নাম : মোঃ শানুমিয়া সরকার

গ্রাম : কাইয়ুমপুর

ডাক : মন্দভাগ বাজার

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : এস. এস. সি পাস

১৯৭১ সালে বয়স : ১৮/১৯

১৯৭১ সালে পেশা : সৈনিক

বর্তমান পেশা : চাকুরি

 

 

প্রশিক্ষণার্থী শানুমিয়া ২৫শে মার্চ রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ছিলেননিরস্ত্র শানুমিয়া গোলাগুলির মধ্য থেকে পালিয়ে নিজ গ্রামে চলে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনতিনি বলেছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাতে যে আক্রমণ হলো সেই আক্রমণ সম্পর্কে কি জানেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা?

 

উ: তখন আমি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত্র সাড়ে ১২টার সময় হঠাৎ আমি ঘুম থেকে জেগে গেছি,শুনতেছি গুডুম গুডুম আওয়াজ; কানে আসলো বৃষ্টির মতো গুলির আওয়াজতখন আমরা গুশ থেকে উইঠা বইসা গেলামসেখানে আমাদের নবীনগর থানার কাইতলা নিবাসী একজন হাবিলদার ছিলেনউনি আইসা আমরার সবাইকে জাগ্রত করলতারপর উনি বলছে তোমরা উর্দি পরো,পাঞ্জাবিরা আমাদের উপর আক্রমণ করছেএর আধা ঘন্টা পরে আইসা বলছে যে তোমরা এখান থেইকা চইলা যাও-জান বাঁচাওতখন আমরা ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম পার্শ্বে পাহাড়ের অপজিট সাইডে যাইয়া প্রাণ রক্ষা করলামরাত্র প্রভাতের পর আমরা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে আর যাইতে পারি নাইঐখান থেইকা আমরা বাহির হইয়া চইলা আসলামআমাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল নাআমরা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে তখন ট্রেনিং-এ ছিলামআমাদের হাত শূন্যতখন ঐখান থেইকা আমরা পায়ে হেঁটে উত্তর দিকে রওনা হইলামআমরা কুমিল্লা থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে আইসা আবার বাধাপ্রাপ্ত হইলামকুমিল্লা থেকে বেলুচ রেজিমেন্ট যেটা চিটাগাং-এর দিকে অগ্রসর হয়েছিল তারা সামনেআমরা বাধাপ্রাপ্ত হইরাম ২৭শে মার্চ তারিখেআমরা আবার পিছনে চলে গেলামতখন শুধু আমি একা না,হাজার হাজার লোক ছিলমেয়ে পুরুষ-শহর থেইকা বাহির হইয়া যার যার বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিছেএইখান থেইকা পিছনে সরে আমরা ফৌজদারহাট হাফিজ জুট মিলের ক্যান্টিনে ২৭ তারিখ দিবাগত রাত্রডা অপেক্ষা করলামএরপর আমি ২৮ তারিখ ঐখান থেইকা বাহির হইয়া দক্ষিণে সাগরের কুল দিয়া যাইয়া এক ব৭শের ঝাড়ের ভিতর লুকাইয়া প্রাণ রক্ষা করছিপাঞ্জাবিরা নদীর পাশ থেইকা যে ডিস্ট্রিক্ট রোড আছে- যেটা শহরের দিকে চইলা গেছে-তখন পাঞ্জাবিরা নদীর কুল-গ্রাম ছাইড়া দিয়া ডিস্ট্রিক্ট রোডের উপরে উইঠা গেছেরাস্তার উপরে যাইয়া তারা অবিরল এল এম জির ব্রাশ ফায়ার করতে করতে এবং মর্টার মারতে মরতে দক্ষিণ দিকে চট্টগ্রাম শহরের দিকে এডভান্স করছেতারা বিকাল ৪ ঘটিকার সময় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে আগুন দিছেতখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রায় ২ মাইল উত্তরে অবস্হান করছিলামঐখান থেইকা শুনলাম যে পাকবাহিনী ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে আগুন দিছে এবং দক্ষিণ দিকে চইলা গেছেতারপর আমরা উত্তর দিকে হাঁটতে হাঁটতে চইলা আসলামআমি সীতাকুণ্ড থেইকা ৪ মাইল দক্ষিণে এক মসজিদে রাত্র যাপন করলামপরদিন সকালে ঐখান থেইকা হাঁটতে হাঁটতে ২৯ মার্চ তারিখে আমি ফেনী শহরে আইসা রাত্র ৮ ঘটিকার সময় আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কিছু খানা খাদ্য খাইলামঐখানেও আমি এক মসজিদের ভিতরে রাত্রটা কাটালামআমি আমার এলাকায় আসলাম ৩১শে মার্চ তারিখেসেখানে আইসা দেখলাম আওয়ামী লীগের কর্মীদের মাধ্যমে এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের সহযোগিতায় মানুষ সংগঠিত হইতে শুরু করছেআওয়ামী লীগের তখন সানু মিয়া ছিলেনআওয়ামী লীগের অত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারি,প্রাক্তন চেয়ারম্যানছাত্রনেতা ফারুক আহমেদ ছিলেনছাত্রনেতা কাজী হারুনুর রশিদ ছিলেনছাত্রনেতা লক্ষ্মীপুরের খুরশেদ আলম ছিলেন,আলমগীর ছিলেন

