নাম :  মোঃ নুরুল ইসলাম

পিতা : আবদুল করিম মন্ডল

গ্রাম : গৌরিপাড়া,

পৌরসভা : ফুলবাড়ি,

ডাক : ফুলবাড়ি

থানা : ফুলবাড়ি,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ৩০

১৯৭১ সালে পেশা : রিকশা চালক,

বর্তমান পেশা : শ্রমিক

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময়কার কথা কি আপনার মনে পড়ে ?

 

উ:,তখন তো প্রথম আমরা পালাপালিতেই ছিলামখানেরা আমাদের এখানে আইসা মাইরপিট শুরু করলোতারপরে আমরা তো চইলা গেলাম ইন্ডিয়ায়

 

প্র: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: আক্রান্ত মানে ! আমাদের বাড়িঘর সব ওদের হাতে ধ্বংস হয়া গেলোসেই বাড়িঘর তো এখনও হয় নাইআমার ভাই পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ি গেছিলোওর নাম আবদুস সালামএরপর আমি এখান থেইকা খানেদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য চলে গেলাম মুক্তিযোদ্ধায় নাম লিখাইতে

 

প্র: আপনার ভাই কিভাবে ধরা পড়লো ?

 

উ: রাজাকারেরা ধরি দিলোআমার ভাইরে রাজাকাররা ধরি থানায় খানেদের কাছে নিয়া আসছে

 

প্র: তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ?

 

উ: না,মুক্তিযোদ্ধা ছিলো নাধরে নিয়ে আইসে ওর উপর তারা নির্যাতন শুরু করে দিলো৭ দিন খুব নির্যাতনের পর খানেরা আমার ভাইরে গুলি করে মারলোএখানে ঐ যে তালের গাছ আছে, সেই তাল গাছের গোড়ায় খানেরা আমার ভাইকে মারি পুতি দিলোএরপরে আমি মুক্তিযোদ্ধায় গেলামআমার ভাইকে খানেরা যখন মারলো তখন আমিও দেখছি ঐ ব্যাটাদেরকে

 

প্র: কোথায় গেলেন আপনি ?

 

উ: প্রথমে গেলাম ভারতের পতিরামআমার সঙ্গে আরো কয়জন ছিলোঐখানে অরুণ নারায়ণ নামে এক লোক ছিলোউনার কাছে আমরা একটা দরখাস্ত লেখলামদরখাস্ত লিখে পতিরাম থেকে চলে গেলাম ট্রেনিং সেন্টারেজায়গাটা মনে হয়,গঙ্গারামপুরের পাটন গ্রামএটা দার্জিলিংয়ের পাশেওখানে যাইয়া ট্রেনিং নেওয়া শুরু করলামট্রেনিং শেষ হইলে আমাদের অপারেশনে পাঠাইলোআমরা প্রথম আসলাম হলদিবাড়িতেহলদিবাড়ি থাইকা চিলাহাটি দিয়া ডাইরেক্ট চইলা আসলাম নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায়ডিমলা থানা থাকি আমরা আসলাম কেরাকাঠি হাটএটা ডোমার থানায়ডোমার থানায় আমরা যুদ্ধ করছি খানদের সঙ্গেসামনাসামনি ৫০ গজের মধ্যেআমরা ছিলাম ১০ জনখানেরা বহু জন আছিলোওখানে যুদ্ধ হইলো আপনার সকাল ৯টা থাকি বেলা ৫টা পর্যন্তআমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আরো কয়টা পার্টি ওখানে ছিলোখানেরা পিছনে হইটা গেলোযুদ্ধ করার সময় আমাদের কয়টা ছেলে নষ্ট হয়া গেলোতারপর আমরা তো ঐ দিন আবার রওয়ানা দিলাম ডিমলা থানায়ডিমলা থানায় ক্লোজ হইলামক্লোজ হওয়ার পর ওখান থেকে ফির আবার আমাদেরকে নিয়া গেলো জলঢাকাসেখানে একটা স্কুল আছিলোওটার নাম পুটিমারি স্কুলআমরা ঐ স্কুলে হল্ট করলাম রাত্রেপরদিন সকালে ওখান থাকি আগাইয়া জলঢাকা থানা অ্যাটাক করলামঅ্যাটাক করার পর আমরা দেখলাম থানায় খানরা একটাও নাইওরা সব চলি গেছেআমরা থানায় একদিন থাকলামপরদিন আমরা আবার চলি গেলাম কিশোরগঞ্জকিশোরগঞ্জ থাকি আবার নীলফামারীতেআমরা জলঢাকাতে থাকতেই স্বাধীনতা ঘোষণা হইছেদেশ স্বাধীনের পর আমাদের জন্য ক্যাম্প হইলো নীলফামারীতেসেখানে ক্যাপ্টেন ইকবাল আছিলো

