নাম : মোঃ নজরুল ইসলাম

পিতা : মৃত আবদুল কাদের আলী বিশ্বাস

গ্রাম : চৌধুরিয়া,

ডাক : কাটলাহাট

থানা : বিরামপুর,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : অষ্টম শ্রেণী

১৯৭১ সালে পেশা : কৃষিকাজ,

বর্তমান পেশা : যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

১৯৭১ সালে বয়স : ১৮

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে আপনার কি মনে হয়েছিল ?

 

উ: নির্বাচনের পর পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করলে দেশে আন্দোলন শুরু হয়পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সারা বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হলোমানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করছে না কেনতখন আমার মনে হয়েছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদেরও কিছু করা দরকার৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভাষণ দিলেনসেই ভাষণে তিনি বললেন, আপনাদের যার যা আছে তাই নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ূনআমরা তার নির্দেশ মতো প্রস্তুতি নিতে থাকি

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণ সম্পর্কে কি শুনেছেন ?

 

উ: পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করেছেঢাকায় এবং দেশের অন্যান্য স্হানে সাধারণ মানুষদের বেশুমার গুলি করে হত্যা করছেযাকে যেখানে পাচ্ছে হত্যা করছেঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিছেমা-বোনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে

 

প্র: আপনার তখন কি মনে হয়েছিল ?

 

উ: এসব কথা শুনে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি এবং আমার মনে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়আমার তখন মনে হয়েছিল যে, এদের বিরুদ্ধে আমার একা কিছু করা সম্ভব নয়, এলাকাবাসী সকলে মিলে যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কিছু করতে পারি এবং কিছু করা যায়, তাহলে পাকিস্তানিদের অবশ্যই এদেশ থেকে তাড়ানো যাবেকিভাবে প্রতিরোধ করা যায় তা নিয়ে একটা চিন্তা ভাবনা আমরা করেছিলাম

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: জ্বী, হয়েছিলাম

 

প্র: কিভাবে আক্রান্ত হলেন ?

 

উ: যে দিন আক্রান্ত হই সে তারিখটার কথা আমার সঠিক খেয়াল নাইআমরা তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের ভেতরেই ক্যাম্পে ছিলামআমাদের এক গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে নবাবগঞ্জ থানার চরারহাট যায়সেখানে খান সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়সে স্হান ছিল ডাঙ্গাপাড়া রেল স্টেশন থেকে ২/৩ কিলোমিটার পূর্বেআমরা ক্যাম্পে আছি এমন সময় আমাদের একজন সংবাদদাতা খবর দিল যে, চরারহাটে খান সেনাদের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা যুদ্ধ করছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পাকিস্তানি খান সেনারা সেই গ্রামের কয়েকশ নারী পুরুষকে লাইন করে গুলি করে হত্যা করেছেসংবাদদাতার কথা মতো আমরা ৮/১০ জনের একটি দল সেখানে রওনা দেইচরার হাট যাবার পথে ডাঙ্গাপাড়া রেল স্টেশনের এক কিলোমিটার দূরে দেখি কয়েকজন খান সেনা একটি ব্রিজের উপর টহল দিচ্ছেআমরা তখন পাশ্ববর্তী গ্রামে ঢুকিএমন সময় সেখানকার খান সেনাদের সাথে আমাদের সংঘর্ষ শুরু হয়আমরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে খান সেনাদের মোকাবেলা করতে থাকিএদিকে অন্য স্হান থেকে আরও কিছু খান সেনা এসে ওখানকার খান সেনাদের সাথে যোগ দেওয়ায় তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়এমন সময় আমাদের কমান্ডার মোসফা খান বললেন, আমরা যদি খান সেনাদের সঙ্গে ফাইট করতে থাকি তা হলে পরে আমাদের অসুবিধা হতে পারেআমাদের গোলাবারুদ এবং অস্ত্রশস কম ছিলতিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন, পিছনে হটে আপনারা নিজের নিজের জীবন বাঁচানতার নির্দেশমতো আমরা ক্রলিং করে পিছনে হটে আসছিলামপিছনে হটার সময় আমরা খান সেনাদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাইএদিকে আমরা পিছনে মুক্তিযোদ্ধাদের যে পার্টি রেখে গেছিলাম তারাও শত্রু ভেবে আমাদের উপর গুলি করছিলতখন আমরা বিপদে পড়ে গেলামআমি কোনরকমে নিজের জীবন বাঁচাইরে সরে এসে আমার সঙ্গীসাথীদের খোঁজ করতে থাকিতখন সন্ধ্যা হয়ে গেছেসঙ্গীসাথীদের কোন খোঁজ পেলাম নাপার্শ্ববর্তী মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে খবর দেয়ার পর রাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেখানে এলপরদিন সকাল ৮/৯টার দিকে আমরা তিনজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ উদ্ধার করিশহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আমাদের কমান্ডার গোলাম মোস্তফা খানও ছিলতাদের উদ্ধার করে ১০/১১টার দিকে জানাজা পড়ে তাদের কবর দিয়ে ওখান থেকে আমরা ক্যাম্পে ফেরত গেলাম

 

প্র: খান সেনাদের হাতে কেউ ধরা পড়েনি ?