 

প্র: এলাকায় আসার পর আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন?

 

উ: আমি এলাকায় আসার পর ১লা বৈশাখ কসবা সদরে যখন পাকবাহিনী আইসা ক্যাম্প করল এবং হামলা দিল তখন মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করলতহন থেইকা আমাদের ধারণা হইল যে,আমরা আর খাততে পারব নাএছাড়া চতুর্দিকে শোনা যাইতাছে যে যুবকদেরকে বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি তাহলে আমাদের দেশকে মুক্ত করতে পারবমনে শক্তি আইল,আমরা ভাবলাম তাদের হামলা থেকে আমাদের প্রাণে বাঁচতে হবেসেই হিসাবে আমরা ভারতে যেয়ে আশ্রয় নিছিতারপর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছি এবং আমরা যুদ্ধ করেছি

 

প্র: আপনি কার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন?

 

উ: আমি যুদ্ধ করেছি হাবিলদার শহিদুল হক-এর নেতৃত্বেতাঁর বাড়ি সিলেট ছিলোমন্দভাগ রেল স্টেশনের পাশেই উনার ক্যাম্প ছিলআমি ঐ ক্যাম্পে ছিলামআমার সাথে ছিলেন কসবার ফিরোজ আলম ভাই এবং পিয়ারা ভাই

 

প্র: এই এলাকাতে ব্যাপকভাবে যুদ্ধ হয়েছে এর কারণটা কি?

 

উ: কারণটা হইল পাকবাহিনী আসছে পশ্চিম দিক থেইকাসি অ্যান্ড বি রোড দিয়া যোগাযোগ ভালোতারা ঐ দিক থেইকা আক্রমণ করছেএইদিক দিয়া মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেইকা সীমান্তে আসছেনিকটবর্তী কাইয়ুমপুর, মঈনপুর,মন্দভাগ ইত্যাদি এলাকায় আক্রমণ সহজ ছিলএখানে ঝোপ জঙ্গল ছিল,পাহাড় ছিলপাহাড় থেকে গোলাবর্ষণ করা, অ্যামবুশ করার সুবিধা ছিলোসীমান্ত এলাকা হিসাবেও মুক্তিবাহিনীরা সুবিধাজনক অবস্হানে ছিলকারণ আক্রমণ করেই আমরা ভারতে চলে আসতে পারতামএই জন্য এই এলাকায় যুদ্ধডা বেশি হইছে

 

প্র: এই এলাকা পাকিস্তানিরা কখন কিভাবে আক্রমণ করল?

