নাম : মোহাম্মদ দৌলত খান

গ্রাম : মীরতলা

ডাক : কসবা

ইউনিয়ন : কসবা

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ৪৫/৫০

১৯৭১ সালে পেশা : কৃষিকাজ

বর্তমান পেশা : কৃষিকাজ

 

মোহাম্মদ দৌলত খান যুদ্ধে যেতে পারেননি বটে-তবে তাঁর ছেলে এবং ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলোকিন্তু তিনি রাজাকারদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মায়ের অসুখের মিথ্যা খবর দিয়ে ভাইকে নিয়ে এসেছিলেন যুদ্ধের মাঠ থেকেতারপর মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে তুলে দিলেন রাজাকারদের হাতেদৌলত খান অকপটে স্বীকার করেছেন তাঁর কৃতকর্মের কথা

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরের ঘটনাবলী আপনার মনে আছে কি?

 

উ: তহনতো আমরা চারিদিগদা হুড়াহুড়ি দেখছিযেমন পাঞ্জাবি আইয়্যা এহেনদা অ্যাটাক করলোআমরা মনে করছি,আমরার বুঝি আর নিস্তার নাইএহেনদা কসবাতে ঘাঁটি করেঘাঁটি কইরা চতুর দিগদা ভয় দেখান শুরু করলোতহন দেখলাম যে তারা খালি শিক্ষিত আওয়ামী লীগ বিছরায়া বাইর কইরা নির্যাতন করতাছেতাদের বাড়ি আক্রমণ করতাছে

 

প্র: পাক বাহিনী কিভাবে আক্রমণ করলো?

 

উ: প্রথম দেখলাম যে,চৌমুহনীতে তারা আইছে গাড়ি নিয়াতাদেরে একেবারে কারবালা মাঠের মতো দেহা গেলরাত্রে কিছু বষ্টি আইছিল ফুডি ফুডি (ফোটা ফোটা) বৃষ্টি পড়তাছেসকালে উইঠা গিয়া দেখলাম যে,কত যে গাড়ি আইছেতফাৎ থেইক্কা চাইছিএরপরে ৮টা ৯টার সময় দেখলাম যে,পাঞ্জাবি এই রাস্তা দিয়া পূর্ব দিগে অ্যাডভান্স করতাছেরাস্তার দুনো সাইড দিয়া তারা ক্রলিং কইরা পূর্ব দিগে আক্রমণ কইরা টি. আলীর বাড়ি পর্যন্ত গেছেটি. আলীর বাড়ির সম্মুখ দিয়া যাওয়ার সময় দেখলাম যে,তাদের উপর কিছু ফায়ার করলোতহনই তারা এইখানের মধ্যে তাবু গাড়লোটি. আলীর বাড়ির মধ্যে আর কিতারপর হুনলাম যে,তারা পুরাণ বাজার পুড়াই দিছে

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু অইলো পাঞ্জাবি যহন আইছে তার কিছুদিন পরেএ সময় মুক্তিবাহিনী বাইর হইলো আরকিগ্রামে গ্রামেও তারা হুনছি (শুনছি) লাইম্মা আইছেমুক্তিবাহিনী ইন্ডিয়াতে ট্রেনিং দিয়া নাইম্মা আইছেতহন আমার ভাই,আমার ছেলে তারাতো ভারতে গেলগাতহন সিদ্দিক মিয়া আড়াইবাড়ির এখানে ক্যাম্প করলোহে রাজাকারের বিগ লিডার ছিল আরকিতহন তারা পাঞ্জাবিদের কাছে আইয়া লাগাইল যে,দৌলত খাঁন ছেলে বা ভাই ভাতিজা তারা ইন্ডিয়া চইলা গেছেতারা গিয়া অনেক কিছু ম্যাপ ট্যাপ কইরা দেয়ঐহান থেইক্কা আবার শেলিং মারে আমরার এ কুলেপাঞ্জাবিরাও মারে চৌমুহনী থেইকাতহন দেখছি যে গুলিগুলা আমরার মাথার উপরেদা পইড়া অন্যদিকে যায়গাএহানতে আবার মারে চৌমুহনীএইভাবে দেখতাছিআমরা মাঝখানেতহনতো আমরা বাংকারও খুঁড়ছিমাইনষে বলছে যে,বাংকারে পইড়্যা থাকলে গুলি লাগে নাতহন আমরা বাংকারে পইড়্যা রইছিযহন দেখছি যে শান- অইছে,তহন আমরা উঠছি আরকিতহন আমারে সিদ্দিক মিয়া ডেইকা নিল ঐখানেআমারে আইন্যা কইলো যে,আপনের ছেলে কই? আমি বলি তারা বেড়াইতে গেছে মামার বাইত (বাড়িতে)এমনকালে ভারত গেছে বইলা আর কইলাম নাকয় যে,এক সপ্তার ভিতরে তারারে আইন্না হাজির করবেনআমি মামুন বাড়িত তো কইলাম,অহনে কই থেকে আইন্না হাজির করিতারাতো গেছেগা হেহানে (ভারতে)যাওয়ার পর এক সপ্তাহ গেছে চইল্যাএরপরদা ঠিকই রাজাকার গিয়া আমারে বলে যে তোমাকে এখানে যাইতে অইবো সিদ্দিক মিয়ার কাছেতো গেলামগিয়া কই যে,আইবো সামনের তারিখতহন আরেকদিন বলে যে এক সাপ্তার ভিতরে যদি তুমি না আনতে পারো তোমারে গুলি কইরা মারা অইবোআমি বললাম যে, আচ্ছা দেহা যাক আমি তালাশ করিএরপরে আমি একটু চিন্তা করলাম যে, তারার হাতে ধরা পড়লেই তো আমারে নিবোগাতাই আমি যেইভাবেই হউক পুষ্কুর্নির মধ্যখানের জায়গাটায় কতডি পানা (কচুরি পানা) রাখছিলামতারা গেলে ঐ পানাডার তলে বইয়া নাক জাগাইয়া পইড়্যা থাকছিজান তো বাঁচান লাগবোদেখলেতো আবার গুলি করেহুনলাম যে, আওয়ামী লীগের বাড়ি বলে পুইড়্যা লায় (পুড়িয়ে ফেলো)পুড়ছেও তহন কিছুবাড়ি থেইকা মালটাল সরাইছিযে যেইডা রাখছে ইডাই (এগুলিই) নিছে গা আর পাইছি নাশেষ পর্যন্ত দেখি যে, আমার আর বাচার উপায় নাইঅনেকে এভাবে বলতাছে তোমার ছেলেরে বা ভাইয়ের যদি আইন্যা সারেন্ডার না করাও তো তোমার আর রেহাই নাইকি করামরে (করবরে) আমি! তখন শুনলাম তারা হেইখানে (ভারতে) গেছিলগা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে এবং ট্রেনিং নেওয়ার পরে পার্টি লইয়া তারা অপারেশনে আমরার একুল আইয়া বাংলাদেশে লামছেপাঞ্জাবিরার লগে ফাইট করবে, বুঝলেননি? তারাতো আর প্রকাশ্য ঘুরতো পারে নাশুনছি তারা একখানে বইসা থাকে আড়ালেযখন পাঞ্জাবিরা পথে নামে তহন তারা তফাত থেইক্যা গুলি কইরা পাঞ্জাবি মারেসালদা নদীর ইহানদা তো বহুত পাঞ্জাবি মারা গেছিলমুক্তিযোদ্ধারা একটা বড় এ্যাটাক করছিলএই অ্যাটাকে পাঞ্জাবিরা একটু নরম অইছেযা হউক, এরপরে আমি আসলামসিদ্দিক মাস্টার তহন আবার কইল যে,সাত দিনের ভিতর যদি আপনের ভাইয়ের বা আপনের ছেলেরে আইন্না আমরার লগে দেহা না করান তো আপনের ভাইয়েরে বা আপনের ছেলেরে আইন্না আমরার লগে দেহা না করান তো আপনেরে গুলিদা মারা অইবোতহন আমরার লতিফ মোল্লা সাহেব কইল যে,এক কাম কর,লিডার মেম্বারের ধরউনি যদিও মুসলিম লীগ কইর‌্যা থাকে তবে আমরার গ্রাম বাঁচাইছেঅনেকরে বাঁচাইছেতারার থেইকা রেহাই দিছে সুপারিশ কইরা। অনেকরে ছুডাইছেতহন আরও কইল যে,তোমরাতো রেহাই নাইতো দেহ,মেম্বারকে দিয়া কিছু করা যায় কি না

 

প্র: তারপর কি করলেন?

 

উ: তহন আমি খোঁজ খবর শুরু করলাম যে তারা কোনো গ্রামে নামছে,জীবন তো বাঁচান লাগবোগ্রামে মুক্তিবাহিনীর পার্টির সাথে আমার ভাইয়েরে ফাঁকি দিলাম যে আমার মার খুব বেশি অসুখ,আমার মারে একটু দেইখ্যা আসুকআমার উদ্দেশ্য অইলো তারে ফাঁকি দিয়া আনতে পারলে সালেন্ডার (সারেন্ডার) কইরাইয়া জীবন বাঁচান যাইবোরাজাকাররা বলতেছে যদি অহন এইহানে আইন্যা লালেন্ডার (সারেন্ডার) করান তো আপনেরা ফুলের মালা পাইবেন,হেও ফুলের মালা পাইব,আর নাইলে রেহাই নাইযা হউক,আমি যেই ভাবেই হউক মার কথা কইয়া তারে নিয়া আসলামআমার মারে সাথে কইরা নিছিলাম কি না মনে নাইমাথার মধ্যে একটা পাঞ্জাবি দিয়া ফকির বেশে বাড়িতে নিয়া আসলামলতিফ মোল্লারে বললাম,তারে তো অহন আনছিলতিফ মোল্লা কিন্তু তহন লায়েক (বড়) ছিলতার কথা সবাই শুনতোপাঞ্জাবি কন,আর যাই কন লতিফের কথা শুনতোলতিফ মোল্লা মানুষের উপকারও করছেআওয়ামী লীগ বুঝি না,মুসলিম লীগ বুঝি না সবাইর উপকার করছেকেউ বিপদে পড়লে লতিফ মোল্লা কইল যে আসছো,চলো তাদের নিয়া সারেন্ডার কইরা লাইভাইরে নিয়া গেলাম পর এই ছিদ্দিক মিয়া দুই চার কথা জিগাইল,তোমরা কই ছিলা,কি ছিলা,কোহানো ট্রেনিং দিছো এ কথা কইয়া শেষ পর্যন্ত তারে আটকাই দিলকইছিল যে,লগে ফুলের মালা দিয়া বিদায় কইরা দিবকিন্তু তারা আটকাই দিলকইল যে সহালে (সকালে) আইয়া আপনেরা নিবেনএই সহালো আই,কয় যে,না বিকালে নিয়েনতারারে রাইখা তারা কোনখানে ছিল ইতা নাম লয় আরকিসকাল বিকাল এইভাবে শুরু করলকয় যহন তহন ফুলের মালা দিয়া বিদায় কইরা দিবআমার মায় কয় তর পুত (পুত্র) বাঁচাইলিতারে বাঁচাইতে গিয়া আমার পুতেরে শেষ করলিতারাতো আর ছাড়তেছে নাএকেবারে লাস্ট মুহূর্তে আস্ট মাস পরেইতো দেশ স্বাধীন হলোচাইয়া দেহি যে আমরার খালেবিলে দিয়া পাঞ্জাবিরা দৌড়াদৌড়ি কইরা জান বাঁচাইয়া খালি হেদিগে যাইতাছেতহন আমরা চিন্তা করলাম ব্যাপার কি? এইদিন শাহপুরের বাজার আছিলএকটু আগে আমি আইলাম এহানে শাহপুর বাজর করামবাজার তো করন লাগেকিন্তু শাহপুরে ওদের ক্যাম্প আছেচাইয়া দেখলাম রাস্তাডা পরিষ্কার কিনা? রাস্তাডা পরিষ্কার থাকলে ফাল দিয়া বাজারে যাইকারণ সামনে পড়লেইতো তারা আটকাইয়া দেয়দেখলাম যে,না টি. আলীর বাড়িত ক্যাম্প থেইকা পাঞ্জাবিরা পথ দিছে পশ্চিম দিগে

 

প্র: গাড়িতে না হাইটা?

 

উ: কিছু হাইটা কিছু গাড়িতে যে যেমনে পারে খালি যাইতাছেইহানে আসা দেইখ্যা একটা আতঙ্ক অইলাম যে ব্যাপার কি? তারা এইভাবে যাইতাছে ক্যান? কতক্ষণ পরে হুনলাম যে পাঞ্জাবি যতখানে আছিল সব ক্লোজ কইরা গেছেগাগেলাম বাজারেঠিকই মানুষের মধ্যে একটা জিগারের (আনন্দের) ভাব উইঠ্যা গেলগাআনন্দ উৎসব, দেশতো স্বাধীন অইছেএর মধ্যে দেখলাম যে বাজারের মধ্যে বহুত রেজাকারযে যেখানে ছিল খবর পাইয়া শাহপুর বাজারে আইয়া তারা পড়ল আমরারে বাঁচাওআমরা কই যে পাঞ্জাবি গেছেগাতহন আমার ভাই আছিল ঐহানে, আটকাইল সিদ্দিক মিয়াতহন সিদ্দিক মিয়া খবর পাইছে না যে পাঞ্জাবি গেছেগা দেশ স্বাধীন অইছেএই রকম অবস্হা যহন তহন আমি লোক পাডাইলাম সিদ্দিক মিয়ার কাছেআমার এক ভাই আছিল মনতাজ তারে তহনও তারা আটকাইয়া রাখছেমনতাজ খবর দিল যে ৫০০ টেহা যদি আইন্যা দিতারেন (দিতে পানে) তো এই মুহূর্তে ছাইড়া দিবতো গেলাম আবার বাইত(বাড়িতে)স্বাধীন যে হইছি হেডাতো তেমন নিশ্চয়তা হইছে না তহনআইনা দিলাম পর তারা ছাইড়া দিলতারে লইয়া বাজারে যেই আইয়া সারছি তহনই সমস্ত জয় বাংলা কইরা একটা জিগার দিলাইছে (দিছে),দেশ স্বাধীন অইছেএরপরে সিদ্দিক মিয়ারেও আর এইখানে লাগ পাইলাম না

 

প্র: আপনার এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?

 

উ: রাজাকার তো বহুত লোকই ছিলপ্রত্যেক ঘরে ঘরে বাদ আছিল নাপরে দিয়া জানের ভয়ে শেষ পর্যন্ত তারা প্রায় সবাই রাজাকার হইয়া যায়

 

প্র: কোন মাসের দিকে রাজাকারে বেশি সংখ্যক লোক ভর্তি অইছে?

 

উ: প্রথম তো শুধু পাঞ্জাবিই আছিল,পরেদা রেজাকারে তারা ভর্তি করল আরকিরেজাকারে ভর্তি অইলে তার একটা সুবিধা ঘরবাড়ি আর হয়তো জান বাঁচান যাইবেযে লাভেই দেউক নাম দিছিল

 

প্র: শান্তি কমিটিতে কারা ছিল?

 

উ: আমরার গ্রামে শান্তি কমিটি হয় নাইলতিফ মোল্লা আগে থেকে মুসলিম লীগের নেতা ছিল,পাঞ্জাবির নেতা ছিল,অতটুকু জানিএহানে শাহপুরে তারা শান্তি কমিটি করছেডান্ডি কার্ড দিত মৌলুক হুসেন মিয়াএই ডান্ডি কার্ড নিলে আপনারে ধরতো নাতো আমরা আওয়ামী লীগ যারা তারা অনেকেই নিছি

 

প্র: এই এলাকার সব মানুষই ডান্ডি কার্ড ব্যবহার করতো?

 

উ: হাঁ,অনেকেই নিছেলইয়া লইয়া চলছে,কি করবো জান বাঁচাইতে পারে না

 

প্র: আপনার ভাইয়ের অবস্হা কি হলো বলেন?

 

উ: তার সাধারণ ক্ষমা অইলোতহন তারে মুক্তিবাহিনীর দলের সাথে তারা মিশাইলোস্বাধীন অইছে পর মুক্তিরা হাতিয়ার লইয়া আইয়া আমার বাড়ি ঘেরাও করছেএহনত তারা স্বাধীন অইছে,আমি কেন তারে আনছিলাম? আইন্যা সে যদি মারা যাইত এইডার জন্য দায়ী আমি হতামতারা কইল তাইলে আপনেরে আমরা গুলি কইরা মাইরা ফেলতামআমি কইলাম আরে বাপু,আনছিলাম বিপদে পইড়াতোমরা হায়াতে বাঁচছো,দেশতো স্বাধীন অইছে, অহন ক্ষমা কইরা দাওস্বাধীনের পর ছেলেকে স্কুলে ভর্তি কইরা দিছিএরপরে আমার ভাইডার চাকরি অইছিল

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : মোঃ সোলেমান খান

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২৯ নভেম্বর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৩৫