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

 

উ: তারিখটা মনে নাই  মনে হয় ওটা এপ্রিল মাসেপাকিস্তানি সেনারা সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ফুলবাড়িত অ্যাটাক করেতহন আমরা বাড়ি ছাড়ি চলি গেলাম দুমাইল দূরেদুমাইল দূরে এক গ্রামে যাইয়া ছিলাম রাত্রেখানেরা ফুলবাড়ি ঢুকি গোলাগুলি শুরু করি দিলোওরা আসছে পার্বতীপুর হয়াকেউ গাড়ি নিয়া, কেউ হাঁটি আসছেতহন তো আমরা দৌড় মাইরা পালাইলামওরা আসি আগুন লাগাইলো, নারী নির্যাতন করিলোমেয়েদেরকে ধরপাকড় করিলো আর পুরুষদেরকে গুলি কইরা মারিলো, এই কাজগুলা তারা প্রথম দিন করিলোতার পরদিনও খানেরা এসব কাজ করিছেএরপর তারা দিনাজপুর চলি গেলোপরে আবার আইলোআইসা ক্যাম্প করিলো

 

প্র: খান সেনারা ঐ দিন কতজনকে মারছে ?

উ: আমার চোখে দেখা মতে ১০ জননামগুলা কইতে পারুম নাসব বাহিরের লোকখানদের ঐ মারা দেইখাই আমরা সরি গেছিবাড়িঘর ত্যাগ করি চলি গেছি

 

প্র: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: আমার ভাই হইছে একজনসে কথা তো আগে কইছিতাকে ধরি নিয়া খুব নির্যাতন করছেখানেরা আমার ভাইয়ের চোখ তুলি নিছেযে রাজাকাররা আমার ভাইকে ধরি দিছিলো- তাদের দুইজন বর্তমানে আছেতারা বাঁচি আছেএকজনের নাম ইনসারআরেকজন হইলো জাপানীলোকে তাকে জাপানীই কয়

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: এটা তো আমি সঠিক কতি পারবো নাতখন তো আমি ইন্ডিয়াত মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিচ্ছি

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: জনগণ ভাবছে এরা আমাদের উপকার করার জন্যই আসছেমুক্তিরা আমাদের উপকার করবেখান সেনার হাত থাকি এরা আমাদের বাঁচাইবেতারা থাকবার জাগা দিছিলো মুক্তিযোদ্ধাদেরকে

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: দুইজনাকেই আমি পাইছিইনসার আর জাপানীএখনও বাঁইচা আছে এরাআর সবার নাম জানা নাই

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: শান্তি কমিটিতে ছিলো নুরুল হুদা চৌধুরীউনি মারা গেছেন

 

প্র: এ সব স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বাধীনতার পর ধরা হয়েছিলো কি ?

 

উ: না,তাদের ধরা হয় নাই

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে এসে কি অবস্হা দেখলেনস্কুল মসজিদ মন্দির-এগুলা ?

 

উ: আমার এলাকায় এগুলো সব পোড়া আর ভাঙাচুরা দেখলামমন্দিরও ভাঙাসব কিছু ভাঙা

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?

 

উ: আমি অস্ত্র জমা দিছি ছয় নম্বর সেক্টরে,নীলফামারীতে ক্যাপ্টেন ইকবালের কাছে

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : অক্টোবর ৩০, ১৯৯৬