নাম : মনোদা বিশ্বাস

পিতা : নিতাই মন্ডল

স্বামী : বিজয়কুমার বিশ্বাস

গ্রাম : দেবিতলা, ইউনিয়ন : গঙ্গারামপুর

ডাক : দয়ারডাঙ্গা, থানা : বৈঠাঘাটা, জেলা : খুলনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা : পঞ্চম শ্রেণী

১৯৭১ সালে বয়স : ৪০

১৯৭১ সালে পেশা : গৃহিনী

বর্তমান পেশা : গৃহিনী

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের কথা আপনার মনে পড়ে কি ?

 

উ:, মনে আছেসে বছর দেশে যুদ্ধ হইছিলোযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদিন আমাগোর এখানে চকরাখালি স্কুলে গুলি হইছিলোসে সময় ওখান থাইকে লোক আইসে আমাগোর বাড়িতে উঠলো

 

প্র: চকরাখালি কোন জায়গায়--চকরাখালি আপনি চেনেন কি ?

 

উ: চকরাখালি দলমোরা ইউনিয়নেআমি জায়গাটা চিনিচকরাখালি নদীর ওপার

 

প্র: ওখান থেকে আপনাদের বাড়িতে কারা এসেছিলো-তাদের আপনি চিনতেন কি ?

 

উ: আমাগো আত্মীয়-স্বজনরা আইসে ছিলোওরা মাতব্বর বাড়ির লোকতাগো আমি চিনতামওরা আমাগো বাড়িতে আইসে ছিলো

 

প্র: এটা কোন মাসে ?

 

উ: বাংলা বৈশাখ মাসেঐ মাসের শেষের দিকে

 

প্র: তারপরে কি হলো ?

 

উ: ওরা আমাগো এই জাগায় ছিলোতারপর জ্যৈষ্ঠ মাসের ৪ তারিখে আমাগো এই জাগায় খানসেনা আসিলো

 

প্র: সেই দিনের ঘটনা বলতে পারবেন কি ?

 

উ:, পারুমসকালে হঠা আমাগো এলাকায় গুলি হতে লাগিলোপূবের দিকে পট পট গুলির শব্দআমি ওই শব্দ শুইনাও মনে করছিলাম ওটা কিছু নাসেই সময় আমি রান্না করতেছিলামতখন আমার একটা ভাই আইসে বলিলো যে, ভাত টাত আর রান্না করতি হবি নাতাড়াতাড়ি হাঁটা দেওসব লোক চইলে যাচ্ছেগুলি হচ্ছে ওদিকেতারপরে আমরা সব চইলে গেলাম বাড়ি থেকেদৌড় দিলাম একদিকে

 

প্র: আপনি কোন দিকে দৌড়ালেন ?

 

উ: পশ্চিম দিকে দৌড় দিলামদৌড় দিয়াই মনে পড়িলো আমার মেজ ছেলেটা ঘরে ঘুমাইয়া আছে

 

প্র: মেজ ছেলের কথা মনে হওয়ার পর আপনি কি করলেন ?

 

উ: আবার বাড়ি ফিরে আইলামমেজ ছেলে একটা খাটে মশারির নিচে ঘুমাই ছিলোওরে মশারির তলের থাইকে টাইনা উঠায় নিয়ে আবার দৌড় দিলামতারপর ভাইয়ের হাতে ওকে দিলামভাই ওরে নিয়া দৌড়াই যাইয়া নৌকায় উঠিলোওরা নৌকা ভাসাই দিলে আমি ডাঙা দিয়া দৌড় দিলামআমার এক কাকা ছিলোসেই কাকারে নিয়া আমি ডাঙা দিয়া দৌড় দিলাম

 

প্র: আপনার স্বামী ?

 

উ: সে সময় বাড়ি ছিলো না

 

প্র: আপনার স্বামী কোথায় ছিলো ?

 

উ: বাদামতলা বাজারে ছিলোআমি কাকারে বলিলাম আমার স্বামীরে রাইখে বাড়ি থাইকে আমি কি কইরে যাই ! উনি আমারে কলো বাবুরে পাবানে পরেতুমি এখন আমার সাথে আসোএই কলি আমি তার সাথে হাঁটা দিলামহাঁটা দিলি আমাগো বাড়ির ঐ পাশে পশ্চিমে ধারে একটা বাড়ি আছে, সেই বাড়ির ধারে যাইয়া দেখি যে, বাবু এই দিকে আসতেছে

 

প্র: বাবু কে ?

 

উ: আমার স্বামীসে বাড়ি যাইতেছিলোতারপরে বাবুরে কাকা আর বাড়িতে যাইতে দিলো নাউনি বলিলো যে, ওরা (পাকিস্তানি সৈন্য) আইসে গেছে, গুলি হতিছে ওদিক আর যাইয়ো নাশেষে ওখান থাইকে সবাই পশ্চিম দিকে হাঁটা দিলামওখানে পশ্চিম পাশে একটা খাল আছে, লোকে বইন্যা খাল বলেসেই খালে একটা বড় চারওর উপর দিয়া মানুষ খাল পার হয়তার পাশে আরেকটা খালবড় খালের পাশেই একটা ছোট খালআমরা চারটা পার হইয়া ওই ছোট খালের পাশে গেলি দেখি যে, মিলিটারিরা কোন দিক দিয়া যেন ওখানে আইছেআমরা মিলিটারির সামনে পড়ি গেলাম

 

প্র: তখন আপনার সঙ্গে কে কে ?

