নাম : মোঃ জামশেদ মিয়া

গ্রাম : গাববাড়ি

ডাক : নেয়ামতাবাদ

ইউনিয়ন : বিনাউটি

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ১৭/১৮

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র (মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী)

বর্তমান পেশা : বেকার

 

 

মোঃ জামশেদ মিয়া ভারতে ট্রেনিং শেষে একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে মেলাঘর দেবীপুর হয়ে কসবা আসেনতিনি কসবা এবং শিমরাইলে অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছেনজামশেদ মিয়া বলেছেন তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা,যুদ্ধ জয়ের কথা

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাস সম্পর্কে আপনি কি জানেন?

 

উ: ১৯৭১-এর ২৬ শে মার্চ অর্থাৎ ২৫ মার্চ দিবাগত রাত্রে আমাদের ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন,ইপিআর হেডকোয়ার্টার,কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট,কুমিল্লা শহরসহ প্রধান প্রধান শহর পশ্চিম পাকিস্তানিরা দখল করে নেয়সারা দেশে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেলআমাদের এইখানে তখন ইপিআর ছিল বর্ডার এলাকাতেআমাদের যারা আনসার বা প্রাক্তন সৈনিক অনেকে বাড়িতে ছিলেন বা পেনশনে ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের সংগঠক যাঁরা ছিলেন তাঁরা প্রস্তুতি নিলেনতহন আমরা উজানিসার ব্রিজের কাছে গাছ ফালাইলাম এবং উজানি সার ব্রিজের কিছু অংশ আমরা ধ্বংস করলামএটা করলাম যাতে পাঞ্জাবি সেনারা রাস্তাঘাটে চলাচল না করতে পারে এবং এদেরকে যাতে প্রতিহত করা যায়তারপরে এইদিকে রেললাইন দিয়ে যাতে ট্রেন চলাচল না করতে পারে সেজন্য যোগাযোগ বিছিন্ন করে দেওয়া হলোএইসব কাজকর্ম আমরা আমাদের নেতাদের নির্দেশে আরম্ভ করে দিলাম

 

প্র: পাকসেনাদরে আক্রমণের খবরাখবর শুনে আপনার কি মনে হয়েছিল বা আপনার এলাকার মানুষের মনের ভাব তখন কি ছিল?

 

উ: তহন এলাকার মানুষদের মনে একটা হতাশা আইসা পড়লো যে,আমরা ভোট দিয়া আইলাম এবং আমরা যাকে নেতা নির্বাচন করলাম-সেই নেতাকে ক্ষমতা না দিয়ে তারা সামরিক আইন জারি করলো এবং আমাদের সাধারণ মানুষের উপরে বিরাট অত্যাচার জুলুম আরম্ভ করলো; হাজার হাজার মানুষকে বিভিন্ন জায়গাতে তারা হত্যা করলোএতে আমরা হতাশ হইয়া পড়লামআমার সঠিক তারিখ স্মরণ নেই এপ্রিলে সর্বপ্রথম পাঞ্জাবিরা কসবাতে আইসা কসবা দখল করে নেয়এইখানে আমাদের পুলিশ,আওয়ামী লীগের কিছু লোক,আনসার এবং অন্যরা মিরে সামান্য যা কিছু গোলা বারুদ ছিল তাই দিয়ে পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে গোলাগুরি হইছেকিন্তু অল্প পরেই আমাদের তারা (লোকরা) পিছু হইট্যা ইন্ডিয়া চলে গেলেন

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে কেন অংশগ্রহণ করলেন?

 

উ: এপ্রিলে পাঞ্জাবিরা আমাদের এলাকায় চলে আসে এবং এলাকা তাদের দখলে চলে গেলআমাদের বাঁচার কোনো পথ ছিলোনাঅত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য,দেশকে মুক্ত করার জন্য মক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি

 

প্র: পাঞ্জাবিরা কিভাবে আসলো আপনার গ্রামে?

