নাম : মোহাম্মদ আবদুল মান্নান

গ্রাম : লতুয়ামুড়া

ডাক : চন্ডীদ্বার

ইউনিয়ন : গোপীনাথপুর

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ১৬/১৭

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী

১৯৭১ সালে পেশা : ছাত্র

বর্তমান পেশা : চাকুরি

 

 

 

একাত্তরে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান অস্ত্র হাতে লড়াই করেননি-তবে মুক্তি বাহিনীকে গুলির বাক্স পৌঁছিয়ে দিয়েছেন,পথ চিনিয়েছেন,আহারের ব্যবস্হা করেছেনপাকিস্তানিদের হাতে ধরাও পড়েছিলেন তিনিআবদুল মান্নান জানিয়েছেন তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা

 

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কবে প্রবেশ করলো? কোন পথ দিয়ে তারা প্রবেশ করলো?

 

উ: ১লা বৈশাখ বুধবার অনুমান দেড়টা দুইটার দিকে পাঞ্জাবি কসবা আসেতারা আমাদের এলাকাতে ঐদিনই রাত্রে আসছেতখন রাত্র তিনটা সাড়ে তিনটা অনুমানআমরা রাত্রে একজনের পর একজন ডিউটি করি কখন পাঞ্জাবি আসে না আসেঅন্যদের সব ভারতে দিয়া আসছিঐকানে আমরা ঘর উঠাইয়া দেই,ঐগুলির মধ্যে এরা থাকেআর আমরা পুরুষ কয়েকজন বাড়িতে থাকিপাঞ্জাবি কখন আসে না আসে ঐদিকে খেয়াল রাখিএক ভাইয়ের পরে আর এক ভাই বা বাপ বা ভাই একজন মনে করেন সজাগ থাকিআর বাকি কয়জন ঘুমাইএইভাবে আমরা পাহারা দেইরাত অনুমান সাড়ে তিনটার দিকে পশ্চিম দিক থেইক্যা পূর্ব দিকে যহন ফায়ার হইল তহন আমার ভাই এক্স আর্মি,উনি বাড়িতে ছিলেন,উনাকে ডাইকা উঠাইলামউনার নাম আবদুল হালিমউনি হাবিলদার মেজর ছিলেনউনাকে বললাম ভাই গুলিতো পশ্চিম দিক থেকে আসতেছে ব্যাপার কি? উনি উঠলোদৌড়াইয়া আমরা মোড়াকান্দায় গেলামচাইয়া দেখি চন্দ্রপুরের উত্তর সাইড দিযা যে রোডটা আসছে চাচঘিরা দিয়া কসবা থেইক্যা, সেই রোডটা দিয়া রেললাইন দিয়া অক্করে আমাদের লতুয়ামুড়া পর্যন্ত শুধু পাঞ্জাবি আর পাঞ্জাবি দেখা যাচ্ছেতখন আমরা দৌড়াইয়া পূর্ব দিকে যাইয়া ইন্ডিয়া উঠলামআমার হাতে ছিল একটা সুটকেসআমার ভাইয়ের হাতে ছিল একটা হুক্কাআর চাচাতো ভাই হালিম সাব উনি ছিল খালি হাতেকারো হুশ নাই যাইতাছিকোনো জিনিস নিতেও পারি নাইআমরা তখন দৌড়াইয়া পূর্ব দক্ষিণ কণারে লক্ষ্মীপুরের পূর্বপাশ দিয়া আমরা যাইয়া ভারতে উঠা গেলামআর পাঞ্জাবি এদিকদা আইসা রাজনগরের উত্তর দিক দিয়া যাইয়া পূর্ব দিকে গেলরাজনগর আবদুল খালেকের বাড়িতে আবদুর রশীদকে গুলি কইরা মারলোতারপর দক্ষিণ দিকে গেল লতুয়ামুড়াপুলের দিক দিয়া আইসাই নূর মোহাম্মদকে লাগল পাইয়া খুব মাইর ধইর করছেবেয়নেট দিয়া ঘাইও দিছেকিন্তু তবু সে বাঁইচ্চা আছেপরে সে কোনরহমে এহানতে অক্করে ইন্ডিয়া চইলা যায় তারপর পাঞ্জাবি দক্ষিণ দিক দিয়া গেলঐদিকদা যাইয়া খিরনাল কুইপাইন্না লক্ষ্মীপুর দিয়া এদিকে আসলোএদিকে উত্তরদা চণ্ডীদ্বার আগুনপুর দিয়া রাজনগর যায়পাকসেনারা পঙ্গাপুর পর্যন্ত গেছিলমুক্তিবাহিনী যা-ও ২/৪ জন ছিল তখন উনারা এদেরকে প্রতিরোধ করতে পারবে না বিধায় এরা চইলা গেছেপাঞ্জাবিদের সংখ্যা ছিল খুব বেশিমুক্তিবাহিনী ছিল অল্পমুক্তিবাহিনীর কাছে শুধু রাইফেল ছিলওদের কাছে হেভি হাতিয়ার ছিলযার জন্য উনারা এদের সাথে লড়তে ভয় পাচ্ছিলআমরা চইলা গেলাম ইন্ডিয়াঐখানে ঘর উঠাইয়া রইলামআমরা এইখান থেইক্যা পরে শুনলাম যে রেশন কার্ড দিবেএরপর আমরা কান্দানিয়া চইলা গেলামঐখান যাইয়া শুনলাম যে আমাদের এলাকায় ছেলেপেলে ভারতে আইসা অস্ত্র ধরছেঐ খবর শুইন্যা আমি ওখানে গেলামআমার ভাই হালিম সাব উনিও ছিলেনঐখানে সুবেদার সামসুল হক নামের একজন ছিলউনিও আসলোউনি আইসা আমার ভাইয়ের খোঁজ নিলউনারা একসাথেই চাকরি করতোকয়,হালিম তুমি বাড়ি আইসা গেলা? আমি এখনও রইয়া গেলামউনার আন্ডারে বেশ লোক ছিলআমরাও উনার সাথে একত্রে আসা যাওয়া করছিউনাকে আমরা সব সময় রাস্তা ঘাট দেহাই দিছি

 

প্র: আপনি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?

 

উ: আমি বলছিলাম যে মুক্তিবাহিনীতে যাবআমার এক ভাই ছিল পুলিশ ডিপার্টমেন্টেউনার কোনো খোঁজ খবর পাই না সেজন্য আমার বৃদ্ধ মা আমাকে যাইতে দেয় নাইইন্ডিয়া যাওয়ার পর আমার বড় ভাইকে পাঠাই দিল ঐ ভাইকে খুঁজে আনার জন্যমা বললেন,যদি তার কিছু হয় তাইলে আমি পাগল হইয়া যাবঅস্ত্র হাতে লড়াই করতে পারি নাই তবে আমি যথেষ্ট মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করছি

 

প্র: আপনি কিভাবে তাদেরকে সাহায্য করলেন এই ব্যাপারে কিছু বলেন?

 

উ: অনেক সময় উনারা বলতো যে আজকেতো আমরা চন্দ্রপুর অ্যাটাক করবোতুমি আমাদের জন্য চিড়া মুড়ির ব্যবস্হা করগুলির বাক্স আউগাইয়া দেওএসবগুলি করছিপথ দেখাইয়া দিছি

 

প্র: আপনিতো ভারতে আশ্রয় নিলেন-ভারতের মানুষ আপনাদেরকে কিভাবে সহযোগিতা করলো?

 

উ: এরা যথেষ্ট সহযোগিতা করছেওরা যথেষ্ট সম্মান করছেআমরা যাওয়ার সাথে সাথে এদের ঘর ছাইড়া দিছে, থাকতে দিছে আমাদেরতারা বলছে তোমাদের অহনতো চাউল ডাউল নাই,আমাদের ঘর থেইক্যা নিয়া পাক করতারা বিভিন্নভাবে সাহায্য করচেআগরতলা সীমান্ত অঞ্চলে ঐ সময় প্রচুর মানুষ ছিলো

 

প্র: পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি জানেন?

 

উ: আমরাতো ভারতে ছিলামতারপর শুনতাছি এদিগদা যুদ্ধ হইতেছেএকটা ঘটনার কথা বলি; আমার তালুই লতুয়ামুড়ার,উনার জামাতা এবং উনার পুত্র আবদু আর শহীদ হেরা দুইজনই ছিল মুক্তিবাহিনীতেকসবা যহন অ্যাটাক করে তহন রাত্রেবেলায়তো গ্রেনেড মারামরি হইছিলতখন কার্তিক মাস হবেকসবা আক্রমণের সময় শহীদকে রাত্রবেলা পাঞ্জাবিরা ধইরা ফালায়যহন ধইরা ফালাইছে তহন সে একটা চিৎকার দিছেকয় ভাই,আমাকেতো ধইরা নিয়া গেল পাঞ্জাবিরাতহন ওর বড় ভাই দৌড়াইয়া গেছেসেও মুক্তিবাহিনীসে যাইয়া দেখে যে সত্যিই ভাইকে নিয়া যাইতেছেবড় ভাই পিছে দিয়া গিয়া বেয়নেট দিয়া ঘাই দিয়া ঐ পাঞ্জাবিকে ফালাইছেএরপর পাঞ্জাবিকে মাইরা তার ভাইকে ওখান থেইক্যা উদ্ধার কইরা নিয়া আসছে সে

 

প্র: আপনিতো মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকবার আপনার বাড়িঘর,এলাকা দেখতে আসছেন-সে সময়ের কথা কি কিছু বলবেন?

 

উ: একবার ভাবলাম যে অনেক মাস হয়ে গেছেগা বাড়িগুলো দেখি নাই দেইখ্যা আসিতাছাড়া আমি অসুস্হও ছিলামতারপর হাঁটতে হাঁটতে আসলাম পরেই পাঞ্জাবি ধইরা বইলআমার সাথে আবার ইন্ডিয়া উইঠ্যা  যে আইডেনটি কার্ডটা করছি সেই কার্ডটাও আমার সাথে ছিলএইটা আবার আমর জাইঙ্গার পকেটে রাখছিআমারে ধইরা চণ্ডীদ্বার বাজারে আনছেআমাকে একখানে বসাই কইল যে আমাদের অফিসার আসবে,তোমাকে ইনকোয়রি করবোএখানে দেখলাম অনেক পাঞ্জাবি আর রাজাকারআমাদের চাইরপাড়া,অনন্তপুরের বেশ কয়েকজন রাজাকার ছিলবেশ কিছুক্ষণ পরে অফিসার আসলোআসার পরে জিজ্ঞাসা করছেআমি কই আমার অসুখতহন একজন ডাক্তার আসলোআইসা কয় তুমি কি বিহারীআমিতো আর উর্দু বুঝি নাবলতে পারি নাইতহন আমি বললাম যে ভাই আমিতো উর্দু বলতে পারি নাইংরেজি কইবাতাওতহন আমি বললাম যে I am suffering from one month. One month? Yes. তখন বললো  Come in আমি গেলাম উনার সাথে  যাওয়ার পরে উনি বললো সিট ডাউনবসলামবসার পরে সে আমাকে দেখলোসে দেইখ্যা বলে খুব অসুস্হআমাকে ওষুধ দিলতারপর বললো You should drink cold water, understand? আমি বললাম হ্যা,ডাক্তার ছিলেন পাঞ্জাবিউনার নামটা আমার খেয়াল নাইতারপর বললো যে দু-একদিন পরে আইসা আবার ওষুধ নিওএখন আমি যাব কোথায়? রহিমুদ্দি সাবের যে মিয়া বাড়ি ঐ বাড়িতে দুইদিন রইলাম

দুইদিন ঐ বাড়িতে থাকার পর আমি আবার চণ্ডীদ্বারে ঐ মেজরের কাছে আসলামসে আমাকে আবার ঐষধ দিবে বলেছিলআইসা দেখি ডাক্তার এখানে নাইঠিক সেই মুহূর্তে এক বিহারী আইসা আমাকে বলল যে,একটা ডালডার টিন নিয়া লতুয়ামুড়া যাইতে হবেআমি বললাম যে,ভাই আমিত অসুস্হ,আমি যাইতে পারব নাতখন সে বন্দুকের গোড়াডা দিয়া আমারে একটা পাড় দিয়া ফালাই দিছিল তিন হাত দূরেহোচট খাইয়া আমি মাটিতে পইড়া গেছিতখন আবার চুলডি ধইরা টানদা উঠাইছে উডাইয়া দুই তিনটা গালি দিছেতারপর আমারে জোরে হাঁটতে বলছেকিন্তু আমি হাঁটতে পারি নাখুব অসুস্হ আমিডাক্তার কইছে প্যারাটাইফয়েড আমারতখন আমি এই যে দীঘিটা আছে তার উত্তর পাড়ে আছিউত্তর পাড়ে আইসা দাঁড়াইয়া চিন্তা করতেছি যে,এই মুহূর্তে আমি যে ডালডার টিন লইয়া যামু সেই শক্তি আমার নাইসেই সাহসও নাইআমি হাঁটতেই পারি না,এত দুর্বলঠিক ঐ মুহূর্তেই সেই ডাক্তার আসছে  ডাক্তারকে দেইখা আমার একটু ভরসা অইছে যে,এখন কিছু করতে পারবডাক্তার দেইখাই আমাকে ডাক দিছে বন্ডু,এধার আওতখন তার কাচে গেলামযাওয়ার পর বললাম যে ভাই আমিত অসুস্হ,কিন্তু আমাকে বলতাছে ডালডার টিন নিয়া লতুয়ামুড়া যাইতেতখন সে আমারে তার ঘরে বসাইলঐ বিহারীও ঘরের দরজায় দাঁড়াই রইছেসে বিহারীরে কয়েকটা গালি দিলআমাকে আবার ঔষুধ-টষুধ দিয়া বলল যে, ২-৩ দিন পরে আবার তুমি আমার সাথে দেখা করবা,তোমার শরীর কেমন থাকে জানাইওঘর থাইকা এক পা আমি বাহিরে দিছি আরেক পা ঘরের ভিতরে রইছেদেখলাম বিহারী লোকটা ঐখানে দাঁড়ানোসে আমারে কয়,মাদারচুদ, তোর জন্য একটা বুলেট খরচ করামযখন ভাই একথা বলছে তখন আমি আবার পাক দিয়া ঘরে গেলাম গাতখন ডাক্তার মেজর আমারে জিজ্ঞাসা করল কি ব্যাপার তুমি গেলা না কেন? আমি বললাম যে,ভাই আমি যামু কেমনে, আমি এখানথে বাইর হইলে আমার লাইগ্যা একটা গুলি খরচ করবঐ যে দাঁড়াই রইছে স্টেনগান নিয়াতখন সে আমারে বসাইলসে ওখান থাইকা সম্ভবত অয়্যাললেসে কি জানি বললতারপর ঐ বিহারীকে ডাক দিয়া আনাইলতারে আনাইয়া শাস্তি দিয়া ট্রান্সফার করল গঙ্গাসাগরঐখান থেইকা প্রায় ৬ মাইল দূরে গঙ্গাসাগরতখন তারে ভারী বোঝা দিয়া বলল যে,ডাবল মার্চ করডাবল মার্চ কইরা সে চইলা গেলতখন (ডাক্তার) আমারে বলল যে,এই বিহারী শালারাই নারী নির্যাতন করছে,মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করছেএখন মুতি যদি বাইর হইতে তবে গুলি করত তোমাকেবুদ্ধি কইরা তুমি ভিতরে আসছ এইজন্য তুমি বাঁচছো নইলে তোমারে সে অবশ্যই গুলি করতআল্লার মেহেরবানিতে সে দফা আমি বাঁচছিতারপর আমি যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে চইলা গেলামতারপর রাত্র প্রভাত হইছে এমনি আমার দাঁত ব্যথা আরম্ভ হইছেদাঁত দুইটা পুকে খাইয়া লাইছিলঐগুলো খুব ব্যথা করতেছেসারাটা দিন গেছে কিছু খাইনি,কিছু খাইতেও পারি না,গরম পানিদা একটু পর পর কুলি করিবিকালের দিকে এক পাঞ্জাবি আইসা আমাকে বলল যে চণ্ডীদ্বার একটু যাইতে অইব বাজারে চলকেন? কাজ আছেআইয়া আবার ডাক্তারের লাগল পাইলামডাক্তার বলল যে,এরে আনছ কেন? এ-ত অসুস্হগিয়া দেখি প্রায় ৫/৭শত লোককোথাত থাইকা এইলোক আনছে এরাই জানেপাঞ্জাবিদের যে মাল ছামান আছে এগুলো সরাইয়া নিয়া যাইতেছেতখন ভাবলাম যে হয়তো যুদ্ধ আপাতত এখানেই শেষআর্মি এখানে প্রায় শতেক হবেরাজাকারও ছিল

 

প্র: আর কিছু দেখছেন?

 

উ: এখানে বাজারের উত্তর পার্শ্বে যে একটা বাড়ি ছিল আগে,মজিদ মিয়ার বাড়ি,ঐখানে একটা গর্তের ভিতরে মাথা পাওয়া গেছে অনেকগুলি২০/২৫ টা মাথা হাড় কঙ্কাল ছিলযাহোক,তারপরে ডাক্তার বলল,কি করবা ভাই, তোমারে যখন ধইরা আনছে,যাও এদের সাথেমানে এদের আনি মানতে অইবযাওন লাগবগেছি পর কতগুলা গ্রেনেড দিছে,মেছ লাইট দিছেবাউনগাঁ এর যে ব্রিজটা আছে রেল লাইনের ব্রিজটার কাছে সেখানে একটা নৌকা দিয়া রাখছেনৌকাটার মধ্যে উইঠ্যা আস&#