নাম : মোহাম্মদ জাকারিয়া

পিতা : মো: আনোয়ার আলী

গ্রাম/মহল্লা : রেলগেট, দৌলতপুর, ডাক : দৌলতপুর

থানা : দৌলতপুর, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এস. এস. সি.

১৯৭১ সালে বয়স : ২০

১৯৭১ সালে পেশা : শ্রমিক রাজনীতি

বর্তমান পেশা : শ্রমিক রাজনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা

 

 

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি  কি জানেন ?

 

উ: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে আমি স্হানীয় ছাত্র লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলামআমাদের এই এলাকায় তখন আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন মরহুম আবু সুফিয়ান সাহেবনির্বাচনের পর সুফিয়ান সাহেবের নির্দেশে আমি শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হইএখনও সেই শ্রমিক রাজনীতিতেই আমি আছি

 

   পাকিস্তানের প্রথম থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের উপর অন্যায় অত্যাচার করে আসছিলোআমরা বাঙালিরা তাদের অন্যায় অত্যাচারে খুবই অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম১৯৭০ সালের নির্বাচনে তারই বহি:প্রকাশ ঘটেনির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেকিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও পশ্চিম পাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দেয় নাইআমরা আবার তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হইএরপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশে আন্দোলন শুরু হয়১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ভাষণ দেনতারপর থেকে দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়আমাদের এখানেও সংগ্রাম কমিটিগঠিত হয়সংগ্রাম কমিটি শ্রমিকদের ট্রেনিং গ্রহণের ব্যবস্হা করেট্রেনিং গ্রহণে শ্রমিকরা সাধারণভাবে লাঠি ব্যবহার করতোসেই সময় আমাদের এখানে আর একটা সমস্যা দেখা দেয়অসহযোগ আন্দোলনের কারণে বেশিরভাগ মিল বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি পাচ্ছিলো নাফলে, শ্রমিকরা প্রচন্ড অর্থ কষ্টের মধ্যে পড়ে যায়তখন এই শ্রেণীর শ্রমিকদের জন্য এখানে কয়েকটা ক্যাম্প করা হয়সেই সব ক্যাস্পে খাবার দাবার রান্না বান্না করে তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্হা করা হয়শ্রমিকদের পরিবারের লোকেরাও এই সব ক্যাম্পে খেতোএইভাবে আমাদের মিল এলাকায় কর্মকান্ড চলছিলোতারপর তো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ করলো

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

 

উ: আমি সেদিন মানিকতলায় একটা ক্যাম্পে ছিলামওই ক্যাম্পে কিছু শ্রমিক ছিলোতারা ট্রেনিং নিতোআমিও ট্রেনিং নিতামইপিআরের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আমাদের ট্রেনিং দিতোপিযুষকান্তি লাহিড়ী নামে আর এক হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেনতিনিও আমাদের ঐ ক্যাম্পে ট্রেনিং দিতেনআমরা প্রতিদিন প্যারেড ট্যারেড করতামকিভাবে রাইফেল ধরতে হয়, কিভাবে গুলি করতে হয়, সে সব লাহিড়ী বাবু আমাদের শিখাতেনআমরা সেই সময় লোকজনের কাছ থেকে কয়েকটা বন্দুক সংগ্রহ করেছিলামআর লাঠি সোটাতো ছিলোইআমরা ২৬ মার্চ সকালে খবর পেলাম যে, ঢাকায় পাক আর্মি আক্রমণ করেছেতারা আক্রমণ করে হাজার হাজার লোককে মেরে ফেলছে

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনী আপনাদের এখানে কখন আক্রমণ করলো ?