 

উ: ধরা পড়ছিলেনযে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ আমরা উদ্ধার করি তারাই খান সেনাদের হাতে ধরা পড়েছিলধরা পড়ার পর খান সেনারা তাদের হত্যা করেআমাদের কমান্ডর সাহেবও ধরা পড়েছিলেন

 

প্র: চরার হাটে খান সেনারা কতজন লোককে হত্যা করেছিল ?

 

উ: ঐ দিন আমার ধারণা অন্তত: না হলেও পাঁচ সাতশ হবেএকটা গ্রামের মনে করেন সব মানুষকেই খানেরা হত্যা করেছে

 

প্র: সেখানে কি কেউ বাঁচেনি ?

 

উ: বাঁচছে হয়তোসেটা আমার জানা নেইতবে বাঁচতে পারে হয়তো ২/৪ জন

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: পাকিস্তানিরা আমাদের দেশে সন্ত্রাস দৃষ্টি করে মানুষ হত্যা করছিল, নারীদের উপর ব্যাপক নির্যাতন করছিলএই সন্ত্রাসী এবং দুশমনদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং জাতিকে বাঁচানোর জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানিরা কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: ১৯৭১ সালের এপ্রিলের দিকে

 

প্র: তারা কিভাবে আক্রমণ করলো ?

 

উ: খান সেনারা দল বেঁধে আমাদের গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় আসেব্যাডারা আগুন ধরাইয়া দিছে বাড়িতেপেট্রোল ঢাইলে আগুন ধরায় দিছে এবং গুলি করে মানুষ মারছেনানা ধরনের অত্যাচার করেছে

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক সেনারা আপনার এলাকায় আর কি কি করলো ?

 

উ: নারী নির্যাতন করেছে এবং লুটপাট করে বাড়িঘরে আগুন দিছে

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচারে আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আমার এবং আমাদের পারিবারের কেউ শহীদ হয়নি

 

প্র: আপনার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: প্রতিবেশী একজন শহীদ হয়েছে

 

প্র: তিনি কিভাবে শহীদ হলেন ?

 

উ: তারিখটার কথা আমার খেয়াল নাই, এপ্রিল-মে মাসের দিকে হবেতার নাম ছিল ছাবদের আলীউনি আমার গ্রাম সম্পর্কের ভাই হতেনতিনি একটি স্কুলের শিক্ষক এবং গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেনখান সেনারা বিরামপুরে ধরে নিয়ে যেয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তপরতা শুরু হয় ?

 

উ: জুন থেকে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিল ?

উ: জনগণের মনোভাব খুব ভাল ছিল এবং খুব উসাহিত ছিলজনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে থাকতো এবং তাদেরকে সহযোগিতা করতো

 

প্র: আপনার এলাকায় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কারা ছিল ?

 

উ: আমার এলাকায় রাজাকার, আল-বদর বাহিনী হিসাবে কারা ছিল আমি জানি নাতারা সবাই আমার অপরিচিত ছিলপরিচিতদের মধ্যে কেউ রাজাকার ছিল না

 

প্র: এই সমস্ত স্বাধীনতা বিরোধীরা এখন কোথায় ?

 

উ: এদের সম্পর্কে আমি অবগত নই, তাই তারা এখন কে কোথায় কি অবস্হায় আছে জানি না

 

প্র: আপনি কোন কোন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: আমি যুদ্ধ করেছি হাকিমপুর থানা এবং বিরামপুর থানা এলাকায়

 

প্র: হাকিমপুর থানা এবং বিরাপুর থানায় কোন কোন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: খট্টা, মাধবপাড়া, দেবখন্ডা, হরিকৃষ্ণপুর, সাতপুরি, কাটলা, আভিরামপুর, হরিয়ারপুরএইসব এলাকায় যুদ্ধ করেছি

 

প্র: এই সমস্ত এলাকার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ আপনি কোথায় করেছেন ?

 

উ: সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ, যেটা ইতিপূর্বে বলেছি সেখানে আর আপনার অভিরামপুর, হরিয়ারপুর এলাকায়

 

প্র: সেখানে কিভাবে যুদ্ধ করলেন ?

