নাম : মধুসূদন জোয়ারদার

পিতা : রামচন্দ্র জোয়ারদার (১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত)

গ্রাম : গোপালখালি, ইউনিয়ন : গঙ্গারাম, ডাক : কাশিয়ানগর

থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ১৫/১৬

১৯৭১ সালে পেশা : বেকার

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরের ঘটনা সম্পর্কে আপনার কিছু মনে পড়ে কি ?

 

উ: হ্যাঁ, কিছু কিছু মনে আছেসে সময় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হয়আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ছিলোআমাদের এলাকার লোক সবাই নৌকায় ভোট দিছিলোলোকজন মনে করছিলো, নৌকায় ভোট দিলি আমরা নিজেদের দেশ নিজেরাই শাসন করবোশেখ সাহেব আমাদের দেশের লোকতিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেনশেখ সাহেব দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে আমাদের ভালো হবেকিন্তু শেখ সাহেব তখন ক্ষমতা পায় নাইতারপর দেশে গন্ডগোল শুরু হইয়া গ্যালোআমাদের এলাকার বিভিন্ন জাগায় লুটতরাজ আর গোলাগুলি শুরু হইলো

 

প্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতা আপনি শুনেছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, শুনিছিলাম

 

প্র: কি শুনেছিলেন ?

 

উ: সেটা আমার এখন মনে নাই

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কিছু শুনেছিলেন কি বা কিছু জানেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, শুনিছিলামআমরা শুনিছিলাম যে, ঢাকা টাউনে খুব গোলাগুলি হইতেছেপাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় বাঙালিদের যাকেই সামনে পাইতেছে তাকেই গুলি কইরে মাইরা ফেলতেছেআমরা ঐ খবর পাওয়ার কিছুদিন পর আমাদের এখানেও তো সমস্যা হইলোতখন আমাদের এখান থাইকে কিছু লোক ইন্ডিয়া চলি গ্যালোআমরাও তখন ইন্ডিয়ায় যাতি চাইছিলামকিন্তু আমরা যাইতে পারিলাম নাআমার বড় ভাই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কুমিল্লায় বি.এড. ট্রেনিং নিতে গেছিলোসে তখন ওখানেই আটকা পড়ছিলোবড় ভাই দেওতলা স্কুলের হেড মাস্টার ছিলোকুমিল্লা যাওয়ার সময় সে অন্য একজনকে হেড মাস্টারের দায়িত্ব দিয়া গেছিলোযাকে হেড মাস্টারের দায়িত্ব দিছিলো সে বললো, আপনারা যাবেন না, এখানেই থাকেনআপনাদের কোনো অসুবিধা হইলে আমরা তো আছিআমরা বললাম, না সবাই চলে যাচ্ছে, আমরাও যাইএর মধ্যে আমার বড় ভাই কুমিল্লা থাইকে আইসা পড়েবড় ভাইও আইসে বললো যে, না এখানে থাকা সম্ভব না

 

প্র: তখন আপনাদের কি সমস্যা হলো ?

 

উ: চুরি-ডাকাতি, লুটতরাজ শুরু হইলো

 

প্র: এটা কারা করলো ?

 

উ: এখানকার স্হানীয় লোকজনমানে আমাদের গ্রামের এবং আশপাশ গ্রামের  মুসলমান লোকজনতাদের জন্য আমাদের খুব সমস্যা হইলোতখন আমরা দিন-রাত ডিউটি করতাম যাতে কেউ আইসে চুরি ডাকাতি, লুটতরাজ না করেআমি সে সময় ছোট ছিলামআমার বড় ভাইরা এ সব করতো

 

প্র: আপনাদের এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা কখন আক্রমণ করে ?

 

উ: সেই সময়টার কথা আমার মনে নাইপাকিস্তানি সৈন্যরা নদী দিয়া গানবোট নিয়া আসেসেটা আমি দেখি নাইকিন্তু তারপর একদিন দেখিলাম খান সেনারা নদীতে গানবোট নিয়া ঘোরাফেরা করতেছেকিন্তু সেদিন আমাদের গ্রামে ঢোকে নাইসৈন্যদের আমার কাকাও দূর থাইকে দেখছিলোতখন আমরা পলাই গেলামএরপর তো আমরা গ্রাম ছাইড়া চইলা গেলামখান সেনারা তারপর আর আসছে কি না সেটা আমি জানি না

 

প্র: আপনারা আপনাদের গ্রাম থেকে কোন মাসে চলে গেলেন ?

 

উ: আমরা চলে গেলাম জ্যৈষ্ঠ মাসের পয়লা দিনতখন থেকেই আমাদের গ্রামে লুটপাট শুরু হয়মুসলমানরা হিন্দুদের বাড়িতে ঢুকে গরু ছাগল, ধান চাল যা পাইলো সব নিয়া গ্যালো

 

প্র: যারা লুট করলো তারা কোন গ্রামের ?