 

উ: ঢাকায় আক্রমণ করার দুই দিন পরই আমাদের এখানে পাক আর্মি আক্রমণ করেসেই সময় আমাদের নেতা আবু সুফিয়ান সাহেব এখানে ছিলেন নাপাক আর্মি এখানে এসে প্রথম তার বাড়িতে আক্রমণ করেএই এলাকায় তখন জয় বাংলার ফ্লাগ মানে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত ফ্লাগ টাঙানো ছিলোওই ফ্লাগ তখন রাস্তার দুপাশে অনেক জায়গায় টাঙানো ছিলোআর্মি এখানে এসে ওই সব ফ্লাগ নামাতে থাকেরেল লাইনের দুপাশে তখন অনেক বস্তি ছিলোআর্মি ওই সব বস্তিতে গুলি করে এবং আগুন লাগায় দেয়আমরা আগেই তাদের আসার পথ অবরোধ করে রেখেছিলামএখানে পেট্রোল পাম্পের সামনেও আমরা বিরাট অবরোধ সৃষ্টি করেছিলামতখন দিন রাত চেষ্টা করে যশোর রোডে আমরা অবরোধ সৃষ্টি করেছিলামফুলবাড়ি রেলগেট থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত ছয় জায়গায় আমরা রাস্তা কেটে দেই এবং রাস্তার মধ্যে ক্রংক্রিটের বড় বড় পিলার ফেলে রাখি যাতে কোনো আর্মি এই এলাকার ভিতর ঢুকতে না পারেবহু মানুষ নেমে গিয়েছিলো এ সব কাজ করতে

 

   পাক আর্মি যেদিন আসে সেদিন এখানে একটা মিছিল হচ্ছিলোঅসুস্হতার কারণে আমি সেদিন মিছিলে যেতে পারি নাইসেদিন সকাল বেলা একটা লোক এসে আমাকে বললো যে, ফুলবাড়ি গেটের কাছে যশোর থেকে আর্মি আসছেতারা রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে এদিকে আসছেতখন আমরা বিভিন্ন জায়গায় লোক রাখছিলামতারা খবর আনা নেওয়া করতোআধা মাইল বা এক মাইল পর পর আমাদের লোক থাকতোতাদের কারো কাছে সাইকেল, কারো কাছে মটর সাইকেল ছিলোতারা একজন আর একজনের কাছে খবর পৌঁছে দিতোযাহোক, সে আমাকে বললো যে, যশোর থেকে ৩৫টা গাড়িতে করে আর্মি ফুলবাড়ি গেটের কাছে চলে এসেছেতারা রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে ফুলতলা থেকে ওখানে আসছেখবর পেয়েই আমি রোডের উপর চলে আসলামআমাদের এখানে হামিদা মঞ্জিল নামে একটা বিল্ডিং ছিলোরেলগেট থেকে অল্প কিছু দূরেবের হয়ে দেখি সেই হামিদা মঞ্জিলের সামনে পাক আর্মিতারা হেঁটে এদিক আসছেআর আমি যেখানে দাঁড়ায় ছিলাম সেখানে ৩/৪টা স মিল ছিলোসেই স মিলের মোটামোটা কাঠ আর কাঠের গুড়ি শ্রমিকদের দিয়ে ঠেলে নিয়ে আমরা রাস্তার উপরে আগেই ফেলে রেখেছিলামদূরে মিলিটারি দেখে আমি পেট্রোল দিয়ে ঐসব কাঠে আগুন ধরাই দিলামকাঠে আগুন লাগাতে গিয়ে আমাদের এক কর্মী মোস-ফা তার একটা পা পুড়ে গেলোএর মধ্যে ৩/৪ জন লোককে আমি পাঠালাম সুফিয়ান সাহেবের কাছেতারা ৫০ সি. সি.-র মটর সাইকেল নিয়ে সুফিয়ান সাহেবের খোঁজে গেলোআমি সুফিয়ান সাহেবকে খবর দিলাম যে, পাক আর্মি চলে এসেছে আমরা পাক আর্মিকে মোকাবেলা করছি, আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসেনএদিকে পাক আর্মি দূর থেকে আগুনের মধ্যে কি যেন একটা গ্যাস মারলোআমি দেখলাম তাতে আগুন নিভু নিভু হয়ে গেলোওটা মারার ২/৩ মিনিটের ভিতরেই আগুন একদম কমে গেলোপাক আর্মি আমাদের ঐ দিককার ব্যারিকেড টপকাইয়া চলে আসতে লাগলোতখন আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র নাইশুধু লাঠিশুধু লাঠি নিয়ে তো আর আমরা তাদের সামনে যেতে পারি নাকিছুক্ষণ পর দেখলাম মহেশ্বর স্কুলের সাইডে যে পোস্ট অফিস আছে, তার সোজাসুজি সুফিয়ান সাহেবের কিছু লোক চলে আসছেসুফিয়ান সাহেবের লোকজন মানে সব শ্রমিকরা-তাদের দেখে মিলিটারিরা ওখানে একটু থমকে দাঁড়ায়দাঁড়িয়ে পড়লেও কিন্তু ওরা প্রথমে গুলি করে নাইতখন আমি এবং আরো কয়েকজন শ্রমিক নেতা সুফিয়ান সাহেবের লোকজন যেখানে ছিলো ওদের দিকে দৌড়ে গেলামগিয়ে দেখি ওদের সাথে কয়েকজন বাঙালি মিলিটারিএর মধ্যে ওখানে হাজার হাজার লোক জমা হয়ে গেলোকে কার কথা শোনে ! সব লোক তখন আর্মির উপর লাফায় পড়ার উপক্রমএরপর আর্মি গুলি করতে থাকেমিলিটারিদের গুলিতে আমাদের জুট কেসের কয়েকজন শ্রমিক আর অন্যান্য মিলের কয়েকজন শ্রমিক মারা গেলোআমার শরীরেও গুলি লাগেআরো কিছু লোকের শরীরেও গুলি লাগছিলোতাদের মিলিটারিরা তুলে নিয়ে গেলোপরে এদের আর কোনো খবর পাওয়া যায় নাইআমার যে গুলি লাগছে সেটা কিন্তু প্রথমে আমি বুঝতে পারি নাইএকজন আমারে বললো, ভাই আপনার জামায় রক্ততখন হাত দিয়া দেখি আমার শরীর দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে নিলামচিকিসা নিয়ে আমি এলাকাতেই লুকিয়ে থাকলাম