 

উ: পাকিস্তানিরা ১৫ থেকে ২০ বৈশাখের মধ্যে কসবা থেকে এসে সালদা নদী ক্যাম্প করে,তারপর সালদা নদী থেকে মন্দভাগ বাজারে ক্যাম্প করেতারা নদী পথে মন্দভাগ আসেনদীটির নাম গুংগুর নদীএই নদী পথে পাকবাহিনী স্পিডবোটে সালদা নদী এবং মন্দভাগ বাজার ক্যাম্পে যাতায়াত করতোমুক্তিবাহিনী সুযোগের অপেক্ষায় থাকতোএকদিন স্পিডবোটে এই দিক দিয়ে তারা যাচ্ছিলতারা যখন মঈনপুরের পশ্চিম পাশে তখন মুক্তিযোদ্ধার স্পিডবোটটি উড়িয়ে দেয়সেখানে মোট ১৩ জন পাকিস্তানি ছিলএরা সবাই মারা যায়এই ঘটনার পরের দিনে পাকবাহিনী মাধবপুর ইউনিয়ন জ্বালাইয়া দেয় এবং সামনে যাকে পাইছে তাকেই গুলি কইরা হত্যা করছেমাধবপুর ইউনিয়নের বহুত বাড়িঘর পোড়াইছেমাধবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকেও মেরে ফেলছেআমাদের গ্রামের চন্দু মিয়া শ্বশুর বাড়িতে বেড়াইতে গেছিলতিনিও নিহত হনআমারই কাকা লাগে উনারে মেরে ফেললবহুত যুবতী মেয়েকে হরণ করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়

 

প্র: সাধারণত যুবতী মেয়েদেরকে কোন কোন এলাকা থেকে ধরে নিয়ে গেছে ?

 

উ: পকসেনা রাজাকাররা মাধবপুর,রানীগাছা ছাইরশলা,হাকিমপুর,তারপর মন্দুছ,বাড়ানী,কান্দুঘর-এই সমস্ত এলাকা থেকে ধইরা নিছে

 

প্র: আপনি কি কখনো আক্রান্ত হযেছিলেন?

 

উ: আমি একবার আক্রান্ত হয়েছিলাম দেবীদ্বার থানার শালঘরেশালঘর আমার মামার বাড়িশালঘর স্কুলে তারা যহন আসে তকন আমি আক্রান্ত হয়েছিলামআমার নানী তাদের কাছে আমার জীবন ভিক্ষা করে আমাকে ছুটাইয়া আনেআমি আর্মিতে ছিলামথ-সেটা মনে হয় ওরা আমার মাথার ছোট করে চুল করাটা দেইখা সন্দেহ করছিরোআমার নানী কইছে আমার নাতির শরির ভালো ছিল না,জ্বর ছিলনানীর পাশের গ্রামের ইউসুফপুরের ইউনুস মিয়াকে বইল্লা কইয়া আমাকে বাঁচাইয়া আনেএরপর আমি আবার ইন্ডিয়াতে গেলাম এবং সেকান থেইকা কোনাবনদেউশে একটা ঘটনা ঘটেছিলদেউশ এবং মন্দভাগ বাজারে ক্যাম্প ছিলপাকবাহিনী এক ব্যাটেলিয়ান সৈন্য নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালায়ভোর ৪টার সময় পাঞ্জাবিদের আসার খবর আগেই আমাদেরকে জাল বাওইন্না (জেলে-একজনে জানাইয়া দিলসে আইয়া বলল যে পাঞ্জাবি আসতাছেআমরা দেখলাম সত্যিই চানলা থেইকা যে রাস্তাটা মন্দভাগ বাজারে আসছে সেই রাস্তার দুই পার্শ্ব দিয়ে কি জানি গড়াইয়া গড়াইয়া আসতাছে,কাছে আইতেই বুঝলাম পাকসেনাপাকসৈন্য পাঁচ সাতশর কম হবে নামসজিদে বাংকার ছিল ঐ বাংকারে আমি ছিলামঐ বাংকার থেইকা গুলি ছোড়া আরম্ভ হইলআমাদের সাথে আবুল কালাম মাস্টার আছিলএরপরে আমরা ত্রিমুখী আক্রমণে অর্থাৎ দেউশ,নোয়াপাড়া এবং চোখবাশ-এই তিন দিক থেইকা আক্রমণ কইরা পাকিস্তানিদেরকে পানিতে ভাসাইয়া দেওয়া হইছেভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ফায়ার অইছেসকাল ৯টার দিকে আমরা পাকসেনাদের অনেকগুলি লাশ কোনাবন নিয়া আসছিসবাই মারা যায় নাইতারাও আর্টিলারি মারছে,আমাদের ডিফেন্স থেইকাও আর্টিলারি মারছেঐ একই দিনে দুপুর ১২টার দিকে পাকিস্তানি প্লেন আমাদের উপরে আবার আক্রমণ করছেসময়টা ভাদ্র অথবা আশ্বিন মাসবিমান আক্রমণে আমাদের মন্দভাগের তিন জন ছেলে মারা গেছেমন্দভাগের তিন জন ছেলে মাছ ধরতে আইছিল ভারত থেইকাএই আক্রমণ করাতে মারা মাঠ থেইকা বাড়িতে যাইতে পারে নাইগুলি পইড়া মারা গেছেবিভিন্ন ঘরবাড়িও ধ্বংস হইয়া গেছে