 

উ: এরা প্রথম রাউৎহাট হইয়া নেয়ামতাবাদ গ্রামে আসলোকারণ,এর আগের দিন একটা অ্যাটাক হইছিল নেয়ামতাবাদের দক্ষিণ পাশে রেললাইনের উপরেঐখানে বেশ কিছু পাঞ্জাবি মারা গেছেএটা সম্ভবত জ্যৈষ্ঠ মাসনেয়ামতাবাদ গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ি এবং তার আশপাশের বাড়ি এবং রাউৎহাট থেকে যে রাস্তা আসছে ঐ রাস্তার পাশ দিয়া বেশ কতগুলা বাড়ি তারা পুড়াইছেতারপরে গোপীনাথপুর গ্রামেও তারা বাড়িঘর পুড়াইছেআবার এর কিছুদিন পরে তারা আমাদের গাববাড়ি,হাসবন,নোয়াপাড়া বর্ডার অঞ্চল অগ্রসর হয়,মানু মারেঅনেক মেয়েছেলে ধইরা তারা নিয়ে গেছিল চণ্ডীদ্বারচণ্ডীদ্বার যে হাইস্কুলটা এইটাতে তারা নারী ক্যাম্প করছিলমেয়েদের ধইরা আইনা অত্যাচার করতো ঐখানে

 

প্র: আপন কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন বা কোন জায়গায় ট্রেনিং নিলেন?

 

উ: আমি নিজেই ভারতে গেছিসীমান্ত এলাকায় যাওয়ার পরে হাবিলদার নাসিম নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বললাম যে ভাই,আমি যুদ্ধে অংশ নিতে চাই-কিভাবে কোথায় যাওয়া যায়? তখন উনি আমাকে বললেন যে, আপনি সোজা কংগ্রেস ভবনে চলে যানতখন আমি কংগ্রেস ভবন চলে গেলামঐখানে যাওয়ার পরে নাম লিস্ট হইলএরপর আমাকে আগরতলা থাইকা পাঠাই দিল খয়েরপুরঐখানকার ক্যাম্প থেইকা উত্তর দিকে বিজনা ক্যাম্প পাঠাইলওখানকার চীফ ছিলেন আমাদের এম.পি. সৈয়দ এমদাদুল বারী সাহেবঐখানে এক সপ্তাহ রইলামওখান থেইক্যা আমাকে পাঠাইয়া দিল গোকুলনগরঐখানে একটা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ছিলোগোকুলনগরে কিছুদিন রইলামএইখান থেইকা আমাদেরকে ট্রেনিং-এ পাঠাইয়া দিল আসামের মেঘালয়েমেঘালয়ে একটা ক্যান্টনমেন্ট আছে ইন্ডিয়া আর্মিদেরঐটার নাম হইল সম্ভবত লায়ালপুরওখানে আমরা ট্রেনিং করলামট্রেনিং করার পরে আমাদেরকে ওখান থেকে নিয়া আসলো আগরতলা কুঞ্জবন ক্যান্টনমেন্টেকুঞ্জবন ক্যান্টনমেন্ট থাইকা আমাদেরকে পাঠাইয়া দিল মেলাঘরমেলাঘরে ছিল মেজর হায়দারউনি ওখান থেকে আমাদের পাঠাই দিলেন কসবার পূর্ব পাশে দেবীপুরদেবীপুর ক্যাম্পে পাইলাম সুবেদার শামসুল হক সাহেবকেউনার আন্ডারে আমি ছিলাম

 

প্র: আপনার কতজন ছিলেন?

