নাম : মোঃ ইউনুছ মিয়া

গ্রাম : মঈনপুর

ডাক : মঈনপুর বাজার

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ১৯/২০

১৯৭১ সালে পেশা : নবম শ্রেণীর ছাত্র

বর্তমান পেশা : দর্জি

 

 

স্কুল ছাত্র মোহাম্মদ ইউনুছ মিয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকিস্তানি অবস্হানের খবর পৌছে দিতেনএকাজ করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েছেন-আবার ছাড়াও পেয়েছেনইউনুছ মিয়া জানিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা

 

 

প্র: ১৯৭১ সারে আপনি কি আক্রান্ত হয়েছিলেন?

 

উ: আমি আক্রান্ত হয়েছিসময়টা আমার খেয়াল নাইআমাদের বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর থ্রি ইঞ্চি মর্টার ওয়ালা পার্টি আসছিলওরা দুইদিন ছিলওরা গোবিন্দপুর থাইকা চৌমুহনী কাঠের পুলে মর্টার মারবেএই পার্টিটা আমাদের বাড়িতে ছিলকিভাবে খবর পাইছে জানি না পরদিন পাঞ্জাবি এবং ৪০ জন রাজাকার আইসা আক্রমণ কইরা আমরার দুইজন মুক্তিবাহিনীকে মারে এবং বাকিগুলারে ধাওয়া করেমুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গের যন্ত্রপাতি সব ওরা নিয়ে যায়তখন আমি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ছিলামপাকবাহিনী আমাদের বাড়িতে আইসা আমাকে এবং আমার ভাইকে ধইরা নিয়া যায়ধইরা নিয়া তারা দিশারা মসজিদের ওহানে আমাদের রাখেঐটা পাকসেনাদের ঘাঁটি ছিলসারাদিন রাইখ্যা সন্ধ্যার দিকে আমাদেরকে ছাড়েআমাদেরকে বহু লোকের সুপারিশে ছাড়ছেদিশারা আমার মামার বাড়িঐখানে রাজাকারের দলবল ছিলদিশারা এবং শাহপুর জায়গাডা রাজাকারের দখলেপাঞ্জাবিরার দখলেরাজাকারদের একজনের নাম হইল তোফায়েল আর একজনের নাম হইল কাওসারএদের বাড়ি শাহপুরআমি রূপবানের নাটক করতামঐ সময় উনাদের সাথে আমার পরিচয়ঐ পরিচয়ে আমারে বাঁচাইয়া দিছেনা অইলে ওরা আমাদের গুলি করত

 

তারপরে আমি আসলাম আমাদের গ্রামে মনে হয় মুক্তিবাহিনীরা ওয়্যারলেসদা জিজ্ঞাস করছে যে আমাদের সামনে যে দুইডা লোক আসতেছে তাদেরকে গুলি করমুনি? তখন ক্যাপ্টেন গাফফার সাহেব নাকি বলছে যে না,গুলি করণের দরকার নাইওরা যহন সিভিল ড্রেসে সরাসরি আসতাছে ওরারে আসতে দাওআমরা যহন সামনে আসলাম তহন মুক্তিবাহিনী বইলা আমরারে চিনলোআমাদেরকে একবারে আনজা (জড়িয়ে ধরে) ধইরা আলগাইয়া নিয়ে গেলতারা থ্রি ইঞ্চি মর্টারের যন্ত্রপাতির জন্য আমাকে ধরলআমি কিছু কিছু যন্ত্র পুস্কুনিতে এবং খালের মধ্যে রাখতামঐ সময় কামালপুর উত্তর পাড়ায় কিছু অস্ত্রশস্ত্র আমি ফালাইয়া গেছিউনারা আমাকে বললো যে এইগুলি বাইর করতহন আমি যাইয়া বাইর টাইর করলামএইদিকে কোনাবন থেইক্যা ক্যাপ্টে ন গাফফার সাবে খবর দেওয়ার পরে গেলামউনির কাছে হাল বিতান- ভাইংগা বললামপাঞ্জাবিরা কিভাবে আছে,জাজিসার থেইক্যা কতটুকু দূরে,বানিয়ারূপ-এর কোনো কোনো জায়গায় এবং আকসিনার কোনো কোনো জায়গায় পাকসেনারা আছেতহন ক্যাপ্টেন গাফফার সাবে হাল বিতান- শুইন্না আমাকে বাবা বলে ডাইক্কা বিশটা টাকা দিলবাবা আসছ এই বিশটা টাকা তোমাকে দিলামবখশিস দিলামতারপরে আমি চইল্লা আসলামআসার পরে আম্বিয়া সাব এবং সিলেট বাড়ি আসাদুল্লাহ সাব উনারার সাথে আমাকে রাখলস্বাধীনতার পরে ঐখান থেইকা আইস্যা পড়লামইন্ডিয়া থেইকা বাংলাদেশে আসলাম আরকি