 

উ: দেওতলা গ্রামেরওরা আমাদের বাড়িতেও আইছিলোযারা আইছিলো তার মধ্যে আমার বড় ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ একজনও ছিলোআমার বড় ভাই তখন বাড়িতেই ছিলোবড় ভাইয়ের পরিচিত লোকটার জন্য অন্য লোকগুলা আমাদের কিছু বলে নাইকিন্তু আমরা মান-সম্মানের ভয়ে, জীবনের ভয়ে সইরে গেলামআমরা গ্রাম থেকে অন্যত্র রওনা হলাম

 

প্র: যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে আপনারা কিছু নিতে পেরেছিলেন কি ?

 

উ: টুকটাক কিছু জিনিস আমরা নিতে পারছিপথ চলার মতো চাল আর চিড়েঅন্য তেমন কিছু নিতে পারিলাম নাবৌদি তার সোনাদানাগুলা নিছিলো কিনা জানিনাআমরা নৌকায় রওয়ানা হইলামআমরা এখান থেকে প্রথম গেলাম বয়ারডাঙ্গা গ্রামেওখানে একদিন না দুইদিন থাকলামবয়ারডাঙ্গা গ্রাম আমাদের ইউনিয়নের ভিতরেইএরপর আমরা মাহিলারা গ্রামে গেছিঐ গ্রামটাও আমাদের বৈঠাঘাটা থানার ভিতরেআমাদের সঙ্গে আরো অনেক স্বজাতি ছিলোপরে ওখান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা চুকনগর বাজারে গেলামআমরা চুকনগর বাজারে গেলাম ৫ জ্যৈষ্ঠসেদিন সম্ভবত: বৃহস্পতিবার ছিলোআমরা সকাল বেলায় ওখানে পৌঁছিতখন মনে হয় সকাল ৮/৯টা বাজেওখানে পৌঁছানোর পর আমার বড় ভাই বললো যে, কিছু রান্নাবান্না করে এখান থাইকে খাইয়ে রওনা দিইএখান থাইকে আমাদের হাঁইটে যাতি হবেনা খাইলে তো আমরা হাঁটতি পারবো নাতারপর তো আমরা নৌকা ঐখানে রাখলামঐখানে যাওয়ার পর কেউ কেউ আইসে আমাদের বলছে যে, নৌকা বিক্রি করো, এটা ওটা বিক্রি করোওরা সব ঐ এলাকার লোক

 

প্র: আপনারা কিছু বিক্রি করলেন কি ?

 

উ: অনেকেই বিক্রি করলোআমরা তেমন কোনো কিছু বিক্রি-টিক্রি করি নাইনৌকাটাও আমাদের ছিলো নাওটা আমার এক কাকার নৌকাআমরা তার নৌকাতেই গেছিলামআমার কাকাতো ভাই বললো, নৌকাটা বিক্রি করলি কিছু টাকা পাওয়া যাবেপথ খরচের জন্য টাকা দরকারকিন্তু ঐ নৌকা বিক্রি করা গ্যালো নাএদিকে সবাই পাক-শাক করতি লাগলোরান্না প্রায় শেষ হয় হয় এমন সময় আমার বড় ভাই বললো যে, তাড়াতাড়ি এখান থাইকে চলি যাতি হবিতখন আমরা সবাই তাড়াতাড়ি খায়ে নিলামআমরা কোনোরকমে ৬ জন ৬ জন করে খায়ে নিলাম

 

প্র: আপনারা চুকনগর বাজারের কোন্‌ দিকে ছিলেন ?

 

উ: কালি মন্দিরের পাশে যে চালের পট্টিটা ছিলো, ওখানেখেয়ে দেয়ে আমরা রওনা হবো এমন সময় হঠা দূরে গুলির শব্দ শুনলামআমার বড় ভাইও শুনিছিলোযারা ভোর রাতে ওখানে পৌঁছেছিলো তারা সকালেই রওনা হইয়া গ্যাছেআমরা ওখানে দেরিতে পৌঁছায়ছিআমাদের বাড়ির লোকজন আর আমার এক কাকার পরিবার এক সঙ্গে ছিলামআরো অসংখ্য লোক ছিলো ঐ বাজারেতারাও আমাদের মতো দেরি কইরা আইছেঅনেকে তখনো আসতেছেযারা আমাদের পরে আইছে তারা মাত্র রান্নার আয়োজন করতেছে

 

প্র: তারপর কি ঘটলো ?

