়দপুর
থাকি, ঐ
দিক থাকি
খানেদের গাড়ি
আমাদের এখানে
আসে। তারা
এখানে লোক
মারে, ওখানে
লোক মারে, একে ধরে, ওকে ধরে। যাক তাক
শাসি দেয়। এটা দেখি
আমরা পালি
গেলাম। ওদের
উপর আমাদের
বিতৃষ্ণা আসি
গেলো। আমরা
আর পারি না। আমরা তখন
যুদ্ধ করার
জন্য
মুক্তিযোদ্ধাত
নাম লিখাইলাম।
প্র:
১৯৭১ সালে
আপনি কি আক্রান্ত হয়েছিলেন ?
উ:
হইছিলাম।
প্র:
কিভাবে ?
উ: আমাক
অ্যাটাক
করছিলো
রাজাকারেরা।
প্র:
কোথায় ?
উ:
বেজাইয়ের
মোড়ে। আমরা
ওখান দিয়া
যাচ্ছিলাম
অপারেশনে। অপারেশনে
যাওয়ার সময়
ওখানে দেখি
চারজন
রাজাকার বসি। আমরা রাস্তা
পার হইছি এমন
সময় ওরা
আমাদের কাছে
আসছে। তারা
আসিয়া বলছে যে, আপনারা
তো
মুক্তিযোদ্ধা, আপনাদের
তো আমাদের
সাথে যাইতে হয়। ওরা
আমাদের
খাওয়ার
দাওয়াত দিলো
এক গ্রামে। আমরা সরল মনে
দাওয়াত খাতে
গেছি। কোনো
কোনো রাজাকার তো
আমাদের
সাহায্য করছে। তাই মনে
করছি এরাও
বোধহয় সেই রকম। পাকশাক
হইছে, দাওয়াত
খাবো আমরা ৮
জন। এদিকে ঐ
রাজাকারেরা
গোপনে খান
সেনাদের বলে দিছে
যে,
এখানে
মুক্তিযোদ্ধা
আসছে। খান
সেনারা এই খবর
পাইয়া আমাদের
ঘেরাও করছে। কিন্তু
তারা আমাদের
ধরতি পারে নাই। আমরা ঘরের
চালের উপর
দিয়া
কোনোরকমে
বাহির হয়া
আসছি। আমরা
আর অন্ন খাতে
পারি নাই। পলাইয়া গেছি। এই ঘটনার
একদিন কি দুই
দিন পরই আমরা
অনেক মুক্তিযোদ্ধা
রাতে ঐ গ্রামে
আবার
অপারেশনে
গেলাম। সেখানে
যায়া ঠিক ঐ
রাজাকারদেরকে
চিনে ফালাইয়া
তাদেরকে
ঘেরাও করছি। ঐ গ্রামে
কিছু খানও
ছিলো। আমাদেরকে
দেখে তারা শেষ
মুহূর্তে ভাগে
গেলো। আমরা
তাদের আর ধরতি
পারলাম না।
প্র:
আপনি কোথায়
ট্রেনিং
নিয়েছেন ?
উ: আমাদের
হায়ার
ট্রেনিং হইছে
শিলিগুড়ির
পানিঘাটায়।
প্র:
ওখানে
ট্রেনিং
নেওয়ার পর
কোথায় আসলেন ?
উ:
ট্রেনিং নিয়া
আমরা আসছি
আঙ্গিনাবাদ ক্যাম্পে। তরঙ্গপুর
থাকি আমাদের
হাতিয়ার
দিছিলো। ফুলবাড়ির
মতিন মাস্টার
আমাদের
হাতিয়ার দিলো। আমার
সঙ্গে আজিজ
প্রিন্সিপাল, কাঁটাবাড়ির
বীরেন
প্রফেসর, তারপর
সামাদ
প্রফেসর ছিলো।
প্র:
কোথায় কোথায়
যুদ্ধ করলেন ?
উ: আমরা
করছি মাদিলা, কেটরা, আফতাবগঞ্জ, পার্বতীপুর
এবং হলদিবাড়ি। পার্বতীপুর
জংশনের ওপারে
আমরা ক্যাম্প
খাটায়ে ছিলাম। আফতাবগঞ্জে
পাক সেনাদের
বাংকার ছিলো। আমরা যখন
আফতাবগঞ্জে
গেছি তখন
বাংকারে পাক সেনাদের
কেউ ছিলো না। আমরা দেখি
খালি একটা
মেয়ে। তার
হাতে মাইন, শরীরের
সবজাগায় মাইন। সেই মেয়ে
জীবিত ছিলো।
প্র:
সেখানে ক’টা মেয়ে
ছিলো ?
উ: ঐ
একটাই। আমরা
মাইন টাইন
সরায়া
মেয়েটাক
উদ্ধার করলাম। খানেরা
খুব নির্যাতন
চালাইছে
মেয়েটার উপর।
প্র:
ঐ মেয়েকে কি
করলেন আপনারা ?
উ: ঐ
মেয়েকে
পাঠায়ে দিলাম
ইন্ডিয়াতে, সুন্দরপুর
গ্রামে।
প্র:
খান সেনারা
তখন ছিলো না ?