 

উ: সে সময় আমার সঙ্গে ছিলো প্রফুল্ল বাউয়ালী আর তার বউসে ওপাড়ার বাজারে থাকতোআর আমাগো বাড়ির পূবের পাশে একটা বাড়ি ছিলো, সেই বাড়ির একটা বুড়া লোক আর আমার সেই কাকা

প্র: আপনার স্বামী ?

 

উ: হ্যাঁ, সেও সঙ্গে ছিলোআমরা যে চারটা দিয়া খাল পার হইছিলাম সেই চারটা তখন প্রায় ভাঙি গেছিলোমিলিটারিরা আমাগো দেইখা কলো যে, আপনারা কেউ দৌড়াবেন নাঐ জাগায় দাঁড়ানআমরা বলছি যে, কি জন্যি দাঁড়াবো ? তারপর মিলিটারিরা ঐ চার দিয়া খালটা পার হইয়া আমাগো কাছে আইলো

 

প্র: কেন দাঁড়াবো এ কথা কে বললো ?

 

উ: আমাগো মধ্যি থাইকে কে যেন বলিলোওখানে আগে থাইকে আরো কটা পুরুষ লোক এবং মায়েলোক ছিলোতা ওরা আবার কলো দাঁড়ানতখন আমরা সব রাস্তার মধ্যে দাঁড়াই গেলাম

 

প্র: এটা কোন জায়গার ঘটনা ?

 

উ: এটা বাদামতলা বাজার থাইকে একটু দূরে, উত্তর পাশে যাইয়ে

 

প্র: ঐ রাস্তা দিয়ে আপনারা যাচ্ছিলেন ?

 

উ: হ্যাঁ, তারপর ওখানে আমরা দাঁড়াই গেলি আমাগো উত্তর পাশে একটা মিলিটারি, দক্ষিণ পাশে একটা আর মধ্যে একটা আইসে দাঁড়ালোদাঁড়ায়ে মধ্যিখানে যেডা সে তার হাতের মেশিন, কি যেন নাম ! সেটা দিয়া আমাগো ঠেইলে ফালাই দিলোপরে ওরা ওই বুড়াটা আর আমার সেই কাকারে ঠেইলে ফেলাই দিলোতারপর বলিলো বুড়া ভাগকাকা উল্টাই পড়ি গেলোআমার স্বামীও আমারে সেই সাথে ঠেইলে দিলোঠেইলে দিয়া বলিলো ওদের পিছনে দৌড়াওতখন ঐ দুই বুড়ার পাছ পাছ আমরা সবাই দৌড় দিলামবাবুও দৌড় দিলোদৌড়াই যাইয়ে ওখানে একটা বাড়ি ছিলো সেই বাড়িতে উঠলাম

 

প্র: তখন ওখানে ওরা কি করলো ?

 

উ: ওরা গুলি করিলোব্রাশ ফায়ার না কি কয়! সেটা করিলোপট পট খালি গুলিঅনেক মানুষ গুলি লাইগে পইড়ে গেলো

 

প্র: কতজন লোক ছিলো ঐ জায়গায় ?

 

উ: অনেক লোক ছিলো

 

প্র: ওরা কতজন লোককে দাঁড়াতে বলেছিলো ?

 

উ: শতেক খানিক হবে

 

প্র: দৌড় মেরেছিলো কত জন ?

 

উ: কয়জন দৌড় মারিছিলো তাতো আর দেখতি  পারি নাইওনে যে বেশ কয়জন মরিলো সেটা আমি জানি

 

প্র: তারপর আপনারা কি করলেন ?

 

উ: গুলি শুরু হওয়ার পর আমরা বাগানের মধ্যি চইলে গেলামবাগানের ভিতর বসে থাইকে দেখতি লাগলাম মিলিটারিরা ওখানে গুলি কইরে বাদামতলা বাজারে আগুন দিলো, মুচি বাড়ি আগুন দিলোগুলি কইরে ওরা এদিক ওদিক যাতি লাগলোএ বাড়ি যাইয়ে আগুন দেয় ও বাড়ি যাইয়ে আগুন দেয়

 

প্র: বাগানের মধ্যে বসে আপনারা সব দেখছেন ?