 

উ: আমাকে নিয়া ৩৫ জনআমার গ্রুপে ছিলেন হোসেন,বজলু,তাহের এরাসব নেয়ামতাবাদ গ্রামেরতারপরে হারিস এবং খবিরউদ্দিন ছিল মান্দাইল গ্রামেরবর্তমানে আখাউড়া থানাতে পড়ছেএরপর ফিরোজ ছিল, আনোয়ার ছিলআনোয়ারের বাড়ি অবশ্য মান্দাইল নয়সে তার মামার বাড়িতে থাকতোতার বাড়ি হইল ষোলনগরএরপর রাইতলার আছিল চার/পাঁচ জনতারপরে দেলির ছেলে আছিলআমার পার্শ্ববর্তী এলাকা শিকারপুরের হাসেম ছিলএরকম অনেকেই ছিল তাদের নাম ভুলে গেছি

 

প্র: আপনি তাদেরকে নিয়া দেবীপুর থেকে কোথায় গেলেন?

 

উ: দেবীপুর আসার পরে আমাদেরকে কসবার ডিফেন্সে পাঠাইয়া দেওয়া হইলসর্বপ্রথম আমরা ডিফেন্স দিলাম কসবার দাওয়াখানার উত্তর পাশে একটি বিল্ডিংয়েএই বিল্ডিং-এ যেদিন আসছি সম্ভবত ঐ দিনেই আমাদের উপর অ্যাটাক হয়সন্ধ্যার সময় আমরা খাওয়া-দাওয়া কইরা একটু রেষ্ট নিতাছিআমাদের প্যাট্রল পার্টি বাইর অইব আর কিএর ভিতরে পাঞ্জাবিরা কিভাবে জানি অ্যাডভান্স কইরা আমাদের পিছনে চইলা আসছেতারা আইসা হঠাৎ কইরা একটা গ্রেনেড ফালাই দিল আমাদের দক্ষিণের জানালাটা দিয়াগ্রেনেডটা তহন বার্স্ট হয় নাইআমাদের কাছেও তো গ্রেনেড ছিল বেয়নেট ছিলআমরা তহন গ্রেনেড ছুঁড়ছিসেটা দরজার মধ্যে বার্স্ট হইছেপাঞ্জাবিরা তহন দেখলাম চিৎকার করতাছেআমরা তহন যে যেমনে পারছি বিল্ডিং দিয়া বাইর হইয়া গেছিএ সময় ইন্ডিয়া থেইকা বিএসএফ-রা ফায়ার করতাছেঐখানে খবর হইয়া গেছে যে আমরা অ্যাটাকে পইড়া গেছিফায়ারের নিচে দিয়া আমরা চইলা গেলামতারপর তারাপুর গ্রামে যাইয়া আমরা হল্ট করলামহল্ট করার পরে আমাদের সাথের আবেদ এবং আর একটা ছেলেকে পাঠাইলাম কেষ্টপুরসেখান থেকে বগাবাড়ি যাইয়া আমাদের ডিফেন্সের খবর লইতে বললামএদিক দিয়া রাজাকার এবং পাঞ্জাবিরা উত্তর দিকে আসতাছে স্টেনগান চার্জ কইরাআর আমার ঐ দুইজন ছেলে ঐদিকেই যাইতাছেকসবার ঠিক রেলস্টেশনাটার মধ্যে টিউবওয়েল এরিয়াটার ওখানে তাদেরসামনা সামনি হয়ে যায়তাদেরকে পাঞ্জাবিরা ঐখানে মাইরা ফালায়পাঞ্জাবিরা আমাদের কসবা রেলস্টেশন পর্যন্ত দহলে নিয়া নেয়আমরা তহন ইন্ডিয়ার ভিতরে চইলা গেছি সবতখন ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন সাব,গাফফার সাব,শামসুল হক সাব এবং আরো বড় বড় অফিসাররা সেখানে আসছেনমেজর খালেদ মোশাররফ সাব আসছেনউনারা বললেন যে আমাদের যে জায়গা দখলে ছিল সে জায়গা পুনরায় দখল করতেই হবেতহন আমরা আবার পরের দিন ভোরবেলায় আক্রমণ করিতাদের সাথে আমাদের তুমুর লড়াই হয়তারা শেলিং করছেমর্টার ব্যবহার করছেআমরাও ব্যবহার করছিকিন্তু তাদেরকে আমরা পর্যুদস- করতে পারলাম নাএর কদিন পর পুনরায় যুদ্ধ লাগলরেলষ্টেশনে যে দুইটা ছেলে ধরা পড়ছিল তাদেরকে মেরে স্টেশনের ওয়ালের উপর টাঙ্গাইয়া দিয়া আমাদেরকে তারা বলতেছে,এই যে মুজিবকা বাচ্চা দেখ,তোমারা মুক্তিফৌজকা কিয়া হাল হুয়াএসময় কিন্তু ফাইট হচ্ছেএই অ্যাটাকে আমরা আমাদের জায়গা পুনরায় দহল করে নিয়েছিঐ সংঘর্ষে সুবেদার আজিজ মারা যানতিনি একজন জীবিত পাঞ্জাবিকে ধরে আনতে চেয়েছিলেনতিনি একাই এগিয়ে গেলেন এবং একজনকে ধরে ফেললেনপাঞ্জাবিরা তখন পিছনে চলে গেছেকিন্তু দুর্ভাগ্য বাংকারে একজন পাঞ্জাবি তখনও বসা ছিলসে সুবেদার আজিজকে স্যারেন্ডার করার জন্য বলেকিন্তু তিনি তা করেননিউভয় পক্ষের ফায়ারে উনি মারা গেলেনদুইজন পাঞ্জাবিও মারা যায়সেই লাশগুলা পরে আমরা আনছিএর কয়েক দিন পরেই কসবা পুরান বাজারে সংঘর্ষ হয়এরপর ঐখান থেইকা আমাদেরকে পাঠাই দিল সিমরাইলসিমরাইল যুদ্ধে আমাদের একজন ছেলে মারা গেলসিমরাইল আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেলআমরা তখন রামচন্দ্রপুর হইয়া কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের একটু দক্ষিণ সাইড দিয়া ফকিরহাট রেলস্টেশন দিয়া আবার আমরা ইন্ডিয়ার সোনামুড়াতে চলে যাইতারপর ঐখান থেকে আবার আমরা চলে আসলাম আমাদের দেবীপুর