 

উ: কিছু সময় পরেই বাজারে একটা গাড়ি আইলোসেই গাড়ি থেকে ৪/৫ জন সৈন্য নাইমা পাল পাড়ার ঐ রোডটা দিয়া নদীর কাছে আইসা ফায়ার শুরু করলোতখন চারদিকে লোকজনের ছুটাছুটিআমার বড় ভাইয়ের হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ ছিলোতার মধ্যে এটা ওটা ছিলোবড় ভাই বললো, তুই এটা নেতখন আমি সেই ব্যাগটা নিছিদূর থেকে আমি সৈন্যদের দেখলামওদের দেইখা আমি ভয় পাইয়া ওখান থাইকে দৌড় দিলামতারপর নদীতে ঝাঁপ দিলামনদীতে সে সময় ভাটা ছিলোনদীতে ঝাঁপ দিয়া আমি সাঁতার দিয়া একটা গাছের গোড়ায় গেলামওখানে যাইয়া দেখি আমার এক বোন এবং কাকা-কাকী ওখানেতাদের সঙ্গে নিয়া আমি গাছের গোড়ায় রইলামতখনো নদীর পারে সৈন্যরা দাঁড়াইয়া গুলি করতি লাগলোআমরা যে ওখানেই আছি সেটা ওরা টের পাই নাইআমার বড় ভাই, বৌদি, মা-বাবা এবং অন্য ভাইরা তখন কে কোথায় সেটা আমি জানি না

 

প্র: তারপর ?

 

উ: তারপরে মিলিটারিরা চলি গ্যালোগুলি গালা বন্ধ হয়ে গ্যালো

 

প্র: পাকিস্তানি সৈন্যরা ওখানে কতক্ষণ গুলিগালা করে ?

 

উ: তা ধরেন এক ঘন্টার কম নাসৈন্যরা চলি যাওয়ার পর চারদিকে মেয়ে মানুষের কান্নার রোল পড়ি গেলোএরপর আমরা ওখান থাইকে বাহির হইলামবাহির হইয়া দেখি চারদিকে মানুষের লাশ আর লাশমেয়ে মানুষরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতেছেলাশ সব পুরুষ মানুষেরকিছুক্ষণ পর মা আর বৌদির সঙ্গে আমার দেখা হইলোতারা কাঁদতে কাঁদতে বললো, সৈন্যরা ওদের মাইরে ফেলছেসৈন্যরা যখন তাদের গুলি করে তখন বৌদি আর আমার মা সামনেই ছিলোবড় ভাইয়ের কোলে ছিলো তার ছেলেটাছেলেটারে কোল থাইকে নামাইয়া দিয়া সবার সাথে লাইন করি তারে গুলি করছেবাবাও ঐ লাইনে ছিলোসৈন্যরা গুলি করার আগে মেয়েছেলেরা ওদের বাধা দিছিলোআমার মা এবং বৌদিও তাদের বাধা দিছেমা-বৌদি সৈন্যদের নাকি বলছে, আগে আমাদের গুলি করোতারপর সৈন্যরা মেয়েদের সরায় দিয়া সব পুরুষদের গুলি করছেবহু লোকের লাশ ওখানেচারদিকে তাকায় দেখলাম বিভিন্ন জাগায় লাশ পড়ি আছেকিছু লাশ নদীতে ভাসতেছেআমার বাবা আর বড় ভাই তখন মৃতআমার সেজ ভাইটারও নাভিতে গুলি লাগছেমিলিটারি তারেও ঐ লাইনে নিয়া গুলি করছেসে শুধু আমার বলতি লাগলো, জল দে, জল দে, আমার শরীর জ্বলি গেলোসে ওখানে কাতরাচ্ছিলোকিন্তু আমি কিছু করতি পারছি নাআমার আর এক ভাইয়ের লাশও ওখানেআমি সেজ ভাইয়ের ওখানে দাঁড়ায় আছি-এমন সময় কিছু লোক আইসে আমাকে টাইনে নিয়ে গ্যালোতারা বললো  চল, চল

 

প্র: আপনার বাবা এবং ভাইদের লাশ কি করলেন ?

 

উ: ওখানেই পড়ে থাকলোওখানে আমি কুড়ি মিনিট মতো ছিলামযারা আমাদের টানি নিয়া গেছিলো তারা বলছে, সৈন্যরা হয়তো আবার আসতি পারেতারা আমাদের জোর করি নিয়া গ্যালো

 

প্র: সেদিন আপনার পরিবারের কয়জন শহীদ হয় ?

 

উ: আমার তিন ভাই আর বাবাআমার কাকার গায়েও গুলি লাগিছিলোকিন্তু সে মরেনি

 

প্র: সেই সময় আপনাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত ছিলো ?

 

উ: ১৪ জন ছিলোতার মধ্যে ৪ জন মারা গ্যালো

 

প্র: চুকনগর বাজার থেকে তারপর আপনারা কোথায় গেলেন ?

 

উ: তারপর ঐদিন থাকুন্দি নাম করে এক গ্রামে গিয়া আমরা থাকলামওটা একটা হিন্দু গ্রামকাঁদতে কাঁদতে আমরা ঐ গ্রামে যাওয়ার পর কিছু লোক আমাদের আশ্রয় দিলোঐখানে আমরা দুই দিন থাকলামএরপর ওখান থাইকে আমরা বাগডাঙ্গা গেলামএটা যশোরের মধ্যেওখানে আমরা কিছুদিন থাকলামবাগডাঙ্গায় গিয়া শুনলাম পাশে ঝাউডাঙ্গা নামে এক জায়গায় নাকি পাকিস্তানি স