 

উ: সব দেখতিছিবাগানের ভিতর থাইকে একটু বার হচ্ছি, খানিক দেখি, আবার বাগানের মধ্যি চলি যাচ্ছিতারপর ওরা জোয়ারদার বাড়িতে আগুন দিলোসে সময় আমরা সব গো আড়ার (জঙ্গল) মধ্যি ঢুকি গেলামওখানে যাইয়া বসি থাকলামএরপর দেখি যে মিলিটারিরা মনোরঞ্জন বাবু, নিখিল বাবুগো বাড়িতে আগুন দিয়া ফিরি আসতি লাগলোওই আড়ার মধ্যি আমাগো মতো আরো অনেকে লুকায় ছিলোআমার ধারে ছিলো এক ছোট মেয়েসে আমারে কানতে কানতে কলো, দিদিমা, আমার দাদু তো মইরে গেছেআমি এখন কি করবো !

 

প্র: মেয়েটির বয়স কত ?

 

উ: তখন দশ-বারো বছরসে কানতেছে আর কইতেছে আমি এখন কি করবো ! আমি কইলাম, মনি, আমরা তো অনেক লোক আছিতুমি আমাগো সঙ্গে যাইওনিতা সে কয় যে, না, আমি দাদুর ধারে যাইতাই কইয়ে সে ও রাস্তায় চলি গেলো

 

প্র: মেয়েটির দাদুকে মিলিটারিরা কোথায় হত্যা করেছিলো ?

 

উ: যে জায়গায় মিলিটারিরা আমাগো দাঁড় করাইছিলো ! ওখানেই তো সবাইরে গুলি করিলোতারপর  দেখি মেয়েটি সত্যি সত্যি রাস্তায় চইলে গেলোআমি আড়ার মধ্যি থাইকে দেখিলাম মিলিটারিরা মেয়েটিরে ধরিলোতাই দেইখে আমি আড়ার আরো ভিতরে চইলে গেলামতারপর ওই মেয়েটির কি হইলো সেটা আমি আর দেখতি পারলাম না

 

প্র: তারপর আপনি কি করলেন ?

 

উ: আড়ার মধ্যি অনেকক্ষণ বসি থাকিলামমিলিটারি চইলে গেলে আমার স্বামী ফিরি আইলোসে আড়ার আর এক কোণে ছিলোসে আইলে আমরা আড়ার মধ্যি থাইকে বাহির হয়া মরা দেখতি লাগিলামএকটা মুসলমান আমাগো খেতের কাজ করিতোদেখিলাম সেই মুসলমানডারেও মিলিটারিরা ওখানে মারি ফালায় দিছে

 

প্র: মিলিটারিরা ওখানে কতজন লোককে হত্যা করেছিলো ?

 

উ: দেখিলাম ১০/১২ জন মরাআধ মরা দেখিলাম ১৫/২০ জন

 

প্র: যারা ওখানে নিহত হয়েছিলো বা আহত হয়েছিলো তাদের কাউকে আপনি চিনতেন কি ?

 

উ:, কয়েক জনরে চিনতামআমাগো এ জাগায় এক ঠাকুর ছিলোসেই ঠাকুর আর তার বউফুলতলার সুশীল বিশ্বাসের বউরে চিনিলামআর যে মুসলমানের কথা বলিলাম তারে চিনিলামআর কাউরে চিনিলাম না

 

প্র: যারা গুলিতে নিহত এবং আহত হয়েছিলো তারা কোন্‌ এলাকার ?

 

উ: আমাগো গ্রামের আশে-পাশের

 

প্র: আহত লোকদের কি হলো ?

 

উ: তা তো আর দেখতি পারিলাম নাআমার স্বামী আইসে আমাগো নৌকায় নিয়া গেলোআমাগো নৌকা একটু পর ওখান থাইকে ছাইড়ে দিলোনৌকা ছাড়ার আগে নৌকায় বসি থাকার সময় দেখি যে একটা ছেলে ওখানে চেঁচাচ্ছে আর আমারে কতিছে, ওরে মা, তুই বাইর হস নেতোরে মিলিটারিরা গুলি কইরে মাইরে ফালায় দেবানিদেখ, মিলিটারিরা আমারে কি করছে ! আমি তারে কইছি তোর কি করছে রে ? তারপর ওর কাছে যাইয়া দেখি যে, ওর হাতে গুলি লাগে রক্ত বেরোচ্ছেআমারে কাছে পাইয়া সে বলিলো, ওরে মা, আমারে একটু জল দে, আমারে একটু জল দেআমি ওখানে কোনো জাগায় একটু জল পাই নাএকটা গেলাশ বা ঘটি-বাটিও নাইকিসে করে ওরে জল দিবো ! অনেক খোঁজাখুঁজি করি একটা মাটির বাটিতে জল আইনে ওরে জল খাওয়ালামজল খাওয়াইয়া দেখি যে, ওর হাতের যেখানে গুলি লাগিছে সেখানে হাড় মাংশ প্রায় নাইআমি ওর চাদর দিয়া তার হাতখান বান্দি দিলামতখন সে আমারে বলিলো, ওমা আমি বাঁচবানে ! তা আমি কইছি, ও মানিক বাঁচবানেতোমার তো আর কোনো জাগায় গুলি লাগেনিখালি হাতে লাগিছেডাক্তারের কাছে গেলি তুমি বাঁচবানেএই কতি কতি দেখি যে তার এক কুটুম্ব আইসে তারে নিয়া চইলে গেলো