উ: ছিলো
না। তারা
কিছুক্ষণ আগে
ভাগে গেছে। আমরা একবার
যুদ্ধ করি খান
সেনা তো মারছি
বেশ ক’জনরে। এই যে
সামনে, আমার বাড়ির
সামনে জালাল
চৌধুরীর
বাড়িতে আমরা
খান সেনা
মারছি। আমরা
তিন দিক দিয়া
একদিন জাগাটা
ঘেরাও করছিলাম। পর্বদিক
খোলা ছিলো। আমরা
দক্ষিণে, উত্তরে আর
পশ্চিমে--এই
তিন দিক
আটকাইছি। আমাদের
এখানে ওরা
রেইড করতে
আসছিলো। খান সেনারা
মাদিলা থেকে
আসছে। ঐ
সময় ধান খেতে
ধান ছিলো। প্রথমে
আমাদের ২টা
ছেলে মারা
গেলো নদীর
ঘাটে। আমাদের
কাছে হেভি
হাতিয়ার ছিলো
না। তখন
আমরা মফিজ
স্যারকে
বললাম যে, স্যার, পাক
সেনারা তো
আমাদের একদম
কাছে আসে গেছে। আমরা তো
হেভি হাতিয়ার
পাচ্ছি না। তালে করা যায়
কি ?
সেইখানটায়
মোজাম্মেল
ডাক্তারও
ছিলো। উনি
ওখানটায় কি
যেন বললো। পরে উনি আবার
ফিরলো
এল.এম.জি. একটা
নিয়া। আমরা
ঐ এল.এম.জি. আর
অন্য অস্ত্র
দিয়া তাদের
উপর তিন দিক
থাকি ফায়ার
করছি। অনেকগুলান
খান ছিলো। তাদের মধ্যে
বেশ ক’জন
মারা যায়। তবে কতজন
মারা গেছে তা
বলতে পারবো না।
প্র:
পাকিস্তানিরা
কতজন ছিলো ?
উ: তাও
বলতে পারবো না। তারপর
জাঙ্গাল
ব্রিজের
ওখানে আমরা
একবার অপারেশন
করছি। ব্রিজটা
উড়ি দিতে
যাইয়া আমাদের
একটা ছেলে ব্রিজের
নিচে পড়ি মারা
গেলো। আমরা
তাক বাইর করতে
পারি নাই। ছেলেটার
বাড়ি ভেরমে। নাম হাই।
প্র:
সেই সময় আপনার
পরিবারে কেউ
শহীদ হয়েছে কি
?
উ: না।
প্র:
তখন
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
জনগণের মনোভাব
কেমন ছিলো ?
উ: ভালো
ছিলো। তারা
আমাদের
সহযোগিতা
করছে। জনগণ
বলছে আমরা
খানদের হাত
থাকি বাঁচতি
চাই। এর ছেলে, ওর
ভাতিজা, ওর নাতি
সকলকেই
মুক্তিযোদ্ধাত
পাঠি দেও। আমরা যেন এই
দুর্যোগ থাকি
বাঁচি। জনগণ
বলছে দেশকে
মুক্ত করতে
হবি- নাইলে
পাক সেনারা
আমাদের
মা-বোনদের
ইজ্জত শেষ করে
দিবি।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
কি অবস্হা দেখলেন-
গ্রামের
স্কুল-মাদ্রাসা, বাড়িঘর, ব্রিজ, কালভার্ট
?
উ: এগুলা
সব খারাপ
দেখলাম। খানেরা ভাঙে
চুরে সব শেষ
করে দিছে। বাড়িঘর সব
ভাঙাচুরা
আছিলো। আমাদের
কারো হালের
গরু নাই। গ্রামের
মানুষজন কে যে
কোথায় গেছে। শুনলাম
কেউ রায়গঞ্জে, কেউ
কালিয়াগঞ্জে।
প্র:
আপনার অস্ত্র কোথায় জমা
করলেন ?
উ:
দিনাজপুর
মহারাজা
স্কুলে। আমরা
ওখানটায়
ছিলাম। সেখানে
ক্যাপ্টিন
শাহরিয়ার
ছিলেন। ওইখানে
থাকার সময়
মাইন বার্স্ট
হইয়া আমি আহত হই। অ্যান্টি
ট্যাংকের পিন
নাকি খুলি
গেছিলো, বেলা
ডুবতেছে সেই
টাইমে। বেলা
ডুবার ঐ টাইমে
হঠাৎ মাইন
ফাটছে। আমরা
বারান্দায়
ছিলাম। কেবল
আমাদের খাওয়া
দাওয়া হইছে, প্লেট
উঠাচ্ছি ঐ
টাইমে। কোনো
ছেলে আবার চলি
গেছে বই দেখতে। তার আগে
মাইনগুলা কেউ
কেউ ক্লোজ
করতেছে। রহমতগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, দুরিপুর, নাটিমোড়, লিয়াডাঙ্গি
ইত্যাদি জাগা
থাকি
মাইনগুলা আনছিলো।
প্র:
এই বিস্ফোরণে
কতজন মারা
গেছে ?
উ: না
হলেও তিন থেকে
সাড়ে তিনশ’।
প্র:
আপনার কোথায়
লাগছে ?
উ: ডান
পায়ের নিচের
দিকে। তারপর
আমি পড়ছিলাম
গর্তের ভিতর। ওখান থাকি
লোকজন আমাকে
টানে বার করছে। চিকিৎসা
করাইছি
অনেকদিন।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারী : আবদুল
কাইয়ুম
সাক্ষাৎকার
গ্রহণের
তারিখ : নভেম্বর ১০, ১৯৯৬
ক্যাসেট
নম্বর : ৭৯