 

প্র: ১৯৭১ সালে যারা রাজাকার,আলবদর,আলশামস ছিল এবং শান্তি কমিটিতে ছিল-তারা কোন ধরনের লোক ছিল? সমাজের কোন শ্রেণীর লোক ছিল ?

 

উ: শান্তি কমিটিতে সমাজের গণমান্য ব্যক্তিরাই ছিলেনকিছুলোক যাইতে বাধ্য হইছেন,পাঞ্জাবিরা খবরদা নিয়া গেছেআর কিছু লোক তাদের সাথে যাইয়া হাত মিলাইছে ইচ্ছাকৃতভাবেটাউট,বাটপার উচ্ছৃঙ্খল যারা ছিল তারা যাইয়া পাঞ্জাবিদের সাথে আগে হাত মিলাইছেতাদেরকে দিয়াই গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উঠাইয়া নিয়া শান্তি কমিটি এবং অন্যান্য কমিটি করা হইছেযেমন-আমাদের এইখানে মন্দভাগের তবদুল হোসেন সরদার ছিলো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান

 

প্র: কয়েকজন কুখ্যাত রাজাকারের নাম বলতে পারেন?

 

উ: আমাদের গ্রামের একজন ছিলসে মাধবপুর,রানীগাছা,চাইরশলা,হাকিমপুর প্রভৃতি এলাকায় লুটতরাজ করছেতার নাম আলী আরশাদ,পিতা মৃত চাঁন মিয়া সাং কাইয়ুমপুরতার সাথে আরও লোক ছিলরাজাকার ছিলো আড়াইবাড়ির সিদ্দিক মাস্টার,সফিক মিয়া,আবদুল মজিদ এরা ছিলো

 

প্র: যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে আপনি কি দেখলেন?

 

উ: আমি ১৭ ডিস্মেবর সকাল ৭ঘটিকার সময় আমার গ্রামে আইসা দেখলাম যে গ্রামের ভিতরে ঝোপ ঝাড়ে বাড়িঘর একদম জঙ্গলে পরিণত হইয়া গেছেমাঠে ধান পইড়া রইছে,পাঞ্জাবিদের বাংকার রইছে,রাস্তা-ঘাটে চলা-ফেরা বিপদজনক ছিলআমাদের কমান্ডাররা নির্দেশ দিছিলো যে,আমরা যেন চলতে ফিরতে খুবই সতর্কতা অবরম্বন করিকারণ জাগায় জাগায় মাইন ফিট কইরা রাখছে পাকিস্তানিরাস্কুল,মসজিদ,মাদ্রাসা ধ্বংস হইছেইউনিয়ন অফিসের ছাদের উপরে বাংকার ছিলআমার রুমের ভিতরে বাংকার ছিল,কৃষি অফিসের ছাদের উপরে বাংকার ছিলপ্রাইমারি স্কুলে পাঞ্জাবিদের বাংকার ছিল 

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২ নভেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৬০