 

প্র: দুই নম্বর সেক্টরেতো মেজর খালেদ মোশাররফ,ক্যাপ্টেন গাফফার,ক্যাপ্টেন আউনউদ্দিন-এঁরা ছিলেনএঁদের মধ্যে কার ভূমিকা বেশি ছিল বলে আপনি মনে করেন?

 

উ: এইখানে ক্যাপ্টেন গাফফার সাব খুব সাহসী ছিলেন,বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছেনআইনউদ্দিন সাবও ভালো ছিলেনআসলে আমাদের এখানে যে তিন চারজন অফিসার ছিলেন তাঁরা সবাই সিরিয়াস ভূমিকা নিয়েছেনতাঁদের একটা কথাই ছিল যে,আমাদের মাতৃভূমি যে কোনো উপায়ে হউক আমরা উদ্ধার করবোই

 

প্র: আপনার এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?

 

উ: আমার গ্রামে কোনো রাজাকার ছিল নাশুনছি আড়াইবাড়ির সিদ্দিক নামে এক লোক ছিল,সে নাকি কুখ্যাত রাজাকার ছিল

 

প্র: যুদ্ধের পরে আপনি কি করলেন?

 

উ: দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদেরকে ক্লোজ করা হইল ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টেক্লোজ করার পরে এফ এফ যারা ছিল তাদেরকে মনে করেন ১০০ টাকা,একটা কম্বল আর ওসমানী সাহেবের একটা সার্টিফিকেট দিয়া বিদায় করে দিলআমরা চলে আসলাম

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনার গ্রামে এসে বাড়িঘরের অবস্হা কি দেখলেন?

 

উ: আমাদের গ্রামের এলাকা তখন মনে করেন একদম জঙ্গলের মতো অবস্হাআর বাড়িঘরগুলা পোড়াঅনেকের বাড়িঘর ভাঙ্গা

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : এইচ. এম. একবাল

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২৪ নভেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৫১