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন?

 

উ: বাংলাদেশের মধ্যে দেখতেছি পশ্চিমা হানাদাররা মা-বোনদের ইজ্জত লুট কইরা নিতেছেভাইকে মারতেছে,বাবার সামনে ছেলেরে মারতেছেএই ব্যথা আমি সহ্য না করতে পাইরা মুক্তিবাহিনীতে ঢুকছি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করল? কিভাবে আক্রমণ করল?

 

উ: জ্যৈষ্ঠ মাসে পশ্চিমারা আমাদের এলাকায় আইসা ঢুকছেআমাদের মঈনপুর গ্রামের পশ্চিম দিকে একটা নদী আছে,গুংগুর নদীএই গুংগুর নদী দিয়া পাকিস্তানিরা একটা স্পিডবোট দিয়া যাওয়ার পথে মুক্তিবাহিনীরা সেই স্পিডকোটটাকে উড়াইয়া দেয়প্রায় ১০/১২ জন পাঞ্জাবিকে একবার ধ্বংস কইরা দিলএরপরে পাঞ্জাবিরা পাগলের মতন আইসা মা-বোনদের ধর্ষণ করছেগুলি কইরা মানুষ মাইরা লাইছে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়? তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কি ছিল ?

 

উ: বৈশাখ মাস থেইকা মুক্তিবাহিনীর তৎপরত আরম্ভ হয় এবং আমাদের এলাকায় যখন মুক্তিবাহিনীরা আসে তখন আমাদের থেইক্যা খবরাখবর  নেয়আমরা ওদেরকে সাহায্য করতামএলাকার জনগণও খুব সাহায্য করছে

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?

 

উ: আমাদের গ্রামে কোনো রাজাকার নাইরাজাকার বাহিনীতে শাহপুর,দিশারা,আকসিনা-এইসব জায়গার লোকই বেশিরাজাকাররা গাইন বাড়ির হাছান আলী এবং কামালপুরের উত্তর বাড়ির জনাব আলীর বৌয়ের ইজ্জত লুটছে

 

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে আপনি কি দেখলেন?

 

উ: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফির দেখলাম আমাদের গ্রামে মানুষজন নাইশুধু বাংকার আর বাংকারগাছ পালা কাইট্যা একদম তছনছ কইরা ফেলছেজায়গায় জায়গায় বনজংগল হইয়া রইছে

 

প্র: আপনার গ্রামের বা এলাকার স্কুল,কলেজের অবস্হা কি দেখলেন?

 

উ: আমাদের গ্রামের স্কুল,কলেজ ভাইঙ্গা চুরমার করছেপশ্চিমের হাইস্কুলের টিন লইয়া বাংকারের উপরে ছাউনি দিছে

 

প্র: আর কোন কোন স্কুল,মসজিদ,মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে বলেন?

 

উ: আমাদের মঈনপুর স্কুল নষ্ট হইছেপশ্চিম পাড়ার মাদ্রাসা নষ্ট হইছে

 

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন?

 

উ: আমি যে সময় মুক্তিবাহিনী থেইকা আসি তহন জমা দিয়া আসছি

 

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি কি করলেন?

 

উ: যুদ্ধের শেষে অনেকদিন চাকরির জন্য অপেক্ষা করলামঘুরলামকোনো জায়গায় আমার আর চাকরি হলো নাতখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়া টেইলারিং মাস্টারির কাজ শুরু করলাম যাতে আমি বাঁচতে পারি

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ৩ অক্টোবর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৫৪