নাম : মৃণালকান্তি দাস

গ্রাম : মঈনপুর

ডাক : মঈনপুর বাজার

থানা : কসবা

জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া

১৯৭১ সালে বয়স : ১৬

১৯৭১ সালে শিক্ষাগত যোগ্যতা : নবম শ্রেণীর ছাত্র

১৯৭১ সালে পেশা : স্কুল ছাত্র

বর্তমান পেশা : সরকারি চাকুরি

 

 

মুক্তিযোদ্ধা মৃণাকান্তি দাস ট্রেনিং শেষে অসংখ্য যুদ্ধে  অংশগ্রহণ করেছেনতিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ দিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেনতিনি বলেছেন মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার জীবন-মরণ কাহিনী,জানিয়েছেন নির্যাতিতা মা-বোনদের কথা

 

প্র: আপনি কোথায় ট্রেনিং নিলেন? কোথায় কোথায় যুদ্ধ করলেন?

 

উ: আমি এইখান থেইকা ভারতে চইলা যাইতারপর গোকুলনগর ক্যাম্পে যাইয়া মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করলামসেখান থেকে যুদ্ধে গেলামসেখানে একজন ভারতীয় অফিসার ছিলেন উনার নাম রবীন্দ্র সেনউনি আমাদেরকে প্যারেড পি. টি করাইতেনএরপর আমাদের কিছুলোককে পাঠায় আসামের কাছার ডিস্ট্রিক্ট-এর লায়ালপুরসেখানে আমাদেরকে ট্রেনিং দেয়ার জন্য নিয়া যাওয়া হয়সেখানে আমরা ২১ দিন ট্রেনিং করলামট্রেনিং শেষ করার পর আমরা মেলাঘর ক্যাম্পে আইসা অবস্হান করলামএখানে প্রায় ১৫ দিনের মতো ছিলামআমরা প্রায় সাড়ে চারশ মুক্তিবাহিনী একত্রিত হইয়া কসবা দেবীপুরে আইসা যুদ্ধে নামলামআমরা এইহানে গ্রুপ গ্রুপ হইয়া ভাগ হইলামএখানকার যুদ্ধে আমাদের বহু মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারাইলমারা যাওয়ার একমাত্র কারণ হইল আমাদের কাছে উন্নত মানের আর্মস কিছু ছিল নাএকটা ঘটনার কথা বলিমাসটা বোধহয় বাংলা আশ্বিন মাসলতুয়ামুড়া ক্যাম্পে যখননি আমরা যুদ্ধ করতে গেলাম তখন সন্ধ্যাআমাদের সাথে ইন্ডিয়ান ফৌজের কথা ছিল যে তারা আমাদের সাথে মিশা ক্যাম্পে অ্যাটাক করবোতারা আমাদেরকে এডভান্স করাইয়া দিয়া তারা পিছনে থাকলো  কিন্তু সঙ্গে গেল নাআমরা পাঞ্জাবিদের অবস্হানের ভিতর ঢুইকা গেলামপাহাড়ের ভিতরে পাঞ্জাবিরা ছিলআমরা সেই পাহাড়ের ভিতরে চইলা গেলামসেখানে আমরা যার যার পজিশনে গিয়া যুদ্ধ করতে লাগলামতখন দেখা গেল কি পাঞ্জাবি বা রাজাকার বাহিনী যারা ছিলো তাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী মিশা গেছেআমরা সবাই সবার সাথে মিশা গেছিগাকে মারা মারে বলা যাইতেছে নাঅন্ধকার রাত্র,কেউরে কেউ দেহিনাসেখানে আমরা অনেকক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করার পর দেখা গেল আমাদের মুক্তিবাহিনী মাইর খাইয়া যাইতেছেপাঞ্জাবিরা হেভি বাংকার করছেসেখানে আমরা আক্রমণ কইরা কিছু করতে পারতেছি নালোকগুলি মারতেও পারতেছি নাপাহাড়ের নিচে গর্ত কইরা তারা বাংকার করছেশেষ পর্যন্ত আমরা নিজেদের জান বাঁচানোর জন্য সেখান থেইকা সইরা আসলামসইরা আমরা উচুতে চইলা আসলামসেখানে আইসা ইন্ডিয়ান যে ফোর্স আমাদের সাথে দেওয়ার কথা ছিল তা নিয়া তাদের সাথে নেক কথা কাটাকাটি হইলকথা কাটাকাটি করার পরে আমরা কইলাম আমরা এখানে থাকব নাক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন সাবের আন্ডারে আমরা ছিলামএরপরে আমরা সবাই একসাথে মিলিত হইয়া এখান থেইকা কোনাবনে ফোর বেঙ্গলের ক্যাপ্টেন গাফফার সাবের আন্ডারে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়া আমরা উনার সঙ্গে কাজ শুরু করলাম