 

প্র: পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে আর কি করলো ?

 

উ: এপ্রিল মাসে মিলিটারিরা এখানকার কালিবাড়ি মন্দিরটা পোড়াইয়া দেয়কিছু লোক আর্মির সহযোগিতায় হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট করেমিলিটারিরা দাশ মশায় বলে একজনকে রেল গেটে এনে গুলি করে মারেতার বাড়ি মানিকতলায়আর একটা ঘটনাএটা বোধহয় জুলাই মাসের শেষের ঘটনাআমি নদীর পারে এক বাড়িতে রাতে  শুয়ে আছিরাত ৩ টার দিকে শুনি খুব হৈ চৈ হচ্ছেচারদিকে মহিলাদের আর্তনাদআমি ঘর থেকে বের হয়ে এখানে যে একটা জ্বালানি কাঠের দোকান ছিলো-সেখানে গিয়ে দেখি কয়েকজন বিহারী কিছু মহিলারে ধরছেজানলাম এরা সব হিন্দু মহিলামহিলারা বোধহয় ছেলে-পেলে নিয়ে রাতের বেলা কোথাও চলে যাচ্ছিলোআর তখনই বিহারীরা ওদের ধরছেধরার পরে জোয়ান মহিলাদের তারা এক দিকে করছেআর যারা বৃদ্ধ তাদের গুলি করে নদীতে ফালায় দিলোছোট ছোট কোলের বাচ্চাদেরও তারা নদীতে ফেলে দিলোদূর থেকে আমি আরো দেখলাম, বিহারীরা জোয়ান জোয়ান মেয়েদের ধরে এক জায়গায় জড়ো করছেএরপর দেখলাম মিলিটারিদের একটা গাড়ি এসে ওদের উঠিয়ে নিয়ে গেলো

 

প্র: এখানে পাক আর্মিদের ক্যাম্প কোথায় কোথায় ছিলো ?