 

উ: বিরামপুর অভিরামপুর এলাকায় তকালে রাজকারের একজন নেতা ছিলেন ফজলের রহমানআমরা সংবাদ পেলাম সে তার দলবল নিয়ে কাটলা বাজারে আসবেআমরা মুক্তিযোদ্ধাদের পুরো দল তাদের মোকাবিলা করার জন্য সেখানে গেলামবাজারের কাছাকাছি যেতেই ওদের সাথে গোলাগুলি শুরু হলোআমাদের সাথে টিকতে না পেরে রাজাকাররা সেখান থেকে পালিয়ে বিরামপুর চলে যায়যুদ্ধে আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়তার নাম আব্দুল খালেক ঘোড়া ঘাটের কটিপাড়ায় তার গ্রামের বাড়িকয়েকজন রাজাকারও যুদ্ধে হতাহত হয়আর একটা বড় যুদ্ধ আমরা করেছিলাম সাতকুড়ি গ্রামেসেখানে যে রেললাইন ছিল সেই রেললাইনের উপর খান সেনারা টহল দিছিলআমরা ওদের উপর ফায়ার শুরু করিদেড়/দুই ঘন্টা গুলি বিনিময় হয়তাদের কি ক্ষতি হয়েছে সেটা আমরা জানতে পারিনি

 

প্র: হিলিতে বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলঐ যুদ্ধে আপনি ছিলেন কি ?

 

উ: জ্বীঐ যুদ্ধে আমি ছিলাম

 

প্র: আপনারা কিভাবে যুদ্ধ করলেন ?

 

উ: ভারতের সেনারা আমাদেরকে অর্থা মুক্তিযোদ্ধাদের বললো যে, তোম লোক আগে বাড়ো, যো জোয়ান এফ. এফ. হোতা সামনে বাড়াও, হাম লোক পিছে রয়েআমরা তাদের নির্দেশ মতো আগে বাড়িসামনে এগোনোর সময় ফায়ারিং করছি, আর যাচ্ছিফায়ারিং হচ্ছে, ফায়ারিংয়ের মধ্যে কে কোথায় যে মরতেছে সঙ্গে সঙ্গে তা উপলব্ধি করা যায় নাআমরা প্রায় তিনশ মুক্তিযোদ্ধা ছিলামতার মধ্যে এক-দেড়শ আমরা জীবিত ছিলামআর বাকীগুলান শহীদ

 

প্র: তারা কিভাবে শহীদ হলেন ?

 

উ: খান সেনাদের গুলিতেখানেরা গুলি করছেআমরাও গুলি করছিদুই পক্ষেই ফায়ারিং হচ্ছেআমরা ধরেন রেল লাইনের পশ্চিম পার্শ্বে আর ওরা পূর্ব দিকেখান সেনারা বাংকারে ছিলওদের বাংকার খুব হেভীআমরা অপেন ফিল্ডে ছিলামএই অবস্হায় যুদ্ধে প্রায় দুই আড়াইশ মুক্তিযোদ্ধা মারা গিয়েছিল

 

প্র: মুক্তিযোদ্ধাদের লাশগুলো কি আপনারা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁএই লাশগুলো বেশিরভাগ আমরা উদ্ধার করেছি এবং ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী যা করণীয় তা আমরা করেছি

 

প্র: পাকিস্তানি সৈনিকদেরকে কি আপনারা হটাতে পেরেছিলে সেখানে থেকে ?

 

উ: ওখান থেকে আমরা খান সেনাদের ওই দিন হটাতে পারি নাইপরে হটানো সম্ভব হয়েছিল

 

প্র: যুদ্ধ চলাকালে আপনার জীবনে কোনো স্মরণীয় ঘটনা থাকলে বলুন ?

 

উ: যুদ্ধের শেষ দিকে, সম্ভবত: ডিসেম্বর মাসের ৩/৪ তারিখে একদিন আমাদের মুক্তিযোদ্ধা শিবিরের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নির্দেশ দিলেন যে, তোমার শ্বশুর বাড়ি খাট্টা হোসনা এলাকার পাশে খান সেনাদের একটা ক্যাম্প আছেসে ক্যাম্প সম্পর্কে তুমি গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসএটা হাকিমপুর থানার ভিতরেখান সেনারা আমার শ্বশুর বাড়ির পাশেই ছাটনিতে ক্যাম্প করেছিলএকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে আমি আমার শ্বশুর বাড়িতে গেলামআমাদের দেখেই আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজনরা খুব ভয় পেলতখন আমি তাদের বললাম, আপনাদের কোন ভয় নাইআমি আপনাদের মারতে আসি নাইআপনারা আমাকে সহযোগিতা করেনতারা বললো, কি সহযোগিতা আমরা করতে পারিতখন আমি তাদের বললাম, ছাটনি গ্রামে খান সেনারা যে ক্যাম্প করেছে সে সম্পর্কে আমাকে তথ্য এনে দেনআমার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়রা তখন বললো, ঠিক আছে আপনি কয়েকদিন এখানে থাকেন, আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি৩/৪ দিন আমরা ওখানে ছিলামশেষদিন আমরা দুজনও খান সেনাদের ক্যাম্পের কাছে যাইতখন খান স