 

আর একটি ঘটনার কথা বলিজাজিসার নামে একটা গ্রাম আছেগ্রামের পশ্চিম দিকে একটা খালএই গ্রামের ভিতর তামাক বেপারী আদম মিয়ার বাড়িএর বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা পাকা কবর ছিলসেই পাকা কবরটা খুইদা আমরা বাংকার করলামপ্রথম বাংকারটাতেই আমরা ছিলামএই বাংকার থেইকা আমরা কাজ করতে লাগলামতেমন কোনো অসুবিধা হয় নাইশুধু মারামরি হইতেছে নওয়া গ্রামেনওয়া গ্রামে তখন পাঞ্জাবি ছিলতাদের সাথে আমাদের মারামারি চলতাছেওরাও সামনের দিকে এডভান্স করতে পারতেছি নাযার যার ডিফেন্সেই আমরা রয়ে গেলামএহানে কিছুদিন থাকার পর আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেব আমাদেরকে এহান থেইকা ক্লোজ কইরা নিয়া গেল বেলুনিয়াবেলুনিয়া নোয়াখালী জেলার মধ্যেআমরা সেখানে কিছুদিন অপারেশন করেছিসেইখান থেইকা আমাদের নিয়া গেল ডাইরেক্ট চিটাগাংচিটাগাং নিয়া যাওয়ার পর ইউনিভার্সিটিতে আমাদের ক্যাম্প করা হইলএরপর দেশ স্বাধীন হয়

 

প্র: যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আপনি এলাকায় কি দেখলেন? স্কুল,কলেজ,মসজিদ,মাদ্রাসা,মন্দিরের অবস্হা কি দেখলেন?

 

উ: স্কুল,কলেজ,মসজিদ,মাদ্রাসা এইগুলি প্রায় ধ্বংসের মতোতবে আমাদের গ্রামে যে মসজিদটা আছিল সেটার বিশেষ কিছু হয়নিএই এলাকাতে মন্দির ছিলমন্দিরের টিনগুলা পাকবাহিনী নিয়া বাংকারের কাজে লাগাইছে

 

প্র: আপনি কি বলবেন যে পাকিস্তনিরা মুসলমান এবং হিন্দুকে কিভাবে চিহ্নিত করত?

 

উ: মুসলমান এবং হিন্দুদেরকে চিহ্নিত করাইছে রাজাকাররারাজাকার বাহিনী পাশের এলাকায় বা গ্রামে আইসা এইটা হিন্দু বাড়ি,এইটা মুসলমান বাড়ি-এইভাবে চিনাই দিছেতারা হিন্দু বাড়িতে অনেক লুটতরাজ করছেএমন কি মুসলমান বাড়িতেও তারা আগুনদা জ্বালাইছে এবং অনেক কিছু লুটতরাজ করছেটি. আলীর বাড়িতে যে লোকগুলারে ধইরা নিত,সেই লোকগুলা সেইখান থাইকা আর বাঁইচা আসতে পারে নাইতাদেরকে মাইরা ফালাইতো গুলি কইরাঅনেককে ধইরা পাঁচ কলেমা জিজ্ঞাসা করছেনা পারলে গুলি কইরা মারছেমেয়েদের উপর অত্যাচার করছে বেশিএই ব্যাপারে আমার একটি ঘটনার কথা মনে আছেতিন জন মহিলাতাদের বাড়ি নোয়াখালি ছিলএকদিন রাত্রের বেলা হঠাৎ কইরা রাত্র প্রায় তিনটা বাজে তাদেরকে পাইআমরা তখন জাজিশার গ্রামেআমি বাংকারে পাঞ্জাবিদের সাথে লড়াই করতেছি; গোলাগুলি চলতাছেজ্যোৎস্নাভরা রাত কিন্তু কুয়াশা আছেকুয়াশা ঢাকা হইলেও কিছুটা দেখা যাচ্ছিলবাংকার থেইকা তিনটা মেয়েলোকের মতো দেখলামতারা আমাদের সামনের দিকে আসতাছেযহনি অ্যাডভান্স কইরা আসতেছে তখন আমাদের বাম সাইডে যে লোকজন ছিল তারা কভারিং ফায়ার করছেআবার ডাইন সাইডে যে লোকগুলো ছিল তারাও কভারিং ফায়ার দিছেআবার ডাইন সাইডে যে লোকগুলো ছিল তারাও কভারিং ফায়ার দিছেকিন্তু আমার সামনে যে তারা আসতেছে আমি কিন্তু কোনো ফায়ার করতেছি নাতারা জাজিশার গ্রামের খালের উপর দিয়া আসতেছেযদি আমি ফায়ার করি তাহরে তারা তিনজনই মারা যায়আর আমাদের দুনো সাইড থেইকা যে ফায়ার করতেছে সেটা ঐ খালের পাড়ের কারণে তাদের উপর গুলি পড়তেছে নাযার ফলে তারা খালের উপর দিয়া নিচু হইয়া সামনের দিকে আসতেছেতারা যখন আসতেছে তখন তাদেরকে আমি হল্ট করাইলামহল্ট করার পরে তারা আমার কাছে আত্মসমর্পণ করলোআত্মসমর্পণ করার পরে তহন তাদেরকে আমি আমার বাংকারে নিয়া আসলামনিয়া আসার পরে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলামআমি ভাবলাম যে হয়তো তারা আমাদের কোনো শত্রু পক্ষে লোক হইতে পারে বা মিত্র পক্ষের হইতে পারেসেইজন্য তাদের কাছ থেকে ডিটেলসটা জানলামতাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা কে বা কি? তাদেরে জিজ্ঞাসা করার পরে তহন তারা বললো যে আমাদের বাড়ি নোয়াখালীমেয়ে তিনজন শিক্ষিততাদের পরনে ছিলো সালোয়ার কামিজকিন্তু সেই জামা কাপড় ছিলো রক্তে ভরাপাঞ্জাবিরা রাজাকার বাহিনী দিয়া মহিলাদেরকে ধরে আনেযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়মেয়েগুলা যখন নাকি আসল তখন তাদেরকে আমরা আশ্যয় দিলামমেয়েগুলা খুবই কাঁদছিলোতখন আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে তাদেরকে নেওয়া সম্বব ছিল নাকারণ আমি ডিফেন্স ছেড়ে যেতে পারতেছি নাতখন আমরা প্লাটুন কমান্ডারের কাছে নিয়া গেলামপ্লাটুন কমান্ডার আমাকে সহকারে মহিলাদের নিয়া কোম্পানি কমান্ডারের কাছে গেলকোম্পানি কমান্ডারের বাড়ি সিলেট,উনার নাম অইল আম্বিয়াতিনি মেয়েগুলাকে ভারতে উঠাইয়া চিকিৎসা করার জন্য হাসপাতালে পাঠাই দেনএরপরে মেয়েগুলা দেশে আসছে না আসছে আর কোনো খবর জানি নাএইরকম অনেক ঘটনা ঘটছে