 

উ: এই এলাকায় মিলিটারিদের একটা ক্যাম্প ছিলো মহসীন স্কুলের ওখানেআরেকটা ছিলো বর্তমান বিডিআর ক্যাম্পেবোয়ালখালিতে একটা ক্যাম্প ছিলোআরেকটা ছিলো শাহপুর বাজারেরেল গেটের ওখানেও একটা ছোট ক্যাম্প ছিলো

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছিলো কি ?

 

উ: আমার পরিবারের কেউ শহীদ হয় নাই

 

প্র: এই এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তপরতা শুরু হয় এবং তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে এখানে মুক্তিবাহিনীর তপরতা শুরু হয়১৬ জুলাই কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এখানে আসেএই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিলোমুক্তিযোদ্ধারা মাসুদ নামে এক রাজাকার কমান্ডারকে গুলি করেকিন্তু সে বেঁচে যায়মুক্তিযোদ্ধাদের এই অপারেশনে আমিও তাদের একজন সহযোগী হিসেবে ছিলামএই ঘটনা সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেএদিককার লোক বেশিরভাগ রাজাকার ছিলো এবং এলাকাটাও মুসলিম লীগের ঘাঁটিস্হানীয় অল্প কিছু লোক স্বাধীনতার পক্ষে ছিলোআমি এখানকার স্হানীয় নাআমার অরজিনাল বাড়ি নারায়ণগঞ্জআমার বাবা অনেক আগে থেকে এখানে একটা মিলে চাকরি করতোআমি ছোট বেলা থেকেই এই এলাকায় আছিএখন আমি স্হায়ীভাবে বসবাস করছিমুক্তিযোদ্ধারা তখন সামনা সামনি এই এলাকায় যুদ্ধ করেনিদেশ স্বাধীনের কয়েকদিন আগে থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্যে আসেমুক্তিযোদ্ধারা এই এলাকায় এক জায়গায় থাকতো নাবিভিন্ন জায়গায় থাকতোতবে অপারেশনের সময় সব এক জায়গায় হতোমুক্তিযোদ্ধাদের এখানে কোনো ক্যাম্প ছিলো নাএই এলাকার মানুষ মুক্তিবাহিনীর পক্ষে মনে মনে থাকলেও প্রকাশ্যে ছিলো নাকারণ এলাকাটাতো ছিলো মুসলিম লীগের

 

প্র: এই এলাকায় রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটিতে কারা ছিলো ?

 

উ: আলী আকবর বিশ্বাস এখানে শান্তি কমিটির সেক্রেটারি ছিলোসে দৌলতপুর থানারদিয়ানার আলী বকসও শান্তি কমিটিতে ছিলোসবার নাম এখন আমার খেয়াল নাইতখন এই এলাকার ভিতরে যারা প্রভাবশালী লোক ছিলো তারাই শান্তি কমিটিতে ছিলোরাজাকারে তো বহু লোক ছিলোরাজাকার বাহিনীতে রহমান শেখ ছিলোসে বড় রাজাকার ছিলোমুক্তিযোদ্ধারা তাকে হত্যা করেতারপর শাহাদ, মান্নান, মতি, বেলায়েত, সালাম এবং আরো অনেকে রাজাকার বাহিনীতে ছিলো

 

প্র: এরা এখন কোথায় ?

 

উ: বেশ কিছু তো দেশ স্বাধীনের পরে মারা পড়ছেকয়েকজন রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধারা আটক করে জেলে পাঠায়পরে তারা মুক্ত হয়শাহাদকে মুক্তিযোদ্ধারা আটক করেছিলোপরে সে কিভাবে যেন পালিয়ে যায়

 

প্র: দেশ স্বাধীনের পর এই এলাকার অবস্হা কেমন দেখলেন ?

 

উ: আমাদের এলাকায় নদীর ওপারে আর্মি গিয়ে বাড়িঘর জ্বালায় দিছেলোকজনরে গুলি করে মারছেআমার ঘরে আগুন দিছেএখানকার সিএসডি গোডাউন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেরেল লাইনের দুপাশে অনেক বস্তি ঘর ছিলোসে ঘরগুলা তারা