নাম : মোহাম্মদ আবদুর রশিদ

পিতা : মোহাম্মদ রহিম উদ্দীন চৌধুরী

গ্রাম : সৈয়দপুর,

ইউনিয়ন : বেতদীঘি

থানা : ফুলবাড়ি,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : দশম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে পেশা : মুজাহিদ বাহিনীর থানা কমান্ডার

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

১৯৭১ সালে বয়স : ২৪

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আপনার কি মনে হয়েছিল ?

 

উ: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে......, ২৫ মার্চ রাত্রিতে আমার মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশের মাটি এদিক ওদিক হয়ে গেছেচারদিকে থেকে শব্দ আসতেছিল কানেএই শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল দেশে একটা যুদ্ধ ঘটনা ঘটেছেকোন রাজনৈতিক পরিসি'তি বা ঘটনার উদ্ভব হয়েছেআমি তখন পলাশবাড়িতে

 

প্র: সেই সময় আপনার এলাকার মানুষের মনের অবস্হা কি ছিল ?

 

উ: সেই সময় আমার এলাকার মানুষ ছিল অত্যন্ত ভয়ার্ত

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

 

উ: আমি মুজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার ছিলাম১৯৬৯ সালে আমি মুজাহিদে যোগ দেই২৫/২৬ মার্চ আমি পলাশবাড়িতে (বৃহত্তর রংপুর) ছিলামসেখানে আমি থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে ছিলাম২৪ মার্চ হঠা ঐ রেজিমেন্টের পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের হাতিয়ার ক্লোজ করেকো (অস্ত্রাগার) তালাবদ্ধ করা হয়তারপর আমাদের বলা হয়, তোমাদের বেতন দেয়া হবেবেতন দেয়ার নামে প্রহসন করে আমাদের কোন প্রকার হাতিয়ার ছাড়া রাখা হলোপলাশবাড়ি হাইস্কুলে আমাদের ক্যাম্প ছিলস্কুল বিল্ডিয়ের নিচে আমরা ছিলাম প্রায় ৩৫০শজনউপর তলায় ক্যাপ্টেন শাহজাহান সাহেব২৫ মার্চ রাতে আমাদের কানে একটা শব্দ আসেঠা ঠা একটা শব্দসেটা রাইফেলের গুলির শব্দ বলে মনে হচ্ছিলএই শব্দ পেয়ে আমরা ছুটাছুটি শুরু করিসেখানে আমাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আটক করেআমাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সৈয়দপুরেসেখানে নিয়ে যাইয়া আমাকে ওরা (পাকিস্তানিরা) বলে তোমাকে শান্তি বাহিনীতে যোগ দিতে হবেআমি তখন বাধ্য হয়ে বলেছি, ঠিক আছে, আমি রাজী আছিতখন ওরা আমার কোম্পানির মুজাহিদদের বেতন দশ হাজার টাকা আমার হাতে দেয়এই দশ হাজার টাকা নিয়া আমি আমার কোম্পানিতে, চিন্তামন ফিরে আসিআমার কাছে মুজাহিদদের ৩০০শসার্টিফিকেটও ছিলমুজাহিদদের আমি সার্টিফিকেট এবং বেতন দিয়েছিতাদের বেতন দেওয়ার পর প্রায় ৫০০শটাকার মতো আমার কাছে ছিল, যে টাকা আমি নিজে খরচ করিতারপরে সেখানেই আমি চিন্তাভাবনা করতে থাকি এখন কি করা যায়সেই মুহূর্তে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন আমাকে কল করেইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে শাহ আলম নামে আমার এক ওস্তাদ ছিল, ওনার বাড়ি ছিল আমাদের এলাকায়উনি আমাকে কল করেনতো ওনার কল পেয়ে আমি তখন ফুলবাড়িতে যাইফুলবাড়িতে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা ইউনিটের সঙ্গে কাজ করতে থাকিইতিমধ্যে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়তারা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলোএদিকে তখন তোড়জোর শুরু হয়ে যায় পার্বতীপুরের দিকে যাওয়ার জন্যতারা (পাকিস্তানিরা) আমাদেরকে ধাওয়া করেআমরা সামান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের সাথে টিকতে না পেরে পিছু হটে ঠাকুরগাঁওতে পৌঁছিঠাকুরগাঁও গিয়ে শুনতে পেলাম যে, ঢাকাতে আক্রমণ হয়েছেঢাকাতে আমাদের বাঙালিদের উপর পাকিস্তানিরা অত্যাচার, নির্যাতন এবং বিভিন্নভাবে আক্রমণ শুরু করেছেএই সংবাদ আমরা ২৭ মার্চ রাত ১২টায় পাই

 

প্র: এই সংবাদ আপনারা কিভাবে পেলেন ?

 

উ: আমাদের থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যে ক্যাপ্টেন ছিলেন, ক্যাপ্টেন হারুন, উনার মুখে আমরা জানতে পারি

 

প্র: আপনার তখন কি মনে হয়েছিল ?

 

উ: আমার তখন মনে হল যে, এবার বোধহয় যুদ্ধ লেগেই গেল

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: হ্যাঁ, আমিতো বলেছি পলাশবাড়ি থেকে যখন আমি পালানোর চেষ্টা করি তখন আমাকে ধরে নিয়ে যায়

 

প্র: কে ধরে আপনাকে ?

 

উ: পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী

 

প্র: ধরে কোথায় নেয় ?

 

উ: আমাকে সৈয়দপুর নেয়া হয়

 

প্র: সৈয়দপুর নেয়ার পর ?

 

উ: সৈয়দপুর নেয়ার পরদিন আমাকে ওরা আমার কোম্পানির মুজাহিদদের বেতন দেয়বেতন দেয়ার আগে আমাকে শান্তি বাহিনীতে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেতখন আমি বললাম যে, ঠিক আছে, আমি আমার কোম্পানি নিয়ে ফিরে এসে আপনাদের শান্তি বাহিনীতে যোগ দিবএকথা বলে চলে আসি

 

প্র: কোথায় চলে আসেন ?

 

উ: আমি চিন্তামন আসিসেখানে আমার কোম্পানি ছিলএখানে আসার পরে আমি আর ওদের কাছে ফিরে যাইনি

 

প্র: আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন কেন ?

 

উ: আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম ....., মানে আমি তো পাকিস্তান মুজাহিদ বাহিনীতে ছিলামপাকিস্তান হানাদার বাহিনী আমাদের মুজাহিদদের তাদের দলে টানতে ছিলখোঁজখবর নিচ্ছিল মুজাহিদ কারা এবং কে ? ওরা মনে করছিল এরাই বোধহয় মুক্তিফৌজএই উদ্দেশ্য নিয়া ওরা যাদের নাগাল পাইতো তাদেরকে খতম করতো এবং গুলি করতোএই ভয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি

 

প্র: আপনার এলাকায় পাকিস্তানিরা কখন আক্রমণ করল ?

 

উ: আমাদের এলাকায় পাকিস্তানিরা আক্রমণ করল ৬ এপ্রিল

 

প্র: কিভাবে তারা আক্রমণ করল ?

 

উ: চরকাইতে তাদের ক্যাম্প ছিলওখানে তারা প্রথমে ক্যাম্প করেছিলহঠা তারা সেই ক্যাম্প থেকে উইথড্রো করে এদিকে আসেআমাদের এলাকার মধ্যে যে সমস্ত লোক মুজাহিদ বাহিনীতে ট্রেনিং ফ্রেনিং করেছিল বা অন্যান্য ট্রেনিং করেছিল, বাঙালি যারা অন্যান্য বাহিনীতে ছিল, তাদের বাড়িঘর পুড়াতে পুড়াতে, জ্বালাতে জ্বালাতে পাকিস্তানিরা আসতেছিলমেয়েদের উপরও তারা অনেক নির্যাতন করেতার মধ্যে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটলো সেটা হল, আমাদের ওখানে বড় নগর নামে একটা গ্রাম আছে, সেই গ্রামের কিছু মেয়ে অন্যত্র যাচ্ছিল, সেই সময় খানরা ওদের ধরে তাদের উপর পাশাবিক অত্যাচার করে

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: না, হয়নি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তপরতা শুরু হয় ?

 

উ:  আমাদের এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তপরতা শুরু হয় ....., ধরেন, এপ্রিল মাসের মাঝমাঝি থেকে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিল ?

 

উ: তাদের মনোভাব খুব সুন্দর ছিলসবাই বলেছে যে, আপনারা মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেনতারা বলতেন, মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সহায়তা করেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সরাতে সবরক্তের বিনিময়ে হলেও সরাতে হবেজনগণ যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে

 

প্র: আপনার এলাকায় বা গ্রামে রাজাকার কারা ছিল ?

 

উ: রাজাকার আমাদের এলাকার মধ্যে ছিল, কয়েকজন ছিলতার মধ্যে ......., কি যেন নাম এখন মনে পড়ছে না

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিল ?

 

উ: হ্যাঁ, শান্তি কমিটিতে ছিল, ফজলু হাজি আর ....

 

প্র: আল-বদর, আল-শামস কারা ছিল ?

 

উ: এরা আপনার ......, কুরি নামে একটা লোক ছিল তার বাড়ি কেটাহাটায়

 

প্র: এরা কি বাঙালি ছিল ?

 

উ: হ্যাঁ, এরা বাঙালি ছিল

 

প্র: ওরা রাজাকার, আল-বদর হল কেন ?

 

উ: এরা ..... ধরেন, লোভে পড়ে হইছিলখানেরা কিছু লোভ দিতএই লোভে পড়ে তারা আল-বদর এবং রাজাকার হয়ে গেলরাজাকার হলে তার বাড়িতে অনেক কিছু জিনিসপত্র পাকিস্তানিরা দিতএদের বাড়িতে তারা উঠাবসা করত

 

প্র: তারা এখন কোথায় ?

 

উ: তারা কিছু মারা গেছেকিছু লোক আছে

 

প্র: এইসব স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিল কি ?

 

উ: যুদ্ধের সময়ে অনেকগুলাকে ধরা হয়েছেস্বাধীনতার পরও তাদের ধরার জন্য অনেক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছেকিছু কিছু ধরা পড়েছে আর কিছু ধরা পড়েনি

 

প্র: যাদের ধরা হয়েছিল তারা ছাড়া পেল কিভাবে ?

 

উ: বিচার বিভাগের মাধ্যমে তারা ছাড়া পেয়েছে

 

প্র: আপনি কোন সেক্টরের অধীনে ছিলেন ?

 

উ: আমি থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে কাজ করেছি ৭ নম্বর সেক্টরে

 

প্র: আপনি কোন কোন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন ?

 

উ: কাউনিয়া, লালমনিরহাটে থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে

 

প্র: কিভাবে ?

 

উ: আমি থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করেছিসেই এলাকায় যে সমস্ত রাজাকার-আল-বদর ছিল তাদের ধরার প্রচেষ্টা চালাইছি এবং খান বাহিনীকে হটানোর যুদ্ধ করেছি

 

প্র: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপনাদের কিভাবে যুদ্ধ হয়েছে ?

 

উ: মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছে

 

প্র: কি ধরনের সেটা ?

 

উ: তাদের সঙ্গে আমাদের অতিরিক্ত রকমের যুদ্ধ হয়েছেযুদ্ধে দুপক্ষেই পানি বর্ষণের মত গোলাগুলি চলেআমাদের ১১০ জনের মধ্যে প্রায় ৪০জন জীবন হারায়আল্লা আমার জীবন রক্ষা করেছে

 

প্র: সেটা কোন এলাকাতে ?

 

উ: কাউনিয়ায়

 

প্র: সেখানে আপনারা মোট কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ?

 

উ: সেখানে আমরা মোট ১১০জন, আমরা ৬০জন এবং সামরিক বাহিনীর ৫০জন এই ১১০জন

 

প্র: পাকিস্তানিরা কতজন ছিল ?

 

উ: ওরা দেড়শথেকে দুইশছিল

 

প্র: আপনারা কি তাদের হটাতে পেরেছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁ, হটাতে পেরেছিলামতাদেরকে আমরা পিছনে বহু দূরে নিয়ে গেছিলামপ্রায় ৬ মাইল পিছনে হটাতে সক্ষম হয়েছিলাম

 

প্র : তাদের কাউকে আপনারা ধরতে পেরেছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁ, আমরা তাদের দুজনকে ধরেছিলাম

 

প্র: জীবিত অবস্হায় ?

 

উ: হ্যাঁ, জীবিত অবস্হায়

 

প্র: তাদের মৃত লাশ কটা পেয়েছিলেন ?

 

উ: আমরা লাশ পাইনি