 

আর একটি অন্য ঘটনার কথা বলিআমাদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়াতাকে তো আমরা মাডি দিয়াই ফেলছিলাম আরকিঘটনাটা হইল-পাকিস্তানিরা শেল মারতাছেআওয়াজে আর ভয়ে সে আমার বাংকারে চইলা আসেকুঠি চৌমুহনী থাইকা পাকসেনারা ব্যাংক শেল ছুঁড়তেছেশেল মারায় তাঁর কানের পর্দা নষ্ট হইয়া গেলশব্দের চোটে একসময় ফুল মিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়েআমরা মনে করছি সে মারা গেছিলোআমরা তাদেরকে মাডি দেবার জন্য ভারতে নিয়া গেলামগোলায় মারা গেছিলআমরা তাদেরকে মাডি দেবার জন্য ভারতে নিয়া গেলামভারতে নিয়া যাওয়ার পর ফুল মিয়ারে দেইখা মনে হইল সে আমার গ্রামের ছেলেটার গায়ে মাথায় হাত দিয়া আমার কেমন জানি মনে হইলতারপর তাঁরে ওখান থাইকা উঠাইয়া আলাদা একস্হানে নিলামসেখানে নিয়া তাঁর হাত ধইরা দেখলাম-তাঁর নাড়ি চলতাছেএরপর চিকিৎসা চালানো হইল এবং সে বাঁইচা উঠলোফুল মিয়ার বাড়ি আমাদেরই পশ্চিম পাড়ায়তাঁর পিতার নাম মরহুম রমিজ উদ্দিনস্বাধীনতার পর সে সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেএই রকম বহু ঘটনা আছে

 

প্র: মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজনের নাম বলতে পারবেন?

 

উ: আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ার জহির,পূর্ব পাড়াদা সরফত আলীতারপরে হিন্দু পাড়ায় ছিলাম আমিতারপরে এই দিগদা ছিল চেয়ারম্যান আবুল কাশেমমঈনপুরের আবু তাহের,আক্কেল আলী সেও কাজ করছেএঁরা সবাই ফ্রন্ট ফাইটার ছিল

 

প্র: গ্রামে ফিরে এসে কি মাইন পোতা দেখছেন?

 

উ: হাঁ,মাইনপোতা দেখছিঅনেক লোক আহত হইছেমরছেও অনেক

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : জহিরুল ইসলাম স্বপন

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ৪ অক্টোবর ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৫৫