নাম
:
মোহাম্মদ
মমিনুল হক
খন্দকার
গ্রাম
:
মঈনপুর
ইউনিয়ন
:
কাইয়ুমপুর
থানা
:
কসবা
জেলা
:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১
সালে বয়স : ৩০
১৯৭১
সালে পেশা :
মুজাহিদ
বাহিনীর
সদস্য
বর্তমান
পেশা : ক্ষুদ্র
ব্যবসায়ী
মুজাহিদ
বাহিনীর
সদস্য
মোহাম্মদ
মমিনুল হক খন্দকার
অস্ত্র হাতে
লড়াই করেছেন। কালামুড়া
ব্রিজ
অপারেশন,গুংগুর
নদীতে পাক
টহলযানের ওপর
আক্রমণ চাড়াও
তিনি তাঁর
এলাকায় পাকিস্তানিদের
বর্বর হামলা,নির্যাতন
ও হত্যার কথা
জানিয়েছেন
বর্তমান সাক্ষাৎকারে।
প্র:
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চে
পাকিস্তানি
সামরিক জান্তার
আক্রমণ
সম্পর্কে কি
শুনেছেন বা কি
জানতেন ?
উ:
পাকিস্তানি
জান্তারাতো
সারা
বাংলাদেশে
আক্রমণ করা
আরম্ভ করল। বহুত বাঙালি
মারলো। মা-বোনদের
ইজ্জত নষ্ট
করল। বাড়িঘর
আগুন দিয়া
পোড়াইল। লোক মারফত এই
খবর শুনছি। লোকগুলা
ঢাকা থেইকা
আসছে। দাউদকান্দি
থেইকা আসছে। কেউ
চিটাগাং
থেইকা আসছে। যারা আসছে
তাদের সাথে
সাক্ষাৎ হইছে। অধিকাংশ
লোকই ঢাকা
থেইকা আসছে। আমার
এলাকায় আমার
বাড়ির পাশে
একটা
প্রাইমারি
স্কুল ছিল। রাত্র একটা,দেড়টা,দুইটায়
একশ,দেড়শ,দুইশ
লোক আসত। আমরা
তাদেরকে
স্হান দিতাম
মঈনপুর
প্রাইমারি
স্কুলে। পরদিন সকালে
তাদেরকে আবার
বাড়ি বাড়ি
পাঠাইতাম।
প্র:
যখন এই
আক্রমণের কথা
শুনলেন তখন
আপনার কি মনে
হয়েছিল?
উ: তারা
যখন এইভাবে
আমাদের
আক্রমণ করা
আরম্ভ করছে,আমাদের
বাড়িঘর
পুড়াইতে
আরম্ভ করছে,মানুষ
মারতে আরম্ভ
করছে-তখন আমার
মনে এমন চেতনা
হইছে যে আমরা
সব বাঙালি এক
হইয়া রক্ত
দিয়া হইলেও এই
দেশকে
স্বাধীন করব।
প্র:
আপনার এলাকা
কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করল?
উ: আমাদের
এই এলাকা
পাকিস্তানিরা
এপ্রিল মাসের
শেষ ভাগ দিয়া
আক্রমণ করছে। এপ্রিল
মাসের শেষ
ভাগেদা গিয়া
পাকিস্তানিরা
আস্তে আস্তে দেশে
আসা আরম্ভ করল। জায়গায়
জায়গায় তারা
বাংকার করতে
আরম্ভ করল। তারা প্রথম
ঢুকছে কসবা
দিয়া। কসবা
দিয়া ঢুইক্যা
এরপরে যখন
নাকি
বর্ষাকাল আরম্ভ
হইল তখন
আমাদের
গ্রামের
পশ্চিম দিয়া
একটা গাঙ আছে,সেই
গাঙ-এর পাড়ে
বড় বড় নৌকা
দিয়া আসছে। গাঙডার নাম
হইল গুংগুর
নদী। প্রথম
যখন ঢুকছে তখন
তারা প্রায় এক
দেড়শ লোক হবে। তারা
আইস্যা
মঈনপুর
পশ্চিম পাড়া
ইসাহক আলীর বাড়িতে
বা মৌলভী বাড়ি
বলে ঐ বাড়িতে
প্রথম আশ্রয়
নেয়। ঐ বাড়ি
থেইক্যা তারা
বোম,কামান
ইত্যাদি
মারছে। পাঞ্জাবির
ভয়ে ইসাক আলী
চইল্যা গেছে। ছাড়া বাড়ি
পাইয়া তারা
ঐখানে ঘাঁটি
করছে। এইদিক
দিয়া
মুক্তিবাহিনীও
তাদের উপর
পাল্টা বোম
মারা আরম্ভ করল। পাঞ্জাবি
এবং
রাজাকাররা যা
অত্যাচার
করছে-তা বলার
না। আমাদের
মঈনপুর
প্রাইমারি
স্কুলের
উত্তরের বাড়িটাকে
বলে দারোগা
বাড়ি। ঐ
বাড়িতে আগুন
লাগাইছে। মঈনপুর
বাজারের
দক্ষিণ পাশে
স্বর্ণকারের
বাড়ি। এটাকে
বলে হুরমত আলী
স্বর্ণকারের
বাড়ি। ঐ
বাড়িতে আগুন
লাগাইছিল। আর একটা লোক
আমাদের পূর্ব
পাড়ার আবদুল
কাদির কইরা
নাম। ঐ
কাদিরের
বাড়িতেও আগুণ
লাগাইছিল। আর ঐ
কাদিরকেও
পাঞ্জাবিরা
গুলি কইরা
হত্যা করে। আমি আগেই
বলছি দারোগা
বাড়ির কথা। সেই দারোগার
বাড়িতে
মুক্তিবাহিনীর
কয়েকজন আইসা
আশ্রয় নিছিল। একান
থেইক্যা তারা
এদিক সেদিক
যাইত। টের
পাইয়া
পাঞ্জাবিরা
রাজাকার নিয়া
শাহপুর
থেইক্যা
ছদ্মবেশে
আইস্যা তাদের
উপরে হামলা
করে। হামলা
করাতে দুইজন
মুক্তিবাহিনী
মারা যায়। তাদের নাম
আমার স্মরণ
নাই। তবে
আমাদের
কুল্লাপাথর
শহীদ মিনারে
তাদের নাম
লেখা আছে। আর মঈনপুর
বাজারের
দক্ষিণ পাশে
যেটাকে মিয়া বাড়ি
বলা হয়
পাঞ্জাবিরা
বাজারে
আইস্যা যখন অ্যাটাক
করে তখন তারা
ঐ বাড়িতে
যাইয়া মা
বোনদেরও ইজ্জত
নষ্ট করে।
প্র:
আপনার এলাকায়
কখন থেকে
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয়?
উ: আমাদের
এলাকায়
মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু
হয় জুন মাস
থেইকা। জুন
মাস থেইকা তৎপরতা
বেশি আরম্ভ হয়। অবশ্য মে
থেকেই এলাকায়
মুক্তিবাহিনীর
কিছু তৎপরতা
আরম্ভ হয়।
প্র:
কালামুড়ার
ব্রিজে যে
আক্রমণ হইছে
সে সম্পর্কে
কিছু বলবেন?
উ:
কালামুড়া
ব্রিজটাকে
যখন নাকি আমরা
টার্গেট করি
তখন আমাদের
সাথে ছিল
গোলাম
আম্বিয়া এবং হাবিলদার
এরশাদ উল্লাহ
সাহেব। উনাদের
সহযোগিতায়
আমরা ৫০/৬০ জন
মুক্তিযোদ্ধা
এইখান থেইকা
যাই। তখন
আমার সাথে
কামালপুরের
শহীদ মিয়া ছিল,তারপরে
আরো ছিল, আমরা চারজনে
ঐ ব্রিজের
নিচে লাইমা দুইপাশে-দক্ষিণ
পাশে দুইজন,উতর
পাশে দুইজন
মাইন ফিট করি। কালামুড়ার
ব্রিজে আট জন
রাজাকার ছিল। তাদের
সাথে আমাদের
যোগাযোগ ছিলো। ঐ যোগসাজশের
মাধ্যমে আমরা
কালামুড়ার
ব্রিজে রাজাকারের
উপরে অ্যাটাক
কইরা যে সাত
আট জন রাজাকার
ছিল তাদেরকে
নৌকাতে তুলি
অস্ত্র-শস্ত্রসহ। এরপর মাইন
বাস্ট করে
ব্রিজ ধ্বংস
এবং আমরা নৌকা
ডুবাইয়া চইলা
আসি।
প্র:
তারপর ঐ
গুংগুর নদীর
পাড়ে যে
আপনারা অ্যাম্বুশ
করলেন সে সম্বন্ধে
কিছু বলবেন ?
উ:
পাঞ্জাবিরা
গুংগুর নদী
দিয়া সব সময়ই
আসা যাওয়া করে। কিন্তু তাদেরকে
কিভাবে আমরা
আক্রমণ করব? তারা এই
দিক দিয়া আসে
সারদা
নদী-কুঠি
চৌমুহনী-এই
তাদের রাস্তা। তখন
আমাদের ওহাব
সাব ছিলেন
প্লাটুন
কমান্ডার। ওহাব সাবের
নেতৃত্বে
আমরা তখন
গুংগুর নদীর
পাড়ে যে একটা
বটগাচ ছিল সেই
বটগাছের
পশ্চিম পাশে
এবং বটাগাছের
দক্ষিণ পাশে
পজিশন নিই। এ সময় আমাদের
কাছে খবর আসল
যে,এই দিক
দিয়া স্পিড
বোটে
পাঞ্জাবি
গেছে। এ্যাম্বুশ
দেওয়ার প্রায়
তিনঘন্টা পর
দেখলাম স্পিড
বোটটা আগে আগে
আসতেছে। স্পিড
বোটটার মধ্যে
পাঞ্জাবি ছিল
মোট ১৩ জন। তখন এই স্পিড
বোটটাকে মারা
হইল। যেইখানে
স্পিড বোটটা
মারছি,সেইখান
থেইক্যা
প্রায় এক
কিলোমিটার
দক্ষিণ দিকে
পাঞ্জাবিরার
অপর নৌকাগুলা
আসতেছে। তারা ওখান
থেকে গুলি
করতেছে। তখন অমরা
সাঁতরাইয়া
যাইয়া স্পিড
বোটটারে আনলাম। ঐ স্পিড
বোটটারে
আইন্না তখন
স্পিড বোটটার
যে মেশিনডা
সেই মেশিনডা
আইন্না একটা
পাট জমিনে
লুকাইলাম। এরপর আমরা
দৌড়াইয়া আইসা
পড়লাম। আর
সেই দিক দিয়া
পাঞ্জাবিরা
চৌমুহনী
থেইক্যা সেল
মারা আরম্ভ
করল। এই দিক
দিয়া
পাঞ্জাবিরাও
গুলি করতে
আরম্ভ করল। আমরাও
পাল্টা
মর্টার
মারলাম। এরপর আমরা
সেখান থেইকা
সইরা পড়লাম।
প্র:
মুক্তিবাহিনী
সম্পর্কে
আপনার এলাকার
জনগণের
মনোভাব কি ছিল
?
উ:
মুক্তিবাহিনী
সম্বন্ধে
জনগণের
মনোভাব ছিল যে
আমাদের
মুক্তিবাহিনী
গঠন হইছে,তাই
তাদেরকে
সহযোগিতা করা
আমাদের
কর্তব্য-যাতে
পাকবাহিনীর
হাত থেইকা এই
দেশকে
স্বাধীন করা
যায়।
প্র:
আপনার গ্রাম
বা এলাকায়
কোনো রাজাকার
ছিল?
উ: আমাদের
এলাকায় কোনো
রাজাকার ছিল
না।
প্র:
শান্তি
কমিটিতে কারা
ছিল?
উ:
কামালপুরে
সুরুজ মিয়া শান্তি কমিটি
করছিল। শেষ
পর্যন্ত উনি
আমাদের
মুক্তিবাহিনীর
হাতেই মারা
যায়। শান্তি কমিটির
লিস্টটা উনার
পকেটে ছিল। মুক্তিবাহিনী
সেটা পাইয়া তাকে
মাইরা ফালায়।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
গ্রামে ফিরে
বা এলাকায় ফিরে
কি দেখলেন ?
উ:
যুদ্ধের শেষে
আমরা হাজার
হাজার লোক যার
যার বাড়িতে
ফিরে আসলাম,যার যার
গ্রামে ফিরে
আসলাম। দেখলাম
পাহাড়ের মতন
বন। গাছ টাছ
সব উইঠ্যা
মানে
বিশৃঙ্খলা
হইয়া রইছে। কোনো কোনো
বাড়িতে মাইন ফিট
কইরা রাখছে। কোন কোন
বাড়িতে লোক
আছে। মুক্তিবাহিনীর
সাহায্যে এই
মানুষ গুলারে
রাখা হইছিল।
প্র:
আপনার অস্ত্র
কি
করলেন ?
উ: আমার
অস্ত্র আমি
জমা দিয়া দিছি।
প্র:
কোথায় জমা
দিয়েছেন?
উ:
কমান্ডার
গাফফার
সাহেবের কাছে।
প্র:
যুদ্ধের শেষে
আপনি কি করলেন?
উ: আমার
আম্মা আব্বায়
আমাকে আর্মি
ডিপার্টমেন্টে
যাইবার দিল না। তখন
ব্যবসা আরম্ভ
করছি। আর
বাউল গান
শিখছি। ঐ
বাউল গান নিয়া
আছি।
সাক্ষাৎকার
গ্রহণকারী : জহিরুল
ইসলাম স্বপন
সাক্ষাৎকার
গ্রহনের
তারিখ: ১ অক্টোবর
১৯৯৬,
ক্যাসেট
:
